📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 বিশ্বস্ততা প্রতিপাদন

📄 বিশ্বস্ততা প্রতিপাদন


বর্ণনাকারীর নির্ভরযোগ্যতা দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল-এক. নীতি-নৈতিকতা। দুই. জ্ঞানের বিশুদ্ধতা।
এক. নীতি-নৈতিকতা কুরআন অনুযায়ী সাক্ষীর কিছু বৈশিষ্ট্য-
وَأَشْهِدُوا ذَوَى عَدْلٍ مِنْكُمْ
আর তোমাদের মধ্যেকার দুজন ন্যায়পরায়ণ লোককে সাক্ষী রাখো [১]
مِمَّنْ تَرْضَوْنَ مِنَ الشُّهَدَاءِ
যাদেরকে তোমরা সাক্ষী হিসেবে পছন্দ করো।[২]
ফান্তা ʿইন্দনাল ʿআদলুর রিদা' 'উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু এ কথা দ্বারা আব্দুর রহমান ইবনু আউফকে সম্বোধন করতেন। এর অর্থ হলো, 'আমাদের কাছে আপনি ন্যায়পরায়ণ এবং নির্ভরযোগ্য হিসেবে পরিগণিত।'
'আদল' (ন্যায়পরায়ণ) শব্দটিকে ইমাম সুয়ুতি আরও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বলেন- 'আদল বলা হয় এমন মুসলিমকে, যিনি বয়সের দিক থেকে পরিণত (বালেগ), চিন্তার দিক থেকে পরিপক্ক (আকিল) এবং পাপ ও সুস্থ রুচি-বিবেক পরিপন্থি কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত (سليم من أسباب الفسق وخوارم المروءة )[৩]
ইবনুল মুবারকের (মৃত্যু: ১৮১ হিজরি) মতে বর্ণনাকারীর গ্রহণযোগ্যতার জন্য কিছু বৈশিষ্ট্য থাকা জরুরি—
> জামাতে সালাত আদায় করা।
> নাবিজ থেকে মুক্ত থাকা। এটি এমন পানীয়, যা দীর্ঘকাল রেখে দিলে গাঁজন হয়।
> প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর কোনো প্রকার মিথ্যা না বলা।
> মানসিক প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত থাকা।[৪]
পান্ডিত্যের দৌড়ে হয়তো কেউ অনেক ওপরে উঠতে পারে, কিন্তু নৈতিকতায় ঘাটতি হলে তার হাদিস সত্য হলেও পরিত্যাজ্য। [৫] এ বিষয়ে মুহাদ্দিসদের সর্বসম্মত মত রয়েছে। নবিজির নেক সাহাবিরা বাদে এ শর্ত বাকি সকল বর্ণনাকারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একটি উদাহরণ দেখা যাক—
উপরিউক্ত পাণ্ডুলিপিটি জাল হিসেবে পরিচিত হলেও এর মধ্যকার হাদিসগুলো কিন্তু বানানো নয়। অধিকাংশ হাদিসই প্রসিদ্ধ সাহাবি আনাস ইবনু মালিক থেকে বর্ণিত। কিন্তু এর বর্ণনাধারা ত্রুটিযুক্ত। কারণ আনাস ইবনু মালিকের ছাত্র যুবাইর ইবনু আদির সূত্র দাবি করা হলেও তা মূলত জাল। রাবি বিশর ইবনু হুসাইনকে মুহাদ্দিসগণ 'মিথ্যাবাদী' বলে আখ্যায়িত করেছেন। পুরোটাই তার জাল করা। প্রদত্ত চিত্রে ১০টি হাদিস দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে ছয়টির টেক্সটকে ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম শুদ্ধ বলেছেন। আরও তিনটিকে উদ্ধৃত করেছেন ইমাম আহমাদ। হাদিস নবিজির, কিন্তু জালকৃত ইসনাদ ব্যবহার করার ফলে দলিল হিসেবে তা গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে।[৬]
বর্ণনাকারীর জালিয়াতি ধরার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক তথ্য যাচাই, বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি এবং ব্যবহৃত কাগজ-কালির প্রকার নির্ণয় করা অনেক কষ্টসাধ্য কাজ। তাই ওই ব্যক্তির নৈতিক ও চারিত্রিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে অনেকেই বাধ্য হয়ে সেসময়কার অন্য ব্যক্তিদের শরণাপন্ন হয়। তবে এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত শত্রুতা বা বন্ধুত্বের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য সাবধানতা অবলম্বনের কিছু পন্থা বের করেছেন বোদ্ধা মহল। গবেষকরা এখান থেকে দিকনির্দেশনা পাবেন।[৭]
দুই. জ্ঞানের বিশুদ্ধতা
বর্ণনার ত্রুটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনিচ্ছাকৃত। তবে বর্ণনাকারী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের সময় এসব ভুলকে তালিকাভুক্ত করা আবশ্যক। বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত জোরালো নিরীক্ষণ প্রয়োজন। প্রসঙ্গক্রমে ইবনু মাইনের (মৃত্যু: ২২৩ হিজরি) কথা এখানে উল্লেখ না করে পারা যায় না। ঘটনাটি আনুমানিক দ্বিতীয় শতাব্দীর। তিনি হাম্মাদ ইবনু সালামার (মৃত্যু: ১৬৭ হিজরি) ছাত্র আফফান ইবনু মুসলিমের কাছে যান। উদ্দেশ্য ছিল তার কাছ থেকে হাম্মাদের রচিত গ্রন্থগুলো যাচাই করে নেওয়া। এদিকে ইবনু মাইনের মতো একজন আলিমের উপস্থিতি দেখে আফফান ইবনু মুসলিম তো অবাক। ইমাম হাম্মাদের আর কোনো ছাত্রের কাছে তিনি গিয়েছেন কি না, জিজ্ঞেস করেন। ইমাম ইবনু মাইন উত্তরে বললেন, 'আপনার কাছে আসার আগে এগুলো (ইমাম হাম্মাদের) আরও ১৭ জন ছাত্রের কাছ থেকে শুনেছি।' আফফানের বিস্ময় আরও বেড়ে গেল। তিনি বললেন, 'আল্লাহর শপথ, এগুলো আমি আপনাকে পড়ে শোনাব না।' নির্লিপ্ত কণ্ঠে ইমাম মাইন জানালেন, তিনি তাহলে অর্থ ব্যয় হলেও বসরায় ইমাম হাম্মাদের অন্য ছাত্রদের কাছে যাবেন।

