📄 ১২ সদস্যের পরিষদ
দ্বিতীয় মতটি একটু জটিল। ইবনু সিরিন বর্ণনা করেন-
'উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু কুরআন সংকলনের (جَمْع) উদ্দেশ্যে কুরাইশ ও আনসারদের মধ্য থেকে ১২ সদস্যের একটি পরিষদ গঠন করেন। তাদের মধ্যে উবাই ইবনু কাব ও যাইদ ইবনু সাবিত ছিলেন।'[২]
আলোচ্য ১২ সদস্যের পরিচয় বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়। মুয়াররিজ আস-সাদুসি বলেছেন, 'প্রস্তুতকৃত নতুন মুসহাফটি নিরীক্ষণের জন্য (১) সাইদ ইবনু আসকে দেখানো হয়।' [১] তিনি (২) নাফি ইবনু ঘুরাইব ইবনি আমর ইবনি নাওফালের নামও উল্লেখ করেন। অন্য সূত্র থেকে (৩) যাইদ ইবনু সাবিত, (৪) উবাই ইবনু কাব, (৫) আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইর, (৬) আব্দুর রাহমান ইবনু হিশাম এবং (৭) কাসির ইবনু আফলাহর নাম পাওয়া যায়। [৩] ইবনু হাজার আরও কয়েকজনের কথা উল্লেখ করেছেন: (৮) আনাস ইবনু মালিক, (৯) আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস এবং (১০) মালিক ইবনু আবি আমির।[৪]
ইমাম বাকিল্লানি থেকে অবশিষ্টদের নাম পাওয়া যায়-(১১) আব্দুল্লাহ ইবনু উমার ইবনিল খাত্তাব এবং (১২) আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস।[৫]
টিকাঃ
১. মুয়াররিজ আস-সাদুসি, কিতাবু হাযফিন মিন নাসাবি কুরাইশ, পৃষ্ঠা: ৩৫
২. Ibn Sa'd, Tabaqat, vol: 3, part : 2, p. 62; উল্লেখ্য, ইবনু সিরিন রাহিমাহুল্লাহ এখানে جَمْع (সংকলন) শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
৩. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ২০, ২৫-২৬
৪. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ১৯
৫. আল-বাকিল্লানি, আল-ইনতিসার (সংক্ষেপিত), পৃষ্ঠা: ৩৫৮
📄 সরাসরি মুসহাফ সাজানো
নবিজির সময়ে লিখিত কুরআনের অংশ থেকে উক্ত ১২ জনকে আয়াত সংগ্রহ এবং তালিকাভুক্ত করার কাজে নিযুক্ত করা হয়।[৬] বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ইবনু আসাকির[৭] তার তারিখু দিমাশক গ্রন্থে লিখেছেন-
উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু খুতবায় বললেন, 'জনগণ পাঠপদ্ধতিকে কেন্দ্র করে বিপথগামী হচ্ছে। আর স্বয়ং আল্লাহর রাসুলের কাছ থেকে বর্ণিত কোনো আয়াত কারও সংরক্ষণে থাকলে সেগুলো অবশ্যই আমার কাছে আনতে হবে। এ ব্যাপারে আমি স্থিরকল্প।'
সুতরাং সবাই ফলক, হাড় এবং পাতার ওপর লিখিত আয়াতগুলো নিয়ে আসতে লাগল। এ সংকলন কাজে অংশগ্রহণকারীদের সর্বপ্রথম জিজ্ঞাসাবাদকারী ছিলেন খলিফা উসমান, 'তুমি কি এই আয়াতগুলো সরাসরি আল্লাহর রাসুলের কাছ থেকে জেনেছ?'
প্রত্যেক অংশগ্রহণকারী কসম করে এর উত্তর প্রদান করেন।[১] বর্ণনাকারী অনুযায়ী সংগৃহীত সকল উপাত্ত আলাদা করে নথিভুক্ত করে হস্তান্তর করা হয় যাইদ ইবনু সাবিতের কাছে।[২]
মালিক ইবনু আবি আমির বর্ণনা করেন, মুসহাফ যাদেরকে (লিখিত উৎস থেকে) পড়ে শোনানো হতো, তাদের মধ্যে আমি একজন। কোনো আয়াত নিয়ে বিতর্ক হলেই বলা হতো, 'এর লেখক কোথায়? ঠিক কীভাবে তাকে নবিজি এ আয়াত শিখিয়েছেন?'
