📄 সরাসরি সুহুফ অনুসরণে মুসহাফ তৈরি
প্রথম মতানুযায়ী, হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহার কাছ থেকে সুহুফ সংগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ প্রতিলিপি তৈরি শুরু করে দেন উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু। আল-বারা বলেছেন, হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহার কাছে উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু বার্তা পাঠালেন, 'সুহুফ আমার কাছে পাঠিয়ে দেন, আমি কয়েকটি প্রতিলিপি তৈরি করে মূললিপিগুলো আপনার কাছে ফেরত পাঠাব।' হাফসা তা পাঠালে এর প্রতিলিপি তৈরি শুরু করে দেন যাইদ ইবনু সাবিত, আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইর, সাইদ ইবনু আস এবং আব্দুর রাহমান ইবনু হারিস। তিন কুরাইশি সদস্যকে খলিফা নির্দেশ দিলেন, 'কুরআনের যেকোনো ব্যাপারে যাইদ ইবনু সাবিতের সাথে তোমাদের মতভেদ হলে তা কুরাইশি উপভাষায় লিপিবদ্ধ করবে। কারণ এই কিতাব নাযিল হয়েছে তাদের ভাষায়।' তারা তা-ই করলেন। কয়েকটি প্রতিলিপি তৈরি হয়ে গেলে খলিফা উসমান হাফসার কাছে তার সুহুফটি ফিরিয়ে দেন...।'[১]
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৪৯৮৭; ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা: ১১, ৪৯৮৭; ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১৯-২০; আবু উবাইদ, ফাযায়িল, পৃষ্ঠা: ২৮২
📄 হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফের অবদান
উমাইয়া খিলাফতকালে ইরাকের গভর্নর ছিলেন হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ। তার কঠোর শাসনামলের ইতিহাস খুব একটা প্রশংসাজনক নয়। তার অনেক অপকীর্তি রয়েছে। কিন্তু কুরআনের প্রতি অনেক অবদান আছে তার। তবে এক্ষেত্রেও তার শত্রুর কোনো অভাব ছিল না। আউফ ইবনু আবি জামিলা (মৃত্যু: ১৪৬ হিজরি) হাজ্জাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন-তিনি উসমানি মুসহাফের ১১টি স্থানে পরিবর্তন সাধন করেছেন।[১] আউফ একজন বিশ্বস্ত মানুষ হওয়া সত্ত্বেও শিয়া অনুরাগী এবং উমাইয়া-বিরোধী ছিলেন।[১] হাজ্জাজ ছিলেন উমাইয়াদের শক্তিশালী ভিত। আউফ তাকে দমন করতে চাওয়াটা তাই স্বাভাবিক। এজন্য বিপরীতপক্ষ থেকে উত্থাপিত সকল বিচার্য বিষয়কে সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে যাচাই করা চাই। প্রথম উমাইয়া খলিফা মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর দ্বন্দ্বের কারণই ছিল উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যুকে ঘিরে। আর সেই উসমানি মুসহাফ পরিবর্তন করার অভিযোগ যদি হাজ্জাজের বিরুদ্ধে আনা হয়, তাহলে তা নিদারুণ অবাস্তব দেখায়। তখন উমাইয়াদের গোটা ব্যাপারটাই অনর্থক সাব্যস্ত হয়।
তবুও যেসব শব্দ পরিবর্তনের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে, সেগুলো একটু দেখা যাকাতোঃ
