📄 ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিশ্বাস
আগেই দেখিয়েছি, কোনো যুক্তিতেই ইবনু মাসউদের হাতে সুরা ফাতিহা বাদ যেতে পারে না। কারণ নবিজির সময় থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি মসজিদ এবং বাড়িতে এ সাতটি আয়াত সর্বাধিক পঠিত। বাকি থাকে শুধু ১১৩ এবং ১১৪ নং সুরা। তৃতীয় পক্ষ থেকে জানা যায়, ইবনু মাসউদ সুরা দুটি মুছে ফেলার পরেও উবাই কিছুই বলেননি। এর অর্থ কী দাঁড়ায়? হয় তিনি তাতে সম্মত ছিলেন অথবা অসম্মত থাকা সত্ত্বেও উপেক্ষা করে গেছেন। এদিকে উবাই ইবনু কাবের নিজের মুসহাফেই উভয় সুরা আছে।
তাই প্রথম মতটি গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে পরেরটিও বাতিল। কেননা তা উপেক্ষা করার অর্থ হলো মানুষের পছন্দ মতো কুরআনের অংশ বাছাই করাকে বৈধতা দেওয়া। কিন্তু এ কাজ করলে কেউ মুসলিম থাকতে পারে না। তাই উবাই ইবনু কাবের নিশ্চুপ থাকার বর্ণনা একটি ডাহা মিথ্যা কথা।[১]
এবার ইবnu সাব্বাগের সমন্বয়কৃত অভিমতের ব্যাপারে আসা যাক। ফাতিমা, আয়িশা, আবু হুরাইরা, ইবnu আব্বাস এবং ইবnu মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত হাদিস থেকে জানা যায় প্রতি বছর রামাদানে নবিজি জিবরিলের সাথে একবার কুরআন খতম দিতেন। ইন্তেকালের বছরে খতম দিয়েছিলেন দুবার। ইবnu মাসউদও সেবার অংশ নেন। নবিজিকে তিনি দুবার কুরআন খতম করে শুনিয়েছেন, যা শুনে নবিজি বলেছিলেন, ‘ভালো করেছ।’ এর প্রেক্ষিতে ইবnu আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পাঠকে চূড়ান্ত বিশুদ্ধ জ্ঞান করেন।[২]
এসব মূল্যায়ন দ্বারা বোঝা যায়, ইবnu মাসউদের স্মৃতিতে কুরআন একদম খোদাই করা ছিল। আলকামা, আসওয়াদ, মাসরুক, সুলামি, আবু ওয়াইল, শাইবানি, হামাদানি এবং যিরের মতো প্রসিদ্ধ ছাত্ররা তাদের শিক্ষক ইবনে মাসউদের সূত্রে কুরআনের ১১৪টি সুরাই বর্ণনা করেছেন। বিচ্ছিন্ন বর্ণনাটি পাওয়া যায় একমাত্র যিরের ছাত্র আসিমের কাছ থেকে।[৩] অথচ তার (যিরের) কুরআন-শিক্ষার সূত্র নবিজি পর্যন্ত পৌঁছায়ই ইবnu মাসউদের মাধ্যমে।[৪]
টিকাঃ
১. অধ্যায় ১৩. ৩ এর ইমাম বাকিল্লানির অংশটুকু দ্রষ্টব্য।
২. মুসনাদু আহমাদ, ২৪৯৪, ৩০০১, ৩০১২, ৩৪২২, ৩৪২৫, ৩৪৬৯, ৩৫৩৯ এবং ৩৮৪৫ দ্রষ্টব্য।
৩. আসিম হলেন কিরাতের প্রসিদ্ধ ইমাম। তার বর্ণনায় কুরআনের ১১৪টি সুরাই আছে। তিনি তার কিরাতের শিক্ষা যে সনদে অর্জন করেছেন, সেটা ইবনু মাসউদ হয়েই নবিজি পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে। আর এ কিরাতটি মুতাওয়াতির সূত্রে সাব্যস্ত। এতে পরিষ্কারভাবে প্রমাণ হয় ইবনু মাসউদ অন্যান্য সাহাবির মতো কুরআনের ১১৪টি সুরাতেই বিশ্বাস রাখতেন। নয়তো তার সূত্রে ইমাম আসিম ১১৪ টি সুরা কীভাবে পেলেন? সুতরাং এমন মুতাওয়াতির সব বর্ণনাকে একপাশে রেখে শুধু বিচ্ছিন্ন একটি বর্ণনাকে মূল ধরে ইবনু মাসউদের ব্যাপারে ভুল ধারণা করার কোনো সুযোগ বা বৈধতা নেই। এটা খুব ভালো করে মনে রাখতে হবে-শুধু এক-দুটি সনদের বর্ণনাকারীদের বিশ্বস্ততা দেখেই হাদিসের ওপর ‘সহিহ’ এর হুকুম লাগানো সঠিক নয়; বরং এক্ষেত্রে আরও লক্ষ রাখতে হয়, এ বর্ণনাটির সাথে অন্যান্য বর্ণনার সংঘর্ষ আছে কি না। সংঘর্ষ থাকলে সেক্ষেত্রে অধিক শক্তিশালী কিংবা অধিকাংশ বর্ণনাকারীদের বর্ণনাই প্রাধান্য পায়। এটা উলুমুল হাদিসের স্বীকৃত একটি নীতি। এ নীতিকে পাশ কাটিয়ে শুধু এক-দুটি বর্ণনার বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতা দেখেই ধোঁকা খাওয়ার সুযোগ নেই। বক্ষ্যমাণ আলোচনায় বিতর্কিত বর্ণনাটি মুতাওয়াতির বর্ণনাসমূহের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। তাই নিঃসন্দেহে মুতাওয়াতিরের বিপরীত বর্ণনাটি বাতিল ও পরিত্যাজ্য বলে বিবেচিত হবে; যেমনটি ইমাম ইবনু হাযম, ইমাম নববি, ইমাম সুয়ুতিসহ উম্মাহর বিদগ্ধ আলিমগণ মত দিয়েছেন। তাই এ ব্যাপারে কথা ও মন্তব্য করতে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। শারয়ি সম্পাদক
৪. সুযুতি, আল-ইতকান, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২২১