📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 ইবনু মাসউদের মুসহাফের সুরা বিন্যাস

📄 ইবনু মাসউদের মুসহাফের সুরা বিন্যাস


ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সামসময়িকদের কাছ থেকে সুরা বিন্যাসে অমিল থাকা কোনো মুসহাফের বর্ণনা পাওয়া যায় না। কিছু দাবি উত্থাপিত হয় তার মৃত্যুর পর। ফদল ইবনু শাযানকে উদ্ধৃত করে আন-নাদিম বলেছেন, ‘মুসহাফু ইবনি মাসউদের সুরা বিন্যাস এরকম দেখেছি: বাকারা, নিসা, আলি-ইমরান... (প্রথমে
ফাতিহা নেই)।' [১] আন-নাদিম বলেছেন, তিনি নিজেও ইবনু মাসউদের নামে অনেক মুসহাফ দেখেছেন, কিন্তু এক মুসহাফের সাথে অন্যটির কোনো মিল নেই। আবার হিজরি দ্বিতীয় শতকের অনুলিখিত একটি মুসহাফের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন যেখানে সুরা ফাতিহা ছিল। কিন্তু নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য না দিয়ে ফদলের উদ্ধৃতি টেনেছেন। [২] কারণ এ বিষয়ের ওপর ফদল ইবনু শাযানের পূর্ব প্রসিদ্ধি ছিল। এখানে আন-নাদিমের মন্তব্য থেকে এটি পরিষ্কার, মুসহাফু ইবনি মাসউদের অসামঞ্জস্য প্রসঙ্গে যারা অভিযোগ তোলেন, তারা ওই মুসহাফের মূল সুরা বিন্যাস কী ছিল, তার ব্যাপারে নিশ্চিত কিছুই বলতে পারবে না।
ইবনু মাসউদের কাছ থেকে অসংখ্য প্রসিদ্ধ ছাত্র শরিয়ত (ফিকহ) শিখেছে। তার কাছ থেকে তারা কুরআন শিখেছে এবং শিখিয়েছে। তার মুসহাফ সম্পর্কে এখন পর্যন্ত আমরা দুটি মত পাই: একটির সুরা বিন্যাস বর্তমানের চেয়ে ভিন্ন, আরেকটি হুবহু আমাদের অনুরূপ। কিন্তু ভিন্ন বিন্যাসের ক্ষেত্রে সম্মিলিত বা নির্দিষ্ট কোনো রূপের ব্যাপারে ঐকমত্য নেই। কাজেই যেটি নিশ্চিত মিলে যাচ্ছে, তার সামনে এগুলোর বিচ্ছিন্নতা ধোপে টিকছে না। শক্তিশালী মতের পক্ষেই তাই আমাদের অবস্থান। ইবনু মাসউদ, উবাই ইবনু কাব এবং যাইদ ইবনু সাবিতের মুসহাফ স্বচক্ষে দেখেছেন আল-কুরাযি। তিনি সেগুলোর মাঝে কোনো পার্থক্য পাননি।[৩]
পেশাদার কারিগণ সর্বসম্মতিক্রমে প্রসিদ্ধ সাত সাহাবির কিরাতের অনুসরণ করেন। তাদের নাম হলো: উসমান ইবনু আফফান, আলি ইবনু আবি তালিব, যাইদ ইবনু সাবিত, উবাই ইবনু কাব, আবু মুসা আশআরি, আবু দারদা এবং আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ। তাদের বর্ণনাসূত্র অবিচ্ছিন্নভাবে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে এবং প্রত্যেকটি সুরা বিন্যাস একদম আজকের মতোই ছিল। যদি দাবিকৃত বিচ্ছিন্ন বিন্যাসগুলোকে কেউ পেশ করতে সক্ষমও হয়, তবুও এতে করে কুরআনের বিষয়বস্তুর কোনো এদিক-ওদিক হবে না।[৪]
ইবনু মাসউদ কুরআনুল কারিমের অধিকাংশই সরাসরি নবিজির কাছ থেকে শিখেছেন। এজন্য তাকে উসমানি মুসহাফ কমিটির সদস্য না করায় মনঃক্ষুণ্ণ হন তিনি। এমন কিছু মন্তব্য করে বসেন যা সাহাবিগণের পছন্দনীয় ছিল না। রাগ সংবরণ
হওয়ার পর তিনি হয়তো উসমানি মুসহাফের অনুসরণে নিজের মুসহাফ পুনর্বিন্যস্ত করেছিলেন। দু’রকম মুসহাফের পেছনে এটি একটি সম্ভাব্য কারণ। আল্লাহই এ ব্যাপারে সর্বাধিক জ্ঞাত।
মৃত্যুর পর তার নামে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা মুসহাফগুলোর ক্ষেত্রেই শুধু পরস্পর অমিল দেখা যায়। তাই এগুলোকে গণহারে ইবনু মাসউদের নামের সাথে চালানো মোটেও সমীচীন নয়। এমনটি যারা করেছে, তারা এর উৎস খতিয়ে দেখেনি। দুঃখের বিষয়, কিছু অসাধু প্রত্নতত্ত্ব ব্যবসায়ী এখানে মুনাফা খুঁজে পেয়েছে। পয়সার লোভে ইবনু মাসউদ কিংবা উবাই ইবনু কাবের নামে চালিয়ে দিচ্ছে বানোয়াট মুসহাফ।[১]

