📄 পাঠ করার সময় সমার্থক শব্দ ব্যবহার
গোল্ডজিহার, ব্লাশিরসহ অন্যদের মতে, প্রথম যুগে কুরআনের কোনো শব্দকে সমার্থক কোনো শব্দ দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা স্বাভাবিক বিষয় ছিল। [৩] তাদের এ দাবির ভিত্তি হলো—
উমার ইবনুল খাত্তাবের সূত্রে তাবারি বর্ণনা করেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'উমার, কুরআনের সবকিছুই বিশুদ্ধ (অর্থাৎ ভুলক্রমে কিছু আয়াত ছুটে গেলেও তা শুদ্ধ থাকবে)। তবে আল্লাহর ক্ষমা ঘোষণার আয়াতের বদলে তার ক্রোধ এবং ক্রোধের আয়াতের বদলে ক্ষমার ব্যাপারে ভুল করা ব্যতীত।' [৪]
এই হাদিসকে অস্ত্র বানিয়ে অনেকেই কল্পনাপ্রবণ হয়ে পড়েছেন। তারা ভাবার্থ অপরিবর্তিত রেখে (যে কোনো) প্রতিশব্দ ব্যবহারকে বৈধ বলে দাবি করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা কি তাই? যত বিশুদ্ধই হোক না কেন, কোনো লেখক কি তার বাছাইকৃত শব্দমালাকে এর সমার্থক শব্দ দ্বারা প্রতিস্থাপন করতে রাজি হবে? সেখানে কুরআন তো মানবরচনার ঊর্ধ্বে। স্বয়ং নবিও এতে কোনো পরিবর্তন আনার অধিকার রাখতেন না। তাহলে এমন কাজে অন্যদেরকে কীভাবে তিনি অনুমতি দিতে পারেন?
কথার কথা, একজন কেরানির বক্তব্য ভুলভাবে উদ্ধৃত করলে যতটা ক্ষতি হবে, এর চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি হবে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ বর্ণনায় ভুল করলে। তাহলে স্বয়ং আল্লাহর বাণীতে ইচ্ছামতো প্রতিস্থাপন কীভাবে হতে পারে?
মুখস্থ তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে অনেক সময় মনের অজান্তেই এক সুরা থেকে অন্য সুরায় চলে যাই আমরা। এ ভয়ে লোকেরা হয়তো স্মৃতি থেকে পাঠ করা থেকেই বিরত থাকত। কিন্তু এ হাদিসে নবিজি সাহাবিদের উৎসাহ দিচ্ছেন মুখস্থ তিলাওয়াত করতে। [১] এটি গোটা মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য একটি বিরাট স্বস্তির কারণ।
প্রাচ্যবিদদের মতে, ইবনু মাসউদসহ অনেকেই কিরাতের মাঝে ব্যাখ্যা মিশিয়ে ফেলেছেন। ইমাম বুখারির সূত্রে পাওয়া যায়-
নাফি বলেন, ইবন উমার কুরআন তিলাওয়াত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারও সাথে কথা বলতেন না। একবার আমি কুরআন ধরে ছিলাম আর তিনি সুরা বাকারা মুখস্থ তিলাওয়াত করছিলেন। হঠাৎ একটি আয়াতে থেমে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট জানো?’
