📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 মুসহাফু ইবনি মাসউদের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ

📄 মুসহাফু ইবনি মাসউদের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ


সুরার অনুপস্থিতি-সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো নিচে দেওয়া হলো। বর্ণনাধারাও যুক্ত আছে শুরুতে।
• আসিম ইবনু বাহদালা—যির ইবনু হুবাইশ (ইবনু মাসউদের ছাত্র)—ইবনু মাসউদ : এ বর্ণনা ধারানুযায়ী তিনি মুসহাফে সুরা ফালাক এবং নাস লেখেননি।[১]
• আল আমাশ—আবু ইসহাক—আব্দুর রাহমান ইবনু ইয়াজিদ : ইবনু মাসউদ তার মাসাহিফ থেকে সুরা ফালাক ও সুরা নাস মুছে দিয়ে এ দুটোকে কুরআনের বহির্ভূত বলেছেন। [২]
• সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা—আব্দাহ এবং আসিম—যির ইবনু হুবাইশ: 'আমি উবাইকে [৩] বললাম, “আপনার (দ্বীনি) ভাই মুসহাফ থেকে সুরা ফালাক ও সুরা নাস মুছে দিচ্ছেন।” এটি শুনে তিনি কিছু বললেন না।[৪] এখানে ভাই বলতে ইবনু মাসউদের দিকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা। তিনি বলেন, ইবনু মাসউদ মনে করতেন, নবিজি এ সুরা দুটি দ্বারা (শয়তান ও জিন-জাদুর অনিষ্ট থেকে) হাসান ও হুসাইনের সুরক্ষার জন্য দুআ করেছেন। তিনি নবিজিকে এ সুরা দুটি কোনো সালাতে পড়তে শোনেননি। এ মতের ওপর অনড় ছিলেন তিনি। কিন্তু অন্য সাহাবিগণ সুরা দুটি কুরআনুল কারিমের অংশ বলে নিশ্চিত হয়েছেন, আর তাই সুরা দুটিকে কুরআনুল কারিমে রেখে দিয়েছেন।[৫]
ওপরের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বর্ণনায় দেখি—আগে থেকেই মুসহাফে থাকা দুটি সুরাকে ইবনু মাসউদ মুছে দিচ্ছেন। তাহলে প্রথমে লিখলেনই-বা কেন? ধরে নিলাম অন্য কেউ তার হয়ে লিখে দিয়েছিলেন। তাতে যদি আগে থেকেই সুরা দুটি থেকে থাকে, তাহলে নিঃসন্দেহে তা কুরআনের অংশ হিসেবেই স্থান পেয়েছিল। এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন থেকে থাকলে ইবনু মাসউদের কর্তব্য হতো মদিনা এবং অন্যান্য স্থানের আলিমদের সাথে পরামর্শ করা।
একবার তিনি একটি ফতোয়া দিয়েছিলেন, সহবাসের আগেই স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলে উক্ত নারীর মাকে বিয়ে করা বৈধ। এরপর মদিনায় গিয়ে অন্যান্য আলিমের সাথে এ বিষয়ে কথা বলার পর নিজের ভুল ধরতে পারেন তিনি। যাকে ফতোয়াটি বলেছিলেন, কুফায় ফিরে এসে সবার আগে তাকে খুঁজে বের করে আগের ভুলের ব্যাপারে জানিয়ে দেন। শাস্ত্রীয় জগতে এই ছিল যার চরিত্র, সেখানে কুরআনের মতো স্পর্শকাতর ব্যাপারে তার অবস্থা কেমন হতে পারে? সকল যুক্তি-প্রমাণ পুরো ব্যাপারটিকেই মূলত মিথ্যা সাব্যস্ত করে। আর এজন্যই ইমাম নববি এবং ইবনু হাজমের মতো পূর্ববর্তী আলিমগণ ইবনু মাসউদের নামে প্রচলিত এসব কেচ্ছা-কাহিনিকে বানোয়াট ঘোষণা দিয়েছেন।[৬]
এখানে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন (পরবর্তী যুগের) প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ইবনু হাজার। আহমাদ ইবনু হাম্বল, বাযযার, তাবারানির মতো আলিমগণ যেহেতু ঘটনাটি সঠিক সনদে বর্ণনা করেছেন, তাই তিনি অভিযোগের ভিত্তিকে উড়িয়ে দিতে নারাজ। নাহলে তা হাদিস অস্বীকারের পর্যায়ে পড়ে যেতে পারে। সমন্বয় সাধন করতে গিয়ে তাই তিনি ইবনু সাব্বাগের অভিমতের দ্বারস্থ হন। তার মতে, ইবনু মাসউদ প্রথমে এগুলোকে সুরা হিসেবে গণ্য করার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন না। কিন্তু গোটা উম্মাহ যেহেতু এটিকে কুরআনের অংশ হিসেবে বিশ্বাস করে, তাই তিনিও তা মেনে নেন।[৭] অভিযোগগুলোর পক্ষে এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হিসেবে উত্থাপন করা হয়। মুহাদ্দিসদের পদ্ধতি অবলম্বন করে আমি এ যুক্তিটি খণ্ডন করে দেখাচ্ছি।

