📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 সাহাবিদের সামনে চূড়ান্ত প্রতিলিপি পাঠ করে শোনানো

📄 সাহাবিদের সামনে চূড়ান্ত প্রতিলিপি পাঠ করে শোনানো


সুহুফের সাথে মিলিয়ে নেওয়ার পর চূড়ান্ত প্রতিলিপিটি উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর উপস্থিতিতে সাহাবিদের কাছে পড়ে শোনানো হয়।[১] পাকাপোক্তভাবে নিশ্চিত হওয়ার পর এটির অনুলিপি তৈরি করে মুসলিম খিলাফতের প্রতিটি রাজ্যে প্রেরণ করার নির্দেশ জারি করেন খলিফা। মুসহাফগুলো লিখে রাখার একটি সাধারণ নির্দেশনাও দিয়েছিলেন তিনি। অর্থাৎ তিনি চেয়েছেন সাহাবিরা যেন ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নিজেদের কাছে একটি করে অনুলিপি সংরক্ষণ করেন।

টিকাঃ
১. ইবনু কাসির, ফাযায়িল, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ৪৫০

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 প্রত্যয়নকৃত অনুলিপির সংখ্যা

📄 প্রত্যয়নকৃত অনুলিপির সংখ্যা


কিছু বর্ণনা অনুযায়ী কুফা, বসরা এবং সিরিয়ায় একটি করে অনুলিপি পাঠানো হয়। আরেকটি রেখে দেওয়া হয় মদিনায়। অর্থাৎ মোট চারটি অনুলিপির কথা জানা যায়। মক্কা, ইয়েমেন এবং বাহরাইনের নামও পাওয়া যায় অন্য আরেক বর্ণনা অনুযায়ী। আদ-দানি প্রথম মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।[১] অধ্যাপক শাওকি দাইফের মতে অনুলিপি বানানো হয়েছিল মোট আটটি। কারণ উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের জন্য একটি রেখে দেন।[২]
এর সপক্ষে দলিল হলো খালিদ ইবনু ইয়াস কর্তৃক খলিফা উসমানের নিজের এবং মদিনার জন্য প্রস্তুতকৃত অনুলিপির মধ্যে কৃত তুলনা। তাই আটটি অনুলিপির উপস্থিতি সর্বাধিক যৌক্তিক। শিয়া ইতিহাসবেত্তা আল-ইয়াকুবির মতেও উসমান কুফা, বসরা, মদিনা, মক্কা, মিশর, সিরিয়া, বাহরাইন, ইয়েমেন এবং জাযিরাতুল আরবে অর্থাৎ মোট নয়টি অনুলিপি প্রেরণ করেন।[৩] আবার এগুলো তৈরি করার সময়েই কিছু অতিরিক্ত অনুলিপি নিজেদের জন্য সংরক্ষণ করেন প্রস্তুতকারীগণ। এ সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ সামনেই উপস্থাপন করা হবে।

টিকাঃ
১. আদ-দানি, আল-মুকনি, পৃষ্ঠা: ১৯; ইবনু কাসির (তার মতে সাতটি), ফাযায়িল, খন্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ৪৪৫
২. Suudi Dali, Kitub as-Sab'a of Ibn Mujahid, introduction, p. 7.
৩. আল-ইয়াকুবি, তারিখ, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১৭০

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 অন্য সকল পান্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলা

📄 অন্য সকল পান্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলা


চূড়ান্ত প্রতিলিপি তৈরি এবং এর অনুলিপি সর্বত্র প্রেরণ করা সম্পন্ন। এখানে-ওখানে ছড়িয়ে থাকা খণ্ড খণ্ড কুরআনের আর কোনো প্রয়োজন রইল না। তাই সেগুলো পুড়িয়ে ফেলা হলো। মুসআব ইবনু সাদের সূত্রে জানা যায়, খলিফার এই সিদ্ধান্তে সকলেই সন্তুষ্ট ছিলেন। একটা আপত্তিও আসেনি। অন্যান্য সূত্র থেকেও এই সম্মিলিত ঐকমত্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে আলি ইবনু আবি তালিবের বর্ণনা উল্লেখযোগ্য—
আল্লাহর শপথ, তিনি এই খন্ডাংশগুলো নিয়ে আমাদের উপস্থিতিতেই যা করার করেছেন।
সুতরাং সাহাবিদের পক্ষ থেকে সর্বসম্মতির দলিল সুস্পষ্ট।

টিকাঃ
১. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১৯-২০; সহিহুল বুখারি: ৪৯৮৭; ইবনু কাসির, ফাযায়িল, vi: ৪৪১
২. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ২০
৩. প্রাযুক্ত, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ২১
৪. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ২৫
৫. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২১