আমি উত্তর দিলাম, ‘না।’
তিনি জানালেন, ‘এটি অমুক অমুক ঘটনা সূত্রে নাযিল হয়েছে।’ এরপর আবার তিলাওয়াত চালিয়ে গেলেন। [১]
কিছু আলিম কিরাতের সময় শ্রোতাদের জন্য তাফসির করতে পছন্দ করতেন।[২] এখান থেকে এ কথাই জানা যায়। এটি স্পষ্টত কোনো কিরাতের ভিন্নতা কিংবা কুরআনের অংশ নয়। প্রাচ্যবিদরা এটিকেই কুরআনের টেক্সট সংস্কারের প্রচেষ্টা বলে দাবি করেন। অথচ এরকম কথা সাহাবিদেরকে ধর্মদ্রোহীদের কাতারে ফেলে দেওয়ার শামিল। কারণ এতে আল্লাহর জ্ঞানের ওপরে নিজের জ্ঞানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
টিকাঃ
১. R. Blachere, Introduction au Coran, 1947, pp. 69-70; see also 'Abdus-Sabur Shahin, Tarikh al-Quran, pp. 84-85
২. তাফসীর তাবারী, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৬; মুসনাদু আহমাদ: ১৬৬১৮
৩. মুসনাদু আহমাদ-এ সহিহ সূত্রে বর্ণিত ২১১৪৯ নং হাদিসে নবিজি সাত আহরুফের অনুমোদন করার পর বলেছেন, এর সবগুলোই বিশুদ্ধ। উল্লেখ্য, নবিজি এক শব্দের স্থানে সুনির্দিষ্ট সমার্থক শব্দ দিয়ে তিলাওয়াতের অনুমতি দিয়েছিলেন। এবং এটাকেও নবিজি সাত আহরুফের অন্তর্ভুক্ত আখ্যা দিয়েছেন। তবে গোল্ডজিহারের মতো প্রাচ্যবিদরা এখান থেকে যে বিষফল আহরণ করতে চেয়েছে, তা এর দ্বারা কোনোভাবেই প্রমাণিত হয় না। কারণ এক শব্দের স্থানে সমার্থক অন্য শব্দ দ্বারা তিলাওয়াত করার ক্ষেত্রে সাহাবিগণ স্বাধীন ছিলেন না। খেয়ালখুশি মতো নিজের পকেট থেকে একটা শব্দ বসিয়ে নেওয়ার অধিকার তাদের ছিল না। এক শব্দের স্থানে সমার্থক কোন শব্দটি বসানো যাবে-সেটাও নবিজিই আল্লাহর নির্দেশ মতো নির্ধারণ করে দিতেন।
হাদিসটি শুরু অংশে স্পষ্টভাবেই বিষয়টি বিবৃত হয়েছে। সেখানে বর্ণিত হয়েছে, উবাই ইবন কাব এবং ইবন মাসউদের মাঝে পাঠভিন্নতা নিয়ে তর্ক হয়েছিল। নবিজির দরবারে এসে তাদের প্রত্যেকেই নিজের কিরাতের ব্যাপারে এ দাবি করেছিলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কি আমাকে এভাবে পড়তে শেখাননি?' উত্তরে নবিজি বলেছেন, 'তোমাদের দুজনই সঠিক পড়েছ, সুন্দর পড়েছ।' এরপর নবিজি সাত আহরুফের আলোচনা করেছেন এবং সেখানে এক শব্দের স্থানে সমর্থক প্রতিশব্দ বসানোর অনুমতি দিয়েছেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হয়-এক্ষেত্রে তারা সাধীন ছিলেন না। নবিজি থেকে শিখে নিতে হতো।
অতএব প্রাচ্যবিদরা যা প্রমাণ করতে চেয়েছেন, তা এর থেকে মোটেও প্রমাণিত হয় না; বরং উলটো প্রমাণিত হয়। আরও দেখতে পারেন, মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ২০৫১৪। নবিজির বক্তব্য হিসেবে হাদিসটি জয়িফ তবে ইবনু মাসউদের বক্তব্য হিসেবে সহিহ। দেখুন শুআইব আরনাউত লিখিত হাদিসটির সংশ্লিষ্ট টীকা -শারয়ি সম্পাদক
৪. সহিহুল বুখারি: ৪৫২৬
৫. আব্দুস সবুর শাহিন, তারিখুল কুরআন, পৃষ্ঠা: ১৫-১৬।
📄 অধ্যায় শেষে
দলিল-প্রমাণ বিবেচনায় নিঃসন্দেহে জেফরি এবং গোল্ডজিহারের তত্ত্বগুলোকে বাতিল বলতে হয়। বস্তুত তাদের দাবিকৃত ভিন্নতার কোনো অস্তিত্ব নেই। অসংখ্য উদাহরণ আছে, যেখানে প্রেক্ষাপটভেদে একই গঠনের ওপর একাধিক প্রকারের নুক্তা ও হরকত বসতে পারে। আর কিরাতের যে সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো আছে, তা কুরআনের অর্থের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। [৩] গোল্ডজিহার নিজেও এর স্বীকৃতি দিয়েছেন। মাগুলিস বলেছেন, ‘এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে, যেখানে লিপির অস্পষ্টতা থেকে সৃষ্ট পাঠভিন্নতা তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।’ [৪]
