📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 রিডিং নোটের গুরুত্ব

📄 রিডিং নোটের গুরুত্ব


হাদিস সংকলনকে বিকৃতিমুক্ত রাখাটাই এসব প্রত্যয়নপত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল। বর্তমান সময়ের গবেষকদের জন্য এগুলো এখন তথ্যের মহাসমুদ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি গ্রন্থের বিস্তার সম্পর্কে গ্রন্থপঞ্জিতে যা থাকে, এর চেয়ে অনেক বেশি জানা যায় রিডিং নোট থেকে।

ক. মিঙ্গানা, রবসন এবং হাদিস সংকলনের ধারা:
সহিহুল বুখারি সংকলনের ধারা নিয়ে রেভারেন্ড মিঙ্গানা কাজ করেছেন। জেমস রবসন কাজ করেছেন সহিহ মুসলিম, সুনানু আবি দাউদ, সুনানুত তিরমিযি, সুনানুন নাসায়ি, সুনানু ইবনি মাজাহ নিয়ে। দুজনের কাজের মধ্যেই আছে বড় রকমের ভুল ধারণা। তবে সেদিকে যাচ্ছি না। আপাতত সুনান ইবনি মাজাহ-এর ধারা নিয়ে রবসনের চিত্রটি দেখাচ্ছি। [১]
ক্রমধারার পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটে না উঠলেও ইসহাক খানের উসুলুস সিত্তা ওয়া বুয়াতুহখি গ্রন্থে এর চেয়ে বিস্তৃত চিত্র রয়েছে। নিচে শুধু ইবনু কুদামা সূত্রে বর্ণিত চিত্রটি দেখানো হলো:
এখন শুধু উপরিউক্ত তথ্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে এগোলে ইবনু কুদামার সূত্রে ১২ জনেরও কম বর্ণনাকারী পাওয়া যাবে। দৃষ্টির এই ক্ষীণতা দূর করতে হলে তাই কায়রোর গণগ্রন্থাগারের তাইমুরিয়া পাণ্ডুলিপি, ৫২২ দেখা যেতে পারে।

খ. সুনানু ইবনি মাজাহ গ্রন্থের অনুমতিপত্রসমূহ:
ইবনু কুদামা মাকদিসি (মৃত্যু : ৬২০ হিজরি) অতি মূল্যবান এই পান্ডুলিপির লিপিকার হিসেবে ছিলেন। ইসলামি ফিকহের ওপর রচিত আল-মুগনি-এর মতো একটি বিশ্বকোষের রচয়িতা তিনি। সুনান ইবনি মাজাহ গ্রন্থকে ১৭ খণ্ডে বিভক্ত করে তিনি প্রতিটির সাথে প্রত্যয়নপত্র লেখার জন্য ফাঁকা স্থান ছেড়ে দেন। প্রতিটি অংশ শেষে তিনি সেগুলো সংক্ষিপ্তাকারে অনুলিখন করেন। এর সাথে উল্লেখ করে দেন-পূর্ণ প্রত্যায়নপত্রটি ইবনু তারিক (মৃত্যু: ৫৯২ হিজরি) কর্তৃক লিখিত। এর ষষ্ঠাংশে দেখা যায়-তা আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ ইবনি আহমাদ ইবনি আহমাদ ইবনি খাশশাব থেকে আবু জুরআ তাহির ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি তাহির মাকদিসিকে পড়ে শোনানো। আর উপস্থিতির তালিকায় আব্দুল্লাহ ইবন আলি ইবনি ফাররা, দুলাফ, আবু হুরাইরা, ইবনু কুদামা, আব্দুল গনি, আহমাদ ইবন তারিক প্রমুখের নাম পাওয়া যায়। আর তারিখটি ছিল ১৯ রবিউস সানি ৫৬১ হিজরি, মঙ্গলবার।
কেবল সংক্ষিপ্ত অনুলিখন দ্বারাও ইবনু কুদামা দুটি বিষয় ফুটিয়ে তুলেছেন—
» শেখানো এবং উদ্ধৃত করার উদ্দেশ্যে তিনি উক্ত পাণ্ডুলিপি ব্যবহারের অধিকার রাখেন। কারণ তিনি তা যথাযথ মাধ্যমে অর্জন করেছেন।
» তার অনুলিখনটি মূলত তার শিক্ষকের কাছে পড়ে শোনানো মূল গ্রন্থেরই অনুলিপি। তাই তিনি বর্ণনাধারার কোনো নিয়ম ভাঙেননি।
ষষ্ঠাংশের নোটগুলোর একটি সারাংশ আমি তুলে ধরেছি নিচে। কারণ পাণ্ডুলিপির বাঁধাই দুর্বল হয়ে যাওয়ায় পাতাগুলো এদিক-ওদিক হয়ে গিয়েছে। কিছু পাতা হয়তো নেই কিংবা স্থান বদল করেছে। তবে অন্য অংশের কোনো পাতা এই ভাগে ঢুকতে পারেনি। কারণ নোটের মধ্যে কোন পৃষ্ঠা কোন অংশের তা উল্লেখ আছে।[১]