এরপর উক্ত স্থান ফাঁকা রেখে তারা অনুলিখন চালিয়ে যেতেন। আর লেখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ডেকে পাঠানো হতো সংশ্লিষ্ট লেখককে।[৩]
এভাবে ১২ জনের নিবিড় পর্যবেক্ষণে বানান-সংক্রান্ত সকল অনিশ্চয়তাকে দূরে ঠেলে সরাসরি একটি মুসহাফ তৈরির কাজ এগিয়ে যায়।[৪] আবু উবাইদ রাহিমাহুল্লাহর কাছ থেকে কয়েকটি ঘটনা জানা যায়। উদাহরণস্বরূপ: আত-তাবৃত বানানে লম্বা তা (التابوت) হবে নাকি গোল তা (التابوة) হবে, সেটি নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। হানি বারবারি বলেছেন—
'পরিষদবর্গ মুসহাফ মিলিয়ে দেখার সময় আমি খলিফা উসমানের সাথে ছিলাম। তিনি আমাকে একটি ভেড়ার কাঁধের হাড় সমেত উবাই ইবনু কাবের কাছে নিরীক্ষণের জন্য পাঠালেন। এর ওপর তিনটি সুরা থেকে তিনটি ভিন্ন শব্দ লিখিত ছিল (২: ২৫৯, ৩০ : ৩০, ৮৬ : ১৭ প্রতিটি থেকে একটি শব্দ)। এরপর উবাই ইবনু কাব তা (সংশোধিত বানান) লিখে দিলেন।'
টিকাঃ
১. ইবনু মানযুর, মুখতাসার তারিখি দিমাশক, খণ্ড: ১৬, পৃষ্ঠা : ১৭১-৭২; ইবনু আবি দাউদ, মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ২৩-২৪
২. A. Jeffery (ed.), Muqaddimatan, p. 22.
৩. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ২১-২২
৪. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৯, ২৫
৬. উক্ত ১২ জন নিজেদের মধ্যেও ভাগ ভাগ হয়ে তাদের মতো করে কাজের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। বিস্তারিত সামনে জানা যাবে।
৭. মৃত্যু: ৫৭১ হিজরি
📄 মিলিয়ে দেখার জন্য আয়িশার কাছ থেকে সুহুফ পুনরুদ্ধার
উমার ইবনু শাববা বর্ণনা করেছেন, ইবনু যুবাইরকে একবার জিজ্ঞেস করলাম, 'খলিফা উসমান কুরআনের পুরোনো প্রতিলিপিগুলো পুড়িয়ে ফেললেন কেন?'
তিনি বললেন, “খলিফা উমারের সময় একজন বাচাল ব্যক্তি এসে মানুষের মধ্যে কুরআনের পঠনভিন্নতার কথা তুলে ধরে। উমার তাই কুরআনের সকল প্রতিলিপি সংগ্রহ করে একটি প্রমিত উচ্চারণরীতি প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এ ব্যাপারে আর কিছু করার আগেই ছুরিকাঘাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
উসমানের সময়ও একই লোক এসে সেই কথা মনে করিয়ে দিলে তিনি মুসহাফ গঠন করেন। এরপর তিনি আমাকে আমার খালা আয়িশার কাছ থেকে সম্পূর্ণ কুরআনের লিখিত অংশগুলো নিয়ে আসতে বলেন। সেগুলো স্বয়ং আল্লাহর রাসুলের বর্ণনাকৃত। এরপর সুন্দরভাবে গঠিত মুসহাফটিকে ফলকগুলোর সাথে মিলিয়ে দেখা হয়। ভুল সংশোধন শেষে কুরআনের অন্য সব প্রতিলিপি অবলোপের আদেশ করেন তিনি।[১]
উম্মুল মুমিনিন আয়িশার কাছ থেকে ফলক সংগ্রহ করার ব্যাপারে এখান থেকে কিছু দরকারি তথ্য পাওয়া যায়। তবে মূলধারার মান অনুযায়ী বর্ণনাসূত্র যঈফ।[২] অবশ্য নিম্নলিখিত বর্ণনাটির কারণে আগেরটি জোরালো হয়ে যায়। ইবনু শাববা হারুন ইবনু উমারের সূত্রে বর্ণনা করেন, “আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার বাড়িতেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণিত অংশগুলো ছিল।[৩]
টিকাঃ