| সুরা ও আয়াত | উসমানি মুসহাফ | যেসব কথিত পরিবর্তনের জন্য হাজ্জাজ অভিযুক্ত |
|---|---|---|
| ১ | ২:২৫৯ | لم يتسنه وانظر | لم يتسن وانظر |
| ২ | ৫:৪৮ | شريعة منهاجا | شريعة منهاجا |
| ৩ | ১০:২২ | هو الذي يسيركم | هو الذي ينشركم |
| ৪ | ১২:৪৫ | أنا أنبئكم بتأويله | أنا آتيكم بتأويله |
| ৫ | ২৩:৮৭,৮৯ | سيقولون الله | سيقولون الله |
| ৬ | ২৬:১১৬ | من المرجومين | من المخرجين |
| ৭ | ২৬:১৬৭ | من المخرجين | من المرجومين |
নحن قسمنا بينهم نحن قسمنا بينهم معيشتهم معيشتهم
من ماء غير آسن من ماء غير يسن
منكم وانفقوا منكم وانفوا
بضنين بظنين
আউফ ইবনু আবি জামিলার উত্থাপিত অভিযোগের বহু আগে সকল উসমানি মুসহাফ নিয়ে আলিমগণ গভীরভাবে ঘেঁটে দেখেছেন। অক্ষরে অক্ষরে একটির সাথে মিলিয়ে দেখেছেন অপরটি। কিন্তু আউফের বর্ণিত অমিলের সাথে তাদের প্রাপ্ত বৈচিত্র্যের কোনো মিল নেই। উসমানি মুসহাফে কোনো নুক্তা ছিল না।[১] এমনকি হাজ্জাজের সময়ও এর প্রচলন সেভাবে গড়ে ওঠেনি। ওপরের তালিকায় কিছু শব্দের নুক্তা সরিয়ে নিলে তা একই রকম মনে হয়। [২] তাহলে গঠন না পালটে নুক্তাহীন শব্দগুলোকে তিনি কীভাবে পরিবর্তন করতে পারেন?[৩] কথিত পরিবর্তনগুলোর একটিও আয়াতের অর্থের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত উত্থাপিত দাবির বিপরীতে অবস্থান করছে। [৪]
ইবনু কুতাইবা বলেন-
'আসিম আল-জাহদারি বর্ণনা করেন-তাকে এবং নাজিয়া ইবনু রুমহ ও আলি ইবনু আসমাকে হাজ্জাজ মুসহাফ নিরীক্ষণ করার কাজে নিযুক্ত করেন। উসমানি মুসহাফের বিপরীতে কোনো বিচ্যুতি পাওয়া গেলে তা নির্মূল করাই ছিল মূল লক্ষ্য। মুসহাফের মালিককে বিনিময়ে ৬০ দিরহাম ক্ষতিপূরণ দেওয়া হতো।' [৫]
এভাবে কিছু মুসহাফ হয়তো ধ্বংস না করে কালি মুছে নতুন করে লেখা হয়। এই কাজটিকেই হয়তো ভুলে অনেকে হাজ্জাজের কুরআন বিকৃতি ধরে নিয়েছে।
উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো হাজ্জাজও বিভিন্ন শহরে কুরআনের অনুলিপি প্রেরণ করেন। উবাইদুল্লাহ ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনি উতবার সূত্রে জানা যায়—মদিনার মুসহাফ মসজিদে নববিতে রাখা ছিল। প্রতি সকালে তা তিলাওয়াত করা হতো।[১] উসমান-হত্যাকাণ্ডের পর তৈরি হওয়া অস্থিতিশীল পরিবেশে কেউ মুসহাফটি নিয়ে পালিয়ে যায়। মুহরিজ ইবনু সাবিত তার বাবার সূত্রে বর্ণনা করেন—হাজ্জাজ কিছু মুসহাফ প্রণয়ন করেছিলেন। উল্লেখ্য, মুহরিজ ইবনু সাবিতের বাবা হাজ্জাজের রক্ষীবাহিনীতে ছিলেন। হাজ্জাজ মদিনার উদ্দেশে মুসহাফ পাঠালে উসমানের পরিবার তাতে বিরক্ত হয়। তখন মূল মুসহাফটি জনসম্মুখে এনে পড়তে বললে তারা জানায় তা হত্যাকাণ্ডের দিনেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। উসমানের মাস্টার কপিটি তখনো তার প্রপৌত্র খালিদ ইবনু আমর ইবনি উসমানের কাছে সংরক্ষিত ছিল বলে জানতে পারেন মুহরিজ।
