📄 সুরার মধ্যে আয়াতের বিন্যাস
কুরআনের আয়াত এবং সুরাগুলোর বিন্যাস একেবারেই অনন্য। ওহি যে ধারায় নাযিল হয়েছে কিংবা প্রসঙ্গগুলো যেভাবে এসেছে, তা বিন্যাসের ক্ষেত্রে অনুসৃত হয়নি। এভাবে সাজানোর কারণ এক আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। কারণ এই কিতাবটি তাঁর। এখন আমি যদি বিবেকহীন সম্পাদকের মতো অন্য কারও গ্রন্থের শব্দাবলি পালটে দিই কিংবা বাক্যের ক্রম ঢেলে সাজাই, তাহলে পুরো গ্রন্থের অর্থ পালটে যাওয়া খুব একটা কঠিন কিছু নয়। একে তখন আর মূল লেখকের বাণী হিসেবে অভিহিত করা চলবে না। কারণ শব্দ ও বিষয়বস্তু পরিবর্তনের অধিকার একমাত্র লেখকের। ফলে লেখকের স্বত্ব সংরক্ষিত থাকে।
আল্লাহর কিতাবের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।[১] তিনিই এর একক কর্তৃপক্ষ এবং এর বিষয়বস্তু বিন্যস্ত করাও শুধু তাঁরই ইচ্ছাধিকার। কুরআনে এ কথা স্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে-
إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ
নিশ্চয় এর সংরক্ষণ ও তিলাওয়াত করানোর দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি তা (জিবরিলের মাধ্যমে) তিলাওয়াত করি, তখন আপনি সেই তিলাওয়াতের অনুসরণ করবেন। অতঃপর তা (প্রচ্ছন্ন ওহির মাধ্যমে) বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা আমারই দায়িত্ব।[২]
আল্লাহ পৃথিবীতে না এসে তাঁর বাণী ব্যাখ্যা করার জন্য একজন মনোনীত রাসুলকে নিযুক্ত করেছেন। এ ব্যাপারেও কুরআনে এসেছে-
بِالْبَيِّنَاتِ وَالزُّبُرِ وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ
(তাদের প্রেরণ করেছি) স্পষ্ট প্রমাণাদি ও কিতাবসমূহ এবং আপনার প্রতি নাযিল করেছি কুরআন, যাতে আপনি মানুষের জন্য স্পষ্ট করে দিতে পারেন, যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে; আর যাতে তারা চিন্তা করে।[৩]
এ মর্যাদা প্রদানের অর্থ মূলত নববি ব্যাখ্যার ব্যাপারে আল্লাহর স্বীকৃতি।[৪] ওহি এবং আল্লাহর অনুমোদন সাপেক্ষে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআনের চমৎকার বিন্যাস সজ্জিত করেন। তিনিই ছিলেন একক মনোনীত ব্যক্তি। এছাড়া আল্লাহর কিতাব সাজানো ও বিন্যাসের ক্ষেত্রে খোদ মুসলিমজাতি কিংবা দ্বিতীয় কেউ কোনো প্রকার ইচ্ছাধিকার রাখে না।
কুরআনের সুরাগুলো সমান নয়। সবচেয়ে ছোটটিতে আয়াত রয়েছে ৩টি এবং বড়টিতে ২৮৬টি। একাধিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, ওহি লেখকদেরকে নবীজি নিজে সুরার মধ্যে আয়াতের অবস্থান নির্ণয় করে দিয়েছেন।