১. ইবনু শাববা, তারিখুল মাদিনা, পৃষ্ঠা: ৯৯৯-৯৯১; সুয়ুতি, আল-ইতকান, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৭২
২. বর্ণনাকারীদের মধ্যে একজন মাতরুক (متروك) বর্ণনাকারী আছে।
৩. আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার একটি বর্ণনা সামনে রেখে খ্রিস্টান মিশনারি ও নাস্তিকরা দাবি করে, কুরআনের কিছু আয়াত নাকি চিরতরে হারিয়ে গেছে। কেননা সেগুলো যে পৃষ্ঠায় লেখা ছিল, তা একটি বকরি খেয়ে ফেলেছিল। হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম ইবনু মাজাহ। সে হাদিসটি হলো, “আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রজম সম্পর্কিত আয়াত এবং প্রাপ্তবয়স্ক লোকের ১০ ঢোক দুধপান সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হয়েছিল, যা একটি সহিফায় (লিখিত আকারে) আমার খাটের নিচে সংরক্ষিত ছিল। যখন আল্লাহর রাসুল ইন্তেকাল করেন এবং আমরা তার ইন্তেকালের কারণে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম, তখন একটি ছাগল এসে তা খেয়ে ফেলে।” (সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৯৪৪)
এ হাদিসের ভিত্তিতে উত্থাপিত আপত্তির জবাব আমরা দুভাগে দিতে পারি—এক. হাদিসটির বিশুদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ করে। দুই. হাদিসটিকে বিশুদ্ধ বা প্রমাণযোগ্য মেনে নিয়ে।
প্রথমত হাদিসটির সনদগত মান: মুহাদ্দিসদের মতে এ হাদিসটি সহিহ নয়। কেননা এর সনদে মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক নামক একজন বর্ণনাকারী আছেন। তিনি হাদিসটি এককভাবে বর্ণনা করেছেন। তার নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে ইমামদের মাঝে মতানৈক্য আছে। ইমাম মালিক, ইমাম আহমদ, ইমাম নাসায়ী, দারাকুতনিসহ অনেক ইমামের মতেই তিনি দুর্বল বর্ণনাকারী, যার একক বর্ণনা প্রমাণযোগ্য নয়। এদের অনেকে তো তার ব্যাপারে মারাত্মক সব মন্তব্যও করেছেন। কিছু ইমাম তাকে হাসান পর্যায়ের বর্ণনাকারীও বলেছেন। এছাড়াও সবার ঐকমত্যে তিনি হলেন তাদলিসকারী। ইবনু হাজার আসকালানি বলেন, তিনি দুর্বল, অজ্ঞাত ও তাদের চেয়েও নিম্নস্তরের শাইখদের থেকে তাদলিসকারী হিসেবে প্রসিদ্ধ। (তাবাকাতুল মুদাল্লিসিন, পৃষ্ঠা : ৫১) আর তিনি এখানে (عن )থেকে) শব্দ ব্যবহার করেছেন। উলুমুল হাদিসের সাধারণ মূলনীতি হলো, তাদলিসকারী ব্যক্তি عن )থেকে) শব্দ ব্যবহার করে হাদিস বর্ণনা করলে তা منقطع বা সূত্রবিচ্ছিন্ন হিসেবে বিবেচ্য হওয়ায় তার বর্ণিত হাদিসটি দুর্বল বলে গণ্য করা হয়। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, হাদিসটি দুর্বল। (যে বর্ণনাকারী হাদিসের সনদে খুবই সূক্ষ্মভাবে নিজের শাইখ বা শাইখের শাইখকে (দুর্বল হওয়ার কারণে বা অন্য কোনো কারণে) বাদ দেন কিংবা নিজের শাইখকে তার প্রসিদ্ধ নামের পরিবর্তে ভিন্ন আরেকটি অপরিচিত নাম বা উপাধিতে উল্লেখ করেন, তাকে তাদলিসকারী বলা হয়।)
শাইখ শুআইব আরনাউত বলেন, মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাকের একক বর্ণনা হওয়ায় এ হাদিসটির সনদ দুর্বল। আর হাদিসটির মতন বা ভাষ্যে নাকারাত (হাদিস প্রত্যাখ্যাত হওয়ার মতো কিছু সমস্যা) আছে। (মুসনাদু আহমাদ, খণ্ড: ৪৩, পৃষ্ঠা: ৩৪৩, হাদিস নং ২৬৩১৬)