তবুও মূলটির স্থলে হাজ্জাজের প্রেরিত মুসহাফটিই মসজিদে নববিতে পাঠ করার জন্য গ্রহণ করা হয় বলে ধরে নেওয়া যায়। ইবনু জাবালার সূত্রে আস-সামহুদি বর্ণনা করেছেন, 'মদিনার মতো মূল নগরীগুলোতে হাজ্জাজ কুরআন প্রেরণ করেন। আর এটিই ছিল শহরে প্রেরিত প্রথম মুসহাফ।'[২]
ইবনু শাব্বা বলেছেন, 'আল-মাহদি (আব্বাসীয় শাসক) খলিফা হওয়ার পর মদিনায় আরেকটি মুসহাফ পাঠান, যেটি আজও পাঠ করা হয়। হাজ্জাজের মুসহাফটিকে সরিয়ে রাখা হয় মিম্বারের পাশে একটি বাক্সের ভেতর।'[৩]
শুধু মুসহাফ প্রণয়ন করার মধ্যেই হাজ্জাজের অবদান সীমিত নয়। আবু মুহাম্মাদ হিম্মানি থেকে জানা যায়—হাফিজ এবং পেশাদার তিলাওয়াতকারীদের হাজ্জাজ একত্র করেন এবং নিজে হাফিজদের সারিতে বসে যান। কারণ তিনিও কুরআনের হাফিজ। এরপর তাদের কুরআনের মোট হরফ সংখ্যা খুঁজে বের করতে বলেন। তারা সবাই ৩৪০৭৫০টি হরফের ব্যাপারে একমত হন। অত্যধিক কৌতূহল থেকে তিনি এরপর কোন হরফের ওপর অর্ধেক কুরআন শেষ হয়, তা খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। ১৮তম সূরার ১৯নং আয়াতের وَلْيَتَلَطَّف শব্দটিরও বর্ণে এর উত্তর পাওয়া গেল। এভাবে আবার কুরআনের প্রতি এক-সপ্তমাংশ খুঁজে বের করতে নির্দেশ
করা হয়। সম্পূর্ণ কাজ শেষ হলে তার পরবর্তী লক্ষ্য হয় প্রতি এক-তৃতীয়াংশ এবং এক-চতুর্থাংশ খুঁজে বের করা।[১] প্রতি রাতে তাদের কাজের অগ্রগতির খোঁজ নিতেন তিনি। পুরো কাজ শেষ হতে প্রায় চার মাস লেগে যায়।[২]
ইস্তাম্বুলের তোপকাপি সারায়িতে আল-মুনাজ্জিদ একটি মুসহাফ খুঁজে পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। এর নোটগুলো থেকে জানা যায় তা ৪৯ হিজরিতে লিখিত। উকবা ইবনু নাফি ফিহরিমের জন্য তা লিখেছিলেন হুদাইজ ইবনু মুআবিয়া ইবনি মাসলামা আনসারি। কিন্তু এর তারিখ নিয়ে তিনি সন্দিহান। কারণ কুরআনের প্রতিটি বর্ণের পরিসংখ্যান সেখানে উল্লিখিত আছে। প্রথম শতাব্দীতে এমন পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ করা সম্ভব ছিল কি না, তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন।[৩] অথচ হাজ্জাজ পরিসংখ্যান বের করেছেন। তাই মুনাজ্জিদের সংশয়ের ভিত্তি আমার কাছে সুবিবেচিত মনে হয়নি।
আমাদের কম্পিউটারে নুক্তাবিহীন কুরআনের একটি অনুলিপি আছে। একটি ছোট প্রোগ্রামের সাহায্যে সেখান থেকে ৩৩২৭৯৫টি হরফ খুঁজে পাই। হাজ্জাজের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে জানি না। তিনি কি তাশদিদের দ্বিতীয় অক্ষরকেও স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি হরফ ধরে নিয়েছিলেন? কিংবা যে আলিফ (যথা: ملك ) লেখা হয় না কিন্তু উচ্চারিত থাকে? এ তথ্যগুলো অনুপস্থিত থাকলেও আমাদের কম্পিউটারের হিসাব আর প্রায় ১৪শ বছর আগে হাজ্জাজের কৃত হিসাব খুবই কাছাকাছি। এ থেকে বোঝা যায় চার মাসের ওই শ্রমসাধ্য কার্যক্রম বাস্তবেই হয়েছিল।
