📄 ইসনাদ পরীক্ষা
কিছু ক্ষেত্রে অদ্ভুত কিছু ঘটনাও হাদিস হিসেবে প্রচলিত হয়ে যায়। সনদ পর্যালোচনায় দক্ষ না হওয়ার ফলে ভুল বর্ণনার পেছনে অযথা সময় ব্যয় করেছেন অনেক আলিম, এমনকি অল্প কয়েকজন হাদিস বিশারদও। যেমন: ইমাম আমাশের বর্ণনা থেকে ইমাম যাহাবি একটি হাদিস তুলে ধরেছেন। ইমাম আমাশ বলেন, 'আমি আনাস ইবনু মালিককে إن ناشئة الليل هي أشد وطأ وأصوب قبلا তিলাওয়াত করতে শুনেছি। যখন তাকে (তার উপনাম ধরে) বলা হলো, হে আবু হামজা, এটা তো وأقوم হবে। তখন তিনি উত্তর দিলেন, أقوم এবং وأصوب একই।'[১]
আব্দুস সাবুর শাহিন উক্ত ঘটনাটির বৈধতা প্রমাণ করতে গিয়ে বলেন, আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর উত্তরটি সাত আহরুফ[২] প্রসঙ্গে। কিন্তু প্রসিদ্ধ সনদ পর্যালোচকগণ বলেছেন, ইমাম আমাশ কখনো আনাস ইবনু মালিকের কাছ থেকে কিছু শোনেননি। এর প্রমাণ তার কথা থেকেই পাওয়া যায়। তিনি বলেন, আনাস ইবনু মালিক সকাল-সন্ধ্যায় প্রতিদিন আমার পাশ দিয়ে যেতেন। আমি (মনে মনে) বলতাম, 'আমি আপনার কাছ থেকে (কখনো) হাদিস শুনব না। নবিজির জীবদ্দশায় তার সেবা করেছেন ঠিকই, কিন্তু এরপর হাজ্জাজের কাছে গেছেন (পদের আশায়)। শেষমেশ সে আপনাকে শাসনকর্তা বানিয়েছে।' অতঃপর (আনাসের ব্যাপারে আমার ভুল বুঝতে পেরে) আমি লজ্জিত হয়েছি। তাই পরবর্তী সময়ে অন্য এক ব্যক্তির সূত্রে আমি আনাসের হাদিস বর্ণনা করতে শুরু করি।[৩]
আনাস ইবনু মালিক থেকে অনিচ্ছায় কিছু শুনে থাকলেও সেটা তিনি বর্ণনা করতেন হয়তো, কিন্তু তার পুরো জীবনবৃত্তান্ত গবেষণা করে মিযযিসহ অনেকেই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, নিয়মিত দেখা পাওয়া সত্ত্বেও আমাশ কখনো আনাস থেকে দানা পরিমাণ জ্ঞানও গ্রহণ করেননি। [৪] তাই পুরো ব্যাপারটি হয় নিরেট মিথ্যা আর নাহয় আমাশের ছাত্রদের ভুল।[৫] এ সকল বিষয়ে যাচাই-বাছাই কিংবা সুচিন্তিত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হলে ইসনাদ পর্যালোচনায় গভীর জ্ঞান থাকা আবশ্যক।
টিকাঃ
১. যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ২৪৪; এ বর্ণনাটি সহিহ নয়; বরং সূত্রবিচ্ছিন্ন। কেননা মুহাদ্দিসদের মতে ইমাম আমাশ আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে কোনো কিছু শোনেননি। তাছাড়াও এ বর্ণনায় এসেছে, 'আমি আনাস ইবনু মালিককে তিলাওয়াত করতে শুনেছি।' অথচ আবু ইয়ালার বর্ণনায় এখানে শোনার কথা আসেনি। এভাবে এসেছে, 'আমাশ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনাস রাযিয়াল্লাহ আনহু পড়লেন...' (মুসনাদু আবি ইয়ালা: ৪০২২) হাফিজ হাইসামি বলেন, 'আবু ইয়ালার বর্ণনাকারীগণ সহিহ হাদিসের বর্ণনাকারী। (মাজমাউজ জাওয়ায়িদ: ১১৬১৩) অনুরূপ আবু নাসর মারওয়াজির কিয়ামুল লাইল গ্রন্থেও এভাবে এসেছে, 'আমাশ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু পড়লেন...' (মুখতাসারু কিয়ামিল লাইল: খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪০) এসব বর্ণনায় শোনার কথা বলা হয়নি। তাই আনাস থেকে আমাশের সরাসরি শোনার বর্ণনাটিকে সঠিক বলার সুযোগ নেই।