উসমান থেকে বর্ণিত, অবতীর্ণ ওহিতে দীর্ঘ ধারাবাহিক আয়াত থাকুক কিংবা বিচ্ছিন্ন একক আয়াত থাকুক, সেটি আল্লাহর রাসুল ওহি লেখকদের ডেকে বলে দিতেন, ‘এই আয়াত (বা আয়াতগুলো) ওই সুরায় স্থাপন করো, যেখানে অমুক অমুক কথা বলা হয়েছে।’[৫]
> যাইদ ইবনু সাবিত বলেছেন, ‘আমরা আল্লাহর রাসুলের উপস্থিতিতে কুরআন সংকলন করতাম।’[৬]
》উসমান ইবনু আবিল আস থেকে বর্ণিত, তিনি একদিন নবিজির সাথে বসে ছিলেন। এমন সময় নির্দিষ্ট একটি স্থানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে নবিজি বললেন, 'জিবরিল আমিন আমার কাছে এসে আমাকে-
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ [৭] -এ আয়াতটি এ সুরার এই (নির্দিষ্ট) স্থানে স্থাপন করতে আদেশ করেছেন।' [৮]
وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ [৯]
》এই আয়াত সম্পর্কে ইবনু আব্বাসের সূত্রে আবু সালিহ থেকে আল-কালবি বলেছেন, 'এটি আল্লাহর রাসুলের ওপর নাযিল হওয়া শেষ আয়াত। জিবরিল আমিন এসে তাকে সুরা বাকারার ২৮০ নং আয়াতের পর তা স্থাপন করতে বলেন।' [১০]
》উবাই ইবনু কাব বর্ণনা করেন, কখনো কখনো আল্লাহর রাসুলের ওপর কোনো সুরার প্রথমাংশ অবতীর্ণ হতো এবং আমি তা লিপিবদ্ধ করতাম। আবার অন্য একটি আয়াত আসত এবং তিনি বলতেন, 'উবাই, এটি অমুক সুরায় লিখে রাখো, যেখানে অমুক অমুক কথা বর্ণিত আছে।' কখনো-বা তার ওপর ওহি আসত এবং আমি তার নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকতাম। তিনি আমাকে এর যথাযথ স্থান জানিয়ে দিতেন।' [১১]
》যাইদ ইবনু সাবিত বলেছেন, আমরা একবার আল্লাহর রাসুলের সাথে বসে চামড়ায় লেখা আয়াতগুলো সংকলন করছিলাম। এ সময় তিনি বললেন, ‘ধন্য হোক শাম।’ [১২]
তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘কেন ইয়া রাসুলাল্লাহ?’
তিনি বললেন, ‘কারণ পরম করুণাময়ের ফেরেশতারা এর ওপর তাদের ডানা মেলে দিয়েছেন।’ [১৩]
এই হাদিসেও নবিজির তত্ত্বাবধানে কুরআন সংকলন এবং বিন্যাসের চিত্র পরিলক্ষিত হয়।
» সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ হলো পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে তিলাওয়াতকৃত সুরা। সর্বসম্মতভাবে আয়াতের সুনির্দিষ্ট ধারা না থাকলে জনসম্মুখে তা তিলাওয়াত করা সম্ভব হতো না। আর ইমামের আয়াতক্রমের সাথে জামাতে উপস্থিত মুসল্লিদের দ্বিমত পোষণের নজির নবিজির যুগেও মেলেনি, এ যুগেও মেলে না; বরং জুমআর দিনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো কখনো সুরাগুলো সম্পূর্ণাকারে তিলাওয়াত করতেন। [১৪]