টিকাঃ
১. আন-নাদিম, আল-ফিহরিস্ত, পৃষ্ঠা: ২৯
২. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৯
৩. A. Jeffery (ed.), Muqaddimatan, p. 47.
৪. অধ্যায় ৫.৩.ii দ্রষ্টব্য।
৫. Muqaddimatan, A. Jeffery (ed.), p. 47-48

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 টেক্সটে ভিন্নতা

📄 টেক্সটে ভিন্নতা


কোনো মুসহাফকে ইবনু মাসউদের নামের সাথে সংযুক্ত করতে হলে প্রমাণ থাকা জরুরি। খতিয়ে দেখতে গিয়ে আবু হাইয়ান উন্দুলুসি লক্ষ করেছেন, এগুলোর বেশির ভাগ এসেছে শিয়া উৎস থেকে। সুন্নি আলিমগণ ইবনু মাসউদের মুসহাফকে মুসলিম উম্মাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মত দিয়েছেন।[২] বিচ্ছিন্ন কোনো মাধ্যম কখনো সুনিশ্চিত উৎসের ওপরে প্রাধান্য পাবে না। কিতাবুল মাসাহিফের ‘মুসহাফু আব্দিল্লাহ ইবনি মাসউদ’ অধ্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন মুসহাফকে একত্র করা হয়েছে। আর সবগুলোর উৎস ইমাম আমাশ (মৃত্যু: ১৪৮ হিজরি)। কিন্তু তিনি সেখানে কোনো প্রকার দলিল দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। তার মধ্যে তাদলিসের[৩] প্রবণতা ছিল। তার ব্যাপারে শিয়াসুলভ আচরণের অভিযোগও পাওয়া যায়।[৪] আরও অনেক উদাহরণ আছে, যার
ফলে আবু হাইয়ানর ধারণা আরও জোরালো হয়।
এবার জেফরির বইয়ের প্রসঙ্গে আসা যাক। সেখানে নিচের উদ্ধৃতাংশটি উবাই এবং ইবনু মাসউদের মুসহাফের নামে চালানো হয়েছে (কোনো সূত্র ছাড়াই), 'রাসুলের ওপর বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আলি এবং তার বংশধরেরা অগ্রগামী। সাহাবিদের মধ্যে আল্লাহ তাআলা তাদের বেছে নিয়েছেন এবং অন্যদের ওপর প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। তারাই হলেন বিজয়ী, যারা জান্নাতের অধিকারী হবেন এবং চিরকাল সেখানে থাকবেন।'[১]
আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর বংশধরদের প্রতি এমন ভাবাবেগপূর্ণ বক্তব্যের মধ্যে কেবল শিয়াদের উদ্দেশ্যর প্রতি সমর্থনই প্রকাশ পায়।[২]
অথচ মূল কুরআনে আছে, 'আর (ঈমানে) অগ্রবর্তীরা তো (পরকালেও) অগ্রবর্তী। তারাই হবে নৈকট্যপ্রাপ্ত।'[৩]
গবেষণা করতে গেলে ভিত শক্ত হতে হয়। অথচ আমরা এখানে কেবল মুখের বুলির অকূল পাথারে ভেসে বেড়াচ্ছি। মুসহাফু ইবনি মাসউদের সুনির্দিষ্ট বর্ণনা প্রমাণ করার মতো ইসনাদ তাদের কাছে নেই। তাই সবকিছু বিবেচনা করে জেফরির গবেষণা পন্থা এবং সেমতে প্রাপ্ত ফলাফল গোড়া থেকেই গলদ বলে সাব্যস্ত হচ্ছে।

