📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 বদর যুদ্ধের পূর্ব-পরিস্থিতি

📄 বদর যুদ্ধের পূর্ব-পরিস্থিতি


আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে একটি বিশাল কাফেলা মদিনার পার্শ্ববর্তী এলাকা দিয়ে যাচ্ছিল। এ খবর নবিজির কাছে পৌঁছুলে তিনি সেখানে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু আবু সুফিয়ান তা জেনে যায়। তাই সে তার রাস্তা পরিবর্তন করে এবং সৈন্য সাহায্য চেয়ে মক্কার উদ্দেশে একজন দূত পাঠায়। ফলে আবু জাহলের নেতৃত্বে রওনা হয় ১ হাজার যোদ্ধা এবং ৭০০ উট ও ঘোড়া সম্বলিত বাহিনী। শক্তি ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তারা মদিনার দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
ঘটনার এই পট পরিবর্তনের কথা জানতে পেরে নবিজি সাহাবিদের পরামর্শ চান। আবু বকর ও উমার চমৎকার পরামর্শ দেন। এরপর মিকদাদ ইবনু আমর উঠে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেন—
'আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ আপনাকে যে পথ দেখিয়েছেন, এর ওপর অবিচল থাকুন; আমরা আপনার সাথেই আছি। বনি ইসরাইল মুসা আলাইহিস সালামকে যা বলেছিল, আমরা আপনাকে তা বলব না;[১] বরং আমরা বলব, আপনি আপনার রবকে সাথে নিয়ে লড়াই করুন; আমরাও আপনার সঙ্গে লড়ব। যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, সেই মহান সত্তার কসম খেয়ে বলছি—আপনি যদি আমাদেরকে বার্কে গিমাদেওখি নিয়ে যান, তবুও আপনি তা জয় না করা পর্যন্ত আমরা আপনার সাথে দৃঢ়পদে লড়ে যাব।'
তার এ নিঃশঙ্ক বক্তব্য শুনে নবিজি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তার জন্য দুআ করলেন।
নবিজি আবারও বললেন, 'তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও।' মূলত তিনি এখানে আনসারদের পরামর্শ চেয়েছেন। এর মূলত দুটি কারণ ছিল—
এক. তাদের সংখ্যাধিক্য।
দুই. বাইআতে আকাবা অনুযায়ী, তারা মদিনার বাইরে নবিজিকে রক্ষা করতে বাধ্য নয়। তাই মদিনার সীমানার বাইরে আবু জাহলের শক্তিশালী যুদ্ধবহরের বিপরীতে তারা জিহাদ করতে আগ্রহী হবে কি না, সে ব্যাপারে নবিজি সন্দিহান ছিলেন।
কিন্তু নবির কথা শুনে সাদ ইবনু মুয়ায বলে উঠলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আপনি কি আমাদের মতামত জানতে চেয়েছেন?'
জবাব এল, 'হ্যাঁ।'
সাদ এবার বললেন, 'আমরা আপনার ওপর ঈমান এনেছি, আপনাকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছি। আমরা সাক্ষ্য দিয়েছি-আপনি যা কিছু নিয়ে এসেছেন সব সত্য। আমরা আপনার আনুগত্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। কাজেই আপনি যা উত্তম মনে করেন, সেদিকেই অগ্রসর হন। আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করা সেই আল্লাহর শপথ, আপনি আমাদের নিয়ে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলে আমরাও ঝাঁপ দেব। আমাদের একজনও বাদ যাবে না। আগামীকাল আমাদের সাথে করে আপনি শত্রুর মুখোমুখি করলেও আমাদের কোনো রকম আপত্তি নেই। আমরা যুদ্ধে পারদর্শী এবং আস্থাভাজন। এমনও হতে পারে আল্লাহ আমাদের দ্বারা এমন বীরত্ব প্রকাশ করাবেন, যা দেখে আপনার নয়ন জুড়িয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা যে পথে বরকত রেখেছেন, আপনি আমাদের সেই পথে নিয়ে চলুন।' [২]
সাদের কথায় নবিজি আশ্বস্ত ও অনুপ্রাণিত হন। এরপর তারা বদর অভিমুখে যাত্রা করেন। তারা সংখ্যায় ছিলেন মাত্র ৩১৯ জন। আর সাথে ছিল ৭০টি উট এবং মাত্র দুটি ঘোড়া। এই সামান্য সম্বল আর এক আকাশ রহমত-ভরসা নিয়ে তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। ১ হাজার কুরাইশের সুসজ্জিত বিশাল বাহিনী; যার ভেতর ৬০০ আবার লৌহবর্ম পরিহিত সৈন্য। আর সাথে ছিল ১০০ করে উট এবং ঘোড়া।[৩] এই বিশাল বাহিনীর বিপরীতে সাহাবিগণ তাদের ক্ষুদ্র সামর্থ্য নিয়েই ক্ষুধার্ত সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন। দিনশেষে আল্লাহর অনুগ্রহ স্পষ্ট হয়ে গেল মুসলিমদের ওপর। মুশরিকরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো। আরবের মাটিতে একটি শক্তিশালী সত্তা হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিল ইসলামি রাষ্ট্র।

