📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 উচ্চারণ চিহ্ন না থাকার ফলে সৃষ্ট ভিন্নতা

📄 উচ্চারণ চিহ্ন না থাকার ফলে সৃষ্ট ভিন্নতা


কিরাতের ইতিহাস জানা না থাকলে উল্লিখিত উদাহরণগুলোকে যথার্থ মনে হতে পারে। কিন্তু যেকোনো তত্ত্বকে যথাযথ জ্ঞান করার আগে তা নিরিখ করা প্রয়োজন। তাই তাদের প্রস্তাবনাগুলো একটু নেড়েচেড়ে দেখা যাক।
স্বীকৃত শিক্ষক ছাড়া নিজে নিজে জ্ঞানার্জন না করা চিরন্তন মুসলিম ঐতিহ্যকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে গেছেন জেফরি এবং গোল্ডজিহার।[৪] প্রচলিত এ নিয়মের বাইরে কেউ কুরআন শিখতে সমর্থ ছিল না। কুরআনের অনেক স্থানে প্রসঙ্গ অনুযায়ী নুকাত ও হরকতের একাধিক রকমের ব্যবহার সম্ভব। তারপরও আলিমসমাজ কেবল একটি নিয়মেই পাঠ করেন। এটিই সামগ্রিক পরিস্থিতির চিত্র। বৈচিত্র্য একেবারেই দুর্লভ। তবে সেক্ষেত্রেও উভয় পাঠের লিখিত কাঠামো উসমানি মুসহাফের সাথে মিলে যাবে। উভয়পক্ষই একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে নবিজি পর্যন্ত তাদের কিরাতের দলিল প্রদর্শন করতে পারবে। কাজেই তিলাওয়াতকারী চাইলেই তার মনমতো নুস্তা ও হরকতের ব্যবহার করতে পারে না।
তাদের তত্ত্বগুলোর মধ্যে যদি সত্যের ছিটেফোঁটাও থাকত, তাহলে বাস্তবতা এখনের মতো হতো না। একে তো তিলাওয়াতকারীর সংখ্যা অগণিত। এর ওপর একই গঠনের শব্দকে যদি চার-পাঁচভাবে উচ্চারণ করা যায়, তাহলে কত শত-সহস্র এমনকি লক্ষ-লক্ষ পাঠভিন্নতা বের হতো, ভাবুন একবার! বাস্তবে কি এমনটা দেখতে পাই? অথচ সমস্ত মুসহাফ মিলিয়ে ইবনু মুজাহিদ মাত্র হাজার খানেক বিকল্পপাঠ পেয়েছেন।[১] তত্ত্বকে বাস্তবতার সাথে মেলালেই ফাঁকিবাজি বেরিয়ে আসে।
কয়েকটি উদাহরণের মাধ্যমে বক্তব্য আরও পরিষ্কার করছি।
প্রথম উদাহরণ—
ملك يوم الدين
১:৪
কেউ مال পড়ে, কেউ ملك পড়ে
قُلِ اللَّهُمَّ مَلِكَ الْمُلْكِ
৩:২৬
সর্বসম্মতভাবে ملك পড়া হয়
مَلِكِ النَّاسِ
১১৪:২-৩
সর্বসম্মতভাবে ملك পড়া হয়
এখানে প্রেক্ষাপট অনুযায়ী الله অথবা الله দুটোই তিলাওয়াত করা সম্ভব।
দ্বিতীয় উদাহরণ—
وإن يروا سبيل الرشد
৭:১৪৬
কেউ পড়ে رشد, কেউ পড়ে رَشَدَ
وهيئ لنا من أمرنا رشدا
১৮:১০
সর্বসম্মতভাবে رشد পড়া হয়
لأقرب من هذا رشدا
১৮:২৪
সর্বসম্মতভাবে رشد পড়া হয়
حال أن تُعلمن مما عُلِّمْتَ رُشْداً
৭২:২
কেউ পড়ে رشد, কেউ পড়ে رشدا
يَهْدِي إلى الرشد
৭২:২
সর্বসম্মতভাবে رشد পড়া হয়
أم أراد بهم ربهم رشدا
৭২:১০
সর্বসম্মতভাবে رشد পড়া হয়
فَأَوْلَئِكَ تَحَرَّوْا رَشَدًا
৭২ : ১৪
সর্বসম্মতভাবে রেশদাঁ পড়া হয়
لا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَراء ولا رَشَداً
৭২ : ২৫
সর্বসম্মতভাবে রেশদাঁ পড়া হয়
লেক্সিকোগ্রাফি অনুযায়ী প্রতিটি অবস্থাই প্রতিটি ক্ষেত্রে শুদ্ধ। তৃতীয় উদাহরণ-
مالا يملك لكُم ضَرّاً ولا نفعاً
৫:৭৬