সাহাবিগণ প্রতিটি সুরার শুরু ও শেষাংশ চিনতেন। হাদিস থেকেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়—
» উমারকে নবিজি বলেছেন, ‘সুরা নিসার শেষের আয়াত কি তোমার জন্যে যথেষ্ট নয়? (উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে)’ [১৫]
» আবু মাসউদ বাদরি থেকে বর্ণিত, নবিজি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রাতের বেলা সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়বে, তার জন্য সেটা যথেষ্ট হবে।’ [১৬]
» ইবনু আব্বাস বর্ণনা করেন, ‘আমি এক রাতে আমার খালা মাইমুনার বাড়িতে ছিলাম। সে রাতে আল্লাহর রাসুল ঘুম থেকে উঠে সুরা আলি-ইমরানের শেষ ১০ আয়াত তিলাওয়াত করেছেন।' [১৭]
টিকাঃ
১. এক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বহুগুণ বেশি প্রযোজ্য। কেননা কুরআন আল্লাহর বাণী। এতে কোনোরূপ পরিবর্তন-পরিমার্জনের কথা কল্পনাও করা যায় না। পক্ষান্তরে মানুষের রচিত কোনো গ্রন্থ যতই সতর্কতা ও যত্ন সহকারে লেখা হোক না কেন, অর্থ পরিবর্তন না করে তাতে স্বল্প পরিসরে হলেও একজন দক্ষ সম্পাদক চাইলে পরিবর্তন-পরিমার্জন করতে পারেন। কিন্তু কুরআনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিবর্তন-পরিমার্জনও অসম্ভব একটি বিষয়। তাই লেখকের অনুমতি ছাড়া লেখা ও বিন্যাসে কোনোরূপ পরিবর্তনের বৈধতা বিবেচনায় আল্লাহর কিতাব ও মানবরচিত গ্রন্থের মাঝে তুলনা করা চলে না। কেননা এ দৃষ্টিকোণ থেকে উভয়ের মাঝে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। শারয়ি সম্পাদক
২. সুরা কিয়ামাহ, আয়াত: ১৭-১৯
৩. সুরা নাহল, আয়াত: ৪৪
৪. নবীজির সুন্নাহ হলো কুরআনের প্রায়োগিক ব্যাখ্যা। শব্দগত এবং ফলিত ব্যবহারের দিক থেকে এটিও আল্লাহ কর্তৃক অনুমোদিত। এর মর্যাদা অস্বীকার করার অধিকার কারও নেই।
৫. সুনানুত তিরমিযি: ৩০৮৬; সুনানু আবি দাউদ: ৭৮৬; মুসনাদু আহমাদ: ৩৯৯, ৪৯৯; আস- সুনানুল কুবরা, বাইহাকি: ২৩৭৬; মুস্তাদরাকুল হাকিম: ২৮৭৫, ৩২৭২; সহিহু ইবনি হিব্বান: ৪৩; ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ২২; আবু উবাইদ, ফযায়িল, পৃষ্ঠা: ২৮০; হাদিসটি দীর্ঘ। হাদিসের এ অংশটি (‘এই আয়াত/আয়াতগুলো ঐ সুরায় স্থাপন করো যেখানে অমুক অমুক কথা বলা রয়েছে’। বিশুদ্ধ ও প্রমাণিত। তবে হাদিসটির শেষে অতিরিক্ত কিছু কথা আছে, যা মুনকার বলে সাব্যস্ত। অসিধারিত দেখুন, আত-তালিক আলা মুসনাদি আহমাদ: খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪৬০-৪৬২, হাদিস নং ১৪) লাদিউত তিরমিযি: ১৪১, ৩৯৫৪; মুসনাদু আহমাদ: ২১৬০৭; মুস্তাদরাকুল হাকিম: ২৯০০, ৯০১, ৪২১৭; সহিহু ইবনি হিব্বান: ১১৪; হাদিসটি হাসান।