টিকাঃ
১. বনি ইসরাইল বলেছিল, 'আপনি এবং আপনার রব গিয়ে লড়াই করেন। আমরা এখানে বসে থাকব।' (সূরা মায়িদা, আয়াত: ২৪)
২. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 614-5.
৩. মাহদি রিযকল্লাহ, আস-সিরাহ, পৃষ্ঠা: ৩৩৭-৯.

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 খুবাইব ইবনু আদি আনসারির হত্যাকাণ্ড

📄 খুবাইব ইবনু আদি আনসারির হত্যাকাণ্ড


খুবাইব ইবনু আদি আনসারি রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন একজন মুসলিম বন্দী। সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া তাকে শুধু জনসম্মুখে শহিদ করার উদ্দেশ্যে বন্দী করে। এটা মূলত ছিল বদরে তার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ। সকলে ভিড় জমাল ঘটনা দেখার জন্য। আবু সুফিয়ানও ছিল সেখানে। সে খুবাইবকে বিদ্রুপ করে বলে—
'আল্লাহর শপথ করে বলো তো খুবাইব, তুমি কি চাও না, তোমার স্থলে আমরা মুহাম্মাদকে হত্যা করি আর তোমাকে নিজ পরিবারের কাছে ছেড়ে দিই?'
খুবাইবের উত্তর ছিল, 'আল্লাহর কসম! আমি নিজের পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদে থাকব আর আল্লাহর রাসুলের গায়ে একটি কাঁটার আঁচড়ও লাগবে—তা কিছুতেই হতে পারে না!
শুনে আবু সুফিয়ান গজগজ করে বলতে থাকে, ‘এই মুহাম্মাদের মতো আর কাউকে এভাবে অনুসারীদের ভালোবাসা পেতে দেখিনি।’
এরপর খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শিরচ্ছেদ করার আগে একটি একটি করে তার হাত-পা কেটে ফেলে তারা। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ থেকে ছুটতে থাকে রক্তের নহর।

টিকাঃ
১. উরওয়া, আল-মাগাযি, পৃষ্ঠা: ১৭৭

খুবাইব ইবনু আদি আনসারি রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন একজন মুসলিম বন্দী। সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া তাকে শুধু জনসম্মুখে শহিদ করার উদ্দেশ্যে বন্দী করে। এটা মূলত ছিল বদরে তার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ। সকলে ভিড় জমাল ঘটনা দেখার জন্য। আবু সুফিয়ানও ছিল সেখানে। সে খুবাইবকে বিদ্রুপ করে বলে—
'আল্লাহর শপথ করে বলো তো খুবাইব, তুমি কি চাও না, তোমার স্থলে আমরা মুহাম্মাদকে হত্যা করি আর তোমাকে নিজ পরিবারের কাছে ছেড়ে দিই?'
খুবাইবের উত্তর ছিল, 'আল্লাহর কসম! আমি নিজের পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদে থাকব আর আল্লাহর রাসুলের গায়ে একটি কাঁটার আঁচড়ও লাগবে—তা কিছুতেই হতে পারে না!
শুনে আবু সুফিয়ান গজগজ করে বলতে থাকে, ‘এই মুহাম্মাদের মতো আর কাউকে এভাবে অনুসারীদের ভালোবাসা পেতে দেখিনি।’
এরপর খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শিরচ্ছেদ করার আগে একটি একটি করে তার হাত-পা কেটে ফেলে তারা। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ থেকে ছুটতে থাকে রক্তের নহর।

