📄 কুরআনের প্রতি নবিজির দায়িত্ব
কুরআনে 'তালা' (ত.) বা আবৃত্তি/পাঠ শব্দটির বিভিন্ন রূপ এসেছে— ইয়ুতলু (يَتْلُو), উতলু (أَتْلُو), তাতলু (تَتْلُو), ইয়াতলু (يَتْلُو) প্রভৃতি। সুরা বাকারার ১২৯ ও ১৫১, আলি ইমরানের ১৬৪, হজের ৩০, আনকাবুতের ৪৫, জুমআর ২ নং এবং আরও অনেক আয়াতে আছে এর ব্যবহার।
প্রতিটির মধ্যেই নবিজিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে পুরো সমাজে ওহির সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার জন্য। শুধু আওড়ে গেলেই হবে না, মানতে হবে নির্দেশনাও। আল্লাহর প্রেরিত বাণীর প্রতি নবিজির কর্তব্য কী, তা অনুধাবন করার জন্য নিচের এ আয়াতগুলো পড়া যেতে পারে। ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দুআয় এর উল্লেখ পাওয়া যায়—
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ )
হে আমাদের রব, আর আপনি তাদের মধ্য তাদের থেকে একজন রাসুল প্রেরণ করুন—যিনি আপনার আয়াতসমূহ তাদের কাছে পড়ে শোনাবেন, তাদের শেখাবেন কিতাব (ধর্মগ্রন্থ) ও হিকমাহ (জ্ঞান-প্রজ্ঞা) আর তাদের পরিশুদ্ধ করবেন। নিশ্চয়ই আপনি মহাশক্তিশালী, প্রজ্ঞাময়।[৩]
এরপর আছে—
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ
আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অবশ্যই অনুগ্রহ করেছেন। তিনি তাদের নিজেদের মধ্য থেকে তাদের কাছে রাসুল পাঠিয়েছেন যিনি তাঁর আয়াতসমূহ তাদের কাছে তিলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের শিক্ষা দেন কিতাব (ধর্মগ্রন্থ) ও হিকমাহ (জ্ঞান-প্রজ্ঞা)। যদিও তারা পূর্বে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে ছিল [১]
كَمَا أَرْسَلْنَا فِيكُمْ رَسُولًا مِنْكُمْ يَتْلُو عَلَيْكُمْ آيَاتِنَا وَيُزَكِّيكُمْ وَيُعَلِّمُكُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُعَلِّمُكُمْ مَا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ
যেমন আমি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে রাসুল পাঠিয়েছি যিনি তোমাদের কাছে আমাদের আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তোমাদের পরিশুদ্ধ করেন, কিতাব (ধর্মগ্রন্থ) ও হিকমাহ (জ্ঞান-প্রজ্ঞা) শিক্ষা দেন এবং এমন সব বিষয় তোমাদের শিক্ষা দেন যা তোমরা জানতে না।
সুরা কিয়ামায় আছে—
لَا تُحَرِّكُ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَأَتَّبِعْ قُرْآنَهُ ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ
তাড়াতাড়ি শিখে নেওয়ার জন্যে আপনি দ্রুত কুরআন তিলাওয়াত করবেন না। এর সংরক্ষণ ও পড়ানোর দায়িত্ব আমারই। কাজেই যখন আমি (জিবরীলের মাধ্যমে) তা তিলাওয়াত করি, তখন আপনি সে তিলাওয়াতের অনুসরণ করবেন। অতঃপর তা (প্রচ্ছন্ন ওহির মাধ্যমে) বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা আমারই দায়িত্ব [৩]
টিকাঃ
১. সূরা আল-ইমরান, আয়াতঃ ১৬৪
২. সূরা বাকারা, আয়াত : ১২৯
৩. সূরা কিয়ামা, আয়াতঃ ১৬-১৭
📄 জিবরিলের সাথে কুরআন তিলাওয়াত
ওহি নাযিল হওয়ার সময়ই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা মুখস্থ করে নিতে চাইতেন। সাথে সাথে দ্রুত জিহ্বা নাড়াতেন পরে ভুলে যাওয়ার আশঙ্কায়। কিন্তু তাকে তড়িঘড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছে উক্ত আয়াতে। সব আয়াত তার সিনায় (বুকে) নির্ভুলভাবে খোদাই করে দেওয়ার ব্যাপারে আশ্বস্ত করা হয়েছে। কুরআনকে কালাতীতভাবে সংরক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন কুরআন অবতীর্ণকারী আল্লাহ তাআলা নিজেই।
