📄 একাধিক কিরাতের প্রয়োজনীয়তা
মক্কায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে আরবির সাথে পরিচিত ছিলেন, মদিনায় গিয়ে তাতে বৈচিত্র্য যুক্ত হয়। আরব জুড়ে ইসলাম বিস্তারের ফলে নতুন
নতুন গোত্র ইসলামের ছায়াতলে আসে এবং তৈরি হয় ভাষার বৈচিত্র্য। তাই কুরাইশী আরবিতে কথা বলা সবার জন্য সহজ ছিল না। সহিহ মুসলিমে রয়েছে—
উবাই ইবনু কাব থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গিফার গোত্রের জলাশয়ের (কূপের) কাছে ছিলেন। তখন জিবরিল তার কাছে এসে বলেন, ‘আল্লাহ আপনাকে এ নির্দেশ দিয়েছেন—আপনি যেন আপনার উম্মতকে এক হরফে (পদ্ধতি, উপভাষা) কুরআন পড়ান।’
তিনি বললেন, ‘আমি আল্লাহর নিকট তাঁর মার্জনা ও ক্ষমাপ্রার্থনা করি। কিছুতেই আমার উম্মত এতে সমর্থ হবে না।’
এরপর জিবরিল দ্বিতীয়বার এসে বলেন, ‘আল্লাহ আপনাকে এ নির্দেশ দিয়েছেন—আপনি যেন আপনার উম্মতকে দুই হরফে কুরআন পড়ান।’
তিনি বললেন, ‘কিছুতেই আমার উম্মাত এতে সমর্থ হবে না। আমি আল্লাহ তাআলার কাছে তাঁর মার্জনা ও ক্ষমাপ্রার্থনা করি।’
এরপর জিবরিল তৃতীয়বার এসে বলেন, ‘আল্লাহ আপনাকে এ নির্দেশ দিয়েছেন—আপনি যেন আপনার উম্মতকে তিন হরফে কুরআন পড়ান।’
তিনি বললেন, ‘কোনোভাবেই আমার উম্মাত এতে সমর্থ হবে না। আমি আল্লাহ তাআলার কাছে তাঁর মার্জনা ও ক্ষমাপ্রার্থনা করি।’
এরপর জিবরিল চতুর্থবার তার কাছে এসে বললেন, ‘আল্লাহ আপনাকে এ নির্দেশ দিয়েছেন—আপনি যেন আপনার উম্মতকে সাত হরফে কুরআন শিক্ষা দেন। তারা এর যেকোনো পদ্ধতিতে তিলাওয়াত করলে তা যথার্থ হবে।’ [১]
উবাই ইবনু কাব থেকে আরও বর্ণিত আছে—‘আহজাবুল মিরা’ নামক স্থানে আল্লাহর রাসুলের সাথে জিবরিলের দেখা হলে তিনি তাকে বলেন, ‘আমাকে এক উম্মি (নিরক্ষর) জাতির কাছে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে বয়োবৃদ্ধ পুরুষ, বয়স্ক বৃদ্ধা নারী ও নাবালক শিশু।’
জিবরিল উত্তর দিলেন, ‘তাহলে তাদের সাতটি আহরুফে (পদ্ধতি/উপভাষা) কুরআন তিলাওয়াতের নির্দেশ দেবেন।’ [২]
বিশের অধিক সাহাবি থেকে সাতটি আহরুফ বা উপভাষায় কুরআন নাযিলের ব্যাপারে হাদিস বর্ণিত আছে।[১] 'আহরুফ'-এর অর্থ নিয়ে মতপ্রকার রয়েছে ৪০টি। এর অনেকগুলো বাস্তবতা বিবর্জিত। তবে এ ব্যাপারে অধিকাংশই একমত, এর উদ্দেশ্য কুরাইশি আরবির সাথে অপরিচিতদের জন্য কুরআন তিলাওয়াতকে সহজতর করা। এই অনুমোদন আল্লাহর রহমতস্বরূপ।[৩]
আহরুফের ভিন্নতার ফলে মতবিরোধ সৃষ্টি হয় কয়েক দশক পর। এ কারণেই কুরাইশি আরবিতে কুরআনের মুসহাফ তৈরিতে উদ্বুদ্ধ হন উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু। নথিভুক্ত পাঁচটি মুসহাফের মাঝে পঠনগত পার্থক্য ছিল বড়জোর ৪০টি বর্ণে। মুসহাফের এই গাঠনিক পঠন অনুসরণ করতে বাধ্য ছিলেন মনোনীত কারিগণ। এছাড়া কে কার কাছ থেকে কুরআন শিখেছেন সেটাও উল্লেখ করতে হতো তাদের। কুরআন একত্রকরণ কার্যক্রমের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি যাইদ ইবনু সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'কিরাত এমন একটি সুন্নাহ, যাকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা হয়েছে।' এ বিষয়ে আগেও আলোচনা করেছি।