সর্বসম্মতভাবে দোর্রাঁ পড়া হয়
لا أملكُ لِنَفْسِي نَفْعاً ولا ضراً
৭:১৮৮
সর্বসম্মতভাবে দোর্রাঁ পড়া হয়
لا أملكُ لِنَفْسِي ضراً ولا نفعاً
১০:৪৯
সর্বসম্মতভাবে দোর্রাঁ পড়া হয়
ولا يَمْلِكُ لَهُم ضَرّاً ولا نفعاً
২০:৮৯
সর্বসম্মতভাবে দোর্রাঁ পড়া হয়
ولا يملكون لأنفسهم ضراً ولا نفعاً
২৫ : ৩
সর্বসম্মতভাবে দোর্রাঁ পড়া হয়
لا يَمْلِكُ بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ نَفْعاً ولا ضراً
৩৪:৪২
সর্বসম্মতভাবে দোর্রাঁ পড়া হয়
إن أراد بكم ضراً
৪৮ : ১১
কেউ পড়ে দোর্রাঁ, কেউ পড়ে দোর্রাঁ
এখানেও লেক্সিকোগ্রাফি অনুসারে, প্রতিটি অবস্থা প্রতিটি ক্ষেত্রে শুদ্ধ।[২]
উদাহরণের পেছনে আরও কিছু কালি ব্যয় করা যেত। কিন্তু আমার বক্তব্যের সপক্ষে এতটুকুই যথেষ্ট। কারণ এমন হাজার হাজার উদাহরণ আছে, যেখানে একই শব্দের উভয় গঠনই প্রযোজ্য। কিন্তু ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় একটি। পরিমাণে তা এত বেশি, সেটি আর কাকতালীয় বলা চলে না। কাজেই গোল্ডজিহার এবং জেফরিদের তত্ত্বেরও কোনো ভিত্তি থাকছে না।
এবার নুক্তাহীন শব্দকে নুক্তাযুক্ত করার ফলে কখন তা বিকৃত বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সেটা জানা যাক। শব্দের ভুল এবং সঠিক রূপ সম্পর্কে না জেনে যখন নুক্তা যোগ করা হবে, তখন তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। ধরা যাক, দুটি পান্ডুলিপির একটিতে লেখা قبل المرأة ثم هرب অর্থাৎ 'মহিলাটিকে চুমু খেয়ে সে পালিয়ে গেল।' আবার অন্যটিতে লেখা قتل المرأة ثم هرب অর্থাৎ 'মহিলাটিকে হত্যা করে সে পালিয়ে গেল।' এখানে ঘটনার প্রেক্ষাপট না জানলে সঠিক রূপটি যাচাই করা অসম্ভব। এখানে টেক্সটকে ঘিরে সমস্যা দেখা দিয়েছে।
এবার এমন ১০টি পাণ্ডুলিপির কথা ধরা যাক, যেখানে বিভিন্ন সূত্রে বর্ণনা রয়েছে। এর নয়টিতে আছে قبل المرأة ثم هرب অর্থাৎ 'মহিলাটিকে চুমু খেয়ে সে পালিয়ে গেল;' কিন্তু দশমটিতে রয়েছে قبل المرأة ثم هرب অর্থাৎ 'মহিলাটির হাতি, তারপর সে পালিয়ে গেল।' একে তো উদ্ভট বাক্য, এর ওপর আগের নয়টি বর্ণনার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই এ বর্ণনাটি বর্জন করাই যৌক্তিক।
একই বিষয় কুরআনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ধরুন, বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভিন্ন ভিন্ন তারিখ, ভিন্ন ভিন্ন হাতের লেখা সংবলিত ১০০টি মুসহাফ আনা হলো। এর মধ্যে একটি ছাড়া বাকিগুলো একে অপরের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ওপর ব্যতিক্রমটি উদ্ভট। তাহলে বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিমাত্রই উক্ত ব্যতিক্রমটিকে লিপিকারের ভুল বলে স্বীকৃতি দেবে।