তিনি আরও বলেন, এটি বিশুদ্ধ হাদিস নয়। (তাখরিজু সুনানি আবি দাউদ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৪০৬)
দ্বিতীয়ত, হাদিসটিকে সহিহ ধরে তার জবাব: যদি এই হাদিসটিকে সহিহ বা প্রমাণযোগ্যও ধরা হয়, তবুও এর দ্বারা প্রমাণিত হয় না-কুরআনের কোনো অংশ হারিয়ে গেছে, যা সংরক্ষণ করা হয়নি। কারণ এ হাদিসে বলা হয়েছে, আয়াত দুটির একটি ছিল রজম সম্পর্কিত। অর্থাৎ বিবাহিত পুরুষ-নারীর কেউ যিনা করলে তার শাস্তি পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা। অথচ বাস্তবতা হলো, রজমের সে আয়াত কুরআনের অংশ হিসেবে নাযিল হয়নি, যা স্থায়ীভাবে তিলাওয়াত করা হবে; বরং এটা নাযিল হয়েছে শুধুই বিধান হিসেবে, তিলাওয়াত হিসেবে নয়। এজন্যই তা কুরআন হিসেবে লিপিবদ্ধ করতে আদেশ করা হয়নি; উলটো বরং নিষেধ করা হয়েছে।
ইমাম আহমাদ সহিহ সনদে বর্ণনা করেছেন, 'কাসির ইবনু সালত থেকে বর্ণিত, যাইদ ইবনু সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি আল্লাহর রাসুলকে বলতে শুনেছি, যখন কোনো বিবাহিত পুরুষ অথবা নারী যিনা করে, তখন তাদের উভয়কে রজম (প্রস্তরাঘাতে হত্যা) করো। এটি শুনে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, যখন এটি (বিধান হিসেবে) নাযিল হয়েছিল, তখন আমি আল্লাহর রাসুলকে এসে বললাম, এটা আমাকে লিখে দেন। তখন মনে হলো, তিনি তা (কুরআন হিসেবে) লিপিবদ্ধ করাকে অপছন্দ করলেন। (অর্থাৎ কুরআন হিসেব লিপিবদ্ধ করার অনুমতি দিলেন না।)' (মুসনাদু আহমাদ: ২১৫৯৬; মুস্তাদরাকুল হাকিম: ৮০৭১)
ইমাম বাইহাকি প্রমাণযোগ্য আরেকটি সনদে বর্ণনা করেছেন, 'উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু রজমের আয়াত লেখার অনুমতি চেয়ে নবিজির কাছে গিয়ে আবেদন করেছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে রজমের আয়াতটি লিখে দেন। তখন নবিজি বললেন, আমি তা করতে পারব না।' (আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ১৬৯১৩, আস-সুনানুল কুবরা, নাসায়ি: ৭১১০)
হাদিসটি বর্ণনা করে ইমাম বাইহাকি বলেন, এ হাদিসে এবং পূর্বের হাদিসে একথার প্রমাণ পাওয়া যায়, রজমের আয়াতের বিধান বহাল আছে, কিন্তু তার তিলাওয়াত রহিত হয়ে গেছে। আর এটা ঐকমত্য সমর্থিত একটি বিষয়, যে ব্যাপারে কারও মতানৈক্যের কথা আমি জানি না। (প্রাগুক্ত)
সুতরাং প্রমাণ হলো রজমের আয়াতটি চিরস্থায়ী কুরআন হিসেবে নাযিলই হয়নি। সাময়িক সময়ের জন্য তা নাযিল হলেও তার তিলাওয়াত চিরতরে রহিত হয়ে গেছে। এজন্য এখন কেউ রজমের আয়াত পড়লে তাতে কুরআন তিলাওয়াতের সাওয়াব মিলবে না। কারণ তা কুরআনের অংশ নয়। কাজেই 'কুরআনের কিছু আয়াত হারিয়ে যাওয়ায় সংরক্ষিত হয়নি' বলাটা নিতান্তই অসার ও মিথ্যা কথা।