এক্ষেত্রে 'পাঠের ভিন্নতা' শব্দবন্ধটিই আসলে আমার পছন্দসই নয়। কারণ সংজ্ঞানুযায়ী, ভিন্ন পাঠ জিনিসটাই অনিশ্চয়তার ফল। ধরা যাক, লেখক লিখেছে একভাবে। কিন্তু অনুলেখক মূল লেখকের বাক্যের অনুলিখনে ভুল করল। এভাবে তৈরি হলো একটি অনিশ্চয়তা। পরবর্তী কোনো সম্পাদক যদি শুদ্ধ-অশুদ্ধ নির্ণয় করতে না পারেন, তাহলে তার মতে যেটি সঠিক বলে মনে হয়, সেটিকে মূলপাঠ্যে জায়গা দেবেন। অপর সংস্করণটি লেখবেন মার্জিনে। এটাকে বলে পাঠের ভিন্নতা।
কিন্তু কুরআনের ব্যাপারটি একদমই এমন নয়। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার ওহি গ্রহণ এবং তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে মনোনীত রাসুল। তিনি নিজেই কিছু আয়াতকে একাধিক রীতিতে তিলাওয়াত করেছেন। এখানে তাই অনিশ্চয়তার ব্যাপারটাই অপ্রাসঙ্গিক। কাজেই এটি 'পাঠের ভিন্নতা' হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। একে বরং বিকল্প পাঠ হিসেবে অভিহিত করাই ন্যায়সঙ্গত। তবে এর পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে-
এক. বৈচিত্র্যময় আরবীয় উপভাষাগুলোর মধ্যে স্বল্প সময়ে সামঞ্জস্য বিধান।
দুই. একটি আয়াতের মাঝে লুক্কায়িত অর্থের ব্যাপকতাকে দুটি ভিন্ন শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা। ওই দুটি শব্দই আবার স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুমোদিত। যেমন : সুরা ফাতিহার চতুর্থ আয়াতে মা-লিক (অধিকারী) কিংবা মালিক (অধিপতি) উভয়ই তিলাওয়াত করা যায়। দুটিই নবিজি শিখিয়েছেন। তাই এটি পাঠের ভিন্নতা নয়; বরং বিকল্প।
তবে প্রাচ্যবিদ মহল মুসলিমদের এই ব্যাখ্যাকে অগ্রাহ্য করে নিজেদের মনমতো একটা তত্ত্ব ঠুসে দিতে তৎপর। আর্থার জেফরি আগে থেকেই কুরআনের একটি পর্যালোচনামূলক সংস্করণ তৈরির কাজে ব্যস্ত। এরই অংশ হিসেবে ১৯২৬ সালে অধ্যাপক বার্গস্ট্রেসারের সাথে মিলে এমন একটি আর্কাইভ তৈরির কাজে হাত দেন, যা দিয়ে হয়তো একদিন কুরআনের মূলপাঠ্যের ইতিহাস উদ্ধার করা যাবে। এ কাজের উদ্দেশ্য পাঠের ভিন্নতার ওপর আলোকপাত। [১] সেখানে প্রায় ১৭০টি খণ্ডের ওপর অনুসন্ধান চালান তিনি। তবে উৎসগুলোর সামান্য কিছু অংশ নির্ভরযোগ্য হলেও বাকি অংশের কোনো প্রামাণ্য নির্ভরযোগ্যতা নেই। সংগ্রহ করা তথাকথিত রূপভেদগুলোকে তিনি প্রায় ৩০০ পৃষ্ঠা জুড়ে ছাপিয়ে রেখেছেন। আনুমানিক ৩০ জন আলিমের ব্যক্তিগত মুসহাফও এর অন্তর্ভুক্ত। এ অধ্যায়ে আমি কেবল 'পাঠের ভিন্নতা' প্রসঙ্গে জেফরির কাজগুলো পর্যালোচনা করব।
টিকাঃ
১. সহিহ মুসলিম: ৮২১
২. মুসনাদু আহমাদ: ২১২০৪; হাদিসটি সহিহ।
৩. আস-সুযুতি, আল-ইতকান, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২১১
৪. এর আক্ষরিক অর্থ বর্ণসমূহ।
৫. আহরফের ব্যাপারে মত ৪০টি থাকলেও গবেষক আলিমদের নিকট বিশুদ্ধ ও প্রতিষ্ঠিত মত হলো- কুরআন তিলাওয়াতের ধরন সাত প্রকার। মূল ভাব ও মর্মে কোনোরূপ ব্যত্যয় ঘটা ছাড়াই আরবি ভাষারীতি অনুযায়ী শব্দের সামান্য কিছু পরিবর্তন। যে পরিবর্তনগুলো আরবি ভাষার সাত ধরনের পঠন-রীতির বাইরে যায় না-শারয়ি সম্পাদক
