📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 যাইদ ইবনু সাবিতের পরিচিতি

📄 যাইদ ইবনু সাবিতের পরিচিতি


সৌভাগ্যক্রমে যাইদ ইবনু সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহুর বসবাস নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাসস্থানের নিকটেই ছিল। তাই নবিজির নিয়মিত ওহি লেখকদের মাঝে তিনি ছিলেন অন্যতম। তাকে 'কাতিবুন নবি' হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো। তিনি তখন ২০ বছর বয়সী উঠতি তরুণ এবং (পূর্ণাঙ্গ কুরআনের) হাফিজ। এরকম সুবিশাল যোগ্যতার কারণে কুরআন সংকলনের কাজে তিনি একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে পরিগণিত হন। এ কারণেই উপরিউক্ত বর্ণনায় তার মর্যাদার প্রতি খলিফা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর স্তুতি পরিলক্ষিত হয়।
এখান থেকে কিছু বিষয় খেয়াল করি—
> তার তারুণ্য। তেজস্বিতা ও কর্মশক্তিতে তিনি ছিলেন ভরপুর।
> তার নিখুঁত আখলাক। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিশেষভাবে তাই বলেছেন, 'আপনার বিরুদ্ধে কোনো অনাচারের অভিযোগ আমরা করি না।'
» তার বুদ্ধিমত্তা। এখানে তার যোগ্যতা ও সচেতনতার প্রতি ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
» 'কাতিবুল ওহি' হিসেবে ওহি লিপিবদ্ধ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা।[১]
তিনি আরেকটি অনন্য যোগ্যতার অধিকারী। রামাদান মাসে জিবরিল ও নবিজির সাথে তিলাওয়াতে যোগদানকারী মহাসৌভাগ্যবান সাহাবিদের মাঝে তিনি একজন।[২]

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৪৯৮৬; ইবনু আবু দাউদ, আল মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ৮
২. তাহির আল-জাযায়িরি, আত-তিবইয়ান, পৃষ্ঠা: ১২৬; আর্থার জেফরি সম্পাদিত, আল-মাবানি, পৃষ্ঠা: ২৫

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 যাইদ ইবনু সাবিতের প্রতি খলিফার নির্দেশনা