টেক্সট পরিবর্তনের মাত্রায় কুরআনকে বাইবেলের সমপর্যায়ভুক্ত করতে গিয়ে
প্রাচ্যবিদরা একটি ভুল করে বসেন। সদ্য জন্মানো মুসলিম অনুশাসনের ধর্মীয়-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রাথমিক ইহুদি-খ্রিষ্টীয় সমাজের অস্থিতিশীল অবস্থার পার্থক্য ভুলে যান তারা। এ এক অবাক করা প্রভেদ! প্রতিষ্ঠিত বংশধারার শিশুকে তুলনা করা হচ্ছে অনাথাশ্রমের সামনে ফেলে যাওয়া শিশুর সাথে। সমস্যা হলো, উভয়ের মা-বাবার পরিচয় নিরূপণের ক্ষেত্রে অনাথ শিশুটিকে আদর্শ ধরা হচ্ছে। আমি প্রাচ্যবিদদের যুক্তির দুর্বলতাগুলো দেখাতে চেয়েছি কেবল। তবে পূর্ব অভিজ্ঞতা বলছে তারা যথারীতি সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখবে।[১] এই তর্কযুদ্ধের একটি অবসান দরকার। নাহলে মুসলিম বিদ্বানদের ব্যস্ততা কেবল বাক্যবিনিময়েই পার হয়ে যাবে।
আর ধার্মিক মুসলিমদের জানা উচিত, এটি আল্লাহর কিতাব। তিনি বারবার এই কিতাবকে সংরক্ষণের ঘোষণা দিয়েছেন। তাই কোনোভাবেই কোনো ত্রুটিপূর্ণ ভাষা কিংবা লিপি স্থান পেতে পারে না এতে। সর্বশেষ বার্তা বহন করার যোগ্য করেই একে নাযিল করা হয়েছে। এর সাহিত্য শক্তি, দ্যোতনার গভীরতা, ছন্দময়তা, বানানরীতি এবং লেখনশৈলী এতটাই সমৃদ্ধ ছিল-আল্লাহ অন্য সকল ভাষার ওপর একে বেছে নিয়েছেন। তখন থেকেই সরাসরি আল্লাহর বাণী পাঠ করে আসছে মুসলিমরা। আর এতে চিহ্নযুক্ত করে অনারবদেরও তা মূলভাষায় পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
কুরআনের কিরাত এবং নবিজির সুন্নাহ সংরক্ষণে ইসলামি কর্মপন্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রসঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করলাম। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এভাবে এগুলো বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা পেয়ে এসেছে। পরের অধ্যায়ে এই কম্পন্থাকে তাই একটু যাচাই করে দেখা যাক।
টিকাঃ
১. পক্ষান্তরে বাইবেলের দিকে তাকান। এর পান্ডুলিপিজুড়ে অসংখ্য ভিন্নতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যেমন, John 1: 18-এর কোনো পান্ডুলিপিতে ‘an only One, God’ এবং কোনো পান্ডুলিপিতে ‘the only begotten Son’ ব্যবহৃত হয়েছে। শব্দের আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। পি. ডব্লিউ. কমফোর্টের মতে এর আক্ষরিক অনুবাদ ‘a unique God’ (Early Manuscripts & Modern Translations of the New Testament, Baker Books, 1990, p. 105).
২. D.S. Margoliouth, "Textual Variations", The Moslem World, Oct. 1925, vol. 15, no. 4, p. 340.
৩. Studies in Early Hadith Literature গ্রন্থে আমি গোল্ডজিহার এবং On Schacht's Origin of Muhammadan Jurisprudence গ্রন্থে শাখতের অপনোদন করেছি। এগুলো সবই ছিল অ্যাকাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। অথচ অধ্যাপক জন বার্টন তা 'ইসলামি দৃষ্টিকোণ' হিসেবে অভিহিত করলেন (An Introduction to the Hadith, Edinburgh Univ. Press, 1994, P. 206)। বাকিরাও যথারীতি উপেক্ষা করে গেল।