নবিজির স্মরণশক্তি সতেজ রাখার লক্ষ্যে প্রতি বছর জibরিল কুরআন শোনাশুনির জন্য তার কাছে আসতেন। কয়েকটি হাদিস দেখা যাক-
ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহর রাসুল আমাকে চুপে চুপে জানিয়েছিলেন, "প্রতি বছর জিবরিল সম্পূর্ণ কুরআন আমাকে একবার এবং আমি তাকে একবার তিলাওয়াত করে শোনাতাম। কিন্তু এ বছর তিনি শুনিয়েছেন দুবার। এতে আমি ধারণা করছি, আমার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসছে।”'[১]
ইবনু আব্বাস হতে বর্ণিত, রামাদানের প্রত্যেক রাতে নবিজির সাথে জিবরিলের সাক্ষাৎ হতো। মাস শেষ হওয়া পর্যন্ত তারা একে অপরকে তিলাওয়াত করে শোনাতেন।[২]
আবু হুরাইরার বর্ণনা অনুযায়ী, প্রতি বছর রামাদানে একে অপরকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন নবিজি এবং জিবরিল। কিন্তু নবিজির ইন্তেকালের বছর তারা দুবার তিলাওয়াত করেছিলেন।[৩]
একই রকম বর্ণনা ইবনে মাসউদের কাছ থেকেও পাওয়া যায়। তিনি আরও যুক্ত করেন, 'নবিজি এবং জibরিল একে অপরকে তিলাওয়াত শোনানো শেষে আমিও নবিজির কাছে তিলাওয়াত করে শোনাতাম। আমার তিলাওয়াত সুন্দর হয়েছে বলে জানাতেন তিনি।'[৪]
জিবরিলের সাথে অধিবেশন শেষে নবিজি যাইদ ইবনু সাবিত এবং উবাই ইবনু
কাবকে পরস্পর তিলাওয়াত করে শোনাতেন।[১] ইন্তেকালের বছরে উবাইকে দুবার তিলাওয়াত করে শুনিয়েছেন নবিজি।[২]
উপরিউক্ত প্রতিটি হাদিসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও জিবরিল আলাইহিস সালামের মধ্যকার তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে 'মুআরাদা' (معارضة) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।[৩]
ওহির প্রতি নবিজির কর্তব্য মূলত অপরিমেয়। ঐশী প্রত্যাদেশ কার্যকর করার একমাত্র হাতিয়ার ছিলেন তিনিই। তার মাধ্যমে তা যথাযথভাবে সংকলিত হয়েছে। তিনি এর প্রয়োজনীয় সকল ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, সমাজে তা প্রচার করেছেন এবং সাহাবিদেরকেও শিখিয়েছেন। আয়াতের অর্থ ব্যাখ্যা করতে তো আর আল্লাহ স্বয়ং নেমে আসেননি। এবং 'অতঃপর তা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা আপনার (মুহাম্মাদের) দায়িত্ব'-জাতীয় কোনো আয়াতও নাযিল হয়নি;[৪] বরং বলা হয়েছে- 'অতঃপর তা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা আমারই দায়িত্ব।' অর্থাৎ নবিজি নিজে থেকে কিছুই বলনেনি; বরং তা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত ঐশী প্রেরণা। কুরআনের ক্ষেত্রে এ কথাটিই প্রযোজ্য।
তাই মুখস্থ করার পর কুরআন তিলাওয়াত, সংকলন, শিক্ষাদান এবং প্রচার করা রাসুল হিসেবে তার প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। অটল সংকল্পে তিনি সেগুলো পালন করে গেছেন, তার কাজের অনুমোদনকারী ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। পরবর্তী
অধ্যায়গুলোতে তার দায়িত্বগুলোর ওপর আলোকপাত করা হবে। আর ওহির ব্যাখ্যা হলো, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ। কুরআনের ব্যাখ্যা এবং দৈনন্দিন জীবনে এর শিক্ষা সমগ্র সুন্নাহর ভেতর খুঁজে পাওয়া যায়।
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৩৬২৪, ৬২৮৫; সহিহ মুসলিম: ২৪৫০