৬. A. Jeffery, Materials for the History of the Text of the Qur'an, E.J. Brill, Leiden, 1937. এই আর্কাইভ তৈরিতে জেফরি একগাদা জুডিও-খ্রিষ্টান পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। যেমন: একাদশ পৃষ্ঠায় 'Canonization by Ibn Mujahid'; তৃতীয় ও পঞ্চম পৃষ্ঠার পাদটীকায় 'Muslim Massora'; চতুর্দশ পৃষ্ঠায় মৃত্যুসন বোঝাতে d এর বদলে রুশ চিহ্ন দিয়েছেন (যেন বেচারা অখ্রিস্টানটাকে খ্রিষ্টান বানাতে চাইছেন!) ইত্যাদি।
৭. A. Jeffery, 'The Textual History of the Qur'an', in A. Jeffery, The Qur'an as Scripture, R.E Moore Co., Inc., New York, 1952, p. 97
📄 বিকল্প পাঠ বা তথাকথিত পাঠভিন্নতার দ্বিতীয় কারণ
গবেষণার উপকরণ সংগ্রহে জেফরি প্রাচ্যবিদদের পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। কিন্তু পুরোপুরি উপেক্ষা করে গেছেন মুসলিমদের পর্যালোচনামূলক পদ্ধতি 'ইসনাদ'।[২] তিনি বলেছেন, 'বিশ্লেষক মহল প্রথমে সকল প্রকারের মত, ধারণা, মন্তব্য, অনুমান সংগ্রহ করেন। তারপর স্থান, কাল এবং শর্ত অনুযায়ী কোনটি সেই টেক্সটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তা পর্যবেক্ষণ ও উদঘাটন করেন। বর্ণনার ধারা (ইসনাদ) যা-ই হোক। হোমারের কোনো কবিতা বা দার্শনিক এরিস্টলের কোনো চিঠির টেক্সট যে পন্থায় নির্ণয় করা হয়, তাওরাত ও বাইবেলের টেক্সট নির্ণয়েও তা-ই অনুসৃত হবে।[৩]
অতীতকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে সাক্ষী উপস্থাপন ও যাচাইয়ের মাধ্যমে এর বিভিন্ন অংশ উদঘাটন করা সম্ভব। একজন মিথ্যুক আর একজন সত্যবাদীর সাক্ষ্যকে একই সারিতে নামিয়ে আনা নিতান্তই অসততা। এটাই মুসলিম আলিমদের অবস্থান। অথচ জেফরির পদ্ধতি অনুযায়ী একজন সত্যবাদীর ওপরে একজন মিথ্যুকের সাক্ষ্য প্রাধান্য লাভ করার অবকাশ আছে।[৪] নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণ করতে তারা ইবনু
মাসউদ বা যে কারও নামে চালানো সকল সংস্করণ গ্রহণ করেছে। সূত্র যতই জাল, অবিশ্বস্ত কিংবা অবিদিত হোক না কেন। অথচ অগ্রাহ্য করে গেছে সুপরিচিত, বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য উৎসের বিশাল তথ্য ভান্ডারকে।
নুক্তার অনুপস্থিতির অভিযোগের খন্ডন আগেই করেছি। জেফরির আরেকটি দাবি হলো—কিছু কারি উসমানি মুসহাফের পূর্ববর্তী টেক্সট অনুসরণ করেছেন। সেগুলো উসমানি গঠন থেকে কিঞ্চিৎ আলাদা ছিল এবং খলিফার আদেশের পরেও তা ধ্বংস করা হয়নি।[১] কিন্তু এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ না দিয়েই তা প্রচার করে গেছেন তিনি। ইবনু মাসউদের মুসহাফের নামে উপস্থাপিত উদাহরণগুলো প্রথমেই বাতিল। কারণ তার কোনো তথ্যসূত্রে 'মুসহাফু ইবনি মাসউদ'-নামটাও উল্লেখ করা নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি কেবল 'ইবনু মাসউদ অমুক কায়দায় আয়াত তিলাওয়াত করেছেন' বলে চালিয়ে দিয়েছেন। কোনো প্রমাণ বা বর্ণনাধারার উল্লেখ নেই। এগুলো কেবল আষাঢ় গল্প এবং গুজব ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রমাণিত কিরাতের বিপক্ষে এরকম ভিত্তিহীন একটি বিষয়কে 'দলিল' হিসেবে দাঁড় করানোর অর্থ—সত্য ও মিথ্যা বর্ণনাকারীর মধ্যে কোনো পার্থক্য না দেখা।[২]