এদিকে জেফরি মুসলিমদের নিজেদের কিতাব বিকৃত করার অভিযোগে দায়ী করছেন। তিনি বলেছে, 'কুরআনের পুরোনো পাণ্ডুলিপিগুলোতে কোনো নুক্তা কিংবা হরকত ছিল না। আবার আধুনিক অনুলিপিগুলোর সাথে কুফীয় লিপির অনেক পার্থক্য রয়েছে। লিপি ও অর্থোগ্রাফির আধুনিকায়ন করা হয়েছে, টেক্সটে নুক্তা ও হরকত বসানো হয়েছে। সেগুলোর উদ্দেশ্য যদি ভালোও হয়, টেক্সট তো পরিবর্তিত হয়েছে। আর এখানেই আমাদের সমস্যা।' [৩]
এখানে জেফরি সাংঘাতিক ভুল করে ফেলেছেন। প্রাথমিক মুসহাফ মোটেও কুফীয় লিপিতে লেখা হয়নি। আগেই আলোচনা করা হয়েছে এ ব্যাপারে।[৪] একদম প্রাথমিক মুসহাফ বাঁকানো হিজাযি লিপিতে রচিত।[৫] এরপর আবার কুফীয় লিপির সাথে আধুনিক লিপির পার্থক্য দেখিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ তার কাছে লিপির আধুনিকায়নকে মনে হয়েছে পরিবর্তন।
ধরা যাক, নিজের একটি হস্তলিখিত প্রবন্ধ আমি প্রকাশকের কাছে পাঠালাম। এরপর সেটিকে হেলভেটিকা বা টাইমস নিউ রোমান লিপিতে (Font) পরিবর্তন করে ছাপানো হলো। এজন্য তাকে কি আমি দোষী সাব্যস্ত করব? আরবি যদি হায়ারাগ্লিফিকের মতো মৃত কোনো ভাষা হতো কিংবা কুরআন যদি তোরাহর মতো কয়েক শতাব্দী আগে হারিয়ে যেত, তাহলে তাতে পরিবর্তনের অভিযোগ আনা যেত। কারণ সেক্ষেত্রে একটি হারিয়ে যাওয়া, অস্পষ্ট গ্রন্থের অর্থোদ্ধারের জন্য নির্ভর করতে হতো অনুমানের ওপর। কিন্তু কুফীয় লিপি আজ পর্যন্ত পড়া যায়। আর শুরুতে কুরআন মৌখিকভাবে যেভাবে ছড়িয়েছে, মুসলিমরা আজ পর্যন্ত সেভাবেই তিলাওয়াত করছে। কাজেই জেফরির অভিযোগগুলো ধোপে টেকে না।[৬]

টিকাঃ
১. উসমানি মুসহাফগুলোর মধ্যে আলিমগণ ৪০টি চিহ্নে পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন। এগুলো ছিল অক্ষরের গাঠনিক ভিন্নতার কারণে। একই কারণ ইবন মুজাহিদের ক্ষেত্রে তো ছিলই। এর পাশাপাশি নির্দিষ্ট শব্দাবলির ওপর নুকাত ও চিহ্নের স্থান ভিন্নতার ওপর ভিত্তি করে তিনি ১ হাজার বহুবিধ পাঠ খুঁজে বের করেছিলেন।
২. বিস্তারিত জানতে আব্দুল ফাত্তাহ, আল-কিরাত ফি নাযরিল মুসতাশরিকিন ওয়াল মুলহিদিন, মাজাল্লাতুল আযহার, রামাদান ১৩৬০ হিজরি দ্রষ্টব্য।
৩. A. Jeffery, "The Textual History of the Qur'an', in A. Jeffery, The Qur'an as Scripture, pp. 89-90.
৪. অধ্যায় ৭.৪.৮
৫. এর কিছুকাল পরে অর্থাৎ প্রথম হিজরি শতাব্দির মধ্যভাগে কুফীয় লিপি প্রসিদ্ধি লাভ করে। অধ্যায় ৯.২. iv দ্রষ্টব্য।
৬. উল্লেখ্য, অধিকাংশ প্রাচ্যবিদ ওল্ড টেস্টামেন্টকে ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবে বিশ্বাস করে। অথচ হিব্রু লিপিকে দুবার পরিবর্তন করা হয়েছে এবং খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীর আগে তাতে কোনো উচ্চারণ চিহ্ন ছিল না। সময়ের এ দীর্ঘ পরিক্রমায় নিঃসন্দেহে এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে, যা বর্তমান হিব্রু লিপিতে দেখতে পাই। (অধ্যায় ১৫.৪-৭ দ্রষ্টব্য)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00