টিকাঃ
১. সূরা তালাক, আয়াত: ২
২. সুরা বাকারা: ২৮২
৩. আস-সুয়ুতি, তাদরিবুর রাবি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩০০; এটা ইমাম সুয়ুতি রাহিমাহুল্লাহর এর তাদরিবুর রাবি-এর মধ্যে থাকলেও কথাগুলো মূলত তার নয়; বরং ইমাম নববি রাহিমাহুল্লাহর। তিনি আত-তাকরিব ওয়াত-তাইসির গ্রন্থে এভাবেই 'আদল' এর সংজ্ঞা বর্ণনা করেছেন। (দেখুন, আত-তাকরিব ওয়াত-তাইসির, পৃষ্ঠা: ৪৮) এরপর সুয়ুতি রাহিমাহুল্লাহ এটার ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করতে গিয়ে মূল গ্রন্থের ভাষ্য উপরে উল্লেখ করেছেন, আর নিচে তার ব্যাখ্যা করেছেন। তাই এখানে উদ্ধৃত করার ক্ষেত্রে ইমাম নববির নাম উল্লেখ করা উচিত, ইমাম সুযুতির নয়।—শারয়ী সম্পাদক
৪. আল-খাতিব, আল-কিফায়া, পৃষ্ঠা: ৭৯
৫. al-Azami, Studies in Early Hadith Literature, p. 305.
৬. al-Azami, Studies in Early Hadith Literature, p. 305, 309-310.
৭. আল-ইয়েমেনি, আত-তানকিল, পৃষ্ঠা : ৫২-৫৯

