📄 মক্কা পর্ব
মৌখিক আকারে নাযিল হওয়া সত্ত্বেও কুরআন সর্বদা নিজেকে ‘কিতাব’ বলে অভিহিত করে এসেছে। ইঙ্গিত করা হচ্ছে—একে একসময় না একসময় লিখিত আকারে আনতেই হবে। মূলত কুরআনের লিখিত সংরক্ষণ শুরু হয় একদম প্রথম থেকেই। কুরাইশদের তীব্র রোষের মুখে শত কষ্ট সহ্য করেও সদ্য প্রস্ফুটিত মুসলিমসমাজ এ কাজ চালিয়ে যায়। উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইসলামগ্রহণের পূর্বকার একটি ঘটনা থেকে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে—
উমার একদিন শুনলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং কিছু সাহাবি সাফার পাদদেশে একটি ঘরে একত্র হয়েছেন। উন্মুক্ত তরবারি হাতে বেরিয়ে পড়লেন উমার। সেখানে নারীসহ প্রায় ৪০ জন সাহাবি উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন আবু বকর, আলি, নবিজির চাচা হামজা এবং আরও অনেকেই। তারা ইথিওপিয়ায় হিজরত করেননি। পথিমধ্যে নুআইম ইবনু আব্দিল্লাহ উমারকে তার গন্তব্যের উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানালেন, ‘আমি বিধর্মী মুহাম্মাদের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছি। এ ব্যক্তি কুরাইশদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করেছে, তাদের জ্ঞানীদের বোকা বলেছে, তাদের ধর্মের প্রতি দোষারোপ করেছে, উপাস্যদের অপমান করেছে। তাকে হত্যা করব।"
নুআইম বললেন, ‘মুহাম্মাদকে হত্যা করলে বনু আব্দি মানাফ তোমাকে ছেড়ে দেবে ভেবেছ? এর চেয়ে নিজের ঘরের খবর নাও।’
উমার এতে আশ্চর্য হয়ে বিস্তারিত ঘটনা জানতে চাইলেন। নুআইম জানালেন,
'তোমার ভগ্নিপতি সাইদ এবং বোন ফাতিমা মুহাম্মাদের ধর্ম গ্রহণ করেছে। ভালো হয়, তুমি তাদেরকে সামলাও।'
উমার দ্রুত তার ভগ্নিপতির বাড়ির উদ্দেশ্যে যেতে লাগলেন। তখন একটি চামড়ার টুকরায় লিখিত সুরা তহা তিলাওয়াত করে শোনাচ্ছিলেন খাব্বাব ইবনু আরত। উমারের কণ্ঠ শুনে তিনি একটি ছোট কক্ষে গিয়ে লুকালেন। চামড়ার টুকরাটি টান দিয়ে লুকিয়ে ফেলেন বোন ফাতিমা...।[১]
ক্ষুদ্ধ উমারের যাত্রা সেদিন তাকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসে। যাদেরকে তিনি হত্যা করতে চেয়েছিলেন তাদের জন্যই আল্লাহ তার প্রতিপত্তিকে কাজে লাগান। তবে আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক হলো ওই চামড়ার টুকরা।
ইবনু আব্বাসের সূত্র অনুযায়ী মক্কায় অবতীর্ণ হওয়া আয়াতগুলো মক্কায়ই লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ইমাম জুহরিও একই কথা বলেছেন।[৩] এ সময়টায় আব্দুল্লাহ ইবনু সাদ ইবনি আবিস সারহ কুরআন সংরক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। কিছু মহল তার বিরুদ্ধে জাল আয়াত লেখার অভিযোগ এনেছে। এগুলোর ভিত্তিহীনতা আমি অন্যত্র প্রমাণ করেছি।[৪]
আরেকজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ওহি লেখক খালিদ ইবনু সাইদ ইবনিল আস বলেছেন, আমিই প্রথম 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' লিপিবদ্ধ করেছি।[৫]
কাত্তানি থেকে একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়, 'আকাবার বাইআতের সময় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাফি ইবনু মালিক আনসারির হাতে তখন পর্যন্ত অবতীর্ণ সকল আয়াত তুলে দেন। মদিনায় ফিরে গোত্রের লোকদের একত্র করে সেগুলো পড়ে শোনান তিনি।' [৬]
টিকাঃ
১. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 343-46
২. ইবনু দুরাইস, ফাযায়িলুল কুরআন, পৃষ্ঠা: ৩৩
৩. ইমাম জুহরি, তানযিলুল কুরআন, ৩২; ইবনু কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩৪০; ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা: ২২
৪. আল-আযামি, কৃতত্বাবুন নাবি, ৩য় সংস্করণ, রিয়াদ, ১৪০১ (১৯৮১), পৃষ্ঠা: ৮৩-৮৯
৫. মুহূতি, আদ-দূরত্বল মানসুর, পৃষ্ঠা: ১১
৬. কাখানি, আত-তারাতিবুল ইদারিয়া, পৃষ্ঠা: ৪৪
📄 অধ্যায় শেষে
তৎকালীন সমাজের সবখানে কুরআনে হাফিজের ছড়াছড়ি ছিল। পাশাপাশি প্রত্যেকটি আয়াত লিপিবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তাও মুসলিমজাতি জানত। তাই তাদের সকল কার্যক্রম ছিল কুরআন হিফজ করা এবং বিকৃতি থেকে তা নিরাপদ রাখাকে ঘিরে। এমনকি মক্কার কঠিন নির্যাতনও তাদেরকে এ কাজ থেকে টলাতে পারেনি। এরপর মদিনায় সমৃদ্ধিলাভের পর তো পুরো জাতি এ কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। শিক্ষিত, অশিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিত সবার অন্তরে একই জিনিস গাঁথা। আর তাদের সকল উদ্যোগের প্রাণভোমরা ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। নিজের তত্ত্বাবধানে কুরআন লিখিয়েছেন, ব্যাখ্যা করেছেন। সম্পূর্ণ কুরআন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঐশী সহায়তায় প্রতিটি আয়াত সুবিন্যস্ত করেছেন। এ কাজের জন্য তিনি ছিলেন আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত। তার ইন্তেকালের পরও মহাপবিত্র এই কিতাব কীভাবে ছড়াতে থাকল, পুরো জাতি কীভাবে অবিশ্রান্ত নবদ্যোমে কুরআনের বিশুদ্ধতা রক্ষায় মনোনিবেশ করল তা নিয়েই পরবর্তী অধ্যায়ের আলোচনা।