📄 কুরআন তিলাওয়াতে মূর্তিপূজারীদের প্রতিক্রিয়া
সময়ের সাথে নবিজি তার দায়িত্বগুলো সামলে নিলেন। দিন হলে একদম কাছের মানুষদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকলেন। তাই আল্লাহ তাকে রাতের নীরবতায় কুরআন তিলাওয়াতের আদেশ দেন—
يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا نِصْفَهُ أَوِ انْقُصْ مِنْهُ قَلِيلًا أَوْ زِدْ عَلَيْهِ وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا )
হে চাদরাবৃত, রাতে দণ্ডায়মান হোন কিছু অংশ বাদ দিয়ে। আধা রাত বা এর চেয়েও কিছু কম অথবা এর চেয়েও একটু বাড়ান। আর কুরআন তিলাওয়াত করুন ধীরে ধীরে সুস্পষ্টভাবে [১]
মুশরিকদের ওপর এই কুরআন তিলাওয়াতের প্রভাব কেমন ছিল, তা জানতে ইবনু ইসহাকের বর্ণনা পড়া যাক—
মুহাম্মাদ ইবনু মুসলিম ইবনি শিহাব জুহরি আমার কাছে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। আবু সুফিয়ান, আবু জাহল এবং আখনাস রাতের বেলা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাড়িতে কান পেতে কুরআন তিলাওয়াত শুনতে যায়। তিনজনেই একেকটি জায়গায় বসে। কিন্তু একে অপরের কথা জানত না কেউই। সারারাত ধরে তাই তারা তিলাওয়াত শুনে যায়। ভোর হলে সরে পড়ে এবং ফিরতি পথে দেখা হয়ে যায় একজনের সাথে আরেকজনের। পরস্পরকে তিরস্কার করে সবাই বলে, 'এরকম আর করবে না। উন্মাদগুলোর কেউ তোমাদের দেখে ফেললে সন্দেহ করতে পারে।' এরপর তারা বিদায় নেয়। কিন্তু ঠিকই দ্বিতীয় রাতে কান পাততে চলে আসে। যথারীতি ভোরে একে অপরকে ভর্ৎসনা। যখন তৃতীয়বারও ধরা পড়ে গেল, তখন তারা আর না আসার কঠিন পণ করে। কয়েক ঘণ্টা পর আখনাস তার ছড়ি হাতে নিয়ে যায় আবু সুফিয়ানের বাড়িতে। নবিজির তিলাওয়াত করা আয়াতগুলোর ব্যাপারে অভিমত জানতে চায়। সে উত্তর দেয়, 'ঈশ্বরের শপথ, যা শুনেছি তার অর্থ জানি না কিংবা এর উদ্দেশ্যও বলতে পারি না।'
আখনাস তখন বলে, 'আমারও একই অবস্থা।' এরপর আবু জাহলের বাড়িতে গিয়ে একই প্রশ্ন করে তারা। সে উত্তরে বলে, 'এটা আমি কী শুনলাম! আমরা আব্দু মানাফরা সর্বদা সম্মানের জন্য প্রতিযোগিতা করে গেছি। তারা গরিবদের আহার দিলে আমরাও দিয়েছি, অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ালে আমরাও দাঁড়িয়েছি, তারা দান-খয়রাত করলে আমরাও হাত খুলেছি। সেয়ানে সেয়ানে দুটি ঘোড়ার মতো প্রতিযোগিতা করেছি আমরা। এখন তারা দাবি করছে, 'আমাদের মাঝে একজন নবি আছেন; যিনি আসমান থেকে ওহি পান।' এ জিনিস আর কবে আমাদের ভাগ্যে জুটবে? ঈশ্বরের কসম, আমরা কখনোই তাকে বিশ্বাস করব না, সত্যবাদীও বলব না।' [২]
তাদের ঘৃণা উপেক্ষা করেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিলাওয়াত করে যেতে লাগলেন। এদিকে কান পেতে শোনা লোকের সংখ্যা বাড়তে লাগল ধীরে ধীরে। কুরাইশদের অনেকেই তাদের এ গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে থাকত।[৩] আল্লাহর তাওহিদ নিয়ে নবিজিকে শত্রুদের সাথে তর্ক করতে নির্দেশ দেওয়া হয়নি। কারণ কুরআনের মাঝেই আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাওহিদের যুক্তি-প্রমাণ রয়েছে। স্পষ্টত এটি কোনো মানুষের রচনা নয়। তাই নবিজির তিলাওয়াত যখন রাতের স্তব্ধতা পার করে দিনেও ছড়িয়ে যেতে লাগল, তখন মক্কার উত্তেজনা ক্রমশ গাঢ় হতে শুরু করল।