৬. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ৬
৭. সুরা নাহল, আয়াত : ৯০; অর্থ : 'আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসঙ্গত কাজ এবং অবাধ্যতা করতে বারণ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যাতে তোমরা স্মরণ রাখ।'
৮. মুসনাদু আহমাদ: ১৭৯১৮; ইবনু কাসির বলেছেন, হাদিসটির সনদে কোনো সমস্যা নেই। সম্ভবত হাদিসটি শাহর বিন হাওশাবের নিকট দুটি সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। (তাফসির ইবনি কাসির, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৫১৩)
৯. সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮১; অর্থ : 'আর তোমরা ভয় কর সেই দিনকে, যেদিন তোমাদেরকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। অতঃপর প্রত্যেককে তার কর্মের ফল পূর্ণভাবে প্রদান করা হবে, আর তাদের প্রতি কোনো অন্যায় করা হবে না।'
১০. বাকিল্লানি, আল-ইনতিসার, পৃষ্ঠা: ১৭৬
১১. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৭৬
১২. শাম বলতে বর্তমান সিরিয়া, জর্ডান এবং লেবানন বোঝায়।
১৩. বাকিল্লানি, আল-ইনতিসার, পৃষ্ঠা: ১৭৬-৭৭
১৪. সহিহ মুসলিম: ৮৭২; মুসলিমের বর্ণনায় এভাবে এসেছে, আমরা বিনতু আব্দির রাহমান থেকে তার তাক বোনের সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জুমআর দিন আল্লাহর রাসুলের মুখ থেকে শুনে সুরা কাফ মুখস্থ করেছি। তিনি প্রতি জুমআর দিন মিম্বারে দাঁড়িয়ে এ সুরা পড়তেন। (সহিহ মুসলিম: ৮৭২) হারিস ইবনু নুমানের এক কন্যার সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূলের মুখ থেকে শুনেই সুরা কাফ মুখস্থ করেছি। তিনি প্রতি জুমআর খুতবায় এ সূরা তিলাওয়াত করতেন। (সহিহ মুসলিম: ৮৭৩)
১৫. সহিহ মুসলিম: ১৬১৭
১৬. সহিহুল বুখারি: ৫০০৯
১৭. সহিদুল বুখারি: ১৮৩; সহিহ মুসলিম: ৭৬৩; বিস্তারিত: মুসলিম, কিতাবুত তামইয়, আল আযমি সম্পাদিত, পৃষ্ঠা: ১৮৩-৫
📄 সুরা বিন্যাস
উবাই ইবনু কাব এবং ইবনু মাসউদের মুসহাফের (সংকলিত কুরআনের প্রতিলিপির) সুরা বিন্যাসে মিল না থাকার অল্প কিছু অভিযোগ আছে। কিন্তু নির্দিষ্ট একটি সুরার ভেতরে আয়াত সজ্জার অমিল নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো অভিযোগ তোলা যায়নি।
