📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 যাচাই করার উদ্দেশ্যে হাফসার নিকট থেকে সুহুফ সংগ্রহ

📄 যাচাই করার উদ্দেশ্যে হাফসার নিকট থেকে সুহুফ সংগ্রহ


ইবনু শাববার বর্ণনা, যাইদ ইবনু সাবিত বলেছেন, 'মুসহাফ পুনঃনিরীক্ষণকালে দেখলাম এতে একটি আয়াত (... رجال المؤمنين من) নেই। খোঁজ করলাম আনসার এবং মুহাজির সাহাবিদের কাছে। অতঃপর খুযাইমা ইবনু সাবিত আনসারির নিকটে তা পেয়ে লিখে নিই... এরপর আবার তা নিরীক্ষণ করে আর কোনো ভুল পেলাম না। উম্মুল মুমিনিন হাফসার কাছে সংরক্ষিত সুহূফটি খলিফা উসমান চেয়ে পাঠালেন। তবে আবার ফিরিয়ে দেবেন, এই শর্তে। দুটিকে মিলিয়ে দেখার পর কোনো গরমিল পাইনি। উসমানকে তা ফিরিয়ে দিলাম। তিনি প্রফুল্লচিত্তে এই মুসহাফের প্রতিলিপি তৈরি করার নির্দেশ দেন।'
সুতরাং সুকীয় মুসহাফটি হাফসার কাছে থাকা মূল সুহুফের সাথে মিলিয়ে দেখা হয়েছিল।
প্রশ্ন হতে পারে, সুহুফের সাথেই যদি মিলাতে হয়, তাহলে খলিফা একটি সুকীয় প্রতিলিপি তৈরি করলেন কেন? কারণটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যুগ খানেক আগে ইয়ামামা এবং অন্যান্য স্থানে মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন হাজার হাজার সাহাবি। ফলে তারা অনেকেই সুহুফ সংকলনের বিরাট এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেননি।
আর উপরিউক্ত বর্ণনা অনুযায়ী সুহুফ ও মুসহাফের মধ্যে কোনো প্রকার গরমিল পাওয়া যায়নি। এখান থেকে দুটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি—
» কুরআন প্রথম যুগ থেকেই অপরিবর্তিত ছিল। কাজেই তৃতীয় শতাব্দীর আগ পর্যন্ত কুরআন পরিবর্তনশীল থাকার দাবি নিতান্তই ভিত্তিহীন।
» সংকলনের উভয় ক্ষেত্রেই গৃহীত পদ্ধতিগুলো ছিল যথার্থ ও নির্ভুল।[৩]

টিকাঃ
১. ইবনু শাব্বা, তারিখুল মাদিনা, পৃষ্ঠা: ৯৯৭
২. সুয়ুতি, আল-ইতকান, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৭২
৩. সহিহুল বুখারির হাদিস থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়—যাইদ ইবনু সাবিত থেকে বর্ণিত, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতকালে কুরআন সংকলনের সময় তিনি সুরা তাওবার শেষ দুই আয়াত খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এরপর আবু খুযাইমা আনসারির কাছে তা (লিখিত) পেয়ে গেলেন, যা অন্য কারও কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারেননি। এভাবে জমাকৃত কুরআন (সুহফ) আবু বকরের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার কাছেই জমা ছিল।...' (সহিহুল বুখারি: ৪৯৮৬)
খারিজা ইবনু যাইদ তার পিতা যাইদ ইবনু সাবিতের থেকে বর্ণনা করেন, 'মুসহাফ অনুলিখনকালে সুরা আহযাবের একটি আয়াত (৩৩: ২৩) খুঁজে পাচ্ছিলাম না, যা আমি আল্লাহর রাসুলকে পাঠ করতে শুনতাম। তাই উক্ত আয়াতটি অনুসন্ধান করতে লাগলাম। অবশেষে তা পেলাম খুযাইমা ইবনু সাবিত আনসারির কাছে। এরপর এ আয়াতটিকে কুরআনের ওই সুরাতে সংযুক্ত করে নিই।' (সহিহুল বুখারি: ৪৯৮৮)
কাছাকাছি নামের কারণে দুটি হাদিস নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন কিছু আলিম। একটি হলো খুযাইমা, আরেকটি আবু খুযাইমা। তবে ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে সংকলনের ক্ষেত্রে যাইদ ইবনু সাবিত আবু বকরের খিলাফতকালে 'সুহফ' এবং উসমানের সময় 'মুসহাফ' শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কাজেই এগুলো যে ভিন্ন দুটি সংকলনের ঘটনা, তা সহজেই অনুমেয়।
উল্লেখ্য, সহিহুল বুখারির ৪৯৮৬ নং হাদিসে আবু বকরের সময়কার কুরআন সংকলন এবং ৪৯৮৮ নং হাদিসে উসমানের সময়কার সংকলনের কথা বলা হয়েছে। যদি দ্বিতীয়টিকে যাইদ ইবনু সাবিতের স্বকীয় কুরআনের মুসহাফ বিষয়ক হাদিস হিসেবে ধরা হয়, তাহলেই সব পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু এটিকে আবু বকরের সহফ অনুসরণে উসমানের মুসহাফ মনে করলে একটি বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়। কেননা সুহফই তুমি সামনে থাকে, তাহলে সুরা আহযাবের আয়াত খুঁজে না পাওয়ার কারণ কী? আর যাইদ ইবন সাবিত প্রথম ক্ষেত্রে এক বচন এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বহুবচন ব্যবহার করেছেন, যা একটি দলবদ্ধ প্রয়াস নির্দেশ করে। কাজেই সব মিলিয়ে দ্বিতীয় সংকলনটি যে সুকীয় মুসহাফ কেন্দ্রিকই ছিল, তা বলিষ্ঠভাবে প্রতীয়মান হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00