📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 প্রথম যুগের আলিম

📄 প্রথম যুগের আলিম


প্রথমেই কিছু পরিভাষার সাথে পরিচিত হওয়া যাক-
» প্রথম প্রজন্মকে আমরা ‘সাহাবি’ নামে চিনি। কারণ তারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহচর ছিলেন এবং তাকে সরাসরি চিনতেন। স্বয়ং আল্লাহ তাদের প্রশংসা করেছেন। কুরআনে সাক্ষ্য দিয়েছে তাদের চারিত্রিক পবিত্রতার। এজন্য তাদেরকে ‘আদল’ (الصحابة عدول) বলে ডাকা হয়।
» দ্বিতীয় প্রজন্মকে বলা হয় ‘তাবিয়ি’। তারা সাহাবিদের কাছ থেকে জ্ঞানার্জন করেছেন। সাধারণত প্রথম হিজরি শতাব্দী এবং তার পরের শতাব্দীর শুরুর দুই যুগে বেঁচে ছিলেন তারা। ‘বিশ্বস্ত’ হলেই তাদের হাদিস গ্রহণযোগ্য। সাহাবিদের কাছ থেকে বর্ণনা করায় আর কোনো যাচাই-বাছাই দরকার নেই।[১]
» তৃতীয় প্রজন্মকে ‘তাবে-তাবিয়ি’ বলা হয়। দ্বিতীয় শতকের অর্ধভাগ পর্যন্ত পাওয়া যায় তাদের। সরাসরি তাদের থেকে বর্ণিত কোনো হাদিস অন্যান্য সূত্র দ্বারা প্রতিপাদন করা সম্ভব না হলে তা গরিব (غريب) হিসেবে গণ্য হবে।[২]
» সরাসরি চতুর্থ প্রজন্ম থেকে বর্ণিত কোনো হাদিসকে অন্যান্য সূত্র দ্বারা যাচাই করা না গেলে তা অগ্রহণযোগ্য।[৩] বর্ণনাকারীর মর্যাদা এখানে গৌণ। এ পর্যায়ের বর্ণনাকারীর কেউ কেউ প্রায় ২০০০০০ হাদিস বর্ণনা করেছেন। এতগুলো হাদিসের মধ্যে দু-তিনটি হাদিস পাওয়াও কঠিন হবে, যা একাধিক সনদে বর্ণিত হয়নি। যদি কোনো বর্ণনাকারীর বহুসংখ্যক হাদিসের ব্যাপারে আলাদা আলাদাভাবে নিশ্চিত
হওয়া না যায়, তাহলে তাকে দুর্বল রাবি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে[১]।
নবিজির জীবদ্দশায়ই হাদিস লিপিবদ্ধ করা হয়। তবে তা বিষয়ভিত্তিক পুস্তকাকারে আসে প্রথম শতাব্দীর অর্ধভাগে এসে। নবসৃষ্ট এ জোয়ারের ফলে দ্বিতীয় শতাব্দীতে আমরা বিশ্বকোষ প্রকৃতির কিছু কাজ দেখতে পাই। যেমন: ইমাম মালিকের মুয়াত্তা, মুহাম্মাদ আশ-শাইবানির মুয়াত্তা, আবু ইউসুফের আসার, ইবনু ওয়াহাবের জামি, ইবনু মাজিশুনের কিতাব। এরপর তৃতীয় শতাব্দীতে ইমাম বুখারির সহিহ, আহমাদ ইবনু হাম্বলের মুসনাদ-এগুলোর মতো ভারী ভারী কর্ম সম্পাদিত হয়।
উপরিউক্ত রূপরেখা থেকে আমরা প্রজন্মভিত্তিক ইসনাদের মূল্যায়ন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাই। এরকম একটি পদ্ধতির ভেতরে জাল হাদিস টিকে থাকা কতটা কঠিন-তা আশা করি বোধগম্য। বিশ্বকোষ রচনাকারী সদাসতর্ক হাদিস গবেষকদের উপস্থিতিতে সেগুলো শনাক্ত না হওয়াটা এক প্রকার অসম্ভব বিষয়।