কুরআনের চমৎকার গঠনের কারণে প্রতিটি সুরা আলাদা আলাদাভাবে নিজের অস্তিত্ব প্রকাশ করে। বর্ণনা এক সুরা থেকে শুরু হয়ে অন্য সুরায় গিয়ে শেষ হয় না। তাই সুরার ক্রম পরিবর্তন হলেও কুরআনের বার্তা একই থাকত। আয়াতের ধারাবাহিকতা বা শব্দক্রম পালটে গেলে একটা কথা ছিল। তবে আল্লাহর শোকর, মুসহাফের প্রসিদ্ধতম ভিন্ন রূপের ক্ষেত্রেও এমন দাবি তোলা সম্ভব না।
কুরআনের সুরার ধারাবাহিকতা রক্ষা ফরয কোনো বিধান নয়। সেটি সালাত, তিলাওয়াত, হিফজ, শিক্ষা বা শেখানো যা-ই হোক না কেন। আলিমগণ এ ব্যাপারে একমত। [১]
প্রত্যেকটি সুরা স্বকীয় গুণে বিশিষ্ট। পরের সুরাগুলোকে আগেরগুলোর থেকে অধিক তাৎপর্যমণ্ডিত ভাবার কোনো ব্যাপার নেই। অনেক সময় কোনো রদকৃত আয়াত এমন সুরায়ও থাকে যার বদলি আয়াত তার পূর্বের সুরায় উল্লেখিত আছে। আবার অধিকাংশ মুসলিম ছোট ছোট সুরা দিয়ে হিফজ করা শুরু করে, যেগুলো কুরআনের শেষভাগে অবস্থিত। কাজেই উলটক্রমে সুরা মুখস্থ হচ্ছে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার পর্যায়ক্রমে সুরা বাকারা, নিসা এবং আলি-ইমরান তিলাওয়াত করেন। এগুলো যথাক্রমে কুরআনের ২, ৪ ও ৩ নং সুরা। তিনি সবগুলো একই রাকাতে তিলাওয়াত করেছিলেন।[২]
আমার জানা মতে, সুরার ক্রম রক্ষা নিয়ে কোনো হাদিস পাওয়া যায় না। তবে ভিন্ন মত আছে। সেগুলো জানা প্রয়োজন-
১. সুরাগুলোর যে বিন্যাস দেখতে পাই, তা স্বয়ং নবিজির নির্দেশনা অনুযায়ী হয়েছে।[৩] আমি এই মতটিই গ্রহণ করেছি। এর বিপরীত মতের দাবি হলো, সাহাবিভেদে ভিন্ন ভিন্ন ধারায় বিন্যস্ত সুরার মুসহাফ পাওয়া যায়।[৪] এ ব্যাপারে আগে উবাই ইবনু কাব ও ইবনু মাসউদ প্রসঙ্গে ইতোমধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে।
২. কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, পুরো কুরআনই নবিজি কর্তৃক বিন্যাস করা। শুধু ৯নং সুরাটি বিন্যস্ত করেছেন উসমান ইবনু আফফান।[৫]
৩. অন্য মত অনুযায়ী, সুরা বিন্যাসের কৃতিত্ব সব যাইদ ইবনু সাবিত, খলিফা উসমান এবং অন্যান্য সাহাবির। আল-বাকিল্লানি এ মতটি গ্রহণ করেছেন।[৬]
৪. কিছু সুরা নবিজি বিন্যস্ত করেছেন, আর বাকিটুকু সাহাবিগণ করেছেন। এ মতটির সাথে ইবনু আতিয়া সহমত।[৭]
টিকাঃ
১. বাকিল্লানি, আল-ইনতিসার, পৃষ্ঠা: ১৬৭
২. সহিহ মুসলিম: ৭৭২
৩. সুয়তি, আল-ইতকান, পৃষ্ঠা: ১৭৬-৭৭; সুনানু আবি দাউদ: ৭৮৬
৪. অধ্যায় ১৩ দ্রষ্টব্য। ইবনু মাসউদের মুসহাফ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
৫. সুর্যতি, আল-ইতকান, পৃষ্ঠা: ১৭৭
৬. ধাকিয়ানি, আল-ইনতিসার, পৃষ্ঠা: ১৬৬
৭. ইবনু অর্ডওয়া, আল-মুহাররারুল ওয়াজিষ, পৃষ্ঠা: ৩৪-৩৫
📄 অসম্পূর্ণ মুসহাফে সুরা বিন্যাস