টিকাঃ
১. আল-বাহরুল মুহিত, আবু হাইয়ান উন্দুলুসি, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৬১
২. হাদিসের সনদে বর্ণনাকারী কর্তৃক খুবই সূক্ষ্মভাবে নিজের শিক্ষক বা শিক্ষকের শিক্ষককে (দুর্বল হওয়ার কারণে বা অন্য কোনো কারণে) বাদ দেওয়া কিংবা নিজের শিক্ষককে তার প্রসিদ্ধ নামের পরিবর্তে ভিন্ন আরেকটি অপরিচিত নাম বা উপাধিতে উল্লেখ করাকে তাদলিস বলা হয়-সম্পাদক
৩. আল-মিযযি, তাহযিব, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ৮৭-৯২। উল্লেখ্য, শিয়াসুলভ আচরণ বলতে দুটি অর্থ বোঝায়। একটি হলো, প্রকৃত শিয়ারা যেসব আকিদা-বিশ্বাস রাখে সেসবে বিশ্বাস রাখা। যেমন: আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুকে খিলাফতের প্রথম হকদার বিশ্বাস করা, আবু বকর ও উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমাকে জালিম মনে করা, তাদের গালিগালাজ করা, সাহাবিদের সমালোচনা করা, তাদের অনেককে কাফির আখ্যায়িত করা। শিয়াদের মধ্যে এক শ্রেণির উগ্রপন্থি তো আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মাবুদের কাতারে পর্যন্ত নিয়ে গেছে। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের মতে শিয়াদের আকিদা-বিশ্বাসে রয়েছে অনেক কুফর-শিরক। তাই কেউ প্রকৃত শিয়াদের আকিদা-বিশ্বাস রাখলে সে ইসলামের গন্ডি থেকে বের হয়ে যাবে; যদিও
শিয়াদের মধ্যে ক্ষুদ্র আরেকটি শ্রেণি আছে, যারা এমন মারাত্মক সব কুফরি আকিদা রাখে না, তবে তাদের সংখ্যা খুবই কম। শিয়াসুলভ আচরণের আরেকটি অর্থ হলো, আলির প্রতি অধিক ভালোবাসা রাখা। আলিকে উসমানের চেয়ে খিলাফতের অধিক হকদার মনে করা। কিন্তু আবু বকর ও উমারের প্রতি কোনোরূপ বিদ্বেষ না রাখা এবং উম্মতের মধ্যে তাদের দুজনের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করা। মুহাদ্দিসদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের ব্যাপারে এমন শিয়াসুলভ আচরণের কথা জানা যায়। সন্দেহ নেই, ইমাম আমাশের ব্যাপারে যে শিয়াসুলভ আচরণের অভিযোগ আছে, তা দ্বিতীয় প্রকারের; প্রথম প্রকারের নয়।—শারয়ি সম্পাদক
৪. Materials, p. 97.
৫. শিয়া ধর্মবিদরা দীর্ঘকাল ধরে কুরআনের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করতেন। কারণ সর্বপ্রথম আবু বকর কুরআন সংকলন করেন এবং তা থেকে মুসহাফ তৈরি করেন উসমান। আলির নাম না থাকাটা তাদের প্রধান সমস্যা। অথচ পরবর্তী সময়ে তিনি কিন্তু নতুন কোনো সংস্করণ প্রণয়ন করেননি। তবে ইদানীং তাদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আসছে। কয়েক বছর আগে তেহরানে শিয়া প্রধানরা একটি সম্মেলনে কুরআন নিয়ে তাদের সংশয়হীনতার কথা প্রকাশ করেছেন। উসমানি মুসহাফকে সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ এবং বিকৃতিমুক্ত বলে ঘোষণা দেওয়া হয় সেখানে। ইরানে এখন উসমানি মুসহাফ ছাড়া নাজাফ, কুম, মাশহাদ ইত্যাদি ভিন্ন মুসহাফের কোনো স্বীকৃতি নেই।
৬. সূরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ১০-১১