📄 যাইদ ইবনু সাবিতের প্রতি খলিফার নির্দেশনা


আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতকালীন একটি ঘটনা বর্ণনা করছি। একজন বৃদ্ধা তার মৃত পৌত্রের সম্পত্তির উত্তরাধিকারের দাবি নিয়ে আসে। কিন্তু তার দাবির পক্ষে কুরআনের কোনো বর্ণনা বা নবিজির কোনো হাদিস মনে পড়ছে না বলে জানান আবু বকর। উপস্থিত সাহাবিদের কাছে জানতে চাওয়া হলে মুগিরা ইবনু শুবা দাঁড়িয়ে বললেন, 'আল্লাহর রাসুলের ভাষ্যমতে, ওই বৃদ্ধা পাবে ছয়ভাগের একভাগ।' তিনি নিজে নবিকে এ বিধান বলতে শুনেছেন। আর কেউ মুগিরার কথাকে সমর্থন করে কি না, আবু বকর তা জানতে চান। তখন এর পক্ষে সাক্ষ্য দেন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা। সন্দেহ দূর করার জন্য মুগিরার বিবৃতিকে এভাবে যাচাই করে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল।[১] সাক্ষ্যগ্রহণের ব্যাপারে কুরআনের বিধান তা-ই বলে। ভবিষ্যতে এটি আমরা উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর ক্ষেত্রেও দেখব।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَدَايَنْتُمْ بِدَيْنِ إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى فَاكْتُبُوهُ وَلْيَكْتُبْ بَيْنَكُمْ كَاتِبُ بِالْعَدْلِ وَلَا يَأْبَ كَاتِبٌ أَنْ يَكْتُبَ كَمَا عَلَّمَهُ اللَّهُ فَلْيَكْتُبْ وَلْيُمْلِلِ الَّذِي عَلَيْهِ الْحَقُّ وَلْيَتَّقِ اللَّهَ رَبَّهُ وَلَا يَبْخَسُ مِنْهُ شَيْئًا فَإِنْ كَانَ الَّذِي عَلَيْهِ الْحَقُّ سَفِيهًا أَوْ ضَعِيفًا أَوْ لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يُمِلَّ هُوَ فَلْيُمْلِلْ وَلِيُّهُ بِالْعَدْلِ وَاسْتَشْهِدُوا شَهِيدَيْنِ مِنْ رِجَالِكُمْ فَإِنْ لَمْ يَكُونَا رَجُلَيْنِ فَرَجُلٌ وَامْرَأَتَانِ مِمَّنْ تَرْضَوْنَ مِنَ الشُّهَدَاءِ أَنْ تَضِلُّ إِحْدَاهُمَا فَتُذَكَّرَ إِحْدَاهُمَا الْأُخْرَى وَلَا يَأْبَ الشُّهَدَاءُ إِذَا مَا دُعُوا
মুমিনগণ, যখন তোমরা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ঋণের আদান-প্রদান করো, তখন তা লিপিবদ্ধ করে নাও এবং তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লিখে দেবে; লেখক লিখতে অস্বীকার করবে না। আল্লাহ তাকে যেমন শিক্ষা দিয়েছেন, তার উচিত তা লিখে দেওয়া। ঋণগ্রহীতা যেন লেখার বিষয় বলে দেয় এবং সে যেন নিজের রব আল্লাহকে ভয় করে আর লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্রও বেশ কম না করে। অতঃপর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দুর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বলে দিতে অক্ষম হয়, তবে তার অভিভাবক ন্যায়সঙ্গতভাবে লেখাবে। দুজন সাক্ষী করো, তোমাদের পুরুষদের মধ্যে থেকে। যদি দুজন পুরুষ না হয়, তবে একজন পুরুষ ও দুজন নারী। ওই সাক্ষীদের মধ্য থেকে যাদের তোমরা পছন্দ করো, যাতে একজন যদি ভুলে যায়, তবে একজন অন্যজনকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সাক্ষীরা যেন অস্বীকার না করে, যখন তাদের ডাকা হয়।[২]
সাক্ষ্য সম্বন্ধীয় এ বিধান কুরআন সংকলন এবং হাদিসশাস্ত্রের ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। যাইদ ইবনু সাবিতের প্রতি আবু বকরের নির্দেশনার ভিত্তিও এটি। ইবনু হাজারের সূত্রে পাওয়া যায়—
উমার ইবনুল খাত্তাব এবং যাইদ ইবনু সাবিতকে আবু বকর সিদ্দিক বললেন, মসজিদের একদম প্রবেশমুখে বসবেন। কেউ আল্লাহর কিতাবের কোনো অংশ দুজন সাক্ষীসহ নিয়ে এলে তা লিপিবদ্ধ করবেন।[৩]
সাক্ষ্য বলতে খলিফা কী বুঝিয়েছেন, এর ব্যাখ্যায় ইবনু হাজার বলেছেন, 'দুজন সাক্ষী দ্বারা তাদের সংরক্ষিত স্মৃতি এবং এর সপক্ষে লিখিত বাণী বোঝানো হয়েছে। অথবা আয়াতটি নবিজির উপস্থিতিতে অক্ষরে অক্ষরে লেখা হয়েছে—এই সাক্ষ্যপ্রদান বোঝানো হয়েছে। কিংবা এ আকারেই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে এর সাক্ষ্য দেবে। মোটকথা শুধু স্মৃতির ওপর ভরসা করা নয়; বরং নবিজির উপস্থিতিতে যা লেখা হয়েছে শুধু সেটা গ্রহণ করাই মূল উদ্দেশ্য।'[৪]
আমার কাছে দ্বিতীয় মতটি সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মনে হয়। শুধু সেসব আয়াতই গ্রহণ করা, যেগুলো দুজনের সাক্ষ্য অনুযায়ী নবিজির সম্যক উপস্থিতিতে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। ইবনু হাজারের আরেকটি বর্ণনা এ মতের সপক্ষে আসে-
কোনো ব্যক্তি স্বয়ং নবিজির কাছ থেকে লিপিবদ্ধ করেছে এবং এর পক্ষে দুজন সাহাবি সাক্ষ্য দিয়েছে—এমনটি ছাড়া যাইদ ইবনু সাবিত অন্য কোনো প্রকার লিখিত আয়াত গ্রহণের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন না।[৫]
অধ্যাপক শাওকি দাইফের মতে, বিলাল ইবনু রাবাহ মদিনার পথে পথে হেঁটে স্বয়ং নবিজির মুখ থেকে শুনে আয়াত লিপিবদ্ধ করা সাহাবিদের উপস্থিত হতে অনুরোধ জানিয়েছিলেন।[৬]

