📄 বিভিন্ন প্রকার লিপি এবং কুফীয় মুসহাফ প্রসঙ্গে
উত্তরে আজারবাইজান থেকে দক্ষিণে ইয়েমেন পর্যন্ত, আবার পশ্চিমে লিবিয়া থেকে পূর্বে পারস্য পর্যন্ত সকল ইসলামি প্রদেশে মদিনার কেন্দ্রীয় সরকার থেকে আরবিতে যোগাযোগ করা হতো।[১] ফলে আরবি লিপিতে জায়গা করে নেয় ব্যাপক বৈচিত্র্য। এজন্য প্রায় শুরু থেকেই হিজাযি লিপির পাশাপাশি তির্যক এবং প্যাঁচানো হরফের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। যেমন: ৩১ হিজরি সময়কার আল-হাজরির সমাধিশিলালিপিকে অনেকে কুফীয় লিপি[২] বলেছে উল্লেখ করেছেন। আবার ২২ হিজরি সময়কার প্যাপিরাসেরা।[৩] ওপর প্যাঁচানো লেখা পাওয়া গিয়েছে। নিচে এগুলোর বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। মূলত আরবি লিপি প্রসঙ্গে আলোচনা দীর্ঘ করতে গেলে মূল বিষয়বস্তুকে তা ছাপিয়ে যাবে। তবে যেহেতু কিছু প্রাচ্যবিদ কুফীয় কুরআন নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করেছে, তাই কিছু উদাহরণ তুলে ধরা জরুরি মনে করছি-
১. মিশরের দক্ষিণে আসওয়ান থেকে প্রাপ্ত ৩২ হিজরির একটি সমাধি প্রস্তর। [৪] অধ্যাপক আহমাদ এটিকে সবচেয়ে পুরোনো কুফীয় শিলালিপি বলে আখ্যায়িত করেছেন। [৫]
চিত্র: দক্ষিণ মিশরে প্রাপ্ত একটি সমাধিলিপি, ৩১ হিজরি। সূত্র: Source : Hamidullah, Six Originaux, p. 69.
২. তায়েফের একটি কুফীয় শিলালিপি, ৪০ হিজরি। [৬]
চিত্র: মক্কার পূর্বে প্রাপ্ত একটি কুফীয় শিলালিপি। পাশে মূলের অনুকরণে অক্ষরগুলো তুলে ধরা হলো। সূত্র: Al-Atlal, vol. i, Plate 49
এর অর্থ অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, 'আব্দুর রহমান ইবনু খালিদ ইবনিল আসের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক, ৮০ হিজরি।'
৩. তায়েফের নিকটস্থ মুওয়াবিয়া বাঁধ থেকে প্রাপ্ত নিরলংকৃত কুফীয়[৭] শিলালিপি, ১৫৮ হিজরি।[৮]
৪. মক্কার নিকটে তারিখসহ কুফীয় লিপিতে প্রাপ্ত একটি কুরআনের আয়াত, ৮০ হিজরি।[৯]
চিত্র: কুফীয় লিপির একটি কুরআন আয়াত। সূত্র: আর-রাশিদ, কিতাবাত ইসলামিয়া, পৃষ্ঠা: ১৬০
৫. কুরআনের অনুসরণে লিখিত একটি কুফীয় শিলালিপি; ৮৪ হিজরি[১০]
চিত্র: ৮৪ হিজরির একটি চমৎকার কুফীয় শিলালিপি। সূত্র: আর-রাশিদ, কিতাবাত ইসলামিয়া, পৃষ্ঠা: ২৬
এগুলো ছাড়াও আরও অনেক উদাহরণ আছে।[১১] এদিকে গুয়েন্ডলারের দাবি অনুযায়ী সকল কুফীয় মুসহাফ দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীতে পাওয়া যায়।[১২] অথচ আমরা দেখতে পেলাম কুফীয় লিপি প্রথম শতাব্দীতেও মিশর, হিজায, সিরিয়া, ইরাকের মতো মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে নিজের জায়গা করে নিয়েছিল। প্রথম শতাব্দীর মধ্যভাগে এসে তা মুসলিমবিশ্বে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে মুদ্রা[১৩] তৈরির কাজে। তাই এ লিপিতে মুসহাফ খুঁজে পাওয়ার জন্য আরও দু-এক শতাব্দী অপেক্ষা করার কোনো অর্থ নেই। এমনকি প্রথম শতাব্দীর মধ্যভাগে সমরকন্দের উসমানি মুসহাফ কুফীয় লিপিতেই রচিত।
টিকাঃ
১. আল-আযামি, 'নাশআতুল কিতাবাতিল ফিকহিয়া', দিরাসাত, রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়, ১৩৯৮, খণ্ড: ২, সংখ্যা: ১, পৃষ্ঠা: ১৩-২৪
২. অ্যাকাডেমিক মহলে 'কুফীয়' পরিভাষাটির প্রচলন থাকায় এটিই ব্যবহার করলাম। তবে ব্যক্তিগতভাবে এটি আমি আরও নির্দিস্টাকারে প্রয়োগ করি। মুসহাফ ক্যালিগ্রাফির একদম প্রথম দিকের গবেষক আন-মাদিম এক ডজনেরও বেশি লিপিশৈলীর (রাসমূল খাত) তালিকা করেছেন। এর মধ্যে কুফীয় একটি মাত্র প্রকার। বর্তমানে হয়ত প্রতিটি ক্যালিগ্রাফির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আলাদা করে তুলে ধরা কঠিন। কিন্তু আধুনিক অ্যাকাডেমিয়া যেভাবে সবগুলোকে ঢালাওভাবে 'কুফীয়' বলে, তাতে বিষয়টির সরলীকরণ হলেও বিশুদ্ধতা পিন্ট হচ্ছে। (আ. মুনিফ, দিরাসা ফান্নিয়া লি মুসহাফ মুবাক্কির, রিয়াদ, ১৪১৮, পৃষ্ঠা: ৪১-৪২)। ইউসুফ খুজুনের মতে, 'কুফীয়' শব্দটি বর্তমানে (ভুলভাবে) সকল তির্যক লিপির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যা মূলত জংলিল লিপি থেকে উদ্ভত। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৪২)। অ্যাবটের The Rise of the North Arabic Script গ্রন্থের ১৬নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
৩. প্যাপিরাস হলো কাগজের মতো এক প্রকার প্রাচীন লেখার উপাদান। প্যাপিরাস নামের গাছ থেকে এটি তৈরি করা হত।
৪. ibid, p. 69; also S. al-Munaggid, Etudes De Paleographie Arabe, p.40.