টিকাঃ
১. মুসনাদু আহমাদ : ২১১৮৬, ২১১৮৭; হাদিসটির সনদ হাসান।
২. মুসনাদু আহমাদ : ২১১৮৮; হাদিসটির সনদ সহিহ।
৩. ‘এটি শুনে তিনি কিছু বললেন না।’ এ কথাটি মুসনাদু আহমাদের বর্ণনায় নেই। এখানে এভাবে আছে—‘তিনি এটা শুনে বললেন, আমি আল্লাহর রাসুলকে (এ সুরা দুটির ব্যাপারে) জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন—আমাকে বলা হয়েছে তাই আমি বলেছি।’ উবাই বলেন, ‘সুতরাং আমরাও বলব, যেভাবে আল্লাহর রাসুল বলেছেন।’ (মুসনাদু আহমাদ: ২১১৮৯, হাদিসটির সনদ সহিহ) সম্ভবত এখানে কিছু না বলা বলতে উদ্দেশ্য ইবন মাসউদের এ কাজটির পক্ষে বা বিপক্ষে উবাই কিছুই বলেননি; বরং শুধু নবিজি থেকে নিজের শোনা বাণীটি শনিয়েই ক্ষান্ত করেছেন। ইবন মাসউদের কাজের প্রতি সমর্থন বা নিন্দা কোনোটিই না করাকে উবাইয়ের নীরবতা বলে আখ্যায়িত করেছেন লেখক। লেখকের পরবর্তী আলোচনা আমাদের এ ধারণাকে শক্তিশালী করে। শারয়ি সম্পাদক
৪. মুসনাদু আহমাদ : ২১১৮৯; হাদিসটির সনদ সহিহ।
৫. মুসনাদু আহমাদ : ২১১৮৯; হাদিসটির সনদ সহিহ।
৬. আস-সুয়তি, আল-ইতকান, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২২১
৭. আস-সুয়তি, আল-ইতকান, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২২১-২২ দ্রষ্টব্য। অনুবাদে মার্টন অসততার পরিচয় দিয়েছেন। মূল টেক্সটের সাথে The Collection of the Quran, Cambridge Univ. Press, 1977, PP. ২২৩-২৪ মিলিয়ে দেখলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিশ্বাস

📄 ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিশ্বাস


আগেই দেখিয়েছি, কোনো যুক্তিতেই ইবনু মাসউদের হাতে সুরা ফাতিহা বাদ যেতে পারে না। কারণ নবিজির সময় থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি মসজিদ এবং বাড়িতে এ সাতটি আয়াত সর্বাধিক পঠিত। বাকি থাকে শুধু ১১৩ এবং ১১৪ নং সুরা। তৃতীয় পক্ষ থেকে জানা যায়, ইবনু মাসউদ সুরা দুটি মুছে ফেলার পরেও উবাই কিছুই বলেননি। এর অর্থ কী দাঁড়ায়? হয় তিনি তাতে সম্মত ছিলেন অথবা অসম্মত থাকা সত্ত্বেও উপেক্ষা করে গেছেন। এদিকে উবাই ইবনু কাবের নিজের মুসহাফেই উভয় সুরা আছে।
তাই প্রথম মতটি গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে পরেরটিও বাতিল। কেননা তা উপেক্ষা করার অর্থ হলো মানুষের পছন্দ মতো কুরআনের অংশ বাছাই করাকে বৈধতা দেওয়া। কিন্তু এ কাজ করলে কেউ মুসলিম থাকতে পারে না। তাই উবাই ইবনু কাবের নিশ্চুপ থাকার বর্ণনা একটি ডাহা মিথ্যা কথা।[১]
এবার ইবnu সাব্বাগের সমন্বয়কৃত অভিমতের ব্যাপারে আসা যাক। ফাতিমা, আয়িশা, আবু হুরাইরা, ইবnu আব্বাস এবং ইবnu মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত হাদিস থেকে জানা যায় প্রতি বছর রামাদানে নবিজি জিবরিলের সাথে একবার কুরআন খতম দিতেন। ইন্তেকালের বছরে খতম দিয়েছিলেন দুবার। ইবnu মাসউদও সেবার অংশ নেন। নবিজিকে তিনি দুবার কুরআন খতম করে শুনিয়েছেন, যা শুনে নবিজি বলেছিলেন, ‘ভালো করেছ।’ এর প্রেক্ষিতে ইবnu আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পাঠকে চূড়ান্ত বিশুদ্ধ জ্ঞান করেন।[২]
এসব মূল্যায়ন দ্বারা বোঝা যায়, ইবnu মাসউদের স্মৃতিতে কুরআন একদম খোদাই করা ছিল। আলকামা, আসওয়াদ, মাসরুক, সুলামি, আবু ওয়াইল, শাইবানি, হামাদানি এবং যিরের মতো প্রসিদ্ধ ছাত্ররা তাদের শিক্ষক ইবনে মাসউদের সূত্রে কুরআনের ১১৪টি সুরাই বর্ণনা করেছেন। বিচ্ছিন্ন বর্ণনাটি পাওয়া যায় একমাত্র যিরের ছাত্র আসিমের কাছ থেকে।[৩] অথচ তার (যিরের) কুরআন-শিক্ষার সূত্র নবিজি পর্যন্ত পৌঁছায়ই ইবnu মাসউদের মাধ্যমে।[৪]

