📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 মুসহাফ বিক্রি প্রসঙ্গে

📄 মুসহাফ বিক্রি প্রসঙ্গে


ইবনু মাসউদের বর্ণনায় পাওয়া যায়, সেসময়ে কেউ মুসহাফের অনুলিপি চাইলে স্বেচ্ছাসেবীদের দ্বারস্থ হতে হতো।[৪] আলি ইবনু হুসাইনও (মৃত্যু: ৯৩ হিজরি) একই প্রসঙ্গে বলেছেন, মুসহাফ ক্রয়-বিক্রয়ের নিয়ম ছিল না। কেউ একজন লেখার সামগ্রী নিয়ে এলে স্বেচ্ছাসেবীগণ লেখার কাজে লেগে যেত। এভাবে স্বেচ্ছায় একেকজন লিখে যেত কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত।[৫]
একবার ইবরাহিম নাখয়ির সাথে মুহিল এ নিয়ে তর্ক করতে গিয়ে বলেন, 'তিলাওয়াত
করতে হলে মানুষের মুসহাফ প্রয়োজন। ইবরাহিম জবাব দেন, 'তাহলে লেখার সামগ্রী এবং দোয়াত-কালি কিনে আনো এবং স্বেচ্ছাসেবীদের সাহায্য নাও।'[১] কিন্তু আরবের সীমা পার করে বাড়ন্ত মুসলিম জনসংখ্যার পাশাপাশি বৃদ্ধি পেতে লাগল কুরআনের প্রয়োজন। এতে করে সেচ্ছাসেবকদের ওপর চাপ বেড়ে যায়। সৃষ্টি হয় পেশাদার অনুলেখকদের চল।
এবার আল্লাহ বাণীর জন্য কাউকে অর্থ প্রদান করা নিয়ে শুরু হলো নতুন এক ধর্মীয় বিতর্ক। কারণ বিক্রি সেই জিনিসই করা যায়, যা নিজের। তাহলে আল্লাহর বাণী কীভাবে ব্যক্তি-মালিকানায় বিক্রি করা সম্ভব?
এজন্য অধিকাংশ আলিম পেশাদার অনুলিখন এবং মুসহাফকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করাকে অপছন্দ করলেন। ইবনু মাসউদ, আলকামা, মাসরুক, শুরাইহ, আবু মিজলায এবং ইবরাহিম নাখয়িসহ আরও অনেকে এ দলের অন্তর্ভুক্ত। ইবনুল মুসাইয়িব এর মধ্যে শক্ত অবস্থান নেন।[২] তবে সামসময়িক অন্যান্য আলিম তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন, গৃহীত অর্থ মূলত আল্লাহর বাণীর বদলে নয়; বরং দোয়াত-কালি, পান্ডুলিপি এবং পরিশ্রমের বিনিময়ে নেওয়া হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবকদের তীব্র সংকটের কথা মাথায় রেখে ইবনু আব্বাস, সাইদ ইবনু যুবাইর, ইবনুল হানাফিয়া প্রমুখ আলিম মুসহাফ কেনা বা বিক্রয় করাকে খারাপ চোখে দেখেননি।[৩]
মুসহাফ পুনঃনিরীক্ষণ ও সংশোধনের ক্ষেত্রেও প্রুফরিডিংয়ের পেশা নিয়ে আবার একই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। মুসহাফ সংশোধন ও পুনঃনিরীক্ষণ করে মুসা আল-আসাদির কাছে তা বিক্রির প্রস্তাব দেন সাইদ ইবনু যুবাইর।[৪] পুনঃনিরীক্ষণের জন্য অর্থ আদান-প্রদানকে অনেকেই শুরুতে নাকচ করলেও পরবর্তী সময়ে ইবরাহিম নাখয়ি তার মত পরিবর্তন করেন।[৫]
আমর ইবনু মুররার (মৃত্যু: ১১৮ হিজরি) মতে, সর্বপ্রথম মুসহাফ কেনাবেচা শুরু করে ক্রীতদাসরা।[৬] ইবনু আব্বাসের ক্রীতদাস ১০০ দিরহামের বিনিময়ে কুরআন
অনুলিখনের কাজ করত। [১] মুআবিয়ার শাসনামলে মুসহাফ ব্যবসার প্রচলন শুরু হয় বলে ধারণা করেছেন আবু মিজলায। কাজেই তা প্রথম শতাব্দীর অর্ধেকের আগেই শুরু হয়। দ্রুত একে ঘিরে ব্যাবসা গড়ে ওঠে। এমন দোকানের পাশ থেকে যাওয়ার সময় ইবনু উমার (মৃত্যু: ৭৩ হিজরি) এবং সালিম ইবনু আব্দিল্লাহ (মৃত্যু : ১০৬ হিজরি) একে 'মন্দ ব্যাবসা' [৩] বলে অভিহিত করতেন। এদিকে কুরআন বিক্রয়কে শাস্তিযোগ্য অপরাধ মনে করতেন আবু আলিয়া (মৃত্যু: ৯০ হিজরি)। [৪]
জনকল্যাণমুখী আরেকটি উদ্যোগ ছিল গণপাঠাগার। মুজাহিদের (মৃত্যু: ১০৩ হিজরি) কাছ থেকে জানা যায়, ইবনু আবি লাইলা (মৃত্যু: ৮৩ হিজরি) শুধু কুরআন-সর্বস্ব একটি পাঠাগার তৈরি করেছিলেন। লোকজন তিলাওয়াত করার জন্য সেখানে আসত। [৫] প্রথম শতাব্দীর মধ্যভাগে আব্দুল হাকাম ইবনু আমর আল-জুমাহি একটি ভিন্ন প্রকৃতির পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত করেন। বিভিন্ন বিষয়ের কুররাসাতের (পুস্তিকাদি) পাশাপাশি সেখানে ছিল নানা রকম খেলার উপকরণও। তাই সবাই পড়া এবং বিনোদনের জন্য একটি উন্মুক্ত পরিবেশ পেল।[৬] খালিদ ইবনু ইয়াজিদ ইবনি মুআবিয়াও একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। এছাড়াও হয়তো আরও অনেকেই করেছিলেন, যাদের বিস্তারিত এখন আর পাওয়া যায় না। [৭]

