📄 পঠনপদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক এবং খলিফা উসমানের পদক্ষেপ
সিরিয় ও ইরাকি যোদ্ধাদের সাথে আর্মেনিয়া ও আযারবাইজান বিজয়াভিযান শেষ করেন হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান। তারপর সরাসরি উপস্থিত হন খলিফা উসমানের কাছে। নানা অঞ্চলের মানুষের কুরআন পাঠের ভিন্নতা দেখে তিনি শঙ্কিত ছিলেন। খলিফার উদ্দেশে তিনি বলেন, 'আমিরুল মুমিনিন, ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মতো নিজেদের কিতাবের ব্যাপারে মতভেদ করার আগেই আপনি এই জাতিকে সামলান।' [১]
এ ধরনের বিরোধ নতুন কিছু ছিল না। বহু আগেই পূর্ববর্তী খলিফা উমার ব্যাপারটি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। ইবনু মাসউদ ইরাকে গিয়ে হুযাইলি[১] উপভাষায়
কুরআন শেখাচ্ছিলেন দেখে উমার তাকে বলেছিলেন, 'কুরআন কুরাইশি উপভাষায় অবতীর্ণ করা হয়েছে। তাই হুযাইলিদের উপভাষায় না শিখিয়ে তা কুরাইশদের উপভাষায় শেখান।'
ইবনু হাজার এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন—
'কুরআন শিখতে ইচ্ছুক একজন অনারবের জন্য তা কুরাইশি উপভাষায় পাঠ করাই মঙ্গলজনক। নিশ্চয় তার জন্য এটি সর্বোত্তম (কারণ সব আরবি উপভাষাই তার জন্য সমপরিমাণ কঠিন)। [১]
২৫ হিজরিতে হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান খলিফাকে সতর্ক করেন। ওই বছরেই সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিরসনের সিদ্ধান্ত নেন খলিফা উসমান। বিভিন্ন উপভাষায় পাঠপার্থক্যজনিত সমস্যা তুলে ধরে বিজ্ঞ সাহাবিদের পরামর্শ চান তিনি। নিজ গোত্রের সুবিধার কথা ভেবে কেউ নির্দিষ্ট উপভাষাকে প্রাধান্য দিতে পারে, এ কথাও তার স্মরণে ছিল। তার মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন (আলি ইবনু আবি তালিব থেকে বর্ণিত)—
আমার মতে মানুষকে একটি নির্দিষ্ট মুসহাফের ওপর নিয়ে আসা উচিত, যাতে করে কোনো বিভেদ বা বিতর্ক না থাকে। শুনে আমরা বললাম, চমৎকার প্রস্তাব।
খলিফা উসমানের কর্মপন্থা নিয়ে দুটি মত পাওয়া যায়। প্রথম ও প্রসিদ্ধ মতটি হলো, তিনি উম্মুল মুমিনিন হাফসার কাছে (আবু বকরের আমলে) সংরক্ষিত সুহুফ অনুযায়ী কুরআনের অনুলিপি তৈরি করেন। আর অপ্রসিদ্ধ মতানুসারে, সুহুফের সাথে মিলিয়ে দেখার আগে প্রথমে মূল উৎসগুলো ব্যবহার করে একটি একক মুসহাফ গঠনের নির্দেশ দেন। তবে উভয় মতের ক্ষেত্রেই উসমানি মুসহাফ তৈরিতে সংরক্ষিত সুহূফের গুরুত্ব উঠে এসেছে। [৪]
টিকাঃ
১. সহিহ্বল বুখারি: ৪৯৮৭; আবু উবাইদ, ফাযায়িল, পৃষ্ঠা : ২৮২; ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, খণ্ড : ৮, পৃষ্ঠা : ৬৭৮
২. হুযাইল তৎকালীন আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ গোত্র।
৩. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ৬৭৮
৪. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ২২ দ্রষ্টব্য। এই ঘটনা ২৫-৩০ হিজরির। আমি ইবনু হাজারের মত গ্রহণ করেছি; সুযুতি, আল-ইতকান, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৭০ দ্রষ্টব্য।