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 মুসহাফের পাশাপাশি 'কারি' প্রেরণ

📄 মুসহাফের পাশাপাশি 'কারি' প্রেরণ


মুসহাফের প্রতিটি অনুলিপির সাথে অন্তত একজন ‘কারি’ বা তিলাওয়াতকারীও প্রেরণ করা হয়। যাইদ ইবনু সাবিতকে মদিনায়, আব্দুল্লাহ ইবনু সাইবকে মক্কায়, মুগিরা ইবনু শিহাবকে সিরিয়ায়, আবু আব্দির রাহমানকে কুফায় এবং আমির ইবনু আব্দি কায়িসকে পাঠানো হয় বসরায়। আব্দুল ফাত্তাহ কাযি বলেছেন—
উল্লিখিত প্রত্যেক ‘কারি’ নির্ধারিত শহরের অধিবাসীদের বিশুদ্ধ পন্থায় তিলাওয়াত করে শুনিয়েছেন। এই তিলাওয়াত পদ্ধতি স্বয়ং নবিজি থেকে একাধিক সূত্রে বর্ণিত। সূত্রগুলো পরস্পর অভিন্ন এবং মুসহাফের ব্যঞ্জন কাঠামোর (Consonantal skeleton) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।[১] যেসকল কিরাতের সূত্র কেবল একটি (অথবা রহিত আয়াতবিশিষ্ট), সেগুলো পরিত্যাগ করা হয়েছে। মুসহাফের সাথে ‘কারি’ প্রেরণের ফলে সুরধনিগুলো আর যেনতেনভাবে উচ্চারণের সুযোগ রইল না... সুতরাং কুরআনের সঠিক উচ্চারণের শিক্ষাও সরাসরি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অবিচ্ছিন্ন সূত্রে এসেছে। শুধু লিখিত পাণ্ডুলিপি কিংবা প্রচলিত বানানরীতি অনুযায়ী যথেচ্ছভাবে গড়ে তোলা হয়নি।[২]
প্রাথমিকভাবে উসমানি মুসহাফগুলোতে স্বরচিহ্ন ও নুক্তা ছিল না।[৩] উদাহরণস্বরূপ নিচে একটি হিজাযি লিপি[৪] প্রদর্শিত হলো।

চিত্র: হিজাযি হরফে লিখিত একটি আদি মুসহাফ। নুক্তার ব্যবহার অনুপস্থিত। National Archive Museum of Yemen থেকে সংগৃহীত
অনেকভাবেই চাইলে এসব অনুলিপিকে ভুলভাবে পাঠ করার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু কুরআনের এই দ্বিতীয় সংকলনের সময় খলিফা উসমানের মূল লক্ষ্য ছিল তিলাওয়াত-সংক্রান্ত সকল বিতর্কের অবসান ঘটানো। তাই শুধু মুসহাফ প্রেরণ অথবা 'কারি'দের ইচ্ছার ওপর উচ্চারণরীতি ছেড়ে দেওয়াটা তার নীতিবিরুদ্ধ কাজ হতো। সবাইকে একটি রীতির ওপর আনার প্রচেষ্টা এক্ষেত্রে সফল হতো না।
বিগত ১৪শ বছর ধরে সকল রাষ্ট্র এবং জাতি-দল নির্বিশেষে গোটা মুসলিমবিশ্ব একটি অভিন্ন কুরআনের ওপরে টিকে আছে। আর এটিই হলো উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাফল্য, যার নজির আর দ্বিতীয়টি নেই।

টিকাঃ
১. ব্যঞ্জন কাঠামো বা Consonantal skeleton বলতে স্বরচিহ্ন (-কার) এবং মুস্তাহীন কুরআনের পাঠ্য বোঝানো হয়েছে। আরবিতে এটাকে রাসমুল মুসহাফ বলে।—অনুবাদক
২. আব্দুল ফাত্তাহ কাযি, ‘আল-কিরাআত ফি নাযারিল মুসতাশরিকিন ওয়াল মুলহিদিন’, মাজাল্লাতুল আখতার, খণ্ড: ৪৩ (দ্বিতীয় সংখ্যা), পৃষ্ঠা: ১৭৫, প্রকাশকাল: ১৩৯১
৩. অধ্যায় ১০.৩-এর নুস্তা সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা দ্রষ্টব্য।
৪. কিন্তু আদি উসমানি মুসহাফ হিজাযি হরফে লেখা হয়েছিল। সারা বিশ্বে উসমানি মুসহাফ মর্মে কিন্তু অনুলিপি পাওয়া যায়, যেগুলোর প্রামাণ্যতা স্বীকার বা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কারণ অনুলিপিগুলো এ ব্যাপারে নীরব। তবে এগুলো উসমানি মুসহাফ থেকে অনুলিখিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00