টিকাঃ
১. ইবনু আবি দাউদ, আল মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১১৭
২. ইবনু হাজার, তাকরিবুত তাহযিব, পৃষ্ঠা: ৪৩৩, ৫২১৫
৩. ইবনু আবি দাউদ, আল মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১১৭-১৮
৪. অধ্যায় ৯, ১০ দ্রষ্টব্য
৫. যেমন معيشتهم এবং معنشهم। ৩ ও ৪-এর ক্ষেত্রেও অনুরূপ প্রযোজ্য।
৬. যেমন তালিকার ১নং নমুনা। پسنه এটি বানানের ভিন্নতা মাত্র, যা উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়কালেই সংশোধন করা হয়। (অধ্যায় ৭ এর 'সরাসরি মুসহাফ সাজানো' অংশ দ্রষ্টব্য)
৭. হাজ্জাজ সর্বোচ্চ নিজের ব্যক্তিগত অনুলিপিতে পরিবর্তন করতে পারেন, যেমনটি উবাইদুল্লাহ যিয়াদ করেছিলেন বানানরীতির প্রমিতকরণের জন্য। (বিস্তারিত দশম অধ্যায়ে) মূল উসমানি মুসহাফে কোনো পরিবর্তন করলে তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা এবং মুসলিমবিশ্ব চুপ করে থাকত না। আর সত্যিই যদি এমন হতো, তাহলে পরবর্তীতে আব্বাসীয়রা উমাইয়াদের এ অপকীর্তিকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা নিত।
৮. তাওয়িষ্ণু মুশকিলিল কুরআন, পৃষ্ঠা: ৫১
৯. ইবনু শাব্বা, তারিখুল মাদিনা, পৃষ্ঠা: ৭; ইবনু কুতাইবা, তাওয়িলু মুশকিলিল কুরআন, পৃষ্ঠা: ৫১
১০. আস-সামছুদি, ওয়াফা আল-ওয়াফা, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬৬৮
১১. ইবনু শাব্বব্বা, তারিখুল মাদিনা, পৃষ্ঠা: ৭-৮
১২. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১১৯-১২০
১৩. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১২০
১৪. Salahuddin Al-Munajjid, Etudes de paléographie Arabe, p. 82-83.
📄 মুসহাফ বিক্রি প্রসঙ্গে
ইবনু মাসউদের বর্ণনায় পাওয়া যায়, সেসময়ে কেউ মুসহাফের অনুলিপি চাইলে স্বেচ্ছাসেবীদের দ্বারস্থ হতে হতো।[৪] আলি ইবনু হুসাইনও (মৃত্যু: ৯৩ হিজরি) একই প্রসঙ্গে বলেছেন, মুসহাফ ক্রয়-বিক্রয়ের নিয়ম ছিল না। কেউ একজন লেখার সামগ্রী নিয়ে এলে স্বেচ্ছাসেবীগণ লেখার কাজে লেগে যেত। এভাবে স্বেচ্ছায় একেকজন লিখে যেত কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত।[৫]
একবার ইবরাহিম নাখয়ির সাথে মুহিল এ নিয়ে তর্ক করতে গিয়ে বলেন, 'তিলাওয়াত
করতে হলে মানুষের মুসহাফ প্রয়োজন। ইবরাহিম জবাব দেন, 'তাহলে লেখার সামগ্রী এবং দোয়াত-কালি কিনে আনো এবং স্বেচ্ছাসেবীদের সাহায্য নাও।'[১] কিন্তু আরবের সীমা পার করে বাড়ন্ত মুসলিম জনসংখ্যার পাশাপাশি বৃদ্ধি পেতে লাগল কুরআনের প্রয়োজন। এতে করে সেচ্ছাসেবকদের ওপর চাপ বেড়ে যায়। সৃষ্টি হয় পেশাদার অনুলেখকদের চল।
এবার আল্লাহ বাণীর জন্য কাউকে অর্থ প্রদান করা নিয়ে শুরু হলো নতুন এক ধর্মীয় বিতর্ক। কারণ বিক্রি সেই জিনিসই করা যায়, যা নিজের। তাহলে আল্লাহর বাণী কীভাবে ব্যক্তি-মালিকানায় বিক্রি করা সম্ভব?