টিকাঃ
১. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১১৯-২০
২. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৬৬
৩. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৬৯
৪. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১৬৬
৫. ইবনু আবি শাইবা, মুসান্নাফ, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৯৩; ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১৭৫
৬. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১৭৫-৭৬
৭. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৫৭, ১৬৭, ১৬৯
৮. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৭১
৯. বুখারি, খালকু আফআলিল ইবাদ, পৃষ্ঠা: ৩২
১০. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১৭৫
১১. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৫৯, ১৬৫; ইবনু আবি শাইba, মুসান্নাফ, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৯২
১২. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১৬৯
১৩. Ibn Sa'd, Tabaqat, vol: 4, p. 75; ইবন আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১৫১
১৪. আল-আসফাহানি, আল-আগানি, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৫৩
১৫. M.M. al-Azami, Studies in Early Hadith Literature, pp. 16-17.

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 অধ্যায় শেষে

📄 অধ্যায় শেষে


উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর দক্ষতা অন্তত দুদিক থেকে পরিষ্কার-
এক. এমন কোনো প্রদেশ বাকি ছিল না, যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে এই মুসহাফ মিশে যায়নি।
দুই. মুসহাফের ওপর ১৪শ বছরের দীর্ঘ পরিক্রমা এতটুকু দাগও ফেলতে পারেনি। এর মূলপাঠ অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে। কুরআনুল কারিমের ঐশী পরিচয় একদম প্রকাশ্য ধরা পড়ে যায়। এর আর কী ব্যাখ্যা থাকতে পারে? পরবর্তী খলিফাগণ
ইতিহাসের পাতায় স্থান পেতে কুরআনের অনুলিপির প্রসার বাড়িয়েছেন শুধু। কিন্তু উসমানের প্রতিষ্ঠিত আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক একটা কিছুও তৈরি হয়নি।
কালের আবর্তনে মুসহাফের বিভিন্নরকম বাহ্যিক পরিবর্তন আসে। কিন্তু এর ফলে উচ্চারণ কিংবা অর্থের কোনো পরিবর্তন হয়নি। খলিফা উসমানও হয়তো জীবদ্দশায় এরকম কিছু বিষয় দেখেছেন। স্বরচিহ্ন, আয়াত পৃথকীকরণ চিহ্ন এবং নুক্তা না দেওয়ার পেছনে হয়তো উদ্দেশ্য ছিল—মানুষ যেন সঠিক নির্দেশনা ছাড়া নিজে নিজে কুরআন মুখস্থ করতে শুরু না করে। কিন্তু সময়ের সাথে সেই সমস্যা দূরীভূত হতে থাকলে নুক্তার উপস্থিতি এবং আয়াত পৃথকীকরণ চিহ্ন স্বাভাবিক হয়ে গেল। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আমরা এর নিহিতার্থ নিয়ে আলোচনা করব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00