৫. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ২২; ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ৪০২
৬. মূলত উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু কোনো একক পদ্ধতি গ্রহণ করেননি; বরং নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের সম্ভাব্য যতগুলো উপায় ছিল, সবগুলোই অনুসরণ করেছেন। মৌলিকভাবে তিনি আবু বকর রাযিয়াল্লাহ আনছুর যুগে সংকলিত পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী অনুলিপি তৈরি করেন। কিন্তু এর পাশাপাশি নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য আবু বকরের যুগে যেসব পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল, সেগুলোও পুনরায় অনুসরণ করা
হয়। অর্থাৎ হাফিজ সাহাবিদের সত্যায়ন, নবিযুগে লিখিত পূর্ণ কুরআনের বিচ্ছিন্ন লিপি, ব্যক্তি সংগ্রহে থাকা কপি, ব্যক্তিবিশেষের কাছে সংরক্ষিত খণ্ডিতাংশ, সর্বোপরি দুজন সাক্ষীর সত্যায়ন। উদ্দেশ্য ছিল সর্বজনস্বীকৃত, নির্ভরযোগ্যতার সর্বোচ্চ মানে উত্তীর্ণ একক একটি রাষ্ট্রীয় মুসহাফ তৈরি করা। এরপর খিলাফতের প্রধান শহরগুলোতে প্রেরণ করা। এ ব্যাপারে মুফতি তাকি উসমানির উলুমুল কুরআন থেকে সংশ্লিষ্ট অধ্যায় দেখে নেওয়া যেতে পারে। শারয়ি সম্পাদক
📄 ওসমানী মুসহাফ ভূমিকা
সবার বাইআত গ্রহণের মাধ্যমে উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু তৃতীয় খলিফার আসনে অধিষ্ঠিত হন। অসংখ্য যুদ্ধজয় হয় তার সময়ে। উত্তরে আযারবাইজান এবং আর্মেনিয়া পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে ইসলামি খিলাফত। মুজাহিদ বাহিনীর মধ্যে বিভিন্ন গোত্র ও প্রদেশের লোক ছিল। আঞ্চলিক ভিন্নতার কারণে তাদের আরবিও ছিল বিভিন্ন রকমের। যে ভাষায় কথা বলে অভ্যস্ত, হঠাৎ করে তা ছাড়া কঠিন বিধায় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে নিজ নিজ উপভাষায় কুরআন শিখিয়েছিলেন। কিন্তু উচ্চারণ ভিন্নতার কারণে সময়ের পরিক্রমায় সমাজে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও মতভিন্নতা দেখা দেয়।
📄 সরাসরি সুহুফ অনুসরণে মুসহাফ তৈরি
প্রথম মতানুযায়ী, হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহার কাছ থেকে সুহুফ সংগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ প্রতিলিপি তৈরি শুরু করে দেন উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু। আল-বারা বলেছেন, হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহার কাছে উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু বার্তা পাঠালেন, 'সুহুফ আমার কাছে পাঠিয়ে দেন, আমি কয়েকটি প্রতিলিপি তৈরি করে মূললিপিগুলো আপনার কাছে ফেরত পাঠাব।' হাফসা তা পাঠালে এর প্রতিলিপি তৈরি শুরু করে দেন যাইদ ইবনু সাবিত, আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইর, সাইদ ইবনু আস এবং আব্দুর রাহমান ইবনু হারিস। তিন কুরাইশি সদস্যকে খলিফা নির্দেশ দিলেন, 'কুরআনের যেকোনো ব্যাপারে যাইদ ইবনু সাবিতের সাথে তোমাদের মতভেদ হলে তা কুরাইশি উপভাষায় লিপিবদ্ধ করবে। কারণ এই কিতাব নাযিল হয়েছে তাদের ভাষায়।' তারা তা-ই করলেন। কয়েকটি প্রতিলিপি তৈরি হয়ে গেলে খলিফা উসমান হাফসার কাছে তার সুহুফটি ফিরিয়ে দেন...।'[১]
