📄 সুরা বিন্যাস
উবাই ইবনু কাব এবং ইবনু মাসউদের মুসহাফের (সংকলিত কুরআনের প্রতিলিপির) সুরা বিন্যাসে মিল না থাকার অল্প কিছু অভিযোগ আছে। কিন্তু নির্দিষ্ট একটি সুরার ভেতরে আয়াত সজ্জার অমিল নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো অভিযোগ তোলা যায়নি।
কুরআনের চমৎকার গঠনের কারণে প্রতিটি সুরা আলাদা আলাদাভাবে নিজের অস্তিত্ব প্রকাশ করে। বর্ণনা এক সুরা থেকে শুরু হয়ে অন্য সুরায় গিয়ে শেষ হয় না। তাই সুরার ক্রম পরিবর্তন হলেও কুরআনের বার্তা একই থাকত। আয়াতের ধারাবাহিকতা বা শব্দক্রম পালটে গেলে একটা কথা ছিল। তবে আল্লাহর শোকর, মুসহাফের প্রসিদ্ধতম ভিন্ন রূপের ক্ষেত্রেও এমন দাবি তোলা সম্ভব না।
কুরআনের সুরার ধারাবাহিকতা রক্ষা ফরয কোনো বিধান নয়। সেটি সালাত, তিলাওয়াত, হিফজ, শিক্ষা বা শেখানো যা-ই হোক না কেন। আলিমগণ এ ব্যাপারে একমত। [১]
প্রত্যেকটি সুরা স্বকীয় গুণে বিশিষ্ট। পরের সুরাগুলোকে আগেরগুলোর থেকে অধিক তাৎপর্যমণ্ডিত ভাবার কোনো ব্যাপার নেই। অনেক সময় কোনো রদকৃত আয়াত এমন সুরায়ও থাকে যার বদলি আয়াত তার পূর্বের সুরায় উল্লেখিত আছে। আবার অধিকাংশ মুসলিম ছোট ছোট সুরা দিয়ে হিফজ করা শুরু করে, যেগুলো কুরআনের শেষভাগে অবস্থিত। কাজেই উলটক্রমে সুরা মুখস্থ হচ্ছে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার পর্যায়ক্রমে সুরা বাকারা, নিসা এবং আলি-ইমরান তিলাওয়াত করেন। এগুলো যথাক্রমে কুরআনের ২, ৪ ও ৩ নং সুরা। তিনি সবগুলো একই রাকাতে তিলাওয়াত করেছিলেন।[২]
আমার জানা মতে, সুরার ক্রম রক্ষা নিয়ে কোনো হাদিস পাওয়া যায় না। তবে ভিন্ন মত আছে। সেগুলো জানা প্রয়োজন-
১. সুরাগুলোর যে বিন্যাস দেখতে পাই, তা স্বয়ং নবিজির নির্দেশনা অনুযায়ী হয়েছে।[৩] আমি এই মতটিই গ্রহণ করেছি। এর বিপরীত মতের দাবি হলো, সাহাবিভেদে ভিন্ন ভিন্ন ধারায় বিন্যস্ত সুরার মুসহাফ পাওয়া যায়।[৪] এ ব্যাপারে আগে উবাই ইবনু কাব ও ইবনু মাসউদ প্রসঙ্গে ইতোমধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে।
২. কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, পুরো কুরআনই নবিজি কর্তৃক বিন্যাস করা। শুধু ৯নং সুরাটি বিন্যস্ত করেছেন উসমান ইবনু আফফান।[৫]
৩. অন্য মত অনুযায়ী, সুরা বিন্যাসের কৃতিত্ব সব যাইদ ইবনু সাবিত, খলিফা উসমান এবং অন্যান্য সাহাবির। আল-বাকিল্লানি এ মতটি গ্রহণ করেছেন।[৬]
৪. কিছু সুরা নবিজি বিন্যস্ত করেছেন, আর বাকিটুকু সাহাবিগণ করেছেন। এ মতটির সাথে ইবনু আতিয়া সহমত।[৭]
টিকাঃ
১. বাকিল্লানি, আল-ইনতিসার, পৃষ্ঠা: ১৬৭
২. সহিহ মুসলিম: ৭৭২
৩. সুয়তি, আল-ইতকান, পৃষ্ঠা: ১৭৬-৭৭; সুনানু আবি দাউদ: ৭৮৬
৪. অধ্যায় ১৩ দ্রষ্টব্য। ইবনু মাসউদের মুসহাফ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