এজন্য অধিকাংশ আলিম পেশাদার অনুলিখন এবং মুসহাফকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করাকে অপছন্দ করলেন। ইবনু মাসউদ, আলকামা, মাসরুক, শুরাইহ, আবু মিজলায এবং ইবরাহিম নাখয়িসহ আরও অনেকে এ দলের অন্তর্ভুক্ত। ইবনুল মুসাইয়িব এর মধ্যে শক্ত অবস্থান নেন।[২] তবে সামসময়িক অন্যান্য আলিম তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন, গৃহীত অর্থ মূলত আল্লাহর বাণীর বদলে নয়; বরং দোয়াত-কালি, পান্ডুলিপি এবং পরিশ্রমের বিনিময়ে নেওয়া হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবকদের তীব্র সংকটের কথা মাথায় রেখে ইবনু আব্বাস, সাইদ ইবনু যুবাইর, ইবনুল হানাফিয়া প্রমুখ আলিম মুসহাফ কেনা বা বিক্রয় করাকে খারাপ চোখে দেখেননি।[৩]
মুসহাফ পুনঃনিরীক্ষণ ও সংশোধনের ক্ষেত্রেও প্রুফরিডিংয়ের পেশা নিয়ে আবার একই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। মুসহাফ সংশোধন ও পুনঃনিরীক্ষণ করে মুসা আল-আসাদির কাছে তা বিক্রির প্রস্তাব দেন সাইদ ইবনু যুবাইর।[৪] পুনঃনিরীক্ষণের জন্য অর্থ আদান-প্রদানকে অনেকেই শুরুতে নাকচ করলেও পরবর্তী সময়ে ইবরাহিম নাখয়ি তার মত পরিবর্তন করেন।[৫]
আমর ইবনু মুররার (মৃত্যু: ১১৮ হিজরি) মতে, সর্বপ্রথম মুসহাফ কেনাবেচা শুরু করে ক্রীতদাসরা।[৬] ইবনু আব্বাসের ক্রীতদাস ১০০ দিরহামের বিনিময়ে কুরআন
অনুলিখনের কাজ করত। [১] মুআবিয়ার শাসনামলে মুসহাফ ব্যবসার প্রচলন শুরু হয় বলে ধারণা করেছেন আবু মিজলায। কাজেই তা প্রথম শতাব্দীর অর্ধেকের আগেই শুরু হয়। দ্রুত একে ঘিরে ব্যাবসা গড়ে ওঠে। এমন দোকানের পাশ থেকে যাওয়ার সময় ইবনু উমার (মৃত্যু: ৭৩ হিজরি) এবং সালিম ইবনু আব্দিল্লাহ (মৃত্যু : ১০৬ হিজরি) একে 'মন্দ ব্যাবসা' [৩] বলে অভিহিত করতেন। এদিকে কুরআন বিক্রয়কে শাস্তিযোগ্য অপরাধ মনে করতেন আবু আলিয়া (মৃত্যু: ৯০ হিজরি)। [৪]
জনকল্যাণমুখী আরেকটি উদ্যোগ ছিল গণপাঠাগার। মুজাহিদের (মৃত্যু: ১০৩ হিজরি) কাছ থেকে জানা যায়, ইবনু আবি লাইলা (মৃত্যু: ৮৩ হিজরি) শুধু কুরআন-সর্বস্ব একটি পাঠাগার তৈরি করেছিলেন। লোকজন তিলাওয়াত করার জন্য সেখানে আসত। [৫] প্রথম শতাব্দীর মধ্যভাগে আব্দুল হাকাম ইবনু আমর আল-জুমাহি একটি ভিন্ন প্রকৃতির পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত করেন। বিভিন্ন বিষয়ের কুররাসাতের (পুস্তিকাদি) পাশাপাশি সেখানে ছিল নানা রকম খেলার উপকরণও। তাই সবাই পড়া এবং বিনোদনের জন্য একটি উন্মুক্ত পরিবেশ পেল।[৬] খালিদ ইবনু ইয়াজিদ ইবনি মুআবিয়াও একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। এছাড়াও হয়তো আরও অনেকেই করেছিলেন, যাদের বিস্তারিত এখন আর পাওয়া যায় না। [৭]
টিকাঃ
১. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১১৯-২০
২. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৬৬
৩. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৬৯
৪. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১৬৬
৫. ইবনু আবি শাইবা, মুসান্নাফ, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৯৩; ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১৭৫
৬. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১৭৫-৭৬
৭. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৫৭, ১৬৭, ১৬৯
৮. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৭১
৯. বুখারি, খালকু আফআলিল ইবাদ, পৃষ্ঠা: ৩২
১০. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১৭৫
১১. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৫৯, ১৬৫; ইবনু আবি শাইba, মুসান্নাফ, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৯২
১২. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১৬৯
১৩. Ibn Sa'd, Tabaqat, vol: 4, p. 75; ইবন আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১৫১
১৪. আল-আসফাহানি, আল-আগানি, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৫৩
১৫. M.M. al-Azami, Studies in Early Hadith Literature, pp. 16-17.
📄 অধ্যায় শেষে
উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর দক্ষতা অন্তত দুদিক থেকে পরিষ্কার-
এক. এমন কোনো প্রদেশ বাকি ছিল না, যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে এই মুসহাফ মিশে যায়নি।
দুই. মুসহাফের ওপর ১৪শ বছরের দীর্ঘ পরিক্রমা এতটুকু দাগও ফেলতে পারেনি। এর মূলপাঠ অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে। কুরআনুল কারিমের ঐশী পরিচয় একদম প্রকাশ্য ধরা পড়ে যায়। এর আর কী ব্যাখ্যা থাকতে পারে? পরবর্তী খলিফাগণ
ইতিহাসের পাতায় স্থান পেতে কুরআনের অনুলিপির প্রসার বাড়িয়েছেন শুধু। কিন্তু উসমানের প্রতিষ্ঠিত আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক একটা কিছুও তৈরি হয়নি।
কালের আবর্তনে মুসহাফের বিভিন্নরকম বাহ্যিক পরিবর্তন আসে। কিন্তু এর ফলে উচ্চারণ কিংবা অর্থের কোনো পরিবর্তন হয়নি। খলিফা উসমানও হয়তো জীবদ্দশায় এরকম কিছু বিষয় দেখেছেন। স্বরচিহ্ন, আয়াত পৃথকীকরণ চিহ্ন এবং নুক্তা না দেওয়ার পেছনে হয়তো উদ্দেশ্য ছিল—মানুষ যেন সঠিক নির্দেশনা ছাড়া নিজে নিজে কুরআন মুখস্থ করতে শুরু না করে। কিন্তু সময়ের সাথে সেই সমস্যা দূরীভূত হতে থাকলে নুক্তার উপস্থিতি এবং আয়াত পৃথকীকরণ চিহ্ন স্বাভাবিক হয়ে গেল। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আমরা এর নিহিতার্থ নিয়ে আলোচনা করব।