২. সহিদুল বুখারি: ৬, ৩২২০, ৩৫৫৪, ৪৯৯৭; সহিহ মুসলিম: ২৩০৮
৩. সহিহ্বল বুখারি: ৪৯৯৮
৪. তাফসিরুত তাবারি, পৃষ্ঠা: ২৮
৫. A. Jeffery (ed.), Muqaddimatan, p. 227.
৬. ibid, p. 74; তাহির আল-জাযায়িরি, আত-তিবইয়ান, পৃষ্ঠা: ১২৬
৭. 'মুফাআলা' থেকে 'মুআরাদা' এসেছে। এর অর্থ দুজন ব্যক্তি একই কাজে নিয়োজিত। যেমন : মুকাতালা অর্থ পরস্পর লড়াই করা। এভাবে এখানে মুআরাদা ব্যবহারের অর্থ হলো একবার জিবরিল নবিজিকে তিলাওয়াত করে শোনাতেন, আরেকবার নবিজি বলতেন, জিবরিল শুনতেন। তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে মুসলিমদের এই সাধারণ চর্চা আজ পর্যন্ত চালু আছে। আর নবিজি এবং জিবরিলের মধ্যকার মুআরাদার ব্যাপারে উসমান, যাইদ ইবনু সাবিত, আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ অবগত ছিলেন। (ইবন কাসির, ফাযায়িল। খন্ড ৭, পৃষ্ঠা: ৪৪০)
৮. বিভিন্ন আয়াত থেকে বোঝা যায়, কুরআন বিশদভাবে বুঝিয়ে দেওয়াও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দায়িত্ব। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আর আপনার প্রতি আমরা কুরআন নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেন এবং যাতে তারা চিন্তা করে।' (সুরা নাহল, আয়াত: ৪৪) তবে তিনি কুরআনের যা কিছু মানুষকে বিশদভাবে বুঝিয়ে দেন, তার কিছুই নিজে থেকে বলেন না; বরং তা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত হয়েই বলেন। যেমন অন্য আরেকটি আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আর তিনি মনগড়া কথা বলেন না। এটা তো কেবল ওহি, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়।' (সুরা নাজম, আয়াত: ৩-৪)
📄 প্রাচ্যবিদদের উত্থাপিত দাবি প্রসঙ্গে দুটি কথা
কিছু প্রাচ্যবিদ কুরআনুল কারিমের ব্যাপারে এমন কিছু তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছে, যেগুলোকে অদ্ভুত না বলে পারা যাচ্ছে না। যেমন: থিওডর নোয়েলডেকের দাবি অনুযায়ী, প্রথম দিকে আগত ওহিগুলো মুহাম্মাদ ভুলে গিয়েছিলেন। আবার রেভারেন্ড মিনগানার দাবি হলো, মুহাম্মাদ নিজে কিংবা মুসলিম সম্প্রদায়ের কেউই কুরআনকে তেমন একটা গুরুত্বের সাথে সংরক্ষণ করেনি। কিন্তু ইসলামি খিলাফত দ্রুত বাড়তে থাকায় তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা সংরক্ষণ করে যাওয়ার কথা চিন্তা করে। একটু যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ দ্বারা বিচার করলেই উক্ত দাবিগুলোর আর কোনো ভিত্তি থাকে না।
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নবি বলে মানা কিংবা না মানাও এখানে ধর্তব্য নয়। কারণ (নবি না হলেও) নিজের দাবি অনুযায়ীই ঐশী বাণীকে সংরক্ষিত রাখার জন্য তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টাই করবেন। যুক্তি-বুদ্ধি তা-ই বলে। আর যদি তিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসুলই হয়ে থাকেন, তাহলে তো এটিই স্বাভাবিক। আল্লাহর রাসুল হয়ে আল্লাহর বাণী সংরক্ষণ তার পবিত্র দায়িত্ব।
আগের আলোচনা থেকে জানতে পেরেছি, কুরআন হলো তার ওপর অবতীর্ণ হওয়া প্রথম এবং সর্ববৃহৎ মুজিযা বা অলৌকিক নিদর্শন। এর স্বরূপ দেখলেই বোঝা যায়— কোনো মানুষ তা রচনা করেনি। কাজেই তার আল্লাহর নবি হওয়ার সপক্ষে সবচেয়ে বড় এ দলিল উপেক্ষা করা ভীষণ বোকামি।
তবে তর্কের খাতিরে তাকে যদি ভণ্ড ধরেও নিই, কুরআনকে তার নিজের রচনা মনে করি, তাহলেও কি পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে? অবশ্যই না। এরপরেও তিনি কুরআনকে গুরুত্বের সাথেই দেখবেন, সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের ভান ধরবেন। নাহলে তার কপটতা ধরা পড়ে যাবে। আর এমন সাঙ্ঘাতিক ভুল জগতের কোনো নেতাই করতে যাবে না।