আয়াত দুটির দ্বিতীয়টি ছিল প্রাপ্তবয়স্ক লোকের ১০ ঢোক দুধপান সম্পর্কিত। এটাও মূলত মানসুখ বা রহিত আয়াত। ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন: 'আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কুরআনুল কারিমে এ আয়াতটি নাযিল হয়েছিল (১০ বার দুধপানে মাহরাম হওয়া/বিয়ে হারাম হওয়া সাব্যস্ত হয়) অতঃপর তা রহিত হয়ে যায় এ আয়াতটি দ্বারা (পাঁচবার দুধপানে মাহরাম হওয়া/বিয়ে হারাম হওয়া সাব্যস্ত হয়)। (সহিহ মুসলিম: ১৪৫২)
ইমাম নববি বলেন, ‘আয়াতটি রহিত হওয়ার ব্যাপারটি অনেক দেরিতে (অর্থাৎ নবিজির ওফাতের অল্প কিছুকাল পূর্বে) ঘটেছে। এমনকি নবিজি ইন্তেকাল করার পরও কিছু মানুষ আয়াতটি কুরআন হিসেবে তিলাওয়াত করতে থাকে। কেননা তাদের কাছে তখন পর্যন্ত আয়াতটি রহিত হওয়ার খবর পৌঁছেনি। এরপর যখন তাদের কাছে এ আয়াতটি রহিত হওয়ার খবর পৌঁছল, তখন তারা তা কুরআন হিসেবে তিলাওয়াত থেকে বিরত হলো এবং সবাই একমত হলো, এটা কুরআন হিসেবে তিলাওয়াত করা হবে না।’ (শারহু মুসলিম, নববি, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ২৯)
সুতরাং বোঝা গেল, ১০ বার দুধপানে মাহরাম হওয়া/বিয়ে হারাম হওয়ার আয়াতটি মানসুখ হওয়ার মতো পাঁচবার দুধপানে মাহরাম হওয়া/বিয়ে হারাম হওয়ার আয়াতটিও একটি মানসুখ আয়াত। তবে প্রথমটি রহিত হওয়ার সংবাদ সবাই জানলেও দ্বিতীয়টি রহিত হওয়ার সংবাদ প্রথম প্রথম সবাই জানত না। পরে যখন জানা গেল এটাও রহিত আয়াত তখন সর্বসম্মতিক্রমে তা কুরআনের অংশ না হওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
সারকথা—আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা সহিফায় দুটি আয়াত লিখে রেখেছিলেন ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণ হিসেবে। এটা তিলাওয়াতযোগ্য আয়াত হিসেবে লেখা হয়নি। যদি আয়িশা জানতেনই এ আয়াত দুটি মূল কুরআনের অংশ, যা রহিত হয়নি; তাহলে নিজের জীবনবাজি রেখে হলেও এ ব্যাপারে শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন, যেন আয়াত দুটিকে মুসহাফের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়। যেখানে তিনি উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাতের কিসাস নেওয়ার বিষয়ে আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন, সেখানে তিনি কুরআন সংকলনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিজের জানা দুটি আয়াত অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করবেন না, তা অবিশ্বাস্য ব্যাপার! আর কুরআন তো সর্বপ্রথম সংকলন করেছিলেন তার সম্মানিত পিতা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু। (তাই ব্যাপারটি তার জন্য অনেক সহজ ছিল) সুতরাং ইবনু মাজাহর এ হাদিসের ভিত্তিতে কুরআনের ত্রুটি বের করার কুচেষ্টা একমাত্র সে-ই করতে পারে, যার ইসলাম-বিদ্বেষ তাকে অন্ধে পরিণত করেছে, যার দ্বীন-বিরোধিতা তাকে বধির করে দিয়েছে এবং যার কুফর-পক্ষপাতিত্ব তাকে এমন বানিয়ে দিয়েছে, সে কী বলে কিছুই বোঝে না। (তাকমিলাত ফাতহিল মলহিম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা : ৬৯) অর্থাৎ আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা নিশ্চিতই জানতেন, এটা একসময় কুরআন হিসেবে তিলাওয়াত করা হলেও তা পরে রহিত