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৪৯৮৭; ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা: ১১, ৪৯৮৭; ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১৯-২০; আবু উবাইদ, ফাযায়িল, পৃষ্ঠা: ২৮২
📄 হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফের অবদান
উমাইয়া খিলাফতকালে ইরাকের গভর্নর ছিলেন হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ। তার কঠোর শাসনামলের ইতিহাস খুব একটা প্রশংসাজনক নয়। তার অনেক অপকীর্তি রয়েছে। কিন্তু কুরআনের প্রতি অনেক অবদান আছে তার। তবে এক্ষেত্রেও তার শত্রুর কোনো অভাব ছিল না। আউফ ইবনু আবি জামিলা (মৃত্যু: ১৪৬ হিজরি) হাজ্জাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন-তিনি উসমানি মুসহাফের ১১টি স্থানে পরিবর্তন সাধন করেছেন।[১] আউফ একজন বিশ্বস্ত মানুষ হওয়া সত্ত্বেও শিয়া অনুরাগী এবং উমাইয়া-বিরোধী ছিলেন।[১] হাজ্জাজ ছিলেন উমাইয়াদের শক্তিশালী ভিত। আউফ তাকে দমন করতে চাওয়াটা তাই স্বাভাবিক। এজন্য বিপরীতপক্ষ থেকে উত্থাপিত সকল বিচার্য বিষয়কে সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে যাচাই করা চাই। প্রথম উমাইয়া খলিফা মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর দ্বন্দ্বের কারণই ছিল উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যুকে ঘিরে। আর সেই উসমানি মুসহাফ পরিবর্তন করার অভিযোগ যদি হাজ্জাজের বিরুদ্ধে আনা হয়, তাহলে তা নিদারুণ অবাস্তব দেখায়। তখন উমাইয়াদের গোটা ব্যাপারটাই অনর্থক সাব্যস্ত হয়।
তবুও যেসব শব্দ পরিবর্তনের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে, সেগুলো একটু দেখা যাকাতোঃ
| সুরা ও আয়াত | উসমানি মুসহাফ | যেসব কথিত পরিবর্তনের জন্য হাজ্জাজ অভিযুক্ত |
|---|---|---|
| ১ | ২:২৫৯ | لم يتسنه وانظر | لم يتسن وانظر |
| ২ | ৫:৪৮ | شريعة منهاجا | شريعة منهاجا |
| ৩ | ১০:২২ | هو الذي يسيركم | هو الذي ينشركم |
| ৪ | ১২:৪৫ | أنا أنبئكم بتأويله | أنا آتيكم بتأويله |
| ৫ | ২৩:৮৭,৮৯ | سيقولون الله | سيقولون الله |
| ৬ | ২৬:১১৬ | من المرجومين | من المخرجين |
| ৭ | ২৬:১৬৭ | من المخرجين | من المرجومين |
নحن قسمنا بينهم نحن قسمنا بينهم معيشتهم معيشتهم
من ماء غير آسن من ماء غير يسن
منكم وانفقوا منكم وانفوا
بضنين بظنين
আউফ ইবনু আবি জামিলার উত্থাপিত অভিযোগের বহু আগে সকল উসমানি মুসহাফ নিয়ে আলিমগণ গভীরভাবে ঘেঁটে দেখেছেন। অক্ষরে অক্ষরে একটির সাথে মিলিয়ে দেখেছেন অপরটি। কিন্তু আউফের বর্ণিত অমিলের সাথে তাদের প্রাপ্ত বৈচিত্র্যের কোনো মিল নেই। উসমানি মুসহাফে কোনো নুক্তা ছিল না।[১] এমনকি হাজ্জাজের সময়ও এর প্রচলন সেভাবে গড়ে ওঠেনি। ওপরের তালিকায় কিছু শব্দের নুক্তা সরিয়ে নিলে তা একই রকম মনে হয়। [২] তাহলে গঠন না পালটে নুক্তাহীন শব্দগুলোকে তিনি কীভাবে পরিবর্তন করতে পারেন?[৩] কথিত পরিবর্তনগুলোর একটিও আয়াতের অর্থের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত উত্থাপিত দাবির বিপরীতে অবস্থান করছে। [৪]
