📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 মদিনায় কুরআন শিক্ষায় নবিজির ব্যবহৃত ভাষা

📄 মদিনায় কুরআন শিক্ষায় নবিজির ব্যবহৃত ভাষা


একই ভাষার উচ্চারণ অঞ্চলভেদে ব্যাপকভাবে আলাদা হতে পারে। নিউ ইয়র্কের দুজন মানুষ যদি ভিন্ন সংস্কৃতি এবং আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে আসে, তাদের উচ্চারণে পার্থক্য থাকবে। একইভাবে লন্ডন এবং গ্লাসগোর অধিবাসীদের উচ্চারণে তফাত থাকবে। আবার ব্রিটিশ এবং মার্কিন প্রমিত বানান এক নয়। কখনো বানান এক হলেও উচ্চারণ ভিন্ন (যেমন: Schedule)।
বর্তমান আরব দেশগুলোর অবস্থা দেখা যাক। 'কুলতু' (قلت) শব্দটির কথাই ধরি। এর অর্থ-'আমি বললাম'। এখন মিশরের লোকেরা 'ক'-এর স্থলে 'উ' এনে উচ্চারণ করবে-'উলতু'। আবার ইয়েমেনিরা বলবে- 'গুলতু'। কিন্তু লেখার সময় সকল আরবিভাষী একই জিনিস লিখবে। আরেকটি উদাহরণ দিই- 'কাসিম' নামের ব্যক্তিকে পারস্যে 'জাসিম' বলে ডাকা হবে। এই অঞ্চলের লোকেরা 'জ'-কে 'য়' দ্বারা প্রতিস্থাপিত করে। এভাবে উচ্চারণের সময় 'রিজাল' (رجال) হয়ে যায় 'রিয়াল'।
মক্কায় থাকতে মুসলিমদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা অভিন্ন ছিল। কিন্তু গোত্রের রেখা পেরিয়ে যখন ইসলাম পুরো আরবজুড়ে ছড়িয়ে যায়, তখন বিভিন্ন আঞ্চলিক আরবিভাষীরা একে অপরের সান্নিধ্যে আসতে থাকে। এ গোত্রগুলোকেও কুরআন শেখানো যথারীতি জরুরি ছিল। কিন্তু কুরআন নাযিল হয়েছে প্রমিত কুরাইশি উচ্চারণে। বিভিন্ন গোত্রের নিজস্ব উচ্চারণ বর্জন করে তাদের সেভাবে উচ্চারণ করতে বলাটা সমীচীন ছিল না। তাই বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে নবিজি তাদেরকে যার যার আঞ্চলিক আরবিতে কুরআন শেখান। মাঝেমধ্যে ভিন্ন গোত্রের দুই বা ততোধিক লোক একসাথে অপর গোত্রের উচ্চারণে কুরআন শিখত, তাদের ইচ্ছানুয়াযী।

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 শিক্ষকের দায়িত্বে সাহাবিগণ

📄 শিক্ষকের দায়িত্বে সাহাবিগণ


আব্দুল্লাহ ইবনু মুগাফফাল মুযানির বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়, যখনই আরব গোত্রের কেউ মদিনায় হিজরত করত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য একজন আনসার সাহাবিকে অভিভাবক হিসেবে নিয়োজিত করতেন। তিনি বলেন, 'আমার ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছিল। একজন আনসার সাহাবি আমাকে দ্বীন এবং কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন।'[১] মদিনায় সাহাবিদের এই কার্যক্রমের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। যথারীতি সবগুলো এখানে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তাই যৎসামান্য কিছু বর্ণনা নিচে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হলো-
> নবিজির জীবনকালেই উবাদা ইবনু সামিত কুরআনের পাঠদান করেছেন।[২]
> উবাই ইবনু কাবও মদিনায় কুরআন শিখিয়েছেন নবিজির জীবদ্দশায়।[৩] এমনকি একজন অন্ধ ব্যক্তিকে তার ঘরে গিয়ে নিয়মিত পাঠদান করে গেছেন।[৪]
> আবু সাইদ খুদরি একবার কয়েকজন মুহাজিরের সাথে ছিলেন। সেখানে তাদের কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাচ্ছিলেন একজন কারি।[৫]
আমরা একে অপরকে কুরআন শোনাচ্ছিলাম, এমন সময় আল্লাহর রাসুল আমাদের কাছে এলেন...।- সাহল ইবনু সাদ আনসারির বর্ণনা।[৬]
উকবা ইবনু আমর বলেছেন, ‘মসজিদে আমরা পরস্পর কুরআন শিক্ষা করছিলাম। এমন সময় আল্লাহর রাসুল এলেন।’[৭]
জাবির ইবনু আব্দিল্লাহর বর্ণনা, ‘কুরআন তিলাওয়াত করছিলাম, এমন সময় আল্লাহর রাসুল আমাদের কাছে এলেন। সেই মজলিসে আরব, অনারব উভয়ই ছিল…’[৮]
আনাস ইবনু মালিক বলেছেন, ‘আরব-অনারব, সাদা-কালো সবাই আমরা তিলাওয়াত করছিলাম, এমন সময় আল্লাহর রাসুল এলেন।’[৯]
এছাড়াও মদিনা ছেড়ে অন্যত্র কুরআনের জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার জন্য সাহাবিদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
মুয়ায ইবনু জাবালকে প্রেরণ করা হয় ইয়েমেনে।[১০]
বিরে মাউনায় কুরআন শেখাতে যাওয়ার পথে অন্ততপক্ষে ৮০ জন সাহাবিকে চক্রান্ত করে শহিদ করা হয়।[১১]
নাজরানে পাঠানো হয় আবু উবাইদাকে।[১২]
ওয়াবরা ইবনু ইউহান্নাস সানআয় (ইয়েমেন) উম্মু সাইদ বিনতু বুজরুগকে কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। এটিও নবিজির জীবদ্দশায় [১৩]

টিকাঃ
১. ইবনু শাব্বা, তারিখুল মদিনা, পৃষ্ঠা: ৪৮৭
২. সুনানু আবি দাউদ: ৩৪১৬; মুসনাদু আহমাদ: ২২৬৮৯; হাদিসটি হাসান।
৩. আবু উবাইদ, ফাযায়িল, পৃষ্ঠা: ২০৭
৪. প্রাগুক্ত
৫. আল-খাতিব, আল-ফাকিহ, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১২২
৬. আবু উবাইদ, ফাযায়িল, পৃষ্ঠা: ৬৮; আল-ফারয়াবি, ফাযায়িল, পৃষ্ঠা: ২৪৬
৭. আবু উবাইদ, ফাযায়িল, পৃষ্ঠা: ৬৯-৭০
৮. আল-ফারয়াবি, ফাযায়িল, পৃষ্ঠা: ২৪৪
৯. মুসনাদু আহমাদ: ১২৪৮৪; আল-ফিরয়াবি, ফাযায়িল, পৃষ্ঠা: ২৪৪-৪৫
১০. আল-খলিফা, তারিখ, পৃষ্ঠা: ৭২; দুলাবি, আল-কুনা, পৃষ্ঠা: ১৯
১১. আল-বালাযুরি, আনসাব, পৃষ্ঠা: ৩৭৫
১২. Ibn Sa’d, Tabaqat, vol: 3, part: 2, p. 299.
১৩. আর-রাযি, তারিখু মাদিনাতি সানআ, পৃষ্ঠা: ১৩১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00