📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 প্রারম্ভিক আরবি লিখনকর্ম এবং গাঠনিক নুকাত

📄 প্রারম্ভিক আরবি লিখনকর্ম এবং গাঠনিক নুকাত


উসমানি মুসহাফের রাসমুল খাত বা লিখনশৈলীতে বা (ب), তা (۳) প্রভৃতি অক্ষরের মধ্যে পার্থক্যকারী নুক্তা এবং হরকত অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু ওহি আগমনেরও বহু আগ থেকে আরবরা নুকাতের সাথে পরিচিত। তবে প্রথম দিককার ইসলামি রচনাকর্মে এগুলোর ব্যবহার ছিল না।[১] এর পেছনে উদ্দেশ্য যা-ই হোক, তখনকার আরবি পালিওগ্রাফিতে নুক্তার প্রচলনের কিছু উদাহরণ তুলে ধরা যাক—
১. আনুমানিক ২৬৭ খ্রিষ্টাব্দের রাকুশ সমাধি ফলকটি অন্যতম প্রাক-ইসলামি শিলালিপি। সেখানে যাল (ذ), রা (ر), এবং শিন (ش) বর্ণের ওপর নুক্তা রয়েছে।[২]
২. উত্তর আরবের সাক্কার একটি শিলালিপি, যার উৎস প্রাক-ইসলামি বলে ধারণা করা হয়। খুব সম্ভবত এটি নাবাতীয় ও আরবির সংমিশ্রণে লিখিত। এতে নুন (ن), বা (ب) এবং তা (ت)-এর ক্ষেত্রে নুক্তা ব্যবহৃত হয়েছে।
চিত্র: সাক্কার শিলালিপি। সূত্র: Winnet and Reed, Ancient Records from North Arabia, Figure 8
৩. দুটি ভাষার সংমিশ্রণে প্যাপিরাসের ওপর লিখিত একটি লিপি। এটি বর্তমানে ভিয়েনার Oesterreichische Nationalbibliothek-গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে।
চিত্র: তারিখ সংবলিত একটি মিশরীয় লিপিকা। সূত্র: Austrian National Library, Papyrus Collection, P. Vindob. G39726
চিত্র: এর শেষ লাইনে ‘জামাদাল উলা, ২২ হিজরি’ এবং ‘ইবনু হুদাইদা’ কর্তৃক লিখিত উল্লেখ করা হয়েছে।[৩]
এটি উমার ইবনুল খাত্তাবের খিলাফাতকালের একটি নথি। এখানে নুন (ن), খ (خ) যাল (ذ), শিন (ش) এবং ঝা (ظ)-এর ওপর নুক্তা ব্যবহৃত হয়েছে।
৪. ৪৬ হিজরির একটি মাক্কি শিলালিপি, যেখানে বা (ب)-তে একটি নুক্তা আছে।[৪]
৫. মদিনার নিকটবর্তী মুয়াবিয়া বাঁধের একটি শিলালিপিতে তা (ت)-এর ওপর নুক্তা আছে।[৫]
৬. তায়েফের নিকটবর্তী মুয়াবিয়ার আরেকটি বাঁধে ৫৮ হিজরির তারিখ সংবলিত
চিত্র: তারিখ সংবলিত তায়েফের মুয়াবিয়া বাঁধের শিলালিপি।
একটি শিলালিপি আছে। সেখানে ইয়া (ی), বা (ب), নুন (ن), সা (ث), খা (خ), ফা (ف) এবং তা (ت)-এর ওপর নুক্তার ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়।[৬]
উপরিউক্ত আলোচনায় ৫৮ হিজরি পর্যন্ত একই গঠনের বর্ণের ক্ষেত্রে নুস্তার ব্যবহার দেখতে পেলাম। যেমন: ن و ذو ش ز ي ب ت ف ث এই ১০টি হরফ। ওপরের প্রথম তিনটি শিলালিপি উসমানি মুসহাফের পূর্ববর্তী সময়কার। বর্তমান নুক্তার মতোই তখনও একই নিয়ম প্রচলিত ছিল।
মুহাম্মাদ ইবনু উবাইদ ইবনি আউস গাসসানিকে খলিফা মুয়াবিয়া একবার কিছু লিপিকায় তারকিশ যুক্ত করতে বলেন। শব্দটির অর্থ জিজ্ঞাসা করলে তাকে বলা হলো– ‘প্রতিটি বর্ণের উচ্চারণ অনুযায়ী নুক্তা যোগ করা।' খলিফা নিজেও এই কাজ করেছিলেন নবিজির পক্ষ থেকে চিঠি লেখার সময়।[৭] তিনি তখন এ কথাও জানিয়ে দেন। উল্লেখ্য, গাসসানি ছিলেন মুয়াবিয়ার সচিব। তিনিই এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি মূলধারায় খুব একটা প্রসিদ্ধ না হওয়ার ফলে তার বর্ণনা অতটা শক্ত নয়। কিন্তু তখনকার নুক্তার ব্যবহার-সংক্রান্ত উপরিউক্ত শক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে তার এ ঘটনাকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করার উপায় নেই।