৫. আব্দুর রাজ্জাক আহমাদ, 'নাশআতুল খাত্তিল আরাবি', মাসাহিফ সানআ, পৃষ্ঠা: ৩২ (আরবি অংশ)। লিপিটি তির্যক হলেও এটিকে কুফীয় বলা উচিত হবে না। কুফা ও বসরা শহর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসলামের ইতিহাসের একদম শুরুর দিকে। কুফা প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৭ হিজরিতে সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাতে। প্রায় শূন্য থেকে শুরু হওয়া একটি শহরের নিজস নামে জনপ্রিয় লিপি (কুফীয়) এবং তা আবার দক্ষিণ মিশর পর্যন্ত ছড়িয়ে যাওয়া এবং সেখান থেকে এর অনুসারী তৈরি হওয়া ও এরকম সমাধিপ্রস্তরে এর সন্ধান মেলা, তাও মাত্র ১৪ বছরের ব্যবধানে-সব মিলিয়ে পুরো ব্যাপারটিকে খুব একটা সম্ভাব্য বলে মনে হয় না।
৬. A.H. Sharafaddin, 'Some Islamic inscriptions discovered on the Darb Zubayda', al-Atlai, vol i, 1977, pp. 69-70.
৭. Gruendler, The Development of the Arabic Script, pp. 15-16.
৮. দশম অধ্যায়ে 'প্রারম্ভিক আরবি লিখনকর্ম এবং গাঠনিক নুকতা' সংক্রান্ত আলোচনায় চিত্র এবং বিস্তারিত এসেছে।
৯. আর-রাশিদ, কিতাবাত ইসলামিয়া মিন মাক্কা আল-মুকাররমা, রিয়াদ, ১৪১৬, পৃষ্ঠা: ১৬০-৬১
১০. এটি মূলত কুরআনের আয়াত নয়; বরং দুটি আয়াতের অনুসরণে খোদাইকৃত শিলালিপি। আর-রাশিদ, কিতাবাত ইসলামিইয়া মিন মাক্কা আল-মুকাররমা, পৃষ্ঠা: ২৬-২৯
১১. আরও অসংখ্য তারিখযুক্ত কুফীয় শিলালিপির উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু স্থান সংকুলানের অভাবে সব তুলে ধরা সম্ভব নয়। এর মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য হলো- (i) হাফনাত আল-উবাইদ, ইরাকের কারবালার নিকট একটি লিপি, সময়কাল ৬৪ হিজরি, (al-Munaggid, Etudes De Paleographie Arabe, pp. 104-5); (ii) ডোম অব রকের মোজাইকে থাকা লিপিগুচ্ছ, জেরুসালেম, সময়কাল ৭২ হিজরি (Gruendler, The Development of the Arabic Script, pp. 17-18, 155-56); (iii) খলিফা আব্দুল মালিকের শাসনামলে নির্মিত সড়ক মাইলফলক (৬৫-৮৬ হিজরি) (al-Munaggid, Etudes, p. 108)
১২. Gruendler, The Development of the Arabic Script, pp. 134-35.
১৩. খলিফা আব্দুল মালিক ৭৭ হিজরিতে এই মুদ্রার প্রচলনের দ্বারা পুরো মুসলিমবিশ্বকে একত্র করেন। (Stephen Album, A Checklist of Islamic Coins, 2nd edition, 1998, p. 5) এ-সকল স্বর্ণ, রৌপ্য এবং তাম্র মুদ্রায় কুরআনি বালী, প্রচলনের সাল কুফীয় লিপিতে খোদাই করা থাকত। টাকশালের নামও উল্লেখ করা থাকত বুলা ও তামার ক্ষেত্রে। ১৩২ হিজরিতে উমাইয়্যা খিলাফতের পতনের পরেও এই রীতি চালু থাকে। ('Islamic Coins-The Turath Collection Part I', Spink, London, 25 May 1999, Sale No. 133)