টিকাঃ
১. উরওয়া, আল-মাগাযি, পৃষ্ঠা: ১৭৭

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 মক্কা বিজয়

📄 মক্কা বিজয়


৬ষ্ঠ হিজরির হুদাইবিয়া সন্ধি অনুযায়ী আরব গোত্রগুলোকে মিত্রপক্ষ বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। ফলে বনু বকর কুরাইশদের পক্ষালম্বন করে এবং খুজাআ গোত্র ঐক্যবদ্ধ হয় নবীজির সাথে। কিন্তু বনু বকর চুক্তি ভঙ্গ করে কুরাইশদের সহায়তায় খুজাআ গোত্রে আক্রমণ করে বসে। এমতাবস্থায় হতদন্ত হয়ে কাবাঘরে আশ্রয় নেয় তারা। কিন্তু প্রচলিত আইন অমান্য করে সেখানে রক্তপাত ঘটিয়ে তাদের হত্যা করা হয়। ন্যায়বিচারের জন্য নবীজির দরবারে হাজির হয় শোকাঘাত খুজাআ।
ফলে নবীজি কুরাইশ এবং বনু বকরের সামনে তিনটি পথ খোলা রাখেন। এর মধ্যে শেষটি ছিল হুদাইবিয়ার চুক্তির ইতি টানা। অহংকার প্রদর্শন করে তৃতীয় পথটিই বেছে নিল কুরাইশ। কিন্তু তা যে নির্বুদ্ধিতার কাজ হয়েছে, সেই খেয়াল হওয়ামাত্রই আবু সুফিয়ান দ্রুত হিসাবে মদিনায় এসে চুক্তি নবায়ন করতে চাইল। কিন্তু কোনো ফল হলো না তাতে।
নবীজি এবার প্রস্তুতি নিতে থাকলেন মক্কা আক্রমণের। মুসলিমদের সাথে চুক্তিবদ্ধ সকল গোত্রকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ জারি করা হলো। ২১টি বছর ধরে অন্যায়, অত্যাচার আর পাশবিকতার এহেন কোনো কর্ম নেই, যা কুরাইশরা মুসলিমদের প্রতি করেনি। কিন্তু সময় পালটে যাওয়ার পর খুব ভালোভাবে আসন্ন পরিণতির কথা বুঝতে পারল তারা। ত্রাস আর আতঙ্ক ছেয়ে গেল মক্কার ঘরে ঘরে।
১০ হাজার সৈন্য নিয়ে নবীজি রমজানের ১০ তারিখ মক্কার উদ্দেশ্যে বের হলেন। সময়টা ছিল ৮ম হিজরি। মাররুজ জাহরানে মুসলিমদের শিবির স্থাপিত হলো। কুরাইশরা এ ব্যাপারে কিছুই জানত না। মক্কাবাসীর ওপর অতর্কিত আক্রমণ কিংবা রক্তপাত ঘটানো কোনো ইচ্ছাই নবিজির ছিল না। তিনি চাইছিলেন কুরাইশরা যেন পরিস্থিতি অনুধাবন করে এবং অযথা যুদ্ধে না জড়ায়। এদিকে আবু সুফিয়ান ও হাকিম ইবনু হিযাম গুপ্ত অভিযানে বের হয়ে নবিজির চাচা আব্বাস ইবনু আব্দিল মুত্তালিবের সামনে পড়ে যায়। আবু সুফিয়ানকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে তাকে ইসলাম কবুলের দাওয়াত দেন আব্বাস। তার ইসলামগ্রহণের মাধ্যমে রক্তপাতহীন মক্কাজয়ের পথ তৈরি হয়।
দ্রুত মক্কায় ফিরে এসে আবু সুফিয়ান চিৎকার করে বলতে লাগলেন, 'কুরাইশরা শোনো, মুহাম্মাদ এক অপ্রতিরোধ্য বাহিনী নিয়ে এসেছেন। যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপত্তা পাবে; যে নিজ ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকবে, সেও নিরাপদ; যে পবিত্র ঘরে আশ্রয় নেবে, তার জন্যও নিরাপত্তা।'
এরপর নবিজি নিজের জন্মভূমিতে পা রাখলেন। যে ভূমির লোকেরা কয়েক বছর আগেও তার ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছে, হত্যা করতে চেয়েছে, আজ তাদেরই শহরে বিশাল সৈন্যবহর নিয়েও কোনো রক্ত না ঝরিয়ে সামনে অগ্রসর হচ্ছেন। নামমাত্র কিছু প্রতিরোধ মোকাবিলা করা শেষে কাবার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে কিছু কথা বললেন। সবশেষে বললেন, 'হে কুরাইশ, তোমাদের প্রতি আমি কেমন ব্যবহার করব বলে তোমরা মনে করো?'
তারা বলল, 'আপনি আমাদের সম্মানিত ভাই এবং আরেক সম্মানিত ভাইয়ের পুত্র। আমরা আপনার কাছে উদারতাই কামনা করি।'
শুনে তিনি বললেন- আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। যাও, তোমরা মুক্ত [১]
এভাবে তিনি এক নজিরবিহীন ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন মক্কাবাসীদের প্রতি। অথচ এ লোকগুলোই দীর্ঘ ২০ বছর ধরে মুসলিমদের ওপর লাগাতার নির্যাতন চালিয়ে গেছে।[২]

