📄 মালিক ইবনু আনাস ইবনি মালিক ইবনি আবি আমির আল-আসবাহি
এখন আমরা উসমানি মুসহাফ এবং আরেকজন প্রখ্যাত আলিমের মুসহাফ মিলিয়ে দেখব। ইমাম মালিক ইবনু আনাস রাহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ১৭৯ হিজরি) তার ছাত্রদের একবার এই মুসহাফটি দেখিয়েছিলেন। এর ইতিহাস বর্ণনা করেছিলেন। তার দাদা মালিক ইবনু আবি আমির আল-আসবাহি রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন খলিফা উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর ছাত্র। [২] উসমানি মুসহাফ প্রস্তুতকালে তিনি সেখান থেকে নিজের জন্য তা লিখে নেন।[৩] মালিক ইবনু আনাসের ছাত্ররা তাই দ্রুত এর কিছু বৈশিষ্ট্য টুকে রাখেন।
» এটি রূপা দিয়ে সজ্জিত।
» সুরাগুলো সুসজ্জিত কালো কালি দিয়ে আলাদা করা।
» বিন্দু বা ফোঁটা দ্বারা একেকটি আয়াত পৃথক করা।[৪]
এর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক ছাত্র মালিক ইবনু আবি আমির আল-আসবাহি রাহিমাহুল্লাহর মুসহাফের সাথে মদিনা, কুফা, বসরা ও উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর মূললিপি মিলিয়ে দেখতে উদ্যত হন। মদিনার মুসহাফের সাথে মাত্র চার এবং বাকিগুলোর সাথে আটটি বর্ণের বৈচিত্র্য পাওয়া যায়। সংক্ষেপে সেগুলো দেখানো যাক[৫] :
সুরা এবং আয়াত
উসমান, কুফা, বসরার মুসহাফ
মদিনার মুসহাফ
মালিকের মুসহাফ
বর্তমান মুসহাফ
২:১৩২
ওওয়াস্সী বিহা
ওয়াওসী বিহা
ওওয়াস্সী বিহা
ওওয়াস্সী বিহা
ইব্রাহীম
ইব্রাহীম
ইব্রাহীম
ইব্রাহীম
৩:১৩৩
ও সারিয়ু ইলা মাগফিরাহ
সারিয়ু ইলা মাগফিরাহ
সারিয়ু ইলা মাগফিরাহ
ইলা মাগফিরাহ
৫:৫৩
ওয়া ইয়াকুলুল্লাযীনা আ-মানুআ
ইয়াকুলুল্লাযীনা আ-মানুআ
ইয়াকুলুল্লাযীনা আ-মানুআ
ইয়াকুলুল্লাযীনা আ-মানুআ
৫:৫৪
মন
বৃত মনকম
মন
বৃত মনকম
মন
বৃত মনকম
মন
বৃত মনকম
৯:১০৭
আল্লাহ্ আতক্ধওয়া
আল্লাহ্ আতক্ধওয়া
আল্লাহ্ আতক্ধওয়া
মন
বৃত মনকম
মসজিদ
মসজিদ
মসজিদ
১৮:৩৬
লাইজিন খাইরা
লাইজিন খাইরা
লাইজিন খাইরা
লাইজিন খাইরা
মিনহা
মিনহা
মিনহা
মিনহা
মনকালবা
মনকালবা
মনকালবা
মনকালবা
২৬:২১৭
ওয়াতকাল আলা
ওয়াতকাল আলা
ওয়াতকাল আলা
ওয়াতকাল আলা
আল্লাহ্
আর-রহিম
আল্লাহ্
আর-রহিম
আল্লাহ্
আর-রহিম
আল্লাহ্
আর-রহিম
৪০:২৬
ওয়ান ইয়াঝার ফি
ওয়ান ইয়াঝার ফি
ওয়ান ইয়াঝার ফি
ওয়ান ইয়াঝার ফি
আলআরছ
আলফাসাদ
আলআরছ
আলফাসাদ
আলআরছ
আলফাসাদ
আলআরছ
আলফাসাদ
৪২:৩০
মিন মুসিবা
মিন মুসিবা
মিন মুসিবা
মিন মুসিবা
ফিমা কাসিবত
ফিমা কাসিবত
ফিমা কাসিবত
ফিমা কাসিবত
৪৩:৭১[৬]
ওয়াফিহা মা
ওয়াফিহা মা
ওয়াফিহা মা
ওয়াফিহা মা
তাশতেহি
তাশতেহি
তাশতেহি
তাশতেহি
আল-আনফাস
আল-আনফাস
আল-আনফাস
আল-আনফাস
৫৭:২৪
فإن الله هو الغني الحميد
فإن الله الغني الحميد
فإن الله هو الغني
فإن الله هو
৯১:১৫
فلا يخاف عقبها
ولا يخاف عقبها
ولا يخاف
ولا يخاف
عقبها
عقبها
৪১ নং সুরা পর্যন্ত মালিক ইবনু আবি আমির আল-আসবাহির মুসহাফের সাথে মদিনার মুসহাফের কোনো অমিল নেই। আবার ৪২ নং সুরা থেকে তা উসমানি, কুফা এবং বসরার মুসহাফের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। উসমানি মুসহাফ তৈরির সময় মালিক ইবনু আবি আমির আল-আসবাহি ১২ সদস্যবিশিষ্ট পরিষদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। নিজের মুসহাফটিও একই সাথে লিখে রাখেন তিনি। ওপরের তালিকা লক্ষ করলে আমরা বুঝতে পারি-প্রাথমিকভাবে তিনি মদিনার মুসহাফ তৈরির কাজে নিযুক্ত ছিলেন। এর ছয়ভাগের পাঁচভাগ কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর তিনি কুফা, বসরার মুসহাফ তৈরির কাজে লেগে যান। তাই শেষভাগের সাথে আবার বাকিটুকুর মিল পাওয়া যায়।