জেফরির অভিযোগগুলো শুধু ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রসঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক পঠিত এমন একটি আয়াতের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন, যা কিনা উসমানি মুসহাফের সাথে সাংঘর্ষিক। এ ভ্রান্ত বর্ণনাও খণ্ডন করছি। তার আগে উত্থাপিত আয়াতটি উল্লেখ করা যাক: (وَالْعَصْرِ وَنَوَيْبِ الدَّهْرِ إِنَّ الإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ) (সুরা আসরের প্রথম আয়াতে দুটি অতিরিক্ত শব্দ যুক্ত করা হয়েছে)।[৩]
আল-মাসাহিফ গ্রন্থের লেখক উক্ত বর্ণনাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনটি কারণে[৪]— ক. আসিম ইবনু নাজুদ তার শিক্ষক আস-সুলামি থেকে বর্ণনা করেছেন, আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু উক্ত আয়াতটি পুরোপুরি উসমানি মুসহাফ অনুযায়ী তিলাওয়াত করেছেন। উল্লেখ্য, আস-সুলামি ছিলেন আলির কৃতি ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম।
খ. উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদতের পর আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু শাসনভার গ্রহণ করেন। যদি সত্যিই তিনি উক্ত আয়াত লুকানো হয়েছে বলে মনে করতেন, তাহলে নিজ দায়িত্বে সেই ভুল সংশোধন করতেন। নয়তো এটি তার বিশ্বাসবিরুদ্ধ কাজ হতো।
গ. উসমানের উদ্যোগের সাথে গোটা মুসলিমসমাজের সম্মতি ছিল। কেউ যে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উত্থাপন করেননি, তা স্বয়ং আলির মুখের কথা। একমত না হলে অবশ্যই তিনি এর বিরুদ্ধাচারণ করতেন। [১]
স্বয়ং নবির সাহাবিদের উপস্থিতিতে কুরআনের টুকরোগুলো আগুনে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে, এমন দৃশ্যই তো মুসহাফের বিশুদ্ধতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। হাজার হাজার সাহাবির অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে এখান থেকে। কোনো যোগ, বিয়োগ বা পরিবর্তন তাতে আনা হয়নি। তাই কোনো প্রাক-উসমানি টেক্সটের পক্ষে কোনো সাহাবির সমর্থন থাকার দাবি উত্থাপন করা মানে তাদের বিশ্বাসের ওপর কালিমা লেপন করা।
আল-মাসাহিফ গ্রন্থটি ইবনু আবি দাউদ রচনা করেছেন। তিনি উসমানি টেক্সটের সাথে সাংঘর্ষিক বহু কিরাতের সংগ্রাহক। কিন্তু সেগুলোর একটিকেও তিনি কুরআন হিসেবে অনুমোদন দেননি।[২] এ প্রসঙ্গে তার মত হলো, 'উসমানি মুসহাফ ব্যতীত আর কোনোকিছুকে আমরা কুরআন হিসেবে তিলাওয়াত করার পক্ষপাতী না। সালাতে কেউ এ মুসহাফ-বিরুদ্ধ কিছু তিলাওয়াত করলে আমি তাকে আবারও সালাত আদায় করার আদেশ দিচ্ছি।' [৩]
