📄 স্মৃতিনির্ভর উৎসের ব্যবহার
লিখিত উৎস আমাদের প্রধান আলোচনা। তবে প্রাথমিকভাবে কাঠ, চামড়া, গাছের পাতা ইত্যাদির ওপর লিখিত আয়াত পাওয়া গেলে সবগুলোর উৎস মিলিয়ে দেখা হতো। এরপর স্বয়ং নবিজির কাছ থেকে কুরআন শিক্ষা করা সাহাবিগণ সেগুলো মিলিয়ে দেখতেন নিজেদের মুখস্থ স্মৃতির সাথে। এভাবে সকল লিখিত ও মুখস্থ আয়াতের ওপর একই রকম কড়াকড়ি বহাল রাখার ফলে মানের সমতা নিশ্চিত হয়। যাইদ ইবনু সাবিতের ভাষায়-
'এভাবে আমি বিভিন্ন চামড়ার লেখা, হাড়ের টুকরা এবং মানুষের অন্তর (মুখস্থ স্মৃতি) থেকে কুরআন একত্রিত করি।' [১]
এ বিষয়ে যারকাশি বলেছেন—
'এ কথা থেকে অনেকে ধরে নিয়েছেন, নবীজির জীবদ্দশায় কেউ বুঝি কুরআন সম্পূর্ণরূপে মুখস্থ করতে পারেনি এবং যাইদ ইবনু সাবিত ও উবাই ইবনু কাবের (হিফজ করার) দাবি অমূলক। কিন্তু এই ধারণা ভ্রান্ত। যাইদ ইবনু সাবিতের কথার অর্থ হলো, তিনি বিক্ষিপ্ত সব উৎস থেকে আয়াত খুঁজে বের করে তা হাফিজদের দ্বারা যাচাই করে নিয়েছেন। এভাবে সবাই অংশ নিয়েছেন সংকলনের কাজে। একজন আয়াত সংগ্রাহকও বাদ পড়েনি। তাই সংকলিত আয়াতগুলো নিয়ে কারও আশঙ্কার কারণ নেই। আবার শুধু গুটিকয়েক উৎস থেকে বাছাই করার অভিযোগ তোলারও সুযোগ নেই।'[২]
যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যাইদ ইবনু সাবিত কেবল নিজের হিফজকৃত এবং লিপিবদ্ধ করা আয়াতের ওপর নির্ভর করেননি। ইবনু হাজার এ মর্মে যাইদ ইবনু সাবিতের একটি বিবৃতি পেশ করেন—
'সুরা তাওবার শেষ দুই আয়াত আমি আবু খুযাইমা আনসারি থেকে পেয়েছি।'
সব ক্ষেত্রেই যাচাই-বাছাই ছিল অপরিহার্য।[৩] ইবনু হাজার আরও বলেন—
লিখিত অংশ ছাড়া কোনোকিছু দলিলভুক্ত করার অধিকার যাইদ ইবনু সাবিতকে খলিফা আবু বকর প্রদান করেননি। এ কারণেই লিখিত আকারে না আসা পর্যন্ত সুরা তাওবার শেষ দুই আয়াত অন্তর্ভুক্ত করেননি তিনি। অথচ তিনি এবং তার সহযোগীগণ তা পরিষ্কার মুখস্থ জানতেন।[৪]
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৪৬৭৯, ৪৯৮৬, ৭১৯১; জামিউত তিরমিযি: ৩১০৩
২. সারকাশি, বুরহান, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২০৮-৩৯
৩. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ১৩; সহিহুল বুখারি: ৪৬৭৯
৪. মাজহুদ
📄 কুরআনের বিশুদ্ধতা: সুরা তাওবার শেষ দুই আয়াত
ইসলামি পরিভাষার একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ ‘তাওয়াতুর’। এর অর্থ নানামুখী সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ এবং সেসব সূত্রের পারস্পরিক তুলনার মাধ্যমে তথ্যটির সত্যতা যাচাই। ফলে তথ্যটির বিশুদ্ধতা নিয়ে আর কোনো সংশয়ের অবকাশই থাকে না। কতজন ব্যক্তি বা কয়টি মাধ্যম থেকে তথ্যটি পাওয়া গেলে সেটা তাওয়াতুর হিসাবে ধরা হবে, তার কোনো বাঁধাধরা সংখ্যা নেই। মূল লক্ষ্য শুদ্ধতার নিশ্চয়তা। স্থান, কাল, পাত্রভেদে এর শর্ত পাল্টাতে পারে। সাধারণত আলিমগণ অন্তত আধা ডজন সূত্র নিশ্চিত করতে বলেন। তবে তা যত বেশি হয়, ততই ভালো। কারণ সংখ্যাধিক্যতার ফলে জালকরণের সম্ভাবনা ক্ষীণ ও কঠিন হয়ে যায়।
সুরা তাওবার শেষ দুই আয়াতে ফেরা যাক। আবু খুযাইমার সংরক্ষিত লিপি, এর সপক্ষে দুজন সাক্ষী এবং যাইদ ইবনু সাবিতসহ অন্যান্য হাফিজের সম্মতির ভিত্তিতে তা সুহূফের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু কুরআনের মতো এমন মূল্যবান সম্পদের ব্যাপারে শুধু লিপির টুকরো এবং কিছু সাহাবির স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করে কীভাবে তাওয়াতুর করা সম্ভব?