ইসলামের জনপ্রিয়তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে দেখে কুরাইশরা ওয়ালিদ ইবনু মুগিরার শরণাপন্ন হয়। সবার উদ্দেশ্যে সে বলল, ‘মেলার মৌসুম ঘনিয়ে এসেছে। আরবের বিভিন্ন প্রতিনিধিদল তোমাদের কাছে আসবে। তারা তোমাদের এই ব্যক্তির (নবিজির) কথা জানবে। তাদের জিজ্ঞাসার প্রেক্ষিতে কী ব্যাখ্যা দেবে, সে ব্যাপারে সবাই একমত হও আগে। কোনো মতপার্থক্য থাকতে পারবে না। একজনের কথা যেন আরেকজনের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়।’
তারা বলল, ‘এ বিষয়ে আপনিই আপনার মতামত আগে জানান।’
সে উত্তর দিল, ‘না, তোমরা বলো, আমি শুনি।’
তখন তারা বলল, ‘তাকে জ্যোতিষী আখ্যা দেব।’
ওয়ালিদ বলল, ‘ঈশ্বরের শপথ, সে জ্যোতিষী না। আমি জ্যোতিষীদের দেখেছি। তার মধ্যে জ্যোতিষির কোনো বৈশিষ্ট্যই নেই। জ্যোতিষীরা যেভাবে অন্তঃসারশূন্য কথা বলে, সে সেভাবে বলে না।’
‘তাহলে পাগল।’
‘উঁহু, পাগলও না। আমি পাগলও দেখেছি, পাগলের প্রকৃতিও দেখেছি। সে পাগলের মতো আচরণ করে না। উলটা-পালটা কথাও বলে না।’
‘কবি বললে কেমন হয়?’
‘না, সে কবিও না। কারণ কবিতার তাবৎ মাত্রা ও ছন্দ সম্পর্কে আমরা অবগত।’
‘তাহলে জাদুকর?’
‘না। আমি জাদু ও জাদুকর দুই-ই দেখেছি। সে ঝাড়ফুঁক করে না, জাদুটোনাও করে না।’
উপস্থিত সকলে বলল, ‘তাহলে আপনিই বলে দেন, হে আবু আব্দি শামস।’
ওয়ালিদ বলল, ‘ঈশ্বরের শপথ, তার কথা বড় মিষ্টি। তাৎপর্যও অনেক গভীর। তোমরা যে কথাই বলবে, শ্রোতারা মিথ্যা মনে করবে। তবে জাদুকরের কথাটা বলতে পার। বলতে পার—তার কথা শোনার পর পিতা-পুত্র, ভাই-ভাই, স্বামী-স্ত্রী কিংবা পরিবারের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়।' [৪]
লুকিয়ে কুরআন শোনার ব্যাপারটি আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথেও ঘটে। তিনি মক্কায় নিজের ঘরের পাশে একটি (ছোট্ট ব্যক্তিগত) মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে নিবেদিত প্রাণে সালাত আদায় এবং কুরআন তিলাওয়াত করতেন। নারী ও শিশুরা আড়ি পেতে তার তিলাওয়াত শুনত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কুরআনের প্রভাব পড়ত তাদের অন্তরে।[৫]
টিকাঃ
১. সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত: ১-৪
২. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 315-16.
৩. ইবনু ইসহাক, আস-সিয়ার ওয়াল-মাগাযি, পৃষ্ঠা: ২০৫-৬
৪. ইবনু ইসহাক, আস-সিয়ার ওয়াল-মাগাযি, সুহাইল যাক্কার সম্পাদিত, পৃষ্ঠা : ১৫১; Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 270-71.
৫. ibn Hisharn, Sira, vol. 1-2, pp. 373; আল-বালাযুরি, আনসাব, পৃষ্ঠা : ২০৬