রিডিং নোটের তালিকা:
১. রিডিং: ১, শিক্ষকের নাম: সুনান ইবনি মাজাহ ব্যবহারে ইবনু কুদামার অধিকার বর্ণনা করা হয়েছে।
২. রিডিং: ২, শিক্ষকের নাম: আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ আল-মাকদিসি (ইবনু কুদামা), পাঠকের নাম: উবাইদুল্লাহ ইবনু আব্দিল গনি, প্রত্যয়নকারী: উবাইদুল্লাহ ইবনু আব্দিল গনি, তারিখ: ১৫ শাওয়াল, ৬০৪ হিজরি, আনুমানিক উপস্থিতি: ৩০
৩. রিডিং: ৩, শিক্ষকের নাম: ইবনু কুদামা আল-মাকদিসি, পাঠকের নাম: মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ মুহাম্মাদ, প্রত্যয়নকারী: (অস্পষ্ট), তারিখ: মঙ্গলবার, ১২ রমজান, ৫৬৯ হিজরি, আনুমানিক উপস্থিতি: ৩২
৪. রিডিং: ৪, শিক্ষকের নাম: আব্দুল কাদির রাহাওয়ি, পাঠকের নাম: মুহাম্মাদ ইবনু কাসিম ইবনিল হাসান, প্রত্যয়নকারী: মাহমুদ ইবনু আইয়ুব সোহরাওয়ার্দি, তারিখ: রবিবার, রবিউস সানি, ৫৯৬ হিজরি, আনুমানিক উপস্থিতি: ২১
৫. রিডিং: ৫, শিক্ষকের নাম: ইবনু কুদামা, পাঠকের নাম: আব্দুর রাজ্জাক, প্রত্যয়নকারী: (অস্পষ্ট), তারিখ: (অস্পষ্ট), আনুমানিক উপস্থিতি: (অস্পষ্ট)
৬. রিডিং: ৬, শিক্ষকের নাম: ইবনু কুদামা, পাঠকের নাম: ইউসুফ ইবনু খলিল দিমাশকি, প্রত্যয়নকারী: আবদান ইবনু নাসরিল বাজ্জাজ দিমাশকি, তারিখ: বৃহস্পতিবার, ৮ যুল-কাদাহ, ৬০০ হিজরি, আনুমানিক উপস্থিতি: ৩৩
৭. রিডিং: ৭, শিক্ষকের নাম: ইবনু কুদামা, পাঠকের নাম: মাহফুজ ইবনু ইসা, প্রত্যয়নকারী: মাহফুজ ইবনু ইসা, তারিখ: রবিবার, ১২ যুল-কাদাহ, ৬০০ হিজরি, আনুমানিক উপস্থিতি: ১
৮. রিডিং: ৮, শিক্ষকের নাম: ইবনু কুদামা, পাঠকের নাম: ইয়াহইয়া ইবনু আলি মালিকি, প্রত্যয়নকারী: সালিহ ইবনু আবি বকর..., তারিখ: (৫) ৭৭২০
৯. রিডিং: ৯, শিক্ষকের নাম: মাহমুদ ইবনু আব্দিল্লাহ রাইহানি সোহরাওয়ার্দি আবু জুরআ, পাঠকের নাম: ইবরাহিম ইবনু ইয়াহিয়া ইবনি আহমাদ, প্রত্যয়নকারী: ইবরাহিম ইবনু ইয়াহিয়া ইবনু আহমাদ, তারিখ: মঙ্গলবার, ১১-৫-৬৬৫ হিজরি, আনুমানিক উপস্থিতি: ২০
১০. রিডিং: ১০, শিক্ষকের নাম: মাহমুদ ইবনু আব্দিল্লাহ রাইহানি, পাঠকের নাম: আলি ইবনু মাসউদ ইবনি নাফিস মাউসিলি, প্রত্যয়নকারী: আলি ইবনু আব্দিল কাফি, তারিখ: (মুছে গেছে), আনুমানিক উপস্থিতি: ১২
১১. রিডিং: ১১, শিক্ষকের নাম: আব্দুর রাহমান ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি কুদামা, পাঠকের নাম: (মুছে গেছে), প্রত্যয়নকারী: (মুছে গেছে), তারিখ: বুধবার, ১৫-৭-৬৭৮ হিজরি, আনুমানিক উপস্থিতি: ৪০
১২. রিডিং: ১২, শিক্ষকের নাম: (ক) ইবনুশ শিনহা, আনজাব, আবু জুরআ (খ) সিতুল ফুকাহা, আনজাব, ইবনু কাবিতি, হাশিমি, আবু জুরআ (গ) ইবনুস সাইগ, রিকাবি, সোহরাওয়ার্দি, আবু জুরআ (ঘ) ইবনুল মুহানদিস, বালাবাক্কি, ইবনুল উসতাজ, মুওয়াফফাক, আবু জুরআ (ঙ) ইবনুল মুহানদিস, বালাবাক্কি, ইবনু কুদামা, আবু জুরআ (চ) নাওয়াস, ইবনুল বাগদাদি, ইবনু কুদামা, আবু জুরআ (ছ) নাওয়াস, ইবনুল বাগদাদি, রাহাওয়ি, আবু জুরআ।, পাঠকের নাম: (ক) আব্দুর রাহমান ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি কুদামা (খ) ইবরাহিম ইবনু আব্দিল্লাহ (গ) মুহাম্মাদ ইবনু আব্দির রাহিম (ঘ) আহমাদ ইবনু আহমাদ ইবনি উবাইদিল্লাহ, প্রত্যয়নকারী: ইবনুস সাইরাফি, তারিখ: ১০-১১-৭২৫ হিজরি, আনুমানিক উপস্থিতি: ৫০
১৩. রিডিং: ১৩, শিক্ষকের নাম: ইবনুস সাইরাফি, পাঠকের নাম: আব্দুল মাকদিসি, প্রত্যয়নকারী: আব্দুল মাকদিসি, তারিখ: ১৭-১০-৬৫৯ হিজরি, আনুমানিক উপস্থিতি: ১০০
১৪. রিডিং: ১৪, শিক্ষকের নাম: (ক) আল বালিসি, উম্মু আব্দিল্লাহ (খ) আল হাররানি, ইবনু আলওয়ান, আব্দুল লতিফ বাগদাদি (গ) ইবরাহিম ইবনু বুহাইর, ইবনু আলওয়ান (ঘ) ইবনু সুলতান মাকদিসি, যাইনাব বিনতু কামাল, আবু জুরআ, পাঠকের নাম: মুহাম্মাদ কাইসি দিমাশকি, প্রত্যয়নকারী: মুহাম্মাদ কাইসি দিমাশকি, তারিখ: মঙ্গলবার, ২-১১-৭৯৮ হিজরি, আনুমানিক উপস্থিতি: ৩৫
১৫. রিডিং: ১৫, শিক্ষকের নাম: সিঙুল ফুকাহা, ইবনুল কাবিতি, আবু জুরআ, পাঠকের নাম: আব্দুল আজিজ ইবনু মুহাম্মাদ কালতানি, প্রত্যয়নকারী: আব্দুল আজিজ মুহাম্মাদ কালতানি, তারিখ: বুধবার, ১৯-৮-৬২৫ হিজরি, আনুমানিক উপস্থিতি: ২০