টিকাঃ
১. Ibn Hisham, Sira, vol. 3-4, pp. 389-412
২. বসওর্থ স্মিথ বলেন, 'তিনি যদি মুখোশধারী হতেন, তাহলে এই ছিল তার আসল রূপ প্রকাশের মোক্ষম সময়... তার উদ্দেশ্য ও কামনা চরিতার্থ করার সুযোগ এটাই ছিল। প্রতিশোধ গ্রহণের এক অব্যর্থ সুযোগ; কিন্তু এমন কোনোকিছু কি আমরা দেখতে পাই? মুহাম্মাদের মক্কা বিজয়ের ঘটনা এবং মারিউসের রোম দখলের ঘটনা পাশাপাশি মিলিয়ে দেখুন... শুধু তখনই আমরা আরব নবির মহানুভবতা এবং মধ্যপন্থার সুপরিচয় পেতে পারি।' (Mohammed and Mohammedanism, London, 1876, p. 142, quoted by A.H Siqqiqui, The Life of Mohammad, Islamic Reseach Academy, Karachi, 1969, p. 313)

৬ষ্ঠ হিজরির হুদাইবিয়া সন্ধি অনুযায়ী আরব গোত্রগুলোকে মিত্রপক্ষ বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। ফলে বনু বকর কুরাইশদের পক্ষালম্বন করে এবং খুজাআ গোত্র ঐক্যবদ্ধ হয় নবীজির সাথে। কিন্তু বনু বকর চুক্তি ভঙ্গ করে কুরাইশদের সহায়তায় খুজাআ গোত্রে আক্রমণ করে বসে। এমতাবস্থায় হতদন্ত হয়ে কাবাঘরে আশ্রয় নেয় তারা। কিন্তু প্রচলিত আইন অমান্য করে সেখানে রক্তপাত ঘটিয়ে তাদের হত্যা করা হয়। ন্যায়বিচারের জন্য নবীজির দরবারে হাজির হয় শোকাঘাত খুজাআ।
ফলে নবীজি কুরাইশ এবং বনু বকরের সামনে তিনটি পথ খোলা রাখেন। এর মধ্যে শেষটি ছিল হুদাইবিয়ার চুক্তির ইতি টানা। অহংকার প্রদর্শন করে তৃতীয় পথটিই বেছে নিল কুরাইশ। কিন্তু তা যে নির্বুদ্ধিতার কাজ হয়েছে, সেই খেয়াল হওয়ামাত্রই আবু সুফিয়ান দ্রুত হিসাবে মদিনায় এসে চুক্তি নবায়ন করতে চাইল। কিন্তু কোনো ফল হলো না তাতে।
নবীজি এবার প্রস্তুতি নিতে থাকলেন মক্কা আক্রমণের। মুসলিমদের সাথে চুক্তিবদ্ধ সকল গোত্রকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ জারি করা হলো। ২১টি বছর ধরে অন্যায়, অত্যাচার আর পাশবিকতার এহেন কোনো কর্ম নেই, যা কুরাইশরা মুসলিমদের প্রতি করেনি। কিন্তু সময় পালটে যাওয়ার পর খুব ভালোভাবে আসন্ন পরিণতির কথা বুঝতে পারল তারা। ত্রাস আর আতঙ্ক ছেয়ে গেল মক্কার ঘরে ঘরে।
১০ হাজার সৈন্য নিয়ে নবীজি রমজানের ১০ তারিখ মক্কার উদ্দেশ্যে বের হলেন। সময়টা ছিল ৮ম হিজরি। মাররুজ জাহরানে মুসলিমদের শিবির স্থাপিত হলো। কুরাইশরা এ ব্যাপারে কিছুই জানত না। মক্কাবাসীর ওপর অতর্কিত আক্রমণ কিংবা রক্তপাত ঘটানো কোনো ইচ্ছাই নবিজির ছিল না। তিনি চাইছিলেন কুরাইশরা যেন পরিস্থিতি অনুধাবন করে এবং অযথা যুদ্ধে না জড়ায়। এদিকে আবু সুফিয়ান ও হাকিম ইবনু হিযাম গুপ্ত অভিযানে বের হয়ে নবিজির চাচা আব্বাস ইবনু আব্দিল মুত্তালিবের সামনে পড়ে যায়। আবু সুফিয়ানকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে তাকে ইসলাম কবুলের দাওয়াত দেন আব্বাস। তার ইসলামগ্রহণের মাধ্যমে রক্তপাতহীন মক্কাজয়ের পথ তৈরি হয়।