টিকাঃ
১. মূলত এমন কথা বলা তখনই সম্ভব, যখন এ কথার নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে, তাবিয়িরা সর্বদা সাহাবিদের থেকেই হাদিস বর্ণনা করে থাকেন, অন্য কারও থেকে কখনো হাদিস বর্ণনা করেন না। কিন্তু এটাও সম্ভব, কোনো তাবিয়ি অন্য এক তাবিয়ির সূত্র ধরে সাহাবি থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। সেক্ষেত্রে তাবিয়ির ক্ষেত্রে ওই ছাড় নেই, যা সাহাবির ক্ষেত্রে থাকে। শুধু সাহাবি হওয়াই একজনের বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য যথেষ্ট হলেও সাধারণভাবে তাবিয়ি বা তার নিম্নস্তরের বর্ণনাকারী হলে হাদিস যাচাই-বাছাইয়ের সকল শর্ত তার জন্য প্রযোজ্য হবে।—শারয়ী সম্পাদক
২. ‘গরিব’ উলুমুল হাদিসের একটি পরিভাষা। সাধারণত একক সনদে বর্ণিত হাদিসকে ‘গরিব’ বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ সনদের কোথাও যদি শুধু একজন বর্ণনাকারী থাকে, হাদিস বর্ণনা করার ক্ষেত্রে তার সাথে অন্য কেউ না থাকে তাহলে সেটাকেই ‘গরিব’ বলা হয়। ‘গরিব’ মানেই দুর্বল নয়; যেমনটি কিছু লোক ধারণা করে থাকে। এটা মূলত ইসনাদের একটি অবস্থার নাম। গরিব সনদ তার অবস্থার প্রেক্ষিতে কখনো সহিহ হয়, কখনো হাসান হয়, কখনো দুর্বল হয়।—শারয়ী সম্পাদক
৩. বস্তুত শুধু গরিব হওয়া হাদিস প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কোনো কারণ নয়; যতক্ষণ না হাদিসটি অন্য কোনো বিশুদ্ধ ও প্রমাণিত হাদিসের বিপরীত হয় কিংবা প্রমাণ হয়, বর্ণনাকারী বর্ণনার ক্ষেত্রে ভুল করেছে।—শারয়ী সম্পাদক
৪. এটা রাবি দুর্বল হওয়ার মৌলিক কোনো কারণ নয়। তবে কোনো রাবি যদি প্রচুর পরিমাণে মুনকার ও ভুল হাদিস বর্ণনা করে, তাহলে সেটা তার নির্ভরযোগ্যতায় প্রভাব ফেলবে এবং ভুলের মাত্রা হিসেবে সে দুর্বল, প্রত্যাখ্যাত বা পরিত্যক্ত বর্ণনাকারী হিসেবে বিবেচিত হয়-শারয়ি সম্পাদক।
৫. যাহাবি, আল-মুকিযা, পৃষ্ঠা: ৭৭-৭৮

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 অন্যান্য শাখার ওপর হাদিস-শাস্ত্রের প্রভাব