হয়ে যাওয়ায় মূল কুরআনের অংশ নয়। তাই খাটের নিচ থেকে তার সহিফা বকরি খেয়ে ফেলার ঘটনা মূলভিত্তি ধরে এ অভিযোগ করা নিতান্তই হাস্যকর ও অযৌক্তিক যে, এর কারণে কুরআনের একাংশ চিরতরে হারিয়ে গেছে। কেননা তার জীবদ্দশায়ই কুরআন সংকলন করা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে তার কাছ থেকে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরামর্শও নেওয়া হয়েছে, এমনকি তার মাধ্যমে সংকলন কাজ যাচাইও করা হয়েছে। (তারিখুল মাদিনা, ইবনু শাব্বা: পৃষ্ঠা: ৯৯৭)
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো, কুরআন এমন কোনো গ্রন্থ নয়, যা কেবল কিছু কাগজ ও পত্রনির্ভর; বরং কুরআন তো অসংখ্য সাহাবির হৃদয়ে খোদাই করা ছিল। তাই সকল কাগজ, সহিফা ও পত্র যদি হারিয়ে বা পড়ে গেলেও যেত, তবুও মুসহাফ সংকলনের সময় কুরআনের একটি শব্দ বা অক্ষরও বাদ পড়ত না। খুব সহজেই হাজার হাজার হাফিজের হৃদয় থেকে একেবারে অবিকল ও অবিকৃত কুরআন বের করে আনা সম্ভব হতো। বস্তুত নির্ভরযোগ্যতার সর্বোচ্চ মান নিশ্চিতকল্পেই কুরআন সংকলনের সময় মুখস্থ ও লিখিত উভয় পন্থারই সাহায্য নেওয়া হয়। নতুবা এক্ষেত্রে তো শুধু মুখস্থ পদ্ধতিই যথেষ্ট ছিল। কুরআন এমন গ্রন্থ নয়, কেবল কোনো কাগজ হারিয়ে যাওয়ার কারণে তা চিরতরে হারিয়ে যাবে। যেমন একটি হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসুলকে বলেন: 'আর আমি আপনার প্রতি এমন কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যা পানি কখনো ধুয়ে-মুছে ফেলতে পারবে না।' (সহিহ মুসলিম: ২৮৬৫) কেননা পানি দ্বারা কেবল সেই জিনিস ধুয়ে যাওয়া সম্ভব, যা কাগজপত্রের ওপর কালি ইত্যাদির দ্বারা লেখা হয় এবং এটার ওপরই সর্বদা নির্ভর করতে হয়। কিন্তু যা হাজার-হাজার, লক্ষ-লক্ষ স্মৃতিতে সংরক্ষিত থাকে, তা কখনো পানি বা অন্য কিছুর মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
📄 যাচাই করার উদ্দেশ্যে হাফসার নিকট থেকে সুহুফ সংগ্রহ
ইবনু শাববার বর্ণনা, যাইদ ইবনু সাবিত বলেছেন, 'মুসহাফ পুনঃনিরীক্ষণকালে দেখলাম এতে একটি আয়াত (... رجال المؤمنين من) নেই। খোঁজ করলাম আনসার এবং মুহাজির সাহাবিদের কাছে। অতঃপর খুযাইমা ইবনু সাবিত আনসারির নিকটে তা পেয়ে লিখে নিই... এরপর আবার তা নিরীক্ষণ করে আর কোনো ভুল পেলাম না। উম্মুল মুমিনিন হাফসার কাছে সংরক্ষিত সুহূফটি খলিফা উসমান চেয়ে পাঠালেন। তবে আবার ফিরিয়ে দেবেন, এই শর্তে। দুটিকে মিলিয়ে দেখার পর কোনো গরমিল পাইনি। উসমানকে তা ফিরিয়ে দিলাম। তিনি প্রফুল্লচিত্তে এই মুসহাফের প্রতিলিপি তৈরি করার নির্দেশ দেন।'
সুতরাং সুকীয় মুসহাফটি হাফসার কাছে থাকা মূল সুহুফের সাথে মিলিয়ে দেখা হয়েছিল।
প্রশ্ন হতে পারে, সুহুফের সাথেই যদি মিলাতে হয়, তাহলে খলিফা একটি সুকীয় প্রতিলিপি তৈরি করলেন কেন? কারণটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যুগ খানেক আগে ইয়ামামা এবং অন্যান্য স্থানে মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন হাজার হাজার সাহাবি। ফলে তারা অনেকেই সুহুফ সংকলনের বিরাট এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেননি।