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 অবিরত বর্ণনাধারা

📄 অবিরত বর্ণনাধারা


বর্ণনাকারীর নির্ভরযোগ্যতা প্রথম শর্ত। আর অবিচ্ছিন্ন ধারায় বর্ণনা থাকা দ্বিতীয় আবশ্যক বিষয়। এই অবিরত বর্ণনাধারাই ইসনাদ। যেকোনো ইসনাদের মূল্যায়ন করতে হলে এর বর্ণনাকারীদের জীবনাচার সম্পর্কে জানা আবশ্যক। নীতি ও জ্ঞানের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর আমরা ইসনাদ নিরীক্ষণের দিকে অগ্রসর হতে পারি। তথ্যগুলো বর্ণনাকারীদের একে অন্যের মাধ্যমে পৌঁছেছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
যদি গ কোনোদিন খ-এর কাছ থেকে তথ্য না পেয়ে থাকে কিংবা খ-এর সাথে ক-এর সরাসরি যোগাযোগ না হয়, তাহলে সেটা নিশ্চয় ত্রুটিযুক্ত সূত্র। তাই সূত্র অবিচ্ছিন্ন হলেই কেবল পরের ধাপে যেতে পারি। কিন্তু শর্ত আরও রয়েছে।

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 সপক্ষে বা বিপক্ষে প্রমাণ

📄 সপক্ষে বা বিপক্ষে প্রমাণ


আলোচ্য ইসনাদকে সবশেষে অন্যান্য ইসনাদের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে। ধরা যাক, ক-এর কাছ থেকে ঙ, চ নামের আরও দুজন বিশ্বস্ত রাবি হাদিস বর্ণনা করেছেন অর্থাৎ ক-ঙ-চ। ক-এর কাছ থেকে তাদের পাওয়া তথ্য যদি ক-খ-গ সূত্রের সাথে মিলে যায়, তাহলে তা আরও জোরদার হলো। একে বলে মুতাবাআ (متابعة)। কিন্তু মানের দিক থেকে দুটো অসমান হলে করণীয় কী?
ঙ, চ-এর মান খ, গ-এর চেয়ে উত্তম হলে পরেরটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে যায়। এক্ষেত্রে ক-খ-গ সূত্রটিকে শায (শاذ) বলা হবে। এছাড়া চতুর্থ এবং পঞ্চম কোনো বর্ণনাও যদি ক-ঙ-চ এর সাথে মিলে যায়, তাহলে তা ক-খ-গ এর তুলনায় আরও শক্তিশালী পরিগণিত হয়। তবে নির্ভরশীলতার দিক থেকে ঙ, চ এবং খ, গ সমমানের হলে ক মুযতারিব (مضطرب) হবে। আবার ক-খ-গ এর বর্ণনা যদি ক-ঙ-চ এর সাথে ভিন্ন হয়, তবুও অন্য শত শত বর্ণনার সাথে মিলে যায়, তাহলে ক-ঙ-চ সূত্রের বর্ণনা বর্জন করা হবে।[১]

টিকাঃ
১. এখানের আলোচনার মূলকথা হলো, নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর বর্ণনা যদি অন্যান্য বর্ণনাকারীর বর্ণনার সাথে মিলে যায়, তাহলে তা আরও শক্তিশালী হয়। এ ধরনের মিলকে পরিভাষায় متابعة বলা হয়। এটা থাকা ভালো ও উত্তম, তবে হাদিস সহিহ হওয়ার জন্য শর্ত নয়; যেমনটি লেখকের পূর্বের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছিল। আর যদি তা অন্যান্য বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক হয় তাহলে দেখতে হবে, বর্ণনাকারীদের উভয় পক্ষ নির্ভরযোগ্যতা বা সংখ্যাধিক্যের বিচারে সমমানের কি না। যদি উভয় পক্ষ সমমানের হয় এবং কোনোটিকে প্রাধান্য দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে এ ধরনের বর্ণনাকে মুযতারিব (مضطرب) বলা হয়, যা দুর্বল বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত। আর যদি একপক্ষে তুলনামূলকভাবে অধিক নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী থাকে কিংবা নির্ভরযোগ্যতার বিবেচনায় উভয় পক্ষ সমমানের হলেও একপক্ষে অধিক সংখ্যক বর্ণনাকারী থাকে, তাহলে এ পক্ষের বর্ণনা গ্রহণযোগ্য ও সহিহ বলে বিবেচিত হবে এবং অপর পক্ষের বর্ণনা শায বা বিচ্ছিন্ন বর্ণনা বলে গণ্য হবে, যা দুর্বল হাদিসের একটি প্রকার। শারয়ি সম্পাদক