এখান থেকে সরকারি অনুলিপিগুলোর প্রস্তুতপ্রক্রিয়া সম্পর্কে আমরা জানতে পারি। এটি ছিল একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা, যেখানে কেউ বর্ণনা করেছেন, কেউ লিপিবদ্ধ করেছেন। নিজেদের জন্যও যারা অনুলিপি তৈরি করেছে তাদের উদ্যোগ আমার মতে আরও চমৎকৃত হওয়ার মতো। এরকম ঠিক কতটি অনুলিপি সেসময় প্রস্তুত করা হয়েছিল, তা বলা কঠিন। তবে ইবনু শাব্বা বলেছেন, 'মুসহাফগুলো লিখে রাখার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু।' [৭]
অর্থাৎ নিজেদের জন্য মুসহাফ লিখে রাখার প্রতি সকলকে অনুপ্রাণিত করা হয়েছিল।
মালিক ইবনু আবি আমির আল-আসবাহির মুসহাফে আয়াত ও সুরা পৃথকের জন্য আলাদা নির্দেশক ছিল, যেটি উসমানি মুসহাফে ছিল না। সম্ভবত ইচ্ছাকৃতভাবে এই কৌশলটি খাটিয়েছিলেন খলিফা। এতে করে আয়াত আলাদা করার একাধিক রীতির অবকাশ ছিল। পাশাপাশি এর দ্বারা মনোনীত শিক্ষক ছাড়া তা পড়ার রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। অনেক গবেষকের মতে যেসব পুরোনো মুসহাফে আয়াত ও সুরার জন্য পৃথকীকরণ নির্দেশক পাওয়া যায়, সেগুলো উসমানি মুসহাফের উত্তরকালে রচিত। কিন্তু উক্ত উদাহরণ থেকে বোঝা যায় এ ধারণা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়।
টিকাঃ
১. দ্বারদের মধ্যে ইবনুল কাদিম, আশহাব, ইবনু ওয়াহব, ইবনু আব্দিল হাকাম রাহিমাহুমুল্লাহ এবং আরও অনেকেই উপাদিত ছিলেন।
২. ইবনু হাজার, তাকরিবুত তাহযিব পৃষ্ঠা: ৫১৭, ৬৪৪৩
৩. আল-দানি, আল-মুহকাম, পৃষ্ঠা: ১৭
৪. বিভিন্ন মুসহাফের সুরা এবং আয়াত পৃথক করার উদাহরণ পরের অধ্যায়ে আছে। তবে তার আগে গ্রোহমানের একটি বিবৃতি পেশ করছি, 'সুরা পৃথকীকরণের ব্যাপারে আমার মত হলো, তা গ্রিক অথবা সিরিয়াক পান্ডুলিপির আদলে গ্রহণ করা হয়েছে। এভাবে তারা সুরার শুরু নির্দেশ করত...' (A. Grohmann, 'The Problem of Dating Early Qur'ans', Der Islam, Band 33, Heft 3, p. 228-9) মুসলিমদের প্রতিটি অর্জনকে এভাবে অন্য সভ্যতার কৃতিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা নিদারুণ শোচনীয় এবং হাস্যকর। সুরা পৃথককারী সামান্য বিন্দুর ব্যাপারেও এই প্রাচ্যাবিদরা কতটা মরিয়া!
৫. আল-মুকনি (পৃষ্ঠা: ১১৬) গ্রন্থে আদ-দানি রাহিমাহুল্লাহ মদিনার মুসহাফ এবং মালিক ইবনু আবি আমির আল-আসবাহি রাহিমাহুল্লাহ এর মুসহাফের মধ্যে চারটি বৈচিত্র্যের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, 'মালিকের মুসহাফের বাকি অংশ মদিনার মুসহাফের অনুরূপ। ইসমাইল ইবনু জাফর আল-মাদানি ঠিক যেভাবে বর্ণনা করেছিলেন।' তাই উক্ত তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে আমি আল-মাদানির কৃত গবেষণার সাহায্য নিয়েছি। (আবু উবাইদ, ফাযায়িল, পৃষ্ঠা: ৩২৮-২৯; আদ-দানি, আল-মুকনি, পৃষ্ঠা: ১১২-৪ দ্রষ্টব্য)
৬. ইবনু মুজাহিদ, কিতাবুস সাবা, পৃষ্ঠা: ৩৯০ দ্রষ্টব্য। এখানে ত্রুটি রয়েছে। আদ-দানি রাহিমাহুল্লাহ এর তালিকায় এই আয়াতটি আছে। কিন্তু সেখানে দুইটির মাঝে কোনো পার্থক্যের উল্লেখ নেই। তাই যদিও যেরকম ছিল সেভাবেই তুলে ধরেছি, তথাপি মালিকের মুসহাফের শব্দটি মূলত হবে اتشتهية
৭. ইবনু শাব্বা, তারিখুল মাদিনা, পৃষ্ঠা: ১০০২