টিকাঃ
১. সুনানু আবি দাউদ: ২৮৯৪; সুনানুত তিরমিযি: ২১০১; সুনানু ইবনি মাজাহ: ২৭২৪; সহিহ ইবনি হিব্বান: ৬০৩১; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি: ১২৩৩৭; হাদিসটি হাসান।
২. সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮২
৩. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ৬; ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ১৪
৪. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ১৪-১৫
৫. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ১৪; আয়াত সংগ্রহের উৎস সম্পর্কে জানতে সহিহ্বল বুখারির ৪৯৮৬ নং হাদিস দ্রষ্টব্য।
৬. Shauqi Daif, Kitab as-Sab'a of Ibn Mujahid, Introduction, p. 6.

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 লিখিত উপাদানের সদ্ব্যবহার

📄 লিখিত উপাদানের সদ্ব্যবহার


সাধারণভাবে পাণ্ডুলিপি একত্রীকরণের ক্ষেত্রে একজন সংকলক একই কাজের বিভিন্ন প্রতিলিপি যাচাই করে দেখেন। স্বাভাবিকভাবেই সবগুলো প্রতিলিপি সমমানের হবে না। তাই পাণ্ডুলিপির মান যাচাই করতে, ভালো-খারাপ মূল্যায়নের নিমিত্তে বার্গস্ট্রেসার কিছু নিয়ম অনুসরণ করতে বলেছেন। এর মধ্যে কয়েকটি হলো—
» সাধারণত নতুন প্রতিলিপির চেয়ে পুরোনো প্রতিলিপিগুলো অধিক নির্ভরযোগ্য হয়।
» মূল পাণ্ডুলিপিকে সামনে রেখে লিপিকারদের দ্বারা যাচাই-বাছাই ও সংশোধনকৃত প্রতিলিপির মান অন্যান্য প্রতিলিপির চেয়ে বেশি।[১]
» মূললিপি যদি বর্তমান থাকে, তবে এর যেকোনো প্রতিলিখন গুরুত্ব হারায়।[২] তৃতীয় পয়েন্টটিকে ব্লাশির (Blachere) এবং সাওভাজে (Sauvaget) পুনর্ব্যক্ত করেছেন। লেখকের মূললিপি অথবা লেখক কর্তৃক যাচাইকৃত কোনো প্রতিলিপি থাকলে বাকি সব অকার্যকর গণ্য হবে।[৩] একইভাবে যে অনুলিপির মূল প্রতিলিপি পাওয়া যায়, তা লেখকের মূললিপির অনুপস্থিতিতে বাতিল গণ্য হবে।
লেখকের মূলকপি
ক খ ট ঠ ড ঢ
চিত্র: লেখকের মূললিপির ধারা
উপরিউক্ত চিত্রানুসারে দুটি ব্যাপার চোখে পড়ে—
ধরা যাক, মূলকপি একটি। দ্বিতীয় কোনো সংস্করণ বা সংশোধন করা হলো না। এরপর এ কাজের মোট তিনটি পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেল—১. মূলকপি, ২. মূলকপি থেকে প্রতিলিখিত পাণ্ডুলিপি (যেমন: ‘ক’), ৩. এমন পাণ্ডুলিপি, যা পরবর্তী সময়ে পাওয়া যায় (যেমন: ‘ট’)। তাহলে সংকলনের সময় ২ ও ৩ নং নিঃসন্দেহে বাদ পড়ে যাবে। কারণ এদের কোনোটিই মূলকপির সমমান নয়।
