📄 সাধারণ আরবি লিপিতে তথাকথিত অর্থো এবং পালিওগ্রাফিক ব্যতিক্রম
সাধারণ আরবি এবং কুরআনের আরবির জন্য কীভাবে দুটি ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা হতো, তা আগেই দেখান হয়েছে। উভয় লিপির মধ্যকার পার্থক্য এবং উসমানি মুসহাফে আধুনিক বানান প্রয়োগের বিরুদ্ধে ফতোয়া জানতে পেরেছি; কিন্তু অন্যান্য গ্রন্থগুলোর কী হলো? আরবি পালিওগ্রাফি এবং অর্থোগ্রাফির পরিবর্তন কী প্রভাব ফেলেছিল সেগুলোর ওপর?
চিত্র: ২২৭ হিজরির একটি সাধারণ আরবি লিপি। সূত্র: R.G. Khoury, Wahb b. Munabbih, Plate PB 9.
এই পাণ্ডুলিপি[৩] থেকে খোওরি কিছু বৈচিত্র্যময় বানান খুঁজে পেয়েছেন। যেমন:
| প্রাপ্ত লিপি | আধুনিক বানান | প্রাপ্ত লিপি | আধুনিক বানান | প্রাপ্ত লিপি | আধুনিক বানান |
|---|---|---|---|---|---|
| اعدى | أعداء | سفهاء | سفها | المرأة | المرة |
| نساكم | نساءكم | هولاء | هولی | جاءك | جاك |
তلا تلی
أوحى اوحا
اقرأ اقری
البلاء البلى
ضلت ظلت
ضحی ظحا
আরও কিছু উল্লেখযোগ্য ভিন্নতা আছে। যেমন: -এর স্থলে لِ লেখা হয়েছে। আবার ا-এর স্থলে قُری বানান করা হয়েছে। প্রথম ক্ষেত্রে 'ق' এবং দ্বিতীয়টিতে নুকাতের ব্যবহার অনুপস্থিত।
চিত্র: ২৫২ হিজরির একটি সাধারণ আরবি লিপি। সূত্র: Leined University Library, manuscript no. Or. 298, f. 239b.
চিত্রে আবু উবাইদের গারিবুল হাদিস গ্রন্থের একটি পৃষ্ঠা দেখা যাচ্ছে। এই পাণ্ডুলিপির মধ্যে অসংখ্য তথাকথিত ব্যতিক্রম নুকাত রয়েছে। [১] -এর ওপর ১ম, ২য় এবং ৪র্থ লাইনে কোনো নুক্তা নেই; ৩ ও ৪র্থ লাইনে আবার এর নিচে নুক্তা রয়েছে; শেষ লাইনে এর ওপর দুটি নুক্তা দেওয়া। আবার ي [২]- বর্ণে তৃতীয় লাইনে কোনো নুক্তা নেই; শেষ লাইনে এর আকার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে; অষ্টম লাইনে নিচে দেখা যাচ্ছে দুটি নুক্তা। একই পাতায় তিনটি 'ব্যতিক্রম'। এর অনুলেখক কেবল একজন। একই বর্ণকে
একেকবার একেক রূপে লেখার দ্বারা সবগুলোর গ্রহণযোগ্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আগেও আমরা و , /-এর ক্ষেত্রে এমনটি দেখেছি। মূলত পুরো বিষয়টিকে ব্যতিক্রম মনে করাটাই ধারণাপ্রসূত। কারণ উভয়টিই যদি তখনকার প্রচলিত পদ্ধতি হয়ে থাকে, তাহলে লেখকের ওপর কোনোভাবেই অসামঞ্জস্যতার অভিযোগ আরোপ করা যায় না। এই উদার লিখনরীতির কারণ খোঁজাটাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইসলামি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি শিক্ষার্থীকে অবশ্যই একজন শিক্ষকের সান্নিধ্যে শিক্ষার্জন করতে হবে। শিক্ষকের কাছে না গিয়ে নিজে নিজে অধ্যয়ন করে আলিম হওয়ার সুযোগ নেই। এই মৌখিক শিক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষক নিজেই তার লেখার অনিয়মিত অংশের ব্যাখ্যা প্রদান করতেন। কাজেই বিকৃতির কোনো সুযোগই ছিল না তাতে।
মুসহাফের বানান এবং নুকাত পদ্ধতি-সংক্রান্ত অসাধারণ সব দলিল-প্রমাণ রয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ কয়েকটি হলো—
> আবু আমর আদ-দানি (৩৭১-৪৪৪ হিজরি), কিতাবুন নাক্ত, আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো
> আল-মুহকাম ফি নাক্তিল মাসাহিফ, আদ-দানি, ড. ইযযাত হাসান সম্পাদিত, দামেশক, ১৩৭৯ (১৯৬০)
আগ্রহী পাঠকগণ আল-ফুনাইসান সম্পাদিত আল-বাদি ফি রসমি মাসাহিফি উসমান (পৃষ্ঠা: ৪৩-৫৪) গ্রন্থের ভূমিকা পড়ে দেখতে পারেন। সেখানে ৮০টি দলিল উপস্থাপন করা হয়েছে আলোচ্য বিষয়ের ওপর। এর মূল উদ্দেশ্য হলো উসমানি রীতি সম্পর্কে পাঠকদের ধারণা দেওয়া। তারা যেন এগুলোকে ত্রুটিযুক্ত বা অপূর্ণ মনে না করে। আধুনিক এবং সপ্তদশ শতাব্দীর ইংরেজির অবস্থা আমরা দেখেছি। বিশাল ব্যবধান রয়েছে দুইয়ের মধ্যে। সেটিকে যদি স্বাভাবিক পরিবর্তন বলি এবং ত্রুটি হিসেবে না ধরি, তাহলে একই নীতি আরবির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