বর্তমান সুরা বিন্যাস উসমানি মুসহাফের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।[১] সম্পূর্ণ কুরআনের প্রতিলিপি তৈরি করতে চাইলে এ ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। তবে নির্দিষ্ট কোনো সুরার প্রতিলিপি তৈরি করতে চাইলে উক্ত ক্রম অনুসরণের কোনো প্রয়োজন নেই। যেমন: বিমানে ভ্রমণকালে নিজের কাজগুলো সাথে রাখতে পছন্দ করি। তবে বিশাল বিশাল পাণ্ডুলিপি সাথে রাখা ঝামেলার। তাই যতটুকু প্রয়োজন, সেটুকু ফটোকপি করে রাখি।
শুরুর দিকে মুসহাফগুলো বিশেষ চামড়ার (Parchment) ওপর লেখা হতো। সাধারণ কাগজের চেয়ে সেগুলো অনেক ভারী। একটি পূর্ণ মুসহাফের ওজন কয়েক কেজির মতো। অনেক মুসহাফে কুরআন এত বড় অক্ষরে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, পুরুত্বে তা অনায়াসে মিটার খানেক ছাড়িয়ে যায়।
বর্তমানে মদিনার কিং ফাহাদ কমপ্লেক্স মুদ্রিত মুসহাফকে আদর্শ ধরে নিলে একেকটি মুসহাফ মোটামুটি ৬০০ পৃষ্ঠার হবে। এখানে লক্ষণীয়, ওপরের ইয়েমেনি আর্কাইভের পুরো টেক্সটটি মদিনার মুসহাফের একটি লাইনের অর্ধেকসম। অর্থাৎ এই মাপে একটি মুসহাফ ছাপাতে হলে বর্তমানে ১৮০০০ পৃষ্ঠা প্রয়োজন পড়বে। বড় আকারের ক্যালিগ্রাফি বিরল কিছু নয়। তবে এখান থেকে বোঝা যায় সেসব মুসহাফে সাধারণত অল্প কয়েকটি সুরা লিপিবদ্ধ থাকত। বিশ্বজোড়া লাইব্রেরিগুলোতে তাই প্রচুর মুসহাফ পাওয়া যায়, যেগুলো মূলত কুরআনের অংশবিশেষ। ছকে কেবল একটি লাইব্রেরি থেকেই কয়েক ডজন উদাহরণ পেশ করা হলো। এগুলো ভারতের সালার জাঙ্গ জাদুঘরের[২] সংগ্রহ—
পাণ্ডুলিপি নং
সুরার সংখ্যা
সুরার ক্রম
তাং
২৪৪
২৯
৩৬, ৪৮, ৫৫, ৫৬, ৬২, ৬৭, ৭৫, ৭৬, ৭৮, ৯৩, ৯৪, ৭২, ৯৭, ৯৯, ১০০, ১০১, ১০২, ১০৩, ১০৪, ১০৫, ১০৬, ১০৭, ১০৮, ১০৯, ১১০, ১১১, ১১২, ১১৩, ১১৪
আনুমানিক ১১ হিজরির প্রথমভাগ
২৪৬
১৬
৬২ (প্রথম ৮ আয়াত), ১১০, ১, ৫৭, ১১৩, ৫৬, ৯৪, ১১৪, ৬৪, ৪৮, ৪৭, ৮৯, ১১২, ৩৬, ৭৮, ৬৭
আনুমানিক ১০ হিজরির শুরু এবং ১১ হিজরির শেষভাগ
২৪৭
১০
১, ৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮, ১০৯, ১১২, ১১৩, ১১৪
২৪৮
৯
৭৩, ৫১, ৬৭, ৫৫, ৬২, ১০৯, ১১২, ১১৩, ১১৪
১০৭৬ হিজরি
২৪৯
৯
১৭, ১৮, ৩৭, ৪৪, ৫০, ৬৯, ৫১, ৮৯, ৩৮
১১৮১ হিজরি
২৫০
৯
২০, ২১, ২২, ৬৩, ২৪-২৮
আনুমানিক ১২ হিজরির প্রথমভাগ
২৫১
৮
৬, ৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬২, ৬৭, ৭৬, ৭৮
আনুমানিক ১১ হিজরির প্রথমভাগ
২৫২
৮
১, ৬, ১৮, ৩৪, ৫, ৫৬, ৬৭, ৭৮
আনুমানিক ১১ হিজরির প্রথমভাগ
২৫৫
৮
১, ৩৬, ৪৮, ৫৫, ৬৭, ৭০, ৫৬, ৭৮
আনুমানিক ১৪ হিজরির প্রথমভাগ
২৫৩
৮
৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬২, ৬৭, ৭১, ৭০, ৭৮
আনুমানিক ১১ হিজরির শেষভাগ
২৫৪
৭
১, ৫৫, ৫৬, ৬২, ৬৮, ৭০, ৮৮
আনুমানিক ১২ হিজরির শেষভাগ
২৫৬
৭
৩৬, ৪৮, ৭৮, ৫৬, ৬৭, ৫৫, ৭০
আনুমানিক ১১ হিজরির প্রথমভাগ
২৫৭
৭
৩৬, ৪৮, ৭৮, ৬৭, ৫৬, ৭০, ৬২
আনুমানিক ১১ হিজরির মধ্যভাগ
২৫৮
৭
১৮, ৩২, ৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮
আনুমানিক ১১ হিজরির শেষভাগ
২৫৯
৭
১৮, ৩৬, ৩৭, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮
আনুমানিক ১১ হিজরির শেষভাগ
২৬০
৭
৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮, ৫৫, ৬২
আনুমানিক ১২ হিজরির শেষভাগ
২৬১
৭
৩৬, ৪৮, ৭৮, ৫৬, ৬৭, ৫৫, ৭০
আনুমানিক ১৩ হিজরির শেষভাগ
২৬২
৬
১, ৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮
১১১৫ হিজরি
২৬৩
৬
৩৬, ৪৫, ৫৫, ৫৬, ৬৭, ৬৮
১২৭৮ হিজরি
২৬৪
৬
১, ৩৬, ৪৮, ৫৬, ৭৮, ৬৭
আনুমানিক ১০ হিজরির প্রথমভাগ
২৬৫
৬
১৮, ৩৬, ৭১, ৭৮, ৫৬, ৬৭
আনুমানিক ১০ হিজরির শেষভাগ
২৬৬
৬
৩৬, ৫৫, ৫৬, ৬২, ৬৩, ৭৮
৯৮৯ হিজরি
২৬৭
৫
৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮
১০৭৫ হিজরি
২৬৮
৫
৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮
১১০৪ হিজরি
২৭০
৫
৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮
১১০৬ হিজরি
২৭১
৫
৩৬, ৪৮, ৬৭, ৭২, ৭৮
১১৯৮ হিজরি
২৭২
৫
৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮
১২০০ হিজরি
২৭৩
৫
৩৬, ৪৮, ৫৫, ৫৬, ৬৭
১২৩৭ হিজরি
২৭৫
৫
৩৬, ৭৮, ৪৮, ৫৬, ৬৭
৬২৬ হিজরি ইয়াকুত মুস্তাসিমির অনুলিপি
২৭৯
৫
৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭, ৭৮
১০৮৪ হিজরি
২৮০
৫
১, ৬, ১৮, ৩৪, ৩৫
আনুমানিক ১০ হিজরির প্রথম ভাগ
২৮১
৫
৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭
আনুমানিক ১০ হিজরির প্রথম ভাগ
২৮২
৫
১, ৬, ১৮, ৩৪, ৩৫
আনুমানিক ১০ হিজরির শেষভাগ
২৮৪
৫
৬, ৩৬, ৪৮, ৫৬, ৬৭
২৯৬
৫
১৮, ৩৬, ৪৪, ৬৭, ৭৮
আনুমানিক ১২ হিজরির প্রথমভাগ
৩০৮
৪
৬, ১৮, ৩৪, ৩৫
আনুমানিক ৯ হিজরির প্রথমভাগ
৩১০
৪
৬-৯
আনুমানিক ১২ হিজরির প্রথমভাগ
বোঝাই যাচ্ছে, মুসহাফের অংশবিশেষ তৈরির ক্ষেত্রে লেখকগণ নিজের সুবিধা অনুযায়ী ক্রম নির্ধারণ করেছেন।
টিকাঃ
১. অধ্যায় দ্রষ্টব্য
২. Muhammad Ashraf, A Catalogue of Arabic Manuscripts in Salar Jung Museum & Library, pp. 166-234
৩. কিছু মুসহাফের ওপর রচনাকাল লিখিত আছে, আবার কিছু অলিখিত আছে। অলিখিতগুলোর ক্ষেত্রে ক্যাটালগ অনুযায়ী তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।