ওল্ড এবং নিউ টেস্টামেন্টের অস্তিত্বলাভের সময়টা ছিল ব্যাপক অস্থিতিশীল। রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফলে দুটিই একেবারেই ছিন্নমূল হয়ে পড়ে। একইরকম ত্রুটি
কুরআনের মধ্যে খুঁজে পেতে তাই পশ্চিমা পণ্ডিত মহল সদা ব্যস্ত। কুরআনকে একচোখা দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলেও ওল্ড এবং নিউ টেস্টামেন্টের বেলায় ছাড় দিতে তারা এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। [১] নিজের সংগৃহীত কিছু পাঠভিন্নতার বিশুদ্ধতা নিয়ে কিন্তু জেফরি নিজেই ছিলেন দোটানায়। অথচ সেগুলো উল্লেখ করে নিজেই বই ভরিয়ে ফেলতে একটুও কার্পণ্য করেননি। জেফরি বলেন—
'কিছু পাঠভিন্নতা ভাষাগতভাবে অসম্ভব বলেই মনে হয়... কোনোটা আবার মনে হয় যেন পরবর্তীকালের ভাষা-ইতিহাসবিদদের উদ্ভাবন... তবে এর বিরাট অংশ টিকে যাওয়া প্রাক-উসমানি টেক্সট হিসেবে বিবেচনা পাওয়ার যোগ্য দাবিদার। অবশ্য এদেরকেও আধুনিক পর্যালোচনা-বিদ্যার বৈতরণী পেরিয়েই আসতে হবে...তাহলেই আমরা এগুলোকে স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করে টেক্সটের একটি ইতিহাস পুনর্নির্মাণের চেষ্টায় সফল হব।' [২]
চিন্তা করুন, 'যোগ্য দাবিদার', 'আধুনিক পর্যালোচনা-বিদ্যার বৈতরণী' এগুলো আসলে ফাঁপা কথার ফুলঝুরি ছাড়া কিছুই নয়।
টিকাঃ
১. Jeffery (ed.), al-Masahif, Introduction, pp. 7-8.
২. মুসহাফ ইবনি মাসউদ এবং জেফরির পর্যালোচনা নিয়ে ত্রয়োদশ অধ্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা হয়েছে।
৩. A. Jeffery, Materials, p. 192
৪. A. Jeffery (ed.), Muqaddimatan, pp. 103-4.
৫. অধ্যায় ৭.৪.iii দ্রষ্টব্য
৬. কোনো কিরাত কুরআন হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত। যথা : ১. উসমানি লিপিতে তার সম্ভাবনা বিদ্যমান থাকা, ২. উক্ত কিরাত মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হওয়া, ৩. আরবি ভাষার ব্যাকরণের নীতিমালা অনুযায়ী উক্ত কিরাত শুদ্ধতার মানে উত্তীর্ণ হওয়া।
এ তিন শর্ত পাওয়া না গেলে তা কুরআন হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না। দুর্বল সূত্রে বর্ণিত হলে পরিত্যাজ্য হবে। সহিহ সূত্রে বর্ণিত হলে, তা একটি সহিহ হাদিসের সমমর্যাদায় স্থান পাবে। কুরআনের কোনো আয়াতের ব্যাখ্যা বা কোনো বিধানের বিশ্লেষণে তা কাজে লাগানো যাবে। কুরআন হিসেবে তিলাওয়াত বৈধ হবে না। মুফতি তাকি উসমানির উলমুল কুরআন গ্রন্থে রেফারেন্সসহ এ ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে। শারয়ি সম্পাদক
৭. ইবনু আবু দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ৫৩-৫৭
৮. সম্প্রতি Juynboll রচিত Muslim Tradition বইয়ের জ্যাকেট কাভার আবার উলটে পালটে দেখছিলাম। কাভারের ছবিটি কাগজে লিখিত প্রাচীনতম আরবি পান্ডুলিপি থেকে নেওয়া। নোটে লেখা : 'পান্ডুলিপিটি ২৫২ হিজরি/৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে অনলিখিত বলে দাবি করা হয়।' ওল্ড এবং নিউ টেস্টামেন্টসহ অন্যান্য গ্রন্থের ব্যাপারেও এহেন সতর্কতা কতটা আশা করা যায়?