টিকাঃ
১. Raif G. Khoury, Wahb b. Munabbih, Otto Harrassowitz-Wiesbaden, 1972, p. 22-27.
২. এগুলো আংশিক কিছু উদাহরণ। আরও বহু রয়েছে। ডা গোয়ে এই পান্ডুলিপিতে আরও অনেক ব্যতিক্রম খুঁজে পেয়েছেন (MJ. de Goeje, 'Beschreibung einer alten Handschrift von Abu 'Obaida's Garib-al-hadit', ZDMG, xviii: 781-8007 as quoted in Levinus Warner and His Legacy (Catalogue of the commemorative exhibition held in the Bibliotheca Thysiana from April 27th till May 15th 1970), El. Brill. Leiden, 1970, p. 75-76)
৩. এই "ইয়া লেখার ক্ষেত্রে লেখক দুই রকমের গঠন ব্যবহার করেছেন। তৃতীয় এবং শেষ লাইন দ্রষ্টব্য।
📄 অধ্যায় শেষে
নুকাতের ব্যবহার প্রাক-ইসলামি আরবে প্রচলিত ছিল। আর উচ্চারণ চিহ্ন মুসলিমদেরই আবিষ্কার। কিন্তু উসমানি মুসহাফে কোনোটিই নেই। সম্পূর্ণ নুকাত এবং হরকতবিহীন থাকায় তা মনোনীত শিক্ষক ছাড়া নিজে নিজে পড়া অসম্ভব ছিল। এতে করে এমন একটি পদ্ধতি দাঁড়িয়ে যায়, কেউ নিজস্ব তরিকায় পড়তে গেলেই জনসম্মুখে ধরা পড়ে যাবে। মুসহাফে এসব অতিরিক্ত বিষয়াদি যুক্ত না করার ব্যাপারে ইবন মাসউদও সম্মতি দেন। পরে ইবরাহিম নাখয়িও একই পথ অনুসরণ করেন। তিনি একবার
একটি সুরার শুরুতে 'অমুক সুরার শুরু' লেখা দেখে তা অপসারণের নির্দেশ দেন। ইয়াহইয়া ইবনু কাসির বলেছেন, 'মুসলিমরা সর্বপ্রথম নুকাতকে মুসহাফের সাথে যুক্ত করে। তাদের মতে এতে করে পাঠ্য আরও সহজে পঠনযোগ্য হয়। তারপর এল আয়াত পৃথকীকরণ চিহ্ন এবং সবশেষে সুরার শুরু ও শেষ নির্দেশক।'[১]
সম্প্রতি কুরআনি অর্থোগ্রাফি সম্পর্কে একটি বিরূপ মন্তব্য চোখে পড়ে। আগের নিয়মের পরিবর্তে বর্তমান আরবি গঠনপ্রণালি গ্রহণ করতে বলা হয়েছে সেখানে। আর উসমানি মুসহাফের লিপিকারদের রীতিকে বলা হয়েছে মূর্খদের নির্বুদ্ধিতা। আমি এর সাথে পুরোপুরো অসম্মতি জ্ঞাপন করছি। এটি বরং মন্তব্যকারী এবং কিছু প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গের নির্বুদ্ধিতা।
কারণ তারা ভুলে গেছে-ভাষা সময়ের সাথে রূপান্তরিত হয়। বর্তমান আরবি গঠনপ্রণালি গ্রহণ করার কয়েক শতাব্দী পর অন্যরাও যে তাদের অবদানকে মূর্খদের নির্বুদ্ধিতা বলে অভিহিত করবে না-এর নিশ্চয়তা কী? অথচ মহাবিশ্বের ১৪শ বছরের কোনো পরিবর্তন একটি কিতাবের মৌলিকতায় কোনো আঁচড়ই কাটতে পারল না। এটি যে আল্লাহর প্রেরিত শব্দ সমাহার এবং তিনিই যে এর রক্ষাকর্তা, তার প্রমাণ কুরআন নিজেই। এত দীর্ঘ সময় ধরে এর বিশুদ্ধতা এবং পবিত্রতা অটুট রয়েছে, বাইবেলের মতো টানাহ্যাঁচড়া [২] এর সাথে করা যায়নি।
টিকাঃ
১. ইবনু কাসির, ফাযায়িল, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ৪৬৭
২. বাইবেলের বিকৃতি সম্পর্কে ১৫ এবং ১৭ অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।