📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 খলিফা উমারের অবদান

📄 খলিফা উমারের অবদান


মৃত্যুর আগে উমার ইবনুল খাত্তাবকে পরবর্তী খলিফা হিসেবে নিযুক্ত করেন আবু বকর সিদ্দিক। এর মাধ্যমে সুহুফ তত্ত্বাবধানের দায়িত্বও তার ওপর অর্পিত হয়।[১] বড় বড় যুদ্ধজয় হয় খলিফা উমারের শাসনকালে। এর পাশাপাশি খলিফা হিসেবে তার প্রসিদ্ধির অন্যতম কারণ—পুরো আরবজুড়ে কুরআনুল কারিমের দ্রুত প্রসার। অন্ততপক্ষে ১০ জন সাহাবিকে তিনি বসরায় প্রেরণ করেন কুরআন শেখানোর উদ্দেশ্যে।[২] একই কারণে ইবনু মাসউদকে পাঠানো হয় কুফায়। [৩] এদিকে কুফায় এক ব্যক্তি শুধু স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করে কুরআন বর্ণনা করার খবর শুনে খলিফা রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। কিন্তু যখন জানতে পারলেন, তিনি ছিলেন ইবনু মাসউদ, তখন তার রাগ ঠান্ডা হয়ে গেল। কারণ ইবনু মাসউদের দক্ষতা ও পারঙ্গমতা সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত।
সিরিয়ায় কুরআনের বিস্তার প্রসঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। সিরিয়ার গভর্নর ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফিয়ান জরুরি ভিত্তিতে কয়েকজন শিক্ষক প্রেরণের দাবি জানান খলিফার কাছে। ফলে মুয়ায, উবাদা এবং আবু দারদাকে হিমস, দামেশক ও ফিলিস্তিনে পাঠানো হয়। হিমসে কাজ শেষ করে উবাদাকে সেখানে রেখে মুয়ায ফিলিস্তিন এবং আবু দারদা দামেশকের উদ্দেশে যাত্রা করেন। মুয়ায কিছুকাল
পরেই মৃত্যুবরণ করলেও দীর্ঘদিন দামেশকে বসবাস করেন আবু দারদা। সেখানে তিনি একটি প্রসিদ্ধ ছাত্রসমাজ গড়ে তোলেন। ১৬০০-এর অধিক শিক্ষার্থী তার কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করেন।[১] তাদের ১০টি শ্রেণিতে ভাগ করে প্রতিটির জন্য একজন প্রশিক্ষক নিযুক্ত করা হয়। নিয়ম করে তাদের তদারকির দায়িত্ব নেন তিনি। এভাবে প্রাথমিক ধাপ পার করা ছাত্ররা সরাসরি তার নির্দেশনা লাভ করত। ফলে উচ্চতর শ্রেণির ছাত্ররা দুটি মর্যাদা লাভ করে—আবু দারদার ছাত্রত্ব এবং তার সহকারী হিসেবে শিক্ষকতা।[২]
আবু মুসা আশআরিও একই পদ্ধতিতে শিক্ষা দিয়েছেন। প্রায় তিনশ শ্রেণিবদ্ধ ছাত্রকে বসরা মসজিদে পড়াতেন তিনি।[৩]
ইয়াজিদ ইবনু আব্দিল্লাহকে রাজধানীর শহরতলিতে পাঠানো হয় বেদুইনদের কুরআন শেখানোর জন্য।[৪] আবু সুফিয়ানকেও পরিদর্শক হিসেবে পাঠানো হয়। প্রতিটি গোত্র কতটুকু শিক্ষার্জন করল তা পর্যবেক্ষণ করা ছিল তার কাজ।[৫] উমার পাঁচজন সাহাবিকে মদিনার শিশুদের শিক্ষার কাজে নিযুক্ত করেন। বিনিময়ে মাসপ্রতি ১৫ দিরহাম সম্মানি পেতেন তারা। বড়দেরসহ সবাইকে পাঁচ আয়াত করে সহজে কুরআন শিক্ষাদানের নির্দেশ প্রদান করা হয়।[৬]
২৩ হিজরির শেষে এসে পারস্যের এক খ্রিষ্টান কৃতদাস খলিফা উমারকে ছুরিকাঘাত করে।[৭] মৃত্যুর আগে তিনি কাউকে খলিফা মনোনীত করার দায়িত্ব নিতে রাজি হননি; বরং তা শুরা পরিষদের ওপর ন্যস্ত করেন। তবে সুহুফ হস্তান্তর করে যান উম্মুল মুমিনিন হাফসার নিকট।

টিকাঃ
১. আবু উবাইদ, ফাযায়িল, পৃষ্ঠা: ২৮১
২. Ibn Sa'd. Tabaqat, vol: 4, p. 287.
৩. Ibn Sa'd, Tahaqat, vol: 6, p. 3.
৪. যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৪৪-৪৬
৫. প্রাগুক্ত, খন্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৪৬
৬. আল ফিরয়াবি, ফাযায়িলুল কুরআন, পৃষ্ঠা: ১২৯
৭. ইবনুল কালবি, জামহারাতুন নাসাব, পৃষ্ঠা: ১৪৩; ইবনু হাযম, জামহারাতুল আনসাব, পৃষ্ঠা: ১৮২
৮. ইবনু হাজার, আল-ঈসাবা, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৮৩, ৩৩২
৯. ইবনু কাসির, ফাযায়িল, খন্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ৪৯৫
১০. William Muir, Annals of the Early Caliphate, p. 278.

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 অধ্যায় শেষে

📄 অধ্যায় শেষে


কুরআনুল কারিম সংরক্ষণে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অবদান অত্যন্ত প্রশংসার
দাবিদার। বিশুদ্ধতা নিশ্চিতকরণে কুরআন অনুযায়ী দুজন সাক্ষীর সাক্ষ্যের বিষয়টি অনুসরণ করে তিনি সংকলন কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। ভিন্ন ভিন্ন আকারের চর্মপত্রে লিখিত হলেও ঐশী বাণী সংরক্ষণে তার প্রচেষ্টা ছিল একনিষ্ঠতার সর্বোচ্চ পর্যায়ের। বড় বড় জিহাদে বিজয় লাভ করার ফলে ইসলামের শিক্ষা আরব মরুর সীমানা পেরিয়ে সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে পৌঁছে যায়। আর উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনকালে বাড়তে থাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কুরআন মুখস্থকরণ। মরুময় আরব থেকে শুরু করে সেই আলো ছড়িয়ে যেতে থাকে ইসলামি সাম্রাজ্যের চতুর্দিকে। উসমানি খিলাফতকালে এক নতুন সমস্যা দেখা দিলেও সমাধান নিয়ে আসে যাইদ ইবনু সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিবেদিত শ্রম।

টিকাঃ
১. সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00