আর উপরিউক্ত বর্ণনা অনুযায়ী সুহুফ ও মুসহাফের মধ্যে কোনো প্রকার গরমিল পাওয়া যায়নি। এখান থেকে দুটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি—
» কুরআন প্রথম যুগ থেকেই অপরিবর্তিত ছিল। কাজেই তৃতীয় শতাব্দীর আগ পর্যন্ত কুরআন পরিবর্তনশীল থাকার দাবি নিতান্তই ভিত্তিহীন।
» সংকলনের উভয় ক্ষেত্রেই গৃহীত পদ্ধতিগুলো ছিল যথার্থ ও নির্ভুল।[৩]
টিকাঃ
১. ইবনু শাব্বা, তারিখুল মাদিনা, পৃষ্ঠা: ৯৯৭
২. সুয়ুতি, আল-ইতকান, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৭২
৩. সহিহুল বুখারির হাদিস থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়—যাইদ ইবনু সাবিত থেকে বর্ণিত, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতকালে কুরআন সংকলনের সময় তিনি সুরা তাওবার শেষ দুই আয়াত খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এরপর আবু খুযাইমা আনসারির কাছে তা (লিখিত) পেয়ে গেলেন, যা অন্য কারও কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারেননি। এভাবে জমাকৃত কুরআন (সুহফ) আবু বকরের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার কাছেই জমা ছিল।...' (সহিহুল বুখারি: ৪৯৮৬)
খারিজা ইবনু যাইদ তার পিতা যাইদ ইবনু সাবিতের থেকে বর্ণনা করেন, 'মুসহাফ অনুলিখনকালে সুরা আহযাবের একটি আয়াত (৩৩: ২৩) খুঁজে পাচ্ছিলাম না, যা আমি আল্লাহর রাসুলকে পাঠ করতে শুনতাম। তাই উক্ত আয়াতটি অনুসন্ধান করতে লাগলাম। অবশেষে তা পেলাম খুযাইমা ইবনু সাবিত আনসারির কাছে। এরপর এ আয়াতটিকে কুরআনের ওই সুরাতে সংযুক্ত করে নিই।' (সহিহুল বুখারি: ৪৯৮৮)
কাছাকাছি নামের কারণে দুটি হাদিস নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন কিছু আলিম। একটি হলো খুযাইমা, আরেকটি আবু খুযাইমা। তবে ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে সংকলনের ক্ষেত্রে যাইদ ইবনু সাবিত আবু বকরের খিলাফতকালে 'সুহফ' এবং উসমানের সময় 'মুসহাফ' শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কাজেই এগুলো যে ভিন্ন দুটি সংকলনের ঘটনা, তা সহজেই অনুমেয়।
উল্লেখ্য, সহিহুল বুখারির ৪৯৮৬ নং হাদিসে আবু বকরের সময়কার কুরআন সংকলন এবং ৪৯৮৮ নং হাদিসে উসমানের সময়কার সংকলনের কথা বলা হয়েছে। যদি দ্বিতীয়টিকে যাইদ ইবনু সাবিতের স্বকীয় কুরআনের মুসহাফ বিষয়ক হাদিস হিসেবে ধরা হয়, তাহলেই সব পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু এটিকে আবু বকরের সহফ অনুসরণে উসমানের মুসহাফ মনে করলে একটি বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়। কেননা সুহফই তুমি সামনে থাকে, তাহলে সুরা আহযাবের আয়াত খুঁজে না পাওয়ার কারণ কী? আর যাইদ ইবন সাবিত প্রথম ক্ষেত্রে এক বচন এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বহুবচন ব্যবহার করেছেন, যা একটি দলবদ্ধ প্রয়াস নির্দেশ করে। কাজেই সব মিলিয়ে দ্বিতীয় সংকলনটি যে সুকীয় মুসহাফ কেন্দ্রিকই ছিল, তা বলিষ্ঠভাবে প্রতীয়মান হয়।