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 অধ্যায় শেষে

📄 অধ্যায় শেষে


ইহুদি-খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণ কুরআনের প্রকারভিন্নতা খোঁজার জন্য বহু বছর চাতক
পাখির মতো চেয়ে থেকেছে, কিন্তু আল্লাহ তা এতটা নিরাপদভাবে সংরক্ষিত রেখেছেন, ব্যর্থ হয়েছে তাদের সকল উপকরণ ও প্রচেষ্টা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে কুরআন গবেষণা ইন্সটিটিউট খোলা হয়। সেখানে বিভিন্ন দেশ ও কালের প্রায় ৪০ হাজার কুরআনের অনুলিপি রয়েছে। অধিকাংশই অবশ্য মূলের ছবি আকারে। কুরআনের রূপভেদ খুঁজে পাওয়ার জন্য অনুলিপিগুলোর প্রতিটি শব্দ তারা তন্নতন্ন করে একত্র করেছে।
'দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু আগে একটি প্রাথমিক ও সম্ভাব্য প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। কুরআনের পান্ডুলিপিগুলোতে অনুলিখনজনিত ত্রুটি থাকলেও কোনো রূপভিন্নতা নেই বলে সেখানে উঠে আসে। যুদ্ধচলাকালীন মার্কিন বোমা বর্ষণে ইন্সটিটিউটটি ধ্বংস হয়ে যায়। এর সাথে হারিয়ে যায় সকল কর্মরত পরিচালক, কর্মচারী, পাঠাগার এবং সবই... তবে এতটুকু প্রমাণিত, প্রথম শতাব্দী থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কুরআনের অনুলিপিগুলোর মাঝে কোনো রূপভেদ (Variants) নেই।'[১]
ক্ষীণস্বরে হলেও জেফরি তা স্বীকার করে বলেছেন, 'প্রাচীন গ্রন্থাদি এবং অংশবিশেষকে ঘিরে যথেষ্ট যাচাই-বাছাই হয়েছে। সেগুলোর টেক্সট সব একই। প্রকারভিন্নতার প্রায় সবগুলোকেই লেখার ভুল হিসেবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।'[২]
একই রকম সিদ্ধান্তে উপনীত হন বার্গস্ট্রেসারও।[৩] যদিও জেফরি গোঁয়ারের মতো বলেন, টেক্সটের এ ধরনটি 'তৃতীয় হিজরি শতাব্দীর আগ পর্যন্ত কেমন যেন স্থিতিশীল ছিল না।[৪]... (তাই) যাচাইকৃত খণ্ডাংশগুলোর টেক্সটের আর কোনো প্রকারভেদ টিকে না থাকাটা কৌতূহলের উদ্রেক ঘটায়।[৫] তার প্রশ্নের উত্তর একদম পরিষ্কার। গাছের কারণে বন দেখতে না পাওয়ার মতো অবস্থা। সহজে বললে প্রকার মাত্র একটিই। এছাড়া ভিন্ন কোনো প্রকার কখনো ছিলই না।
প্রাচ্যবিদদের নীতি স্রোতের সাথে পালটায়। তাই তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ না করে আমাদের উচিত মুহাদ্দিসগণের নীতি অবলম্বন করা। মুসলিমদের নীতি অনুযায়ী বাইবেল যাচাই করলে অবস্থা কী দাঁড়াবে? উদাহরণের মাধ্যমে তাদের ভিত্তির ভঙ্গুরতা তুলে ধরা যাক। Dictionary of Bible-এ 'Jesus Christ' বা যিশুকে নিয়ে লিখিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, 'যিশুকে সমাধিস্থ করার একমাত্র সাক্ষী দুজন মহিলা...' এরপর 'Resurrection' বা পুনরুত্থান সম্পর্কে লিখেছে, 'উক্ত বিষয়ে বহু জটিলতা তো আছেই, এ সংক্রান্ত বর্ণনার পরিমাণও দুঃখজনকভাবে কম। আছে পারস্পরিক বৈসাদৃশ্য ও অসামঞ্জস্যও। কিন্তু ইতিহাসশাস্ত্রের নিয়ম-কানুন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করলে যেকোনো ইতিহাসবিদের কাছে আলোচ্য সাক্ষ্য যথেষ্ট বলে গণ্য হবে।' [১]
কিন্তু আমাদের পন্থা অবলম্বন করলে ব্যাপারটি কী দাঁড়াত? যিশুকে সমাধিস্থ করার ঘটনার ব্যাপারে আমরা কী বলতাম? প্রথমত এ ঘটনার লেখক কে? তাদের কোনো নাম-পরিচয় জানা যায় না। ফলে বর্ণনাটি তৎক্ষণাৎ বাতিল। দ্বিতীয়ত, লেখকের কাছে দুজন নারীর সাক্ষ্য কে বর্ণনা করেছে? এটিও অজানা। তৃতীয়ত, ইসনাদ-সংক্রান্ত বিস্তারিত কী জানা যায়? কিছুই নেই। পুরো ঘটনাটি মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনাই তাই সবচেয়ে বেশি।