ধরা যাক, দুই বা তিনজন ছাত্রবিশিষ্ট একটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ছোট ও সহজ একটি কবিতা পড়ে শোনালেন। পাঠদান শেষেই একটি পরীক্ষা নেওয়া হলো। এখন সবার কবিতা পাঠ যদি অভিন্ন হয়, তাহলে সুনিশ্চিতভাবে তা শিক্ষকেরই শেখানো। এ ব্যাপারটিই লিপিবদ্ধ বর্ণনা এবং মৌখিক বা লিখিত উৎস থেকে করা সংকলনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে তথ্য জাল করার ব্যাপারে বর্ণনাকারীদের মধ্যে কোনো গোপন আঁতাত হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। পুরো ব্যাপারটি আমি হাতেকলমে নিজের ক্লাসরুমে করে দেখিয়েছি।
সুরা তাওবার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। প্রাপ্ত উৎসগুলোর অভিন্নতার ফলে নিশ্চয়তার ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। আর গোপন আঁতাত প্রসঙ্গে যৌক্তিকভাবে চিন্তা করলে বলা যায়: আলোচ্য দুই আয়াতে নতুন কোনো ধর্মীয় তত্ত্ব উপস্থাপন করা হয়নি। কোনো সুনির্দিষ্ট গোত্র বা গোষ্ঠী সম্পর্কে স্তুতি গাওয়া হয়নি বা এমন কোনো তথ্যও বলা হয়নি যা কুরআনের অন্য জায়গায় পাওয়া যায় না। কাজেই এরকম একটি আয়াত চক্রান্ত করে উদ্ভাবন করার পুরো ব্যাপারটিই অযৌক্তিক। কারণ তা জাল করার মাধ্যমে কোনো স্বার্থ অর্জিত হয় না।[১] অতএব সম্পূর্ণ পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখতে পাই, আয়াত দুটোর অনুমোদনের সপক্ষে যথেষ্ট তাওয়াতুর রয়েছে। আর এ সাহাবিদের সততার ব্যাপারে তো আল্লাহ নিজেই সাক্ষ্য প্রদান করেছেন।
টিকাঃ
১. সপ্তদশ অধ্যায়ের ইরাসমাস বাইবেলের আলোচনা দ্রষ্টব্য।
📄 রাষ্ট্রীয়ভাবে পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ
সংকলন কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর খলিফা আবু বকরের তত্ত্বাবধানে তা রাষ্ট্রীয় সংগ্রহশালায় সংরক্ষণ করা হয়। মোটকথা বিক্ষিপ্ত কুরআনকে একক খন্ড আকারে সাজান তিনি। একেই বলা হয় ‘সুহূফ’। শব্দটি বহুবচন। এর একবচন হলো ‘মুসহাফ’—যা আমার মতে ভিন্ন অর্থ বহন করে। যাইদ ইবনু সাবিতের চেষ্টা ও পরিশ্রমের ফলে সকল সুরা ও আয়াত যথাযথভাবে সজ্জিত হয়। তিনি মদিনার অধিবাসী হওয়ায় প্রসিদ্ধ মাদানি লিপি ও বানানরীতি অনুসরণ করেন। তবে সংকলনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত পত্র বা চামড়াগুলো আকারে বিসদৃশ হওয়ায় এগুলো একটি স্তূপে রূপ নেয়। তাই একে বহুবচনে সুহুফ বা পত্রপুঞ্জ বলে সম্বোধন করা হয়।
মাত্র ১৫ বছরের ব্যবধানে সুদূর বিস্তৃত ইসলামি খিলাফতের সর্বত্র কুরআনের প্রতিলিপি প্রেরণ করার উদ্যোগ নেন খলিফা উসমান। জিহাদ থেকে অর্জিত সম্পদের ফলে মানসম্মত লেখার উপাদানও সহজলভ্য হয়ে ওঠে ততদিনে। ফলে সমআকৃতির পত্রবিশিষ্ট গ্রন্থ তৈরি করা সম্ভব হয়। এগুলোই মূলত মুসহাফ নামে পরিচিতি লাভ করে।[১]
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৪৯৮৬; সহিতু ইবনি হিববান: ৪৫০৬; আবু উবাইদ, ফাযায়িল, পৃষ্ঠা: ২৮১