টিকাঃ
১. এর পেছনে উদ্দেশ্য সম্পর্কে ষষ্ঠ অধ্যায়ে (৪.iv) আলোচনা করা হয়েছে। আর এর ফলে তিলাওয়াতে কোনো তারতম্য এসেছে কি না, তা একাদশ অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয়।
২. নবম অধ্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা হয়ে গেছে।
৩. Six Originaux des Lettres Diplomatiques du Prophete de L'Islam গ্রন্থের ৪৭ পৃষ্ঠায় লেখক উল্লেখ করেছেন যে, গ্রোহম্যান (From the World of Arabic Papyri, Cairo, 1952, pp. 62, 113-4) পাঁচ লাইন আরবি পড়তে গিয়ে কয়েক স্থানে ভুল করেছেন। যেমন: চতুর্থ লাইনে তিনি خمسة عشر পড়েছেন। অথচ তা ছিল خمس عشر। আবার পঞ্চম লাইনে ابن سنة اثنتين 3 این حديدة وجمدى الأول পড়েছেন।
৪. আ. মুনিফ, দিরাসা ফান্নিয়া লি মুসহাফ মুবাক্কির, পৃষ্ঠা: ১৩৯।
৫. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৪০।
৬. S. al-Munaggid, Etudes De Paleographie Arabe, pp. 101-103 quoting G.C. Miles, Early Islamic Inscriptions Near Taif, in the Hidjaz', JNES, vol. vii (1948), pp. 236-242.
৭. খাতিব আল-বাগদাদি, আল-জামি, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা: ২৬৯

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 উচ্চারণ চিহ্নের উদ্ভাবন

📄 উচ্চারণ চিহ্নের উদ্ভাবন


আরবি উচ্চারণের চিহ্ন অর্থাৎ হরকতের উদ্ভাবন করেন আবুল আসওয়াদ দুয়ালি। ইবনু আবি মুলাইকা থেকে বর্ণিত, খলিফা উমারের সময় এক বেদুইন তার কাছে কুরআন শেখার জন্য শিক্ষকের খোঁজে আসে। তাতে একজন রাজি হয়। কিন্তু সে এত বেশি ভুল শেখানো শুরু করে, বাধ্য হয়ে উমার তাকে থামিয়ে ভুলগুলো শুধরে দেন। এরপর থেকে কুরআন শেখানোর আগে আরবির ওপর পর্যাপ্ত জ্ঞানার্জন আবশ্যক করে দেন। ঘটনাটি তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। আরবি ব্যাকরণের ওপর আবুল আসওয়াদ দুয়ালিকে একটি গবেষণাগ্রন্থ রচনার অনুরোধ করেন।[১]
তিনি একদম মনেপ্রাণে গ্রহণ করেন কাজটিকে। এভাবে তিনি চারটি তাশকিল উদ্ভাবন করেন যা প্রতিটি শব্দের শেষ বর্ণে বসানো যেত। কালো রঙের গাঠনিক নুকাতের সাথে পার্থক্য করার জন্য এতে ব্যবহার করা হয় রঙিন কালি। একেকটির অবস্থান একেক স্থানে। কোনো বর্ণের পরে, ওপরে বা নিচে একটি নুক্তার অর্থ যথাক্রমে যম্মা (পেশ), ফাতহা (যবর) এবং কাসরা (যের)। আবার বর্ণের পরে, ওপরে বা নিচে দুটি নুক্তা মানে তানবিন।[২] মূল প্রচলন আরও বিশদাকার ছিল। এখানে খুবই সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করা হলো। খলিফা মুয়াবিয়ার (মৃত্যু: ৬০ হিজরি) শাসনকালে মুসহাফের একটি অনুলিপির ওপর উক্ত পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটানো হয়। কাজটি আনুমানিক ৬০ হিজরিতে সম্পন্ন হয়।
চিত্র: দুয়ালির কুফীয় লিপিতে রচিত একটি মুসহাফ। সূত্র: National Archive Museum of Yemen
দুয়ালির পদ্ধতি পরবর্তী প্রজন্মেও চালু থেকেছে। আর এর জন্য যারা পরিশ্রম করেছেন, তাদের মধ্যে ইয়াহইয়া ইবনু ইয়ামার (মৃত্যু: ৯০ হিজরি), নাসর ইবনু আসিম আল-লাইসি (মৃত্যু: ১০০ হিজরি) এবং মাইমুন আল-আকরানের নাম উল্লেখযোগ্য। সবশেষে খালিদ ইবনু আহমাদ ফারাহিদি (মৃত্যু: ১৭০ হিজরি) রঙিন নুক্তার বদলে কিছু নির্দিষ্ট বর্ণের অনুরূপ নকশার প্রচলন ঘটান। তবে তার এ পদ্ধতি আগের নিয়মগুলোকে ছাপিয়ে যেতে লেগে যায় প্রায় শতবর্ষ।
একেক কেন্দ্রে প্রথম প্রথম একটু ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা হতো। ইবনু উশতার বর্ণনা অনুযায়ী মক্কার ইমাম ইসমাইল কুস্তের মুসহাফের নুকাত রীতির সাথে ইরাকিদের রীতির ভিন্নতা ছিল। সানআর আলিমগণ আবার অন্য নিয়মের অনুসারী ছিলেন।[৩] মদিনায় যে রীতি চালু ছিল, তা বসরায় অনুসরণ করা হতো না। এভাবে প্রথম শতাব্দীর শেষভাগে এসে বসরার নিয়ম এতটা ব্যাপ্তি লাভ করে, মদিনার আলিমগণও তা গ্রহণ করে নেন।[৪] পরবর্তী সময়ে উচ্চারণ চিহ্নের জন্য বিভিন্ন রঙের নুক্তার ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়।
চিত্র: একটি কুফীয় লিপির মুসহাফ। উচ্চারণ-চিহ্নগুলোর ক্ষেত্রে এখানে লাল, সবুজ, হলুদ এবং নীল রং ব্যবহৃত হয়েছে। আয়াত পৃথিকীকরণ চিহ্ন এবং দশম আয়াত নির্দেশকের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য যে ব্যাপারে অষ্টম অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। সূত্র: National Archive Museum of Yemen