কুরআনের প্রকারভেদ খোঁজা এখনো চলছে। এ যাত্রায় ব্রিলের Encyclopaedia of the Quran গ্রন্থটি অবদান রাখতে চলেছে। এর উপদেষ্টা কমিটিতে ইহুদি ও খ্রিষ্টান পণ্ডিতদের পাশাপাশি আছেন এম. আর্কোন ও নাসর আবু যাইদের মতো ব্যক্তিবর্গ। ইসলামি মহলে তারা ধর্মচ্যুত হিসেবে স্বীকৃত।
বাইবেলকে ঘিরে কিছু অনিয়মতান্ত্রিক ধোঁয়াশাপূর্ণ বিষয়ের কথা এর মধ্যেই উল্লেখ করেছি বেশ কয়েকবার। বলেছি একইরকম অনিশ্চয়তার বীজ কুরআনের মাঝেও খোঁজার ব্যর্থ প্রচেষ্টার কথা। এখন আমরা আরেক ধাপ এগিয়ে সরাসরি তাদের ধর্মীয় গ্রন্থের ইতিহাস সম্পর্কে জানব। শুধু তুলনা করা আমাদের উদ্দেশ্য না। সকল বোদ্ধা এবং সমালোচক তাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশেরই ফলাফল। আর প্রাচ্যবিদরা হলো ইহুদি-খ্রিষ্টীয় প্রেক্ষাপটের ফলাফল। তা সে ইহুদি, খ্রিষ্টান, নাস্তিক—যা-ই হোক না কেন। ইসলাম সম্পর্কিত তাদের সব চিন্তায় এর প্রভাব থাকে। ইসলামিক স্টাডিজকে তারা বিভিন্ন বাইবেলীয় পরিভাষা ব্যবহারের দ্বারা পুরোপুরি ভিন্ন জিনিসে পরিণত করে। যেমন: Introduction au Coran গ্রন্থে উসমানি মুসহাফের ক্ষেত্রে রাশির
'Vulgate' শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কুরআনকে জেফরি বলেছেন 'Masoretic text'. অথচ এসব শব্দ হিব্রু ওল্ড টেস্টামেন্টের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। ওয়ান্সব্রোহ তো কুরআনের সকল পরিভাষা এক প্রকার বাদই দিয়েছেন। উলটো নিজেদের শাস্ত্র থেকে Haggadic exegesis, Halakhik exegesis এবং Deutungsbeduerftigkeit -এর মতো পরিভাষা এনে বসিয়ে দিয়েছেন।[১] কুরআনের সাথে canonisation এবং ইবনু মাসউদের মুসহাফের সাথে codice জাতীয় বাইবেলীয় পরিভাষাও তারা ব্যবহার করেছে। মুসলিম জনতা এসব ভাষার কিছুই বোঝে না।
এর মধ্যেই জেফরি, গোল্ডজিহারসহ অনেকের তত্ত্ব নিয়েই আলোচনা হয়েছে। সেগুলো সবগুলোই বাতিল বলে প্রমাণিত। কিন্তু তাদের এসব কর্মের উদ্দেশ্য এখনও জানা হয়নি। আমরা সেগুলো মূল্যায়ন করে দেখব। প্রাথমিক জুডিও-খ্রিষ্টান ইতিহাস এবং ওল্ড ও নিউ টেস্টামেন্টের ইতিহাসটুকু জানা থাকলে উক্ত বোদ্ধা মহলের চিন্তাজগৎ সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা পাওয়া যাবে। বিস্তারিত বোধগম্য হবে কুরআন প্রসঙ্গে পশ্চিমা উদ্দেশ্য।

টিকাঃ
১. M. Hamidullah, 'The Practicability of Islam in This World', Islamic Cultural Forum, Tokyo Japan, April 1977, p. 15; see also A. Jeffrey, Materials, Preface, p. 1.
২. Arthur Jeffery's review of 'The Rise of the North Arabic Script and It's Kur'anic Development by Nabia Abbott', The Moslem World, vol. 30 (1940), p. 191. আরও বিস্তারিতভাবে বুঝতে অধ্যায় ১১.৩ দ্রষ্টব্য।
৩. Theodor Noeldeke, Geschichte des Qorans, Georg Olms Verlag, Hildesheim -New York, 1981, p. 60-96.
৪. প্রথম শতাব্দীর পান্ডুলিপি যেখানে একে অন্যটিকে সমর্থন করে, সেখানে তৃতীয় শতাব্দীর আগ পর্যন্ত তা নির্দিষ্ট না থাকার কী প্রমাণ আছে?
৫. ibid, p. 191.
৬. Dictionary of the Bible, p. 490.
৭. 1. Wansbrough, Quranic Studies: Sources and methods of scriptural interpretation, Oxford Univ. Press, 1977, Table of Contents.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00