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 ইসনাদ পরীক্ষা

📄 ইসনাদ পরীক্ষা


কিছু ক্ষেত্রে অদ্ভুত কিছু ঘটনাও হাদিস হিসেবে প্রচলিত হয়ে যায়। সনদ পর্যালোচনায় দক্ষ না হওয়ার ফলে ভুল বর্ণনার পেছনে অযথা সময় ব্যয় করেছেন অনেক আলিম, এমনকি অল্প কয়েকজন হাদিস বিশারদও। যেমন: ইমাম আমাশের বর্ণনা থেকে ইমাম যাহাবি একটি হাদিস তুলে ধরেছেন। ইমাম আমাশ বলেন, 'আমি আনাস ইবনু মালিককে إن ناشئة الليل هي أشد وطأ وأصوب قبلا তিলাওয়াত করতে শুনেছি। যখন তাকে (তার উপনাম ধরে) বলা হলো, হে আবু হামজা, এটা তো وأقوم হবে। তখন তিনি উত্তর দিলেন, أقوم এবং وأصوب একই।'[১]
আব্দুস সাবুর শাহিন উক্ত ঘটনাটির বৈধতা প্রমাণ করতে গিয়ে বলেন, আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর উত্তরটি সাত আহরুফ[২] প্রসঙ্গে। কিন্তু প্রসিদ্ধ সনদ পর্যালোচকগণ বলেছেন, ইমাম আমাশ কখনো আনাস ইবনু মালিকের কাছ থেকে কিছু শোনেননি। এর প্রমাণ তার কথা থেকেই পাওয়া যায়। তিনি বলেন, আনাস ইবনু মালিক সকাল-সন্ধ্যায় প্রতিদিন আমার পাশ দিয়ে যেতেন। আমি (মনে মনে) বলতাম, 'আমি আপনার কাছ থেকে (কখনো) হাদিস শুনব না। নবিজির জীবদ্দশায় তার সেবা করেছেন ঠিকই, কিন্তু এরপর হাজ্জাজের কাছে গেছেন (পদের আশায়)। শেষমেশ সে আপনাকে শাসনকর্তা বানিয়েছে।' অতঃপর (আনাসের ব্যাপারে আমার ভুল বুঝতে পেরে) আমি লজ্জিত হয়েছি। তাই পরবর্তী সময়ে অন্য এক ব্যক্তির সূত্রে আমি আনাসের হাদিস বর্ণনা করতে শুরু করি।[৩]
আনাস ইবনু মালিক থেকে অনিচ্ছায় কিছু শুনে থাকলেও সেটা তিনি বর্ণনা করতেন হয়তো, কিন্তু তার পুরো জীবনবৃত্তান্ত গবেষণা করে মিযযিসহ অনেকেই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, নিয়মিত দেখা পাওয়া সত্ত্বেও আমাশ কখনো আনাস থেকে দানা পরিমাণ জ্ঞানও গ্রহণ করেননি। [৪] তাই পুরো ব্যাপারটি হয় নিরেট মিথ্যা আর নাহয় আমাশের ছাত্রদের ভুল।[৫] এ সকল বিষয়ে যাচাই-বাছাই কিংবা সুচিন্তিত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হলে ইসনাদ পর্যালোচনায় গভীর জ্ঞান থাকা আবশ্যক।