ইমাম কুরতুবি তার তাফসিরে ইমাম আবু বকর ইবনুল আনবারির উদ্ধৃতিতে বলেন, 'এটা এমন হাদিস যা কোনো আহলুল ইলমের নিকট সহিহ সূত্রে প্রমাণিত নয়। কেননা এটার ভিত্তি হলো আমাশের ওপর, যিনি আনাস থেকে এটা বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এটা হলো সুত্রবিচ্ছিন্ন বর্ণনা, নিরবচ্ছিন্ন সূত্রে বর্ণিত নয় যে, তা গ্রহণযোগ্য হবে। কেননা আমাশ আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখেছেন বটে, কিন্তু তার থেকে কোনো কিছু শোনেননি। আনাস থেকে আমাশের যে সূত্রগুলো আছে তা মূলত তিনি ইয়াজিদ আর-রাকাশির সূত্রে আনাস থেকে বর্ণনা করেন। (আর ইয়াজিদ আর-রাকাশি দুর্বল বর্ণনাকারী।)' —শারয়ি সম্পাদক
২. আব্দুস সাবুর শাহিন, তারিখুল কুরআন, পৃষ্ঠা: ৮৮
৩. যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ২৪০
৪. আল-মিযযি, তাহযিবুল কামাল, খণ্ড: ১২, পৃষ্ঠা: ৭৬-৯২; ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মাইন, আলি ইবনুল মাদিনি, ইমাম বুখারি, ইমাম তিরমিযি, ইমাম আবু হাতিম রাজিসহ বিজ্ঞ মুহাদ্দিসদের মত এটাই, ইমাম আমাশ আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখলেও তার থেকে কখনো কোনো হাদিস শোনেননি। (বিস্তারিত দেখতে-তারিখু ইবনি মাইন, রিওয়ায়াতুদ দুরি, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৩২৮; মারাসিলু ইবনি আবি হাতিম : ২৯৭; বুখারি, আত-তারিখুল কাবির, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ১৮৮৬; সুনানুত তিরমিযি: ৩৫৩৩; আল-জারহু ওয়াত তাদিল, ইবনু আবি হাতিম, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৬৩০) অবশ্য ইমাম আবু নুআইম আসবাহানিসহ কিছু মুহাদ্দিসের মতে আমাশ আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখার পাশাপাশি তার থেকে হাদিসও বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা বিচ্ছিন্ন একটি মত। মুহাদ্দিসদের প্রসিদ্ধ মত সেটাই, যা হাদিস ও জারহু-তাদিল শাস্ত্রের ইমামগণ বলেছেন। (তুহফাতুল আহওয়াজি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬১-৬২)-শারয়ি সম্পাদক
৫. ব্যাপারটিকে যৌক্তিকভাবে খণ্ডন করা সম্ভব। ঘটনা সত্য হলে তা ৬১ হিজরি (আমাশের জন্ম) থেকে ৯৩ হিজরির (আনাস ইবন মালিকের মৃত্যু) মধ্যবর্তী সময়ে হতে হবে। সে অনুযায়ী ৭৫ হিজরিতে আমাশ একজন ১৪ বছর বয়সী কিশোর। উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু ২৫ হিজরিতে পর্ববর্তী সকল অনলিপি ধ্বংস করার নির্দেশ দেন। সাহাবিরা কোনোদিনও উসমানি মুসহাফের বিরুদ্ধে কিছু করেননি। একটি সহিহ বর্ণনায়ও এমন কিছু পাওয়া যায় না। সেখানে আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহ ছিলেন মুসহাফ কমিটির একজন সদস্য। দীর্ঘ ৫০ বছর সারা মুসলিমবিশ্ব এই একটি টেক্সটের ওপর ঐক্যবদ্ধ। কাজেই এরকম একটি গরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে কোনো অসতর্ক মন্তব্য সমর্থনযোগ্য নয়।