নবি হোক কিংবা না হোক, উভয় ক্ষেত্রে কুরআনের প্রতি তার আন্তরিকতা দেখাতেই হবে। এর প্রতি বিন্দু পরিমাণ উদাসীনতাও চরম অযৌক্তিক দাবি বলে সাব্যস্ত হবে। আল্লাহর নির্দেশ কিংবা নিজের স্বার্থ সংরক্ষণ না করে বিপরীতে যাওয়ার মতো এত বড় একটি কাজ নবি দাবিদার মুহাম্মাদ কেন করতে যাবেন? তত্ত্বপ্রণেতারা এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে অপারগ। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
📄 অধ্যায় শেষে
কুরআন হিফজ, শিক্ষাদান, সংরক্ষণ, সংকলন এবং ব্যাখ্যা করা ছিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রধান দায়িত্ব। কুরআনের প্রবল আকর্ষণে শোনার জন্য কান পেতে থাকত মুশরিকরা। নবিজি এবং প্রথম যুগের মুসলিম সমাজ কুরআনের অপরিবর্তিত এবং বিশুদ্ধরূপ নিশ্চিতকরণে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করব।
এই অধ্যায় শেষ করার আগে বর্তমানের একটি বাস্তবতার দিকে তাকাই। চলমান যুগে কতটা সফলতার সাথে কুরআন শিক্ষার ধারা অব্যাহত আছে, তা খেয়াল করি। পৃথিবীজুড়ে মুসলিমরা ইতিহাসের অসহায়তম সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এমন এক যুগ, যেখানে ধর্মবিশ্বাস টিকিয়ে রাখাই দায়। এরকম অবস্থার মাঝেও ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, দেশ-জাতি নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মুসলিম পরিপূর্ণভাবে কুরআন হিফজ করেছে।
এখন এর সাথে বাইবেলের তুলনা করা যাক। প্রায় ২ হাজার ভাষায় অনূদিত এই গ্রন্থ বিশদভাবে মুদ্রিত এবং বণ্টিত হচ্ছে। তাদের তহবিল দেখে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রীয় বাজেটও লজ্জা পেয়ে যাবে। ফলে বাইবেল এমন এক বেস্টসেলার, যা কিনতে প্রচুর মানুষ আগ্রহী হলেও পাঠের ক্ষেত্রে খুব একটা নয়।[১] আর এমন ঔদাসীন্যের গভীরতার মাত্রা সাধারণ মানুষের চিন্তারও বাইরে।
১৯৯৭ সালের ২৬ জানুয়ারিতে The Sunday Times পত্রিকায় খ্রিষ্টানদের ঐশী ১০ আজ্ঞা বা Ten Commandments-এর ওপর করা একটি জরিপের ফলাফল ছাপা হয়। ২০০ এঙ্গলিকান পাদ্রির ওপর করা হয় সেই জরিপ। তারা কোনো ধর্মজ্ঞানহীন সাধারণ খ্রিষ্টান নন। অথচ জরিপ বলছে ব্রিটেনের দুই তৃতীয়াংশ যাজকও ঈশ্বরের ১০ আজ্ঞা সঠিকভাবে বলতে পারেননি! শ্লোকগুলো কিন্তু তাদের একদম মৌলিক নীতিগত বিধান। এই হলো ধর্মপ্রতিনিধিদের অবস্থা!
অন্যদিকে কুরআনের প্রতিটি আয়াত লক্ষ লক্ষ মানুষের স্মৃতিতে সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষিত
আছে।[১] তাই নবিজি থেকে চলে আসা শিক্ষার এ সফলতার ধারা এবং কুরআনের প্রভাব কল্পনার সীমানাকেও হার মানায়।
টিকাঃ
১. যদিও ২৮৬টি (শেষ গণনা অনুযায়ী) ভাষায় বাইবেল অনুদিত হয়েছে এবং প্রচার-প্রকাশের এই যুগে তা বেস্টসেলের মর্যাদা লাভ করেছে, তবুও খুব কম লোকই তা পাঠ করতে আগ্রহী। সুপার মার্কেট, হোটেল, ক্যাসেট এবং প্রচলিত সমাজ-সংস্কৃতিতে তা সর্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকলেও পড়ার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের শতকরা পনেরো ভাগের মতো তা পাঠ করে থাকে। (Manfred Barthel, What Does the Bible Really Say?, England, Souvenir Press Ltd, 1982)
২. খ্রিস্টান ধর্মের প্রথম তিন-চার শতাব্দীতে যাজক হওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীকে ধর্মগ্রন্থের নির্দিষ্ট কিছু অংশ মুখস্থ করতে হতো। তবে পরিমাণের মাত্রা ছিল একেক রকম। কোথাও যোহনের সুসমাচার, কোথাও সামসঙ্গীত বা তিমথির যেকোনো একটি বা উভয়টি মুখস্থ চাওয়া হতো। (Bruce Metzger, The Text of the New Testament, p. 87, footnote no.1) তবে ধর্মগুরু হয়ে কয়েকটি শ্লোক মুখস্থ করার সাথে মুসলিম শিশুদের গোটা কুরআন হিফয করার কোনো তুলনাই চলে না।