৯. Jeffery, Materials, Preface, p. x.
📄 পাঠ করার সময় সমার্থক শব্দ ব্যবহার
গোল্ডজিহার, ব্লাশিরসহ অন্যদের মতে, প্রথম যুগে কুরআনের কোনো শব্দকে সমার্থক কোনো শব্দ দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা স্বাভাবিক বিষয় ছিল। [৩] তাদের এ দাবির ভিত্তি হলো—
উমার ইবনুল খাত্তাবের সূত্রে তাবারি বর্ণনা করেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'উমার, কুরআনের সবকিছুই বিশুদ্ধ (অর্থাৎ ভুলক্রমে কিছু আয়াত ছুটে গেলেও তা শুদ্ধ থাকবে)। তবে আল্লাহর ক্ষমা ঘোষণার আয়াতের বদলে তার ক্রোধ এবং ক্রোধের আয়াতের বদলে ক্ষমার ব্যাপারে ভুল করা ব্যতীত।' [৪]
এই হাদিসকে অস্ত্র বানিয়ে অনেকেই কল্পনাপ্রবণ হয়ে পড়েছেন। তারা ভাবার্থ অপরিবর্তিত রেখে (যে কোনো) প্রতিশব্দ ব্যবহারকে বৈধ বলে দাবি করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা কি তাই? যত বিশুদ্ধই হোক না কেন, কোনো লেখক কি তার বাছাইকৃত শব্দমালাকে এর সমার্থক শব্দ দ্বারা প্রতিস্থাপন করতে রাজি হবে? সেখানে কুরআন তো মানবরচনার ঊর্ধ্বে। স্বয়ং নবিও এতে কোনো পরিবর্তন আনার অধিকার রাখতেন না। তাহলে এমন কাজে অন্যদেরকে কীভাবে তিনি অনুমতি দিতে পারেন?
কথার কথা, একজন কেরানির বক্তব্য ভুলভাবে উদ্ধৃত করলে যতটা ক্ষতি হবে, এর চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি হবে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ বর্ণনায় ভুল করলে। তাহলে স্বয়ং আল্লাহর বাণীতে ইচ্ছামতো প্রতিস্থাপন কীভাবে হতে পারে?
মুখস্থ তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে অনেক সময় মনের অজান্তেই এক সুরা থেকে অন্য সুরায় চলে যাই আমরা। এ ভয়ে লোকেরা হয়তো স্মৃতি থেকে পাঠ করা থেকেই বিরত থাকত। কিন্তু এ হাদিসে নবিজি সাহাবিদের উৎসাহ দিচ্ছেন মুখস্থ তিলাওয়াত করতে। [১] এটি গোটা মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য একটি বিরাট স্বস্তির কারণ।
প্রাচ্যবিদদের মতে, ইবনু মাসউদসহ অনেকেই কিরাতের মাঝে ব্যাখ্যা মিশিয়ে ফেলেছেন। ইমাম বুখারির সূত্রে পাওয়া যায়-
নাফি বলেন, ইবন উমার কুরআন তিলাওয়াত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারও সাথে কথা বলতেন না। একবার আমি কুরআন ধরে ছিলাম আর তিনি সুরা বাকারা মুখস্থ তিলাওয়াত করছিলেন। হঠাৎ একটি আয়াতে থেমে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট জানো?’