৫. সুর্যতি, আল-ইতকান, পৃষ্ঠা: ১৭৭
৬. ধাকিয়ানি, আল-ইনতিসার, পৃষ্ঠা: ১৬৬
৭. ইবনু অর্ডওয়া, আল-মুহাররারুল ওয়াজিষ, পৃষ্ঠা: ৩৪-৩৫
📄 অসম্পূর্ণ মুসহাফে সুরা বিন্যাস
বর্তমান সুরা বিন্যাস উসমানি মুসহাফের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।[১] সম্পূর্ণ কুরআনের প্রতিলিপি তৈরি করতে চাইলে এ ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। তবে নির্দিষ্ট কোনো সুরার প্রতিলিপি তৈরি করতে চাইলে উক্ত ক্রম অনুসরণের কোনো প্রয়োজন নেই। যেমন: বিমানে ভ্রমণকালে নিজের কাজগুলো সাথে রাখতে পছন্দ করি। তবে বিশাল বিশাল পাণ্ডুলিপি সাথে রাখা ঝামেলার। তাই যতটুকু প্রয়োজন, সেটুকু ফটোকপি করে রাখি।
শুরুর দিকে মুসহাফগুলো বিশেষ চামড়ার (Parchment) ওপর লেখা হতো। সাধারণ কাগজের চেয়ে সেগুলো অনেক ভারী। একটি পূর্ণ মুসহাফের ওজন কয়েক কেজির মতো। অনেক মুসহাফে কুরআন এত বড় অক্ষরে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, পুরুত্বে তা অনায়াসে মিটার খানেক ছাড়িয়ে যায়।
বর্তমানে মদিনার কিং ফাহাদ কমপ্লেক্স মুদ্রিত মুসহাফকে আদর্শ ধরে নিলে একেকটি মুসহাফ মোটামুটি ৬০০ পৃষ্ঠার হবে। এখানে লক্ষণীয়, ওপরের ইয়েমেনি আর্কাইভের পুরো টেক্সটটি মদিনার মুসহাফের একটি লাইনের অর্ধেকসম। অর্থাৎ এই মাপে একটি মুসহাফ ছাপাতে হলে বর্তমানে ১৮০০০ পৃষ্ঠা প্রয়োজন পড়বে। বড় আকারের ক্যালিগ্রাফি বিরল কিছু নয়। তবে এখান থেকে বোঝা যায় সেসব মুসহাফে সাধারণত অল্প কয়েকটি সুরা লিপিবদ্ধ থাকত। বিশ্বজোড়া লাইব্রেরিগুলোতে তাই প্রচুর মুসহাফ পাওয়া যায়, যেগুলো মূলত কুরআনের অংশবিশেষ। ছকে কেবল একটি লাইব্রেরি থেকেই কয়েক ডজন উদাহরণ পেশ করা হলো। এগুলো ভারতের সালার জাঙ্গ জাদুঘরের[২] সংগ্রহ—
পাণ্ডুলিপি নং
সুরার সংখ্যা
সুরার ক্রম
তাং
২৪৪
২৯
৩৬, ৪৮, ৫৫, ৫৬, ৬২, ৬৭, ৭৫, ৭৬, ৭৮, ৯৩, ৯৪, ৭২, ৯৭, ৯৯, ১০০, ১০১, ১০২, ১০৩, ১০৪, ১০৫, ১০৬, ১০৭, ১০৮, ১০৯, ১১০, ১১১, ১১২, ১১৩, ১১৪
আনুমানিক ১১ হিজরির প্রথমভাগ
২৪৬
১৬
৬২ (প্রথম ৮ আয়াত), ১১০, ১, ৫৭, ১১৩, ৫৬, ৯৪, ১১৪, ৬৪, ৪৮, ৪৭, ৮৯, ১১২, ৩৬, ৭৮, ৬৭
আনুমানিক ১০ হিজরির শুরু এবং ১১ হিজরির শেষভাগ
২৪৭
১০
১, ৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮, ১০৯, ১১২, ১১৩, ১১৪
২৪৮
৯
৭৩, ৫১, ৬৭, ৫৫, ৬২, ১০৯, ১১২, ১১৩, ১১৪
১০৭৬ হিজরি
২৪৯
৯
১৭, ১৮, ৩৭, ৪৪, ৫০, ৬৯, ৫১, ৮৯, ৩৮
১১৮১ হিজরি
২৫০
৯
২০, ২১, ২২, ৬৩, ২৪-২৮
আনুমানিক ১২ হিজরির প্রথমভাগ
২৫১
৮
৬, ৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬২, ৬৭, ৭৬, ৭৮
আনুমানিক ১১ হিজরির প্রথমভাগ
২৫২
৮
১, ৬, ১৮, ৩৪, ৫, ৫৬, ৬৭, ৭৮
আনুমানিক ১১ হিজরির প্রথমভাগ