আবারও ধরা যাক, মূলকপি একটি। কিন্তু তা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই সংকলক বাধ্য হয়ে ভিন্ন তিনটি পাণ্ডুলিপির ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে দুটি পাণ্ডুলিপি মূল লেখকের ছাত্রদের দ্বারা লিপিবদ্ধ (ক, খ)। আর তৃতীয়টি (ড) খ-থেকে অনুলিখিত। সুতরাং ড এখানে কার্যত মূল্যহীন হয়ে পড়ে। সংকলককে অবশ্যই ক, খ-এর ওপর নির্ভর করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনোটিকেই বাদ দেওয়া যাবে না। কারণ উভয়টিই সমমান।
এগুলোই ছিল বিংশ শতাব্দীর প্রাচ্যবিদদের টেক্সচুয়াল ক্রিটিসিজম এবং সম্পাদনার মূলভিত্তি। অথচ ১৪ শ বছর আগে যাইদ ইবনু সাবিতও একই কাজ করেছিলেন। নবিজির জীবদ্দশায় পুরো মদিনা কুরআন-হাদিস সংরক্ষণে উঠেপড়ে লাগে। সাহাবিদের কাছে এমন অনেক আয়াতও সংরক্ষিত ছিল, যা তাদের বন্ধু কিংবা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সংগৃহীত। তাই যাইদ ইবন সাবিত শুধু সেসকল আয়াতই গ্রহণ করা শুরু করলেন, যা নবিজির প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এভাবে মানের দিক থেকে সেগুলো ছিল সমপর্যায়ভুক্ত এবং বিশুদ্ধতার দিক দিয়ে সর্বোচ্চ স্তরের। তিনি নিজে ছিলেন কুরআনের হাফিজ এবং স্বয়ং নবিজির অধীন ওহি লেখক। আর এর দুটোই হলো সমমর্যাদার, কোনো দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরের প্রতিরুপ নয়।[৪] সুতরাং সরাসরি মূল উৎস সংগ্রহের জন্য আবু বকর, উমার ও যাইদ ইবনু সাবিতের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং এর সপক্ষে দুজন সাক্ষীর উপস্থিতির দ্বারা সমমান নিশ্চিত করা হয়।
আহ্বানকারীদের উদ্দীপনায় অনুপ্রাণিত হয়ে পুরো ব্যাপারটি সত্যিকার অর্থে একটি জাতিগত কার্যক্রমে রূপ নেয়:
কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার জন্য প্রত্যেক উপযুক্ত ব্যক্তির উদ্দেশে খলিফা আবু বকর একটি সাধারণ আদেশনামা জারি করেন।
পুরো কার্যসূচি মসজিদে নববিতে অনুষ্ঠিত হয়, যা ছিল কেন্দ্রীয় জমায়েতের স্থান।
খলিফার নির্দেশানুযায়ী, উমার ইবনুল খাত্তাব মসজিদ-ফটকগুলোতে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিতে থাকেন। সরাসরি নবিজির কাছ থেকে লিখে নিয়েছে, এমন আয়াত সংগ্রহকারীরা ছিল তার উদ্দেশ্য। বিলালও মদিনার অলিতেগলিতে একইভাবে ঘোষণা দিতে থাকেন।