টিকাঃ
১. যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ২৪৪; এ বর্ণনাটি সহিহ নয়; বরং সূত্রবিচ্ছিন্ন। কেননা মুহাদ্দিসদের মতে ইমাম আমাশ আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে কোনো কিছু শোনেননি। তাছাড়াও এ বর্ণনায় এসেছে, 'আমি আনাস ইবনু মালিককে তিলাওয়াত করতে শুনেছি।' অথচ আবু ইয়ালার বর্ণনায় এখানে শোনার কথা আসেনি। এভাবে এসেছে, 'আমাশ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনাস রাযিয়াল্লাহ আনহু পড়লেন...' (মুসনাদু আবি ইয়ালা: ৪০২২) হাফিজ হাইসামি বলেন, 'আবু ইয়ালার বর্ণনাকারীগণ সহিহ হাদিসের বর্ণনাকারী। (মাজমাউজ জাওয়ায়িদ: ১১৬১৩) অনুরূপ আবু নাসর মারওয়াজির কিয়ামুল লাইল গ্রন্থেও এভাবে এসেছে, 'আমাশ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু পড়লেন...' (মুখতাসারু কিয়ামিল লাইল: খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪০) এসব বর্ণনায় শোনার কথা বলা হয়নি। তাই আনাস থেকে আমাশের সরাসরি শোনার বর্ণনাটিকে সঠিক বলার সুযোগ নেই।
ইমাম কুরতুবি তার তাফসিরে ইমাম আবু বকর ইবনুল আনবারির উদ্ধৃতিতে বলেন, 'এটা এমন হাদিস যা কোনো আহলুল ইলমের নিকট সহিহ সূত্রে প্রমাণিত নয়। কেননা এটার ভিত্তি হলো আমাশের ওপর, যিনি আনাস থেকে এটা বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এটা হলো সুত্রবিচ্ছিন্ন বর্ণনা, নিরবচ্ছিন্ন সূত্রে বর্ণিত নয় যে, তা গ্রহণযোগ্য হবে। কেননা আমাশ আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখেছেন বটে, কিন্তু তার থেকে কোনো কিছু শোনেননি। আনাস থেকে আমাশের যে সূত্রগুলো আছে তা মূলত তিনি ইয়াজিদ আর-রাকাশির সূত্রে আনাস থেকে বর্ণনা করেন। (আর ইয়াজিদ আর-রাকাশি দুর্বল বর্ণনাকারী।)' —শারয়ি সম্পাদক
২. আব্দুস সাবুর শাহিন, তারিখুল কুরআন, পৃষ্ঠা: ৮৮
৩. যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ২৪০
৪. আল-মিযযি, তাহযিবুল কামাল, খণ্ড: ১২, পৃষ্ঠা: ৭৬-৯২; ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মাইন, আলি ইবনুল মাদিনি, ইমাম বুখারি, ইমাম তিরমিযি, ইমাম আবু হাতিম রাজিসহ বিজ্ঞ মুহাদ্দিসদের মত এটাই, ইমাম আমাশ আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখলেও তার থেকে কখনো কোনো হাদিস শোনেননি। (বিস্তারিত দেখতে-তারিখু ইবনি মাইন, রিওয়ায়াতুদ দুরি, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৩২৮; মারাসিলু ইবনি আবি হাতিম : ২৯৭; বুখারি, আত-তারিখুল কাবির, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ১৮৮৬; সুনানুত তিরমিযি: ৩৫৩৩; আল-জারহু ওয়াত তাদিল, ইবনু আবি হাতিম, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৬৩০) অবশ্য ইমাম আবু নুআইম আসবাহানিসহ কিছু মুহাদ্দিসের মতে আমাশ আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখার পাশাপাশি তার থেকে হাদিসও বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এটা বিচ্ছিন্ন একটি মত। মুহাদ্দিসদের প্রসিদ্ধ মত সেটাই, যা হাদিস ও জারহু-তাদিল শাস্ত্রের ইমামগণ বলেছেন। (তুহফাতুল আহওয়াজি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬১-৬২)-শারয়ি সম্পাদক
৫. ব্যাপারটিকে যৌক্তিকভাবে খণ্ডন করা সম্ভব। ঘটনা সত্য হলে তা ৬১ হিজরি (আমাশের জন্ম) থেকে ৯৩ হিজরির (আনাস ইবন মালিকের মৃত্যু) মধ্যবর্তী সময়ে হতে হবে। সে অনুযায়ী ৭৫ হিজরিতে আমাশ একজন ১৪ বছর বয়সী কিশোর। উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু ২৫ হিজরিতে পর্ববর্তী সকল অনলিপি ধ্বংস করার নির্দেশ দেন। সাহাবিরা কোনোদিনও উসমানি মুসহাফের বিরুদ্ধে কিছু করেননি। একটি সহিহ বর্ণনায়ও এমন কিছু পাওয়া যায় না। সেখানে আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহ ছিলেন মুসহাফ কমিটির একজন সদস্য। দীর্ঘ ৫০ বছর সারা মুসলিমবিশ্ব এই একটি টেক্সটের ওপর ঐক্যবদ্ধ। কাজেই এরকম একটি গরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে কোনো অসতর্ক মন্তব্য সমর্থনযোগ্য নয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00