ইবনু কুতাইবা বলেন-
'আসিম আল-জাহদারি বর্ণনা করেন-তাকে এবং নাজিয়া ইবনু রুমহ ও আলি ইবনু আসমাকে হাজ্জাজ মুসহাফ নিরীক্ষণ করার কাজে নিযুক্ত করেন। উসমানি মুসহাফের বিপরীতে কোনো বিচ্যুতি পাওয়া গেলে তা নির্মূল করাই ছিল মূল লক্ষ্য। মুসহাফের মালিককে বিনিময়ে ৬০ দিরহাম ক্ষতিপূরণ দেওয়া হতো।' [৫]
এভাবে কিছু মুসহাফ হয়তো ধ্বংস না করে কালি মুছে নতুন করে লেখা হয়। এই কাজটিকেই হয়তো ভুলে অনেকে হাজ্জাজের কুরআন বিকৃতি ধরে নিয়েছে।
উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো হাজ্জাজও বিভিন্ন শহরে কুরআনের অনুলিপি প্রেরণ করেন। উবাইদুল্লাহ ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনি উতবার সূত্রে জানা যায়—মদিনার মুসহাফ মসজিদে নববিতে রাখা ছিল। প্রতি সকালে তা তিলাওয়াত করা হতো।[১] উসমান-হত্যাকাণ্ডের পর তৈরি হওয়া অস্থিতিশীল পরিবেশে কেউ মুসহাফটি নিয়ে পালিয়ে যায়। মুহরিজ ইবনু সাবিত তার বাবার সূত্রে বর্ণনা করেন—হাজ্জাজ কিছু মুসহাফ প্রণয়ন করেছিলেন। উল্লেখ্য, মুহরিজ ইবনু সাবিতের বাবা হাজ্জাজের রক্ষীবাহিনীতে ছিলেন। হাজ্জাজ মদিনার উদ্দেশে মুসহাফ পাঠালে উসমানের পরিবার তাতে বিরক্ত হয়। তখন মূল মুসহাফটি জনসম্মুখে এনে পড়তে বললে তারা জানায় তা হত্যাকাণ্ডের দিনেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। উসমানের মাস্টার কপিটি তখনো তার প্রপৌত্র খালিদ ইবনু আমর ইবনি উসমানের কাছে সংরক্ষিত ছিল বলে জানতে পারেন মুহরিজ।
তবুও মূলটির স্থলে হাজ্জাজের প্রেরিত মুসহাফটিই মসজিদে নববিতে পাঠ করার জন্য গ্রহণ করা হয় বলে ধরে নেওয়া যায়। ইবনু জাবালার সূত্রে আস-সামহুদি বর্ণনা করেছেন, 'মদিনার মতো মূল নগরীগুলোতে হাজ্জাজ কুরআন প্রেরণ করেন। আর এটিই ছিল শহরে প্রেরিত প্রথম মুসহাফ।'[২]
ইবনু শাব্বা বলেছেন, 'আল-মাহদি (আব্বাসীয় শাসক) খলিফা হওয়ার পর মদিনায় আরেকটি মুসহাফ পাঠান, যেটি আজও পাঠ করা হয়। হাজ্জাজের মুসহাফটিকে সরিয়ে রাখা হয় মিম্বারের পাশে একটি বাক্সের ভেতর।'[৩]
শুধু মুসহাফ প্রণয়ন করার মধ্যেই হাজ্জাজের অবদান সীমিত নয়। আবু মুহাম্মাদ হিম্মানি থেকে জানা যায়—হাফিজ এবং পেশাদার তিলাওয়াতকারীদের হাজ্জাজ একত্র করেন এবং নিজে হাফিজদের সারিতে বসে যান। কারণ তিনিও কুরআনের হাফিজ। এরপর তাদের কুরআনের মোট হরফ সংখ্যা খুঁজে বের করতে বলেন। তারা সবাই ৩৪০৭৫০টি হরফের ব্যাপারে একমত হন। অত্যধিক কৌতূহল থেকে তিনি এরপর কোন হরফের ওপর অর্ধেক কুরআন শেষ হয়, তা খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। ১৮তম সূরার ১৯নং আয়াতের وَلْيَتَلَطَّف শব্দটিরও বর্ণে এর উত্তর পাওয়া গেল। এভাবে আবার কুরআনের প্রতি এক-সপ্তমাংশ খুঁজে বের করতে নির্দেশ
করা হয়। সম্পূর্ণ কাজ শেষ হলে তার পরবর্তী লক্ষ্য হয় প্রতি এক-তৃতীয়াংশ এবং এক-চতুর্থাংশ খুঁজে বের করা।[১] প্রতি রাতে তাদের কাজের অগ্রগতির খোঁজ নিতেন তিনি। পুরো কাজ শেষ হতে প্রায় চার মাস লেগে যায়।[২]
