📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস 📄 ইসনাদ এবং কুরআনের ব্যাপ্তি

📄 ইসনাদ এবং কুরআনের ব্যাপ্তি


তথ্য আদান-প্রদানে এরকম সুগঠিত একটি পদ্ধতি দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়। সুন্নাত থেকে শুরু করে গাতকদের প্রেমজীবন সবই বর্ণনা করা হতো এভাবে। কিন্তু এমন একটি পদ্ধতিকে কেন কুরআন সংরক্ষণে ব্যবহার করা হলো না সেটি নিয়ে প্রশ্ন হতে পারে।
এর উত্তর দেওয়ার আগে কুরআনের প্রকৃতি স্মরণ করা উচিত। একই সাথে আল্লাহর বাণী এবং সালাতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ার কারণে হাদিসের তুলনায় এর ব্যবহার ছিল অনেক বেশি। কাজেই কুরআন শেখার জন্য ক্রমধারা বর্ণনা এবং রিডিং
সার্টিফিকেটের কোনো প্রয়োজন ছিল না। তবে প্রখ্যাত কারিদের মতো উচ্চারণ ও মাখরাজ অনুশীলনসহ পেশাদার কিরাত যারা শিখতেন, তাদের প্রত্যয়নপত্র ছিল আবশ্যক। অবিচ্ছিন্ন সূত্রে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছায় তাদের শিক্ষার ধারা। কারিদের জীবনীর ওপর আবুল আলা হামাজানি আত্তার (মৃত্যু: ৫৬৯ হিজরি) একটি গ্রন্থ সংকলন করেছেন; যার নাম আল-ইনতিসার ফি মারিফাতি কুররাইল মুদুন ওয়াল আমসার। ২০ খণ্ডবিশিষ্ট এই মহাগ্রন্থটি এখন আর নেই। কিন্তু গ্রন্থটি সম্পর্কে অন্যদের বক্তব্য থেকে কিছু খোরাক এখনও পাওয়া যায়। যেমন: লেখকের শিক্ষক এবং সেই শিক্ষকদের শিক্ষকের তালিকা, যা নবিজি পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে।[১] তারা সকলেই ছিলেন বিশিষ্ট কারি। এ তালিকায় কোনো অনভিজ্ঞ কারির নাম খুঁজে পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে কোনো লাভ নেই। কুরআন যে গতিতে ছড়িয়েছে, তা অনুধাবন করাও কঠিন। আবু দারদা (মৃত্যু: ৩২ হিজরি) রাযিয়াল্লাহু আনহু তার দামেশকের পাঠসভার ছাত্রসংখ্যা জানার কৌতূহল বোধ করেন। তার অনুরোধে মুসলিম ইবনু মিশকাম হিসাব করে দেখলেন সেখানে ১৬ শ'র বেশি ছাত্র বিদ্যমান। ফজরের পরে তারা নিয়মিত আবু দারদার কাছে পাঠ নিত। তার তিলাওয়াত শুনে সেটার অনুকরণে অনুশীলন করত নিজেদের মধ্যে।[২]
কুরআন ও হাদিস দুটি ভিন্ন পদ্ধতিতে ছড়ালেও উভয়ের মধ্যে কিছু মিলের জায়গা রয়েছে-
> শিক্ষকের সরাসরি সান্নিধ্য আবশ্যক। শুধু গ্রন্থকেন্দ্রিক জ্ঞানার্জন নিষিদ্ধ।
> শিক্ষকের নৈতিকতা একদম বিশুদ্ধ হতে হবে। পরিচিতজনরা যদি কাউকে বিতর্কিত বিষয়বস্তুর সাথে জড়িত দেখে, তাহলে তার কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা চাই।
> কোনো বিষয়ের বিশালতা বুঝতে শুধু গ্রন্থপঞ্জির তথ্য থেকে বর্ণনাধারার চিত্র অঙ্কন যথেষ্ট নয়। সুনানু ইবনি মাজাহর ষষ্ঠ খণ্ডের ব্যাপ্তি আমরা দেখেছি। একইভাবে কুরআনের প্রসার দেখাতে হলে তা নাযিল হওয়া থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আসা সকল মুসলিমের একটি তালিকা তৈরি করতে হবে। কুরআন ব্যাপ্তির বিশালতা এতটাই বেশি।

টিকাঃ
১. গায়াতুল ইখতিসার, আল-হামাজানি, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা : ৭-১৬২
২. আয-যাহাবি, সিয়ার, খন্ড ২, পৃষ্ঠা: ৩৪৬

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস 📄 অধ্যায় শেষে

📄 অধ্যায় শেষে


স্বীকৃত প্রশিক্ষক, চারিত্রিক জীবন যাচাই-বাছাই, রিডিং সার্টিফিকেটের প্রমাণ এবং আরও সবকিছু মিলে দাঁড়িয়ে যাওয়া শক্ত দেওয়াল হাদিস গ্রন্থগুলোতে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করেছে। কুরআনের প্রসারে এরকম ইসনাদ না থাকার কারণ হলো এর বিকৃতি ঘটানো অসম্ভব। প্রতিটি ঘর, মসজিদ, মাদ্রাসা এবং বাজার থেকে একই শব্দমালা প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনিত হতো। বিকৃতি রোধে কোনো মানবসৃষ্ট পদ্ধতি এর চেয়ে উত্তম হতে পারে না।[১]

টিকাঃ
১. হাদিসের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী মুতাওয়াতির হাদিস। মুতাওয়াতির বলা হয় এমন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিশ্বস্ত রাবি কর্তৃক বর্ণিত হাদিস, যাদের ব্যাপারে মিথ্যা বা ভ্রমের ওপর ঐকমত্য পোষণের বিশ্বাস করা যায় না। এমন সংখ্যক রাবি কোনো হাদিস বর্ণনা করলে তা গ্রহণযোগ্যতার সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত বলে বিবেচিত হয় এবং অকাট্য দলিল হিসেবে সবার নিকট সমাদর হয়। কারণ তা ভ্রম বলে উড়িয়ে দেওয়ার মতো দুইজনের বর্ণনা নয়। কুরআনের প্রতিটি আয়াত সর্বোচ্চ মতাওয়াতির পদ্ধতিতে বর্ণিত। তবে তা হাদিসের মতো শুধু নির্দিষ্ট সংখ্যক রাবি কর্তৃক মুতাওয়াতির নয়; বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, যুগ থেকে যুগান্তর, শতাব্দী থেকে শতাব্দী কর্তৃক অবিচ্ছিন্ন সূত্রে মুতাওয়াতির। কুরআনের তাওয়াতুরের ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে এমন বক্তব্য দিয়েছেন ইমাম আনোয়ার শাহ কাশ্মিরি। কথা অল্প কিন্তু এতে অনেক সংশয়ের জবাব আছে। শারয়ি সম্পাদক

ফন্ট সাইজ
15px
17px