📄 অন্যান্য শাখার ওপর হাদিস-শাস্ত্রের প্রভাব


হাদিসশাস্ত্রের এ পদ্ধতি এত শক্তিশালী প্রমাণিত হয়, নিজ গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রায় সকল শাস্ত্র এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে দ্রুত এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়তে থাকে। উদাহরণস্বরূপ,
» তাফসির বিভাগে আব্দুর রাজ্জাক (মৃত্যু: ২১১ হিজরি) এবং মুফিয়ান আস-সাউরি (মৃত্যু: ১৬১ হিজরি) রচিত তাফসিরদ্বয়।
» ইতিহাস বিভাগে খলিফা ইরনু খাইয়াত (মৃত্যু: ২৪০ হিজরি) রচিত তারিখ।
» শরিয়তের ক্ষেত্রে ইমাম মালিক (মৃত্যু: ১৭৯ হিজরি) সংকলিত মুয়াত্তা।
» সাহিত্য ও লোককথায় আসফাহানি (মৃত্যু: ৩৫৬ হিজরি) রচিত আল-আগানি এবং আল-জাহিয (মৃত্যু: ২৫৫ হিজরি) রচিত আল-বায়ান ওয়াত তাবয়িন। এর মধ্যে আল-আগানি গ্রন্থের ২০টি খণ্ড রয়েছে। এতে রয়েছে কবি, গায়ক, গীতিকারদের কাহিনি এবং অশালীন গল্পকথা। এরকম নিম্নশ্রেণির গল্প-কেচ্ছাও যথাযথ ইসনাদের মাধ্যমে বর্ণনা করার ব্যাপারটি লক্ষণীয়। এমনকি ঘটনা বর্ণনার ক্ষেত্রে লেখক অনুমতিপ্রাপ্ত না হলে সরাসরি লিখে দিতেন, 'আমি এটি অমুকের বই থেকে পেয়েছি'।

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 ইসনাদ এবং কুরআনের ব্যাপ্তি

📄 ইসনাদ এবং কুরআনের ব্যাপ্তি


তথ্য আদান-প্রদানে এরকম সুগঠিত একটি পদ্ধতি দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়। সুন্নাত থেকে শুরু করে গাতকদের প্রেমজীবন সবই বর্ণনা করা হতো এভাবে। কিন্তু এমন একটি পদ্ধতিকে কেন কুরআন সংরক্ষণে ব্যবহার করা হলো না সেটি নিয়ে প্রশ্ন হতে পারে।
এর উত্তর দেওয়ার আগে কুরআনের প্রকৃতি স্মরণ করা উচিত। একই সাথে আল্লাহর বাণী এবং সালাতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ার কারণে হাদিসের তুলনায় এর ব্যবহার ছিল অনেক বেশি। কাজেই কুরআন শেখার জন্য ক্রমধারা বর্ণনা এবং রিডিং
সার্টিফিকেটের কোনো প্রয়োজন ছিল না। তবে প্রখ্যাত কারিদের মতো উচ্চারণ ও মাখরাজ অনুশীলনসহ পেশাদার কিরাত যারা শিখতেন, তাদের প্রত্যয়নপত্র ছিল আবশ্যক। অবিচ্ছিন্ন সূত্রে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছায় তাদের শিক্ষার ধারা। কারিদের জীবনীর ওপর আবুল আলা হামাজানি আত্তার (মৃত্যু: ৫৬৯ হিজরি) একটি গ্রন্থ সংকলন করেছেন; যার নাম আল-ইনতিসার ফি মারিফাতি কুররাইল মুদুন ওয়াল আমসার। ২০ খণ্ডবিশিষ্ট এই মহাগ্রন্থটি এখন আর নেই। কিন্তু গ্রন্থটি সম্পর্কে অন্যদের বক্তব্য থেকে কিছু খোরাক এখনও পাওয়া যায়। যেমন: লেখকের শিক্ষক এবং সেই শিক্ষকদের শিক্ষকের তালিকা, যা নবিজি পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে।[১] তারা সকলেই ছিলেন বিশিষ্ট কারি। এ তালিকায় কোনো অনভিজ্ঞ কারির নাম খুঁজে পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে কোনো লাভ নেই। কুরআন যে গতিতে ছড়িয়েছে, তা অনুধাবন করাও কঠিন। আবু দারদা (মৃত্যু: ৩২ হিজরি) রাযিয়াল্লাহু আনহু তার দামেশকের পাঠসভার ছাত্রসংখ্যা জানার কৌতূহল বোধ করেন। তার অনুরোধে মুসলিম ইবনু মিশকাম হিসাব করে দেখলেন সেখানে ১৬ শ'র বেশি ছাত্র বিদ্যমান। ফজরের পরে তারা নিয়মিত আবু দারদার কাছে পাঠ নিত। তার তিলাওয়াত শুনে সেটার অনুকরণে অনুশীলন করত নিজেদের মধ্যে।[২]
কুরআন ও হাদিস দুটি ভিন্ন পদ্ধতিতে ছড়ালেও উভয়ের মধ্যে কিছু মিলের জায়গা রয়েছে-
> শিক্ষকের সরাসরি সান্নিধ্য আবশ্যক। শুধু গ্রন্থকেন্দ্রিক জ্ঞানার্জন নিষিদ্ধ।
> শিক্ষকের নৈতিকতা একদম বিশুদ্ধ হতে হবে। পরিচিতজনরা যদি কাউকে বিতর্কিত বিষয়বস্তুর সাথে জড়িত দেখে, তাহলে তার কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা চাই।
> কোনো বিষয়ের বিশালতা বুঝতে শুধু গ্রন্থপঞ্জির তথ্য থেকে বর্ণনাধারার চিত্র অঙ্কন যথেষ্ট নয়। সুনানু ইবনি মাজাহর ষষ্ঠ খণ্ডের ব্যাপ্তি আমরা দেখেছি। একইভাবে কুরআনের প্রসার দেখাতে হলে তা নাযিল হওয়া থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আসা সকল মুসলিমের একটি তালিকা তৈরি করতে হবে। কুরআন ব্যাপ্তির বিশালতা এতটাই বেশি।