টিকাঃ
১. অধ্যায় ১৩. ৩ এর ইমাম বাকিল্লানির অংশটুকু দ্রষ্টব্য।
২. মুসনাদু আহমাদ, ২৪৯৪, ৩০০১, ৩০১২, ৩৪২২, ৩৪২৫, ৩৪৬৯, ৩৫৩৯ এবং ৩৮৪৫ দ্রষ্টব্য।
৩. আসিম হলেন কিরাতের প্রসিদ্ধ ইমাম। তার বর্ণনায় কুরআনের ১১৪টি সুরাই আছে। তিনি তার কিরাতের শিক্ষা যে সনদে অর্জন করেছেন, সেটা ইবনু মাসউদ হয়েই নবিজি পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে। আর এ কিরাতটি মুতাওয়াতির সূত্রে সাব্যস্ত। এতে পরিষ্কারভাবে প্রমাণ হয় ইবনু মাসউদ অন্যান্য সাহাবির মতো কুরআনের ১১৪টি সুরাতেই বিশ্বাস রাখতেন। নয়তো তার সূত্রে ইমাম আসিম ১১৪ টি সুরা কীভাবে পেলেন? সুতরাং এমন মুতাওয়াতির সব বর্ণনাকে একপাশে রেখে শুধু বিচ্ছিন্ন একটি বর্ণনাকে মূল ধরে ইবনু মাসউদের ব্যাপারে ভুল ধারণা করার কোনো সুযোগ বা বৈধতা নেই। এটা খুব ভালো করে মনে রাখতে হবে-শুধু এক-দুটি সনদের বর্ণনাকারীদের বিশ্বস্ততা দেখেই হাদিসের ওপর ‘সহিহ’ এর হুকুম লাগানো সঠিক নয়; বরং এক্ষেত্রে আরও লক্ষ রাখতে হয়, এ বর্ণনাটির সাথে অন্যান্য বর্ণনার সংঘর্ষ আছে কি না। সংঘর্ষ থাকলে সেক্ষেত্রে অধিক শক্তিশালী কিংবা অধিকাংশ বর্ণনাকারীদের বর্ণনাই প্রাধান্য পায়। এটা উলুমুল হাদিসের স্বীকৃত একটি নীতি। এ নীতিকে পাশ কাটিয়ে শুধু এক-দুটি বর্ণনার বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতা দেখেই ধোঁকা খাওয়ার সুযোগ নেই। বক্ষ্যমাণ আলোচনায় বিতর্কিত বর্ণনাটি মুতাওয়াতির বর্ণনাসমূহের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। তাই নিঃসন্দেহে মুতাওয়াতিরের বিপরীত বর্ণনাটি বাতিল ও পরিত্যাজ্য বলে বিবেচিত হবে; যেমনটি ইমাম ইবনু হাযম, ইমাম নববি, ইমাম সুয়ুতিসহ উম্মাহর বিদগ্ধ আলিমগণ মত দিয়েছেন। তাই এ ব্যাপারে কথা ও মন্তব্য করতে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। শারয়ি সম্পাদক
৪. সুযুতি, আল-ইতকান, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২২১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00