আমি উত্তর দিলাম, ‘না।’
তিনি জানালেন, ‘এটি অমুক অমুক ঘটনা সূত্রে নাযিল হয়েছে।’ এরপর আবার তিলাওয়াত চালিয়ে গেলেন। [১]
কিছু আলিম কিরাতের সময় শ্রোতাদের জন্য তাফসির করতে পছন্দ করতেন।[২] এখান থেকে এ কথাই জানা যায়। এটি স্পষ্টত কোনো কিরাতের ভিন্নতা কিংবা কুরআনের অংশ নয়। প্রাচ্যবিদরা এটিকেই কুরআনের টেক্সট সংস্কারের প্রচেষ্টা বলে দাবি করেন। অথচ এরকম কথা সাহাবিদেরকে ধর্মদ্রোহীদের কাতারে ফেলে দেওয়ার শামিল। কারণ এতে আল্লাহর জ্ঞানের ওপরে নিজের জ্ঞানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
টিকাঃ
১. R. Blachere, Introduction au Coran, 1947, pp. 69-70; see also 'Abdus-Sabur Shahin, Tarikh al-Quran, pp. 84-85
২. তাফসীর তাবারী, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৬; মুসনাদু আহমাদ: ১৬৬১৮
৩. মুসনাদু আহমাদ-এ সহিহ সূত্রে বর্ণিত ২১১৪৯ নং হাদিসে নবিজি সাত আহরুফের অনুমোদন করার পর বলেছেন, এর সবগুলোই বিশুদ্ধ। উল্লেখ্য, নবিজি এক শব্দের স্থানে সুনির্দিষ্ট সমার্থক শব্দ দিয়ে তিলাওয়াতের অনুমতি দিয়েছিলেন। এবং এটাকেও নবিজি সাত আহরুফের অন্তর্ভুক্ত আখ্যা দিয়েছেন। তবে গোল্ডজিহারের মতো প্রাচ্যবিদরা এখান থেকে যে বিষফল আহরণ করতে চেয়েছে, তা এর দ্বারা কোনোভাবেই প্রমাণিত হয় না। কারণ এক শব্দের স্থানে সমার্থক অন্য শব্দ দ্বারা তিলাওয়াত করার ক্ষেত্রে সাহাবিগণ স্বাধীন ছিলেন না। খেয়ালখুশি মতো নিজের পকেট থেকে একটা শব্দ বসিয়ে নেওয়ার অধিকার তাদের ছিল না। এক শব্দের স্থানে সমার্থক কোন শব্দটি বসানো যাবে-সেটাও নবিজিই আল্লাহর নির্দেশ মতো নির্ধারণ করে দিতেন।
হাদিসটি শুরু অংশে স্পষ্টভাবেই বিষয়টি বিবৃত হয়েছে। সেখানে বর্ণিত হয়েছে, উবাই ইবন কাব এবং ইবন মাসউদের মাঝে পাঠভিন্নতা নিয়ে তর্ক হয়েছিল। নবিজির দরবারে এসে তাদের প্রত্যেকেই নিজের কিরাতের ব্যাপারে এ দাবি করেছিলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কি আমাকে এভাবে পড়তে শেখাননি?' উত্তরে নবিজি বলেছেন, 'তোমাদের দুজনই সঠিক পড়েছ, সুন্দর পড়েছ।' এরপর নবিজি সাত আহরুফের আলোচনা করেছেন এবং সেখানে এক শব্দের স্থানে সমর্থক প্রতিশব্দ বসানোর অনুমতি দিয়েছেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হয়-এক্ষেত্রে তারা সাধীন ছিলেন না। নবিজি থেকে শিখে নিতে হতো।
অতএব প্রাচ্যবিদরা যা প্রমাণ করতে চেয়েছেন, তা এর থেকে মোটেও প্রমাণিত হয় না; বরং উলটো প্রমাণিত হয়। আরও দেখতে পারেন, মুসনাদু আহমাদ, হাদিস: ২০৫১৪। নবিজির বক্তব্য হিসেবে হাদিসটি জয়িফ তবে ইবনু মাসউদের বক্তব্য হিসেবে সহিহ। দেখুন শুআইব আরনাউত লিখিত হাদিসটির সংশ্লিষ্ট টীকা -শারয়ি সম্পাদক
৪. সহিহুল বুখারি: ৪৫২৬
৫. আব্দুস সবুর শাহিন, তারিখুল কুরআন, পৃষ্ঠা: ১৫-১৬।
📄 অধ্যায় শেষে
দলিল-প্রমাণ বিবেচনায় নিঃসন্দেহে জেফরি এবং গোল্ডজিহারের তত্ত্বগুলোকে বাতিল বলতে হয়। বস্তুত তাদের দাবিকৃত ভিন্নতার কোনো অস্তিত্ব নেই। অসংখ্য উদাহরণ আছে, যেখানে প্রেক্ষাপটভেদে একই গঠনের ওপর একাধিক প্রকারের নুক্তা ও হরকত বসতে পারে। আর কিরাতের যে সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো আছে, তা কুরআনের অর্থের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। [৩] গোল্ডজিহার নিজেও এর স্বীকৃতি দিয়েছেন। মাগুলিস বলেছেন, ‘এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে, যেখানে লিপির অস্পষ্টতা থেকে সৃষ্ট পাঠভিন্নতা তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।’ [৪]