টিকাঃ
১. গায়াতুল ইখতিসার, আল-হামাজানি, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা : ৭-১৬২
২. আয-যাহাবি, সিয়ার, খন্ড ২, পৃষ্ঠা: ৩৪৬

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 অধ্যায় শেষে

📄 অধ্যায় শেষে


স্বীকৃত প্রশিক্ষক, চারিত্রিক জীবন যাচাই-বাছাই, রিডিং সার্টিফিকেটের প্রমাণ এবং আরও সবকিছু মিলে দাঁড়িয়ে যাওয়া শক্ত দেওয়াল হাদিস গ্রন্থগুলোতে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করেছে। কুরআনের প্রসারে এরকম ইসনাদ না থাকার কারণ হলো এর বিকৃতি ঘটানো অসম্ভব। প্রতিটি ঘর, মসজিদ, মাদ্রাসা এবং বাজার থেকে একই শব্দমালা প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনিত হতো। বিকৃতি রোধে কোনো মানবসৃষ্ট পদ্ধতি এর চেয়ে উত্তম হতে পারে না।[১]

টিকাঃ
১. হাদিসের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী মুতাওয়াতির হাদিস। মুতাওয়াতির বলা হয় এমন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিশ্বস্ত রাবি কর্তৃক বর্ণিত হাদিস, যাদের ব্যাপারে মিথ্যা বা ভ্রমের ওপর ঐকমত্য পোষণের বিশ্বাস করা যায় না। এমন সংখ্যক রাবি কোনো হাদিস বর্ণনা করলে তা গ্রহণযোগ্যতার সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত বলে বিবেচিত হয় এবং অকাট্য দলিল হিসেবে সবার নিকট সমাদর হয়। কারণ তা ভ্রম বলে উড়িয়ে দেওয়ার মতো দুইজনের বর্ণনা নয়। কুরআনের প্রতিটি আয়াত সর্বোচ্চ মতাওয়াতির পদ্ধতিতে বর্ণিত। তবে তা হাদিসের মতো শুধু নির্দিষ্ট সংখ্যক রাবি কর্তৃক মুতাওয়াতির নয়; বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, যুগ থেকে যুগান্তর, শতাব্দী থেকে শতাব্দী কর্তৃক অবিচ্ছিন্ন সূত্রে মুতাওয়াতির। কুরআনের তাওয়াতুরের ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে এমন বক্তব্য দিয়েছেন ইমাম আনোয়ার শাহ কাশ্মিরি। কথা অল্প কিন্তু এতে অনেক সংশয়ের জবাব আছে। শারয়ি সম্পাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00