দ্রুত মক্কায় ফিরে এসে আবু সুফিয়ান চিৎকার করে বলতে লাগলেন, 'কুরাইশরা শোনো, মুহাম্মাদ এক অপ্রতিরোধ্য বাহিনী নিয়ে এসেছেন। যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপত্তা পাবে; যে নিজ ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকবে, সেও নিরাপদ; যে পবিত্র ঘরে আশ্রয় নেবে, তার জন্যও নিরাপত্তা।'
এরপর নবিজি নিজের জন্মভূমিতে পা রাখলেন। যে ভূমির লোকেরা কয়েক বছর আগেও তার ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছে, হত্যা করতে চেয়েছে, আজ তাদেরই শহরে বিশাল সৈন্যবহর নিয়েও কোনো রক্ত না ঝরিয়ে সামনে অগ্রসর হচ্ছেন। নামমাত্র কিছু প্রতিরোধ মোকাবিলা করা শেষে কাবার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে কিছু কথা বললেন। সবশেষে বললেন, 'হে কুরাইশ, তোমাদের প্রতি আমি কেমন ব্যবহার করব বলে তোমরা মনে করো?'
তারা বলল, 'আপনি আমাদের সম্মানিত ভাই এবং আরেক সম্মানিত ভাইয়ের পুত্র। আমরা আপনার কাছে উদারতাই কামনা করি।'
শুনে তিনি বললেন- আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। যাও, তোমরা মুক্ত [১]
এভাবে তিনি এক নজিরবিহীন ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন মক্কাবাসীদের প্রতি। অথচ এ লোকগুলোই দীর্ঘ ২০ বছর ধরে মুসলিমদের ওপর লাগাতার নির্যাতন চালিয়ে গেছে।[২]

টিকাঃ
১. Ibn Hisham, Sira, vol. 3-4, pp. 389-412
২. বসওর্থ স্মিথ বলেন, 'তিনি যদি মুখোশধারী হতেন, তাহলে এই ছিল তার আসল রূপ প্রকাশের মোক্ষম সময়... তার উদ্দেশ্য ও কামনা চরিতার্থ করার সুযোগ এটাই ছিল। প্রতিশোধ গ্রহণের এক অব্যর্থ সুযোগ; কিন্তু এমন কোনোকিছু কি আমরা দেখতে পাই? মুহাম্মাদের মক্কা বিজয়ের ঘটনা এবং মারিউসের রোম দখলের ঘটনা পাশাপাশি মিলিয়ে দেখুন... শুধু তখনই আমরা আরব নবির মহানুভবতা এবং মধ্যপন্থার সুপরিচয় পেতে পারি।' (Mohammed and Mohammedanism, London, 1876, p. 142, quoted by A.H Siqqiqui, The Life of Mohammad, Islamic Reseach Academy, Karachi, 1969, p. 313)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00