টিকাঃ
১. বার্গস্ট্রেসার, উসুলু নাকদিন নুসুস ওয়া নাশরিল কুতুব (আরবি), কায়রো, ১৯৬৯, পৃষ্ঠা: ১৪
২. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২০
৩. Blachere et J. Sauvaget, Regles pour editions et traductions de textes arabes. Arabic translation by al-Miqdad, p. 47.
৪. কোনো টেক্সটকে প্রামাণ্যরূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে অসম মানের পাণ্ডুলিপির মধ্যে তুলনা অ্যাকাডেমিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 স্মৃতিনির্ভর উৎসের ব্যবহার

📄 স্মৃতিনির্ভর উৎসের ব্যবহার


লিখিত উৎস আমাদের প্রধান আলোচনা। তবে প্রাথমিকভাবে কাঠ, চামড়া, গাছের পাতা ইত্যাদির ওপর লিখিত আয়াত পাওয়া গেলে সবগুলোর উৎস মিলিয়ে দেখা হতো। এরপর স্বয়ং নবিজির কাছ থেকে কুরআন শিক্ষা করা সাহাবিগণ সেগুলো মিলিয়ে দেখতেন নিজেদের মুখস্থ স্মৃতির সাথে। এভাবে সকল লিখিত ও মুখস্থ আয়াতের ওপর একই রকম কড়াকড়ি বহাল রাখার ফলে মানের সমতা নিশ্চিত হয়। যাইদ ইবনু সাবিতের ভাষায়-
'এভাবে আমি বিভিন্ন চামড়ার লেখা, হাড়ের টুকরা এবং মানুষের অন্তর (মুখস্থ স্মৃতি) থেকে কুরআন একত্রিত করি।' [১]
এ বিষয়ে যারকাশি বলেছেন—
'এ কথা থেকে অনেকে ধরে নিয়েছেন, নবীজির জীবদ্দশায় কেউ বুঝি কুরআন সম্পূর্ণরূপে মুখস্থ করতে পারেনি এবং যাইদ ইবনু সাবিত ও উবাই ইবনু কাবের (হিফজ করার) দাবি অমূলক। কিন্তু এই ধারণা ভ্রান্ত। যাইদ ইবনু সাবিতের কথার অর্থ হলো, তিনি বিক্ষিপ্ত সব উৎস থেকে আয়াত খুঁজে বের করে তা হাফিজদের দ্বারা যাচাই করে নিয়েছেন। এভাবে সবাই অংশ নিয়েছেন সংকলনের কাজে। একজন আয়াত সংগ্রাহকও বাদ পড়েনি। তাই সংকলিত আয়াতগুলো নিয়ে কারও আশঙ্কার কারণ নেই। আবার শুধু গুটিকয়েক উৎস থেকে বাছাই করার অভিযোগ তোলারও সুযোগ নেই।'[২]
যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যাইদ ইবনু সাবিত কেবল নিজের হিফজকৃত এবং লিপিবদ্ধ করা আয়াতের ওপর নির্ভর করেননি। ইবনু হাজার এ মর্মে যাইদ ইবনু সাবিতের একটি বিবৃতি পেশ করেন—
'সুরা তাওবার শেষ দুই আয়াত আমি আবু খুযাইমা আনসারি থেকে পেয়েছি।'
সব ক্ষেত্রেই যাচাই-বাছাই ছিল অপরিহার্য।[৩] ইবনু হাজার আরও বলেন—
লিখিত অংশ ছাড়া কোনোকিছু দলিলভুক্ত করার অধিকার যাইদ ইবনু সাবিতকে খলিফা আবু বকর প্রদান করেননি। এ কারণেই লিখিত আকারে না আসা পর্যন্ত সুরা তাওবার শেষ দুই আয়াত অন্তর্ভুক্ত করেননি তিনি। অথচ তিনি এবং তার সহযোগীগণ তা পরিষ্কার মুখস্থ জানতেন।[৪]

টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৪৬৭৯, ৪৯৮৬, ৭১৯১; জামিউত তিরমিযি: ৩১০৩
২. সারকাশি, বুরহান, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২০৮-৩৯
৩. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ১৩; সহিহুল বুখারি: ৪৬৭৯
৪. মাজহুদ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00