টিকাঃ
১. আদ-দানি, আল-মুহকাম, পৃষ্ঠা : ৪-৫, ফুটনোট ২, ইবনুল আনবারির উদ্ধৃতি, আল-ইযাহ, পৃষ্ঠা : ১৫-১৬। আন-নাদিম সেই গবেষণা গ্রন্থের একটি বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তিনি ইবনু আবি বারার পাঠাগারে খুঁজে পেয়েছেন এটি। চার খণ্ডবিশিষ্ট গ্রন্থটি ব্যাকরণবিদ ইয়াহইয়া ইবনু ইয়ামারের অনুলিপি করা। এতে আরেকজন ব্যাকরণবিদ আল্লান নাহাবির স্বাক্ষর ছিল। এর নিচে আবার নাদর ইবন শমাইল স্বাক্ষর করেছেন। (আন-নাদিম, আল-ফিহরিস্ত, পৃষ্ঠা: ৪৬) স্বাক্ষরগুলো মূলত প্রকৃত উৎসের সপক্ষে প্রমাণ।
২. আদ-দানি, আল-মুহকাম, পৃষ্ঠা: ৬-৭
৩. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৩৫
৪. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৭

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 একই সাথে দুটি ভিন্ন উচ্চারণ চিহ্নের ব্যবহার

📄 একই সাথে দুটি ভিন্ন উচ্চারণ চিহ্নের ব্যবহার


খালিল ইবনু আহমাদ আল-ফারাহিদির উচ্চারণ চিহ্নের ব্যবহার দ্রুত প্রসার লাভ করে। কিন্তু মৌলিকতা রক্ষার খাতিরে ইচ্ছা করেই তা থেকে দূরে রাখা হয় কুরআনের প্রধান অনুলিপিগুলোকে। তবে ধীরে ধীরে কুরআনের ক্ষেত্রেও কোনো কোনো লিপিকার নতুন উচ্চারণ চিহ্ন প্রয়োগ করেন।[১] সানআ থেকে পাওয়া কুরআন খণ্ডের কিছু ছবি দ্বারা এর উদাহরণ দেখানো সম্ভব। ওপরের চিত্র দুটি সম্ভবত দ্বিতীয় হিজরির। নিচে তৃতীয় হিজরির একটি কুরআন লিপির নমুনা দেখানো হলো—[২]
চিত্র: তৃতীয় হিজরির একটি কুরআনি লিপি। বিভিন্ন রঙের নুকাতের ব্যবহার লক্ষ্য করার মতো। সূত্র: National Archive Museum of Yemen
নিচের চিত্রটি একই সময়ের সাধারণ আরবি লিপি। আগেরটির সাথে নুকাত, উচ্চারণ চিহ্ন এবং লিপির পার্থক্য খুব সহজেই দৃশ্যমান।
চিত্র: দ্বিতীয় হিজরির একটি সাধারণ আরবি লিপি। এখানে ফারাহাদির উচ্চারণ চিহ্নের ব্যবহার রয়েছে। সূত্র: A. Shakir (ed.), ar-Risalah of ash-Shafi'i, Cairo, 1940, Plate 6

টিকাঃ
১. কিছু লিপিকারের মধ্যে ইবনু মুকলা (মৃত্যু: ৩২৭ হিজরি), ইবনুল বাওয়াব (মৃত্যু: ৪১৩ হিজরি) প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। এমনকি ইবনুল বাওয়াব উসমানি বানানরীতি থেকেও সরে এসেছিলেন। তবে বর্তমানে আদি উসমানি রীতিই অনুসরণ করা হয়। যেমন: মদিনার কিং ফাহাদ কমপ্লেক্স থেকে ছাপানো মুসহাফ।
২. Masahif San’a, Dar al-Athar al-Islamiyyah (Kuwait National Museum), 19 March-19 May 1985, Plate no. 53.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00