টেক্সট পরিবর্তনের মাত্রায় কুরআনকে বাইবেলের সমপর্যায়ভুক্ত করতে গিয়ে
প্রাচ্যবিদরা একটি ভুল করে বসেন। সদ্য জন্মানো মুসলিম অনুশাসনের ধর্মীয়-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রাথমিক ইহুদি-খ্রিষ্টীয় সমাজের অস্থিতিশীল অবস্থার পার্থক্য ভুলে যান তারা। এ এক অবাক করা প্রভেদ! প্রতিষ্ঠিত বংশধারার শিশুকে তুলনা করা হচ্ছে অনাথাশ্রমের সামনে ফেলে যাওয়া শিশুর সাথে। সমস্যা হলো, উভয়ের মা-বাবার পরিচয় নিরূপণের ক্ষেত্রে অনাথ শিশুটিকে আদর্শ ধরা হচ্ছে। আমি প্রাচ্যবিদদের যুক্তির দুর্বলতাগুলো দেখাতে চেয়েছি কেবল। তবে পূর্ব অভিজ্ঞতা বলছে তারা যথারীতি সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখবে।[১] এই তর্কযুদ্ধের একটি অবসান দরকার। নাহলে মুসলিম বিদ্বানদের ব্যস্ততা কেবল বাক্যবিনিময়েই পার হয়ে যাবে।
আর ধার্মিক মুসলিমদের জানা উচিত, এটি আল্লাহর কিতাব। তিনি বারবার এই কিতাবকে সংরক্ষণের ঘোষণা দিয়েছেন। তাই কোনোভাবেই কোনো ত্রুটিপূর্ণ ভাষা কিংবা লিপি স্থান পেতে পারে না এতে। সর্বশেষ বার্তা বহন করার যোগ্য করেই একে নাযিল করা হয়েছে। এর সাহিত্য শক্তি, দ্যোতনার গভীরতা, ছন্দময়তা, বানানরীতি এবং লেখনশৈলী এতটাই সমৃদ্ধ ছিল-আল্লাহ অন্য সকল ভাষার ওপর একে বেছে নিয়েছেন। তখন থেকেই সরাসরি আল্লাহর বাণী পাঠ করে আসছে মুসলিমরা। আর এতে চিহ্নযুক্ত করে অনারবদেরও তা মূলভাষায় পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
কুরআনের কিরাত এবং নবিজির সুন্নাহ সংরক্ষণে ইসলামি কর্মপন্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রসঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করলাম। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এভাবে এগুলো বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা পেয়ে এসেছে। পরের অধ্যায়ে এই কম্পন্থাকে তাই একটু যাচাই করে দেখা যাক।
টিকাঃ
১. পক্ষান্তরে বাইবেলের দিকে তাকান। এর পান্ডুলিপিজুড়ে অসংখ্য ভিন্নতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যেমন, John 1: 18-এর কোনো পান্ডুলিপিতে ‘an only One, God’ এবং কোনো পান্ডুলিপিতে ‘the only begotten Son’ ব্যবহৃত হয়েছে। শব্দের আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। পি. ডব্লিউ. কমফোর্টের মতে এর আক্ষরিক অনুবাদ ‘a unique God’ (Early Manuscripts & Modern Translations of the New Testament, Baker Books, 1990, p. 105).
২. D.S. Margoliouth, "Textual Variations", The Moslem World, Oct. 1925, vol. 15, no. 4, p. 340.
৩. Studies in Early Hadith Literature গ্রন্থে আমি গোল্ডজিহার এবং On Schacht's Origin of Muhammadan Jurisprudence গ্রন্থে শাখতের অপনোদন করেছি। এগুলো সবই ছিল অ্যাকাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। অথচ অধ্যাপক জন বার্টন তা 'ইসলামি দৃষ্টিকোণ' হিসেবে অভিহিত করলেন (An Introduction to the Hadith, Edinburgh Univ. Press, 1994, P. 206)। বাকিরাও যথারীতি উপেক্ষা করে গেল।