ইস্তাম্বুলের তোপকাপি সারায়িতে আল-মুনাজ্জিদ একটি মুসহাফ খুঁজে পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। এর নোটগুলো থেকে জানা যায় তা ৪৯ হিজরিতে লিখিত। উকবা ইবনু নাফি ফিহরিমের জন্য তা লিখেছিলেন হুদাইজ ইবনু মুআবিয়া ইবনি মাসলামা আনসারি। কিন্তু এর তারিখ নিয়ে তিনি সন্দিহান। কারণ কুরআনের প্রতিটি বর্ণের পরিসংখ্যান সেখানে উল্লিখিত আছে। প্রথম শতাব্দীতে এমন পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ করা সম্ভব ছিল কি না, তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন।[৩] অথচ হাজ্জাজ পরিসংখ্যান বের করেছেন। তাই মুনাজ্জিদের সংশয়ের ভিত্তি আমার কাছে সুবিবেচিত মনে হয়নি।
আমাদের কম্পিউটারে নুক্তাবিহীন কুরআনের একটি অনুলিপি আছে। একটি ছোট প্রোগ্রামের সাহায্যে সেখান থেকে ৩৩২৭৯৫টি হরফ খুঁজে পাই। হাজ্জাজের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে জানি না। তিনি কি তাশদিদের দ্বিতীয় অক্ষরকেও স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি হরফ ধরে নিয়েছিলেন? কিংবা যে আলিফ (যথা: ملك ) লেখা হয় না কিন্তু উচ্চারিত থাকে? এ তথ্যগুলো অনুপস্থিত থাকলেও আমাদের কম্পিউটারের হিসাব আর প্রায় ১৪শ বছর আগে হাজ্জাজের কৃত হিসাব খুবই কাছাকাছি। এ থেকে বোঝা যায় চার মাসের ওই শ্রমসাধ্য কার্যক্রম বাস্তবেই হয়েছিল।
টিকাঃ
১. ইবনু আবি দাউদ, আল মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১১৭
২. ইবনু হাজার, তাকরিবুত তাহযিব, পৃষ্ঠা: ৪৩৩, ৫২১৫
৩. ইবনু আবি দাউদ, আল মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১১৭-১৮
৪. অধ্যায় ৯, ১০ দ্রষ্টব্য
৫. যেমন معيشتهم এবং معنشهم। ৩ ও ৪-এর ক্ষেত্রেও অনুরূপ প্রযোজ্য।
৬. যেমন তালিকার ১নং নমুনা। پسنه এটি বানানের ভিন্নতা মাত্র, যা উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়কালেই সংশোধন করা হয়। (অধ্যায় ৭ এর 'সরাসরি মুসহাফ সাজানো' অংশ দ্রষ্টব্য)
৭. হাজ্জাজ সর্বোচ্চ নিজের ব্যক্তিগত অনুলিপিতে পরিবর্তন করতে পারেন, যেমনটি উবাইদুল্লাহ যিয়াদ করেছিলেন বানানরীতির প্রমিতকরণের জন্য। (বিস্তারিত দশম অধ্যায়ে) মূল উসমানি মুসহাফে কোনো পরিবর্তন করলে তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা এবং মুসলিমবিশ্ব চুপ করে থাকত না। আর সত্যিই যদি এমন হতো, তাহলে পরবর্তীতে আব্বাসীয়রা উমাইয়াদের এ অপকীর্তিকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা নিত।
৮. তাওয়িষ্ণু মুশকিলিল কুরআন, পৃষ্ঠা: ৫১
৯. ইবনু শাব্বা, তারিখুল মাদিনা, পৃষ্ঠা: ৭; ইবনু কুতাইবা, তাওয়িলু মুশকিলিল কুরআন, পৃষ্ঠা: ৫১
১০. আস-সামছুদি, ওয়াফা আল-ওয়াফা, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬৬৮
১১. ইবনু শাব্বব্বা, তারিখুল মাদিনা, পৃষ্ঠা: ৭-৮
১২. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১১৯-১২০
১৩. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১২০
১৪. Salahuddin Al-Munajjid, Etudes de paléographie Arabe, p. 82-83.