২৫৫
৮
১, ৩৬, ৪৮, ৫৫, ৬৭, ৭০, ৫৬, ৭৮
আনুমানিক ১৪ হিজরির প্রথমভাগ
২৫৩
৮
৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬২, ৬৭, ৭১, ৭০, ৭৮
আনুমানিক ১১ হিজরির শেষভাগ
২৫৪
৭
১, ৫৫, ৫৬, ৬২, ৬৮, ৭০, ৮৮
আনুমানিক ১২ হিজরির শেষভাগ
২৫৬
৭
৩৬, ৪৮, ৭৮, ৫৬, ৬৭, ৫৫, ৭০
আনুমানিক ১১ হিজরির প্রথমভাগ
২৫৭
৭
৩৬, ৪৮, ৭৮, ৬৭, ৫৬, ৭০, ৬২
আনুমানিক ১১ হিজরির মধ্যভাগ
২৫৮
৭
১৮, ৩২, ৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮
আনুমানিক ১১ হিজরির শেষভাগ
২৫৯
৭
১৮, ৩৬, ৩৭, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮
আনুমানিক ১১ হিজরির শেষভাগ
২৬০
৭
৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮, ৫৫, ৬২
আনুমানিক ১২ হিজরির শেষভাগ
২৬১
৭
৩৬, ৪৮, ৭৮, ৫৬, ৬৭, ৫৫, ৭০
আনুমানিক ১৩ হিজরির শেষভাগ
২৬২
৬
১, ৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮
১১১৫ হিজরি
২৬৩
৬
৩৬, ৪৫, ৫৫, ৫৬, ৬৭, ৬৮
১২৭৮ হিজরি
২৬৪
৬
১, ৩৬, ৪৮, ৫৬, ৭৮, ৬৭
আনুমানিক ১০ হিজরির প্রথমভাগ
২৬৫
৬
১৮, ৩৬, ৭১, ৭৮, ৫৬, ৬৭
আনুমানিক ১০ হিজরির শেষভাগ
২৬৬
৬
৩৬, ৫৫, ৫৬, ৬২, ৬৩, ৭৮
৯৮৯ হিজরি
২৬৭
৫
৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮
১০৭৫ হিজরি
২৬৮
৫
৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮
১১০৪ হিজরি
২৭০
৫
৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮
১১০৬ হিজরি
২৭১
৫
৩৬, ৪৮, ৬৭, ৭২, ৭৮
১১৯৮ হিজরি
২৭২
৫
৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮
১২০০ হিজরি
২৭৩
৫
৩৬, ৪৮, ৫৫, ৫৬, ৬৭
১২৩৭ হিজরি
২৭৫
৫
৩৬, ৭৮, ৪৮, ৫৬, ৬৭
৬২৬ হিজরি ইয়াকুত মুস্তাসিমির অনুলিপি
২৭৯
৫
৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮
১০৮৪ হিজরি
২৮০
৫
১, ৬, ১৮, ৩৪, ৩৫
আনুমানিক ১০ হিজরির প্রথম ভাগ
২৮১
৫
৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭
আনুমানিক ১০ হিজরির প্রথম ভাগ
২৮২
৫
১, ৬, ১৮, ৩৪, ৩৫
আনুমানিক ১০ হিজরির শেষভাগ
২৮৪
৫
৬, ৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭
২৯৬
৫
১৮, ৩৬, ৪৪, ৬৭, ৭৮
আনুমানিক ১২ হিজরির প্রথমভাগ
৩০৮
৪
৬, ১৮, ৩৪, ৩৫
আনুমানিক ৯ হিজরির প্রথমভাগ
৩১০
৪
৬-৯
আনুমানিক ১২ হিজরির প্রথমভাগ
বোঝাই যাচ্ছে, মুসহাফের অংশবিশেষ তৈরির ক্ষেত্রে লেখকগণ নিজের সুবিধা অনুযায়ী ক্রম নির্ধারণ করেছেন।
টিকাঃ
১. অধ্যায় দ্রষ্টব্য
২. Muhammad Ashraf, A Catalogue of Arabic Manuscripts in Salar Jung Museum & Library, pp. 166-234
৩. কিছু মুসহাফের ওপর রচনাকাল লিখিত আছে, আবার কিছু অলিখিত আছে। অলিখিতগুলোর ক্ষেত্রে ক্যাটালগ অনুযায়ী তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।