উপরিউক্ত তথ্যগুলো থেকে জানা যায়, মোট ১১৫ জন শিক্ষার্থী সরাসরি ইবনু কুদামার কাছ থেকে ষষ্ঠ খণ্ড অধ্যয়ন করেছে। আবার তার ছাত্রদের কাছ থেকে শিখেছে আনুমানিক ৪৫০ শিক্ষার্থী। একই সময়ে সুনান ইবনি মাজাহর আরও অনেক পাণ্ডুলিপি ছিল। সেগুলোর পাঠ প্রত্যয়নপত্রেও ইবনু কুদামার নাম থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এ পান্ডুলিপিগুলো হয়তো কালের গহনে হারিয়ে গেছে অথবা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।
উপরিউক্ত একটি সার্টিফিকেটেই এত পরিমাণ তথ্য রয়েছে, এর সামনে (রেভারেন্ড মিঙ্গানা ও জেমস রবসনদের তৈরিকৃত) ইবন মাজাহ কিংবা যেকোনো হাদিস সংকলন গ্রন্থের অন্য সকল চিত্রকে প্রায় তথ্যহীন বলা চলে। তাই এগুলোকে শিশু পর্যায়ের বললেও অত্যুক্তি হয়ে যায়।

টিকাঃ
১. 'The Transmission of Ibn Maga's Sunan', J. Robson, Journal of Semitic Studies, vol. 3 (1958), pp. 129-141. Only the portion relating to Ibn Qudama is shown.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00