📄 অধ্যায় শেষে
দলিল-প্রমাণ বিবেচনায় নিঃসন্দেহে জেফরি এবং গোল্ডজিহারের তত্ত্বগুলোকে বাতিল বলতে হয়। বস্তুত তাদের দাবিকৃত ভিন্নতার কোনো অস্তিত্ব নেই। অসংখ্য উদাহরণ আছে, যেখানে প্রেক্ষাপটভেদে একই গঠনের ওপর একাধিক প্রকারের নুক্তা ও হরকত বসতে পারে। আর কিরাতের যে সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো আছে, তা কুরআনের অর্থের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। [৩] গোল্ডজিহার নিজেও এর স্বীকৃতি দিয়েছেন। মাগুলিস বলেছেন, ‘এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে, যেখানে লিপির অস্পষ্টতা থেকে সৃষ্ট পাঠভিন্নতা তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।’ [৪]
টেক্সট পরিবর্তনের মাত্রায় কুরআনকে বাইবেলের সমপর্যায়ভুক্ত করতে গিয়ে
প্রাচ্যবিদরা একটি ভুল করে বসেন। সদ্য জন্মানো মুসলিম অনুশাসনের ধর্মীয়-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রাথমিক ইহুদি-খ্রিষ্টীয় সমাজের অস্থিতিশীল অবস্থার পার্থক্য ভুলে যান তারা। এ এক অবাক করা প্রভেদ! প্রতিষ্ঠিত বংশধারার শিশুকে তুলনা করা হচ্ছে অনাথাশ্রমের সামনে ফেলে যাওয়া শিশুর সাথে। সমস্যা হলো, উভয়ের মা-বাবার পরিচয় নিরূপণের ক্ষেত্রে অনাথ শিশুটিকে আদর্শ ধরা হচ্ছে। আমি প্রাচ্যবিদদের যুক্তির দুর্বলতাগুলো দেখাতে চেয়েছি কেবল। তবে পূর্ব অভিজ্ঞতা বলছে তারা যথারীতি সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখবে।[১] এই তর্কযুদ্ধের একটি অবসান দরকার। নাহলে মুসলিম বিদ্বানদের ব্যস্ততা কেবল বাক্যবিনিময়েই পার হয়ে যাবে।
আর ধার্মিক মুসলিমদের জানা উচিত, এটি আল্লাহর কিতাব। তিনি বারবার এই কিতাবকে সংরক্ষণের ঘোষণা দিয়েছেন। তাই কোনোভাবেই কোনো ত্রুটিপূর্ণ ভাষা কিংবা লিপি স্থান পেতে পারে না এতে। সর্বশেষ বার্তা বহন করার যোগ্য করেই একে নাযিল করা হয়েছে। এর সাহিত্য শক্তি, দ্যোতনার গভীরতা, ছন্দময়তা, বানানরীতি এবং লেখনশৈলী এতটাই সমৃদ্ধ ছিল-আল্লাহ অন্য সকল ভাষার ওপর একে বেছে নিয়েছেন। তখন থেকেই সরাসরি আল্লাহর বাণী পাঠ করে আসছে মুসলিমরা। আর এতে চিহ্নযুক্ত করে অনারবদেরও তা মূলভাষায় পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
কুরআনের কিরাত এবং নবিজির সুন্নাহ সংরক্ষণে ইসলামি কর্মপন্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রসঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করলাম। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এভাবে এগুলো বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা পেয়ে এসেছে। পরের অধ্যায়ে এই কম্পন্থাকে তাই একটু যাচাই করে দেখা যাক।
টিকাঃ
১. পক্ষান্তরে বাইবেলের দিকে তাকান। এর পান্ডুলিপিজুড়ে অসংখ্য ভিন্নতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যেমন, John 1: 18-এর কোনো পান্ডুলিপিতে ‘an only One, God’ এবং কোনো পান্ডুলিপিতে ‘the only begotten Son’ ব্যবহৃত হয়েছে। শব্দের আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। পি. ডব্লিউ. কমফোর্টের মতে এর আক্ষরিক অনুবাদ ‘a unique God’ (Early Manuscripts & Modern Translations of the New Testament, Baker Books, 1990, p. 105).
২. D.S. Margoliouth, "Textual Variations", The Moslem World, Oct. 1925, vol. 15, no. 4, p. 340.
৩. Studies in Early Hadith Literature গ্রন্থে আমি গোল্ডজিহার এবং On Schacht's Origin of Muhammadan Jurisprudence গ্রন্থে শাখতের অপনোদন করেছি। এগুলো সবই ছিল অ্যাকাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। অথচ অধ্যাপক জন বার্টন তা 'ইসলামি দৃষ্টিকোণ' হিসেবে অভিহিত করলেন (An Introduction to the Hadith, Edinburgh Univ. Press, 1994, P. 206)। বাকিরাও যথারীতি উপেক্ষা করে গেল।