📄 নবিজিকে হত্যার ষড়যন্ত্র
তিন বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা সহ্য করা মক্কার মুসলিমরা মদিনাবাসীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করে হিজরত শুরু করে। কুরাইশরা জানত, নবিজি মদিনায় গেলে তার কাজ আরও দৃঢ় হবে। খুব সহজেই এটা আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে। অদূর ভবিষ্যতে সংঘর্ষ অনিবার্য। আর এই অনিবার্য সংঘর্ষ এড়াতে শত্রুকে এখনই দমন করা চাই। এজন্য কুরাইশরা সর্বসম্মতিক্রমে নবিজিকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিলেন তাদের এই ষড়যন্ত্রের কথা। দ্রুততম সময়ে মদিনায় হিজরতের প্রস্তুতি গ্রহণের আদেশ এল। আবু বকর, তাঁর পরিবার এবং আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুম ছাড়া আর কেউ জানত না এই গোপন প্রস্তুতির কথা। আলিকে নবিজি মক্কায় থেকে যেতে বললেন দুটি কারণে—
এক. শত্রুপক্ষকে ধোঁকা দেওয়া। আলি চাদরমুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকেন নবিজির বিছানায়।[১]
দুই. নবিজির কাছে থাকা মানুষের গচ্ছিত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া।
কেননা এমন পরিস্থিতিতেও মানুষ তাদের জানমালের ব্যাপারে নবিজির ওপর ভরসা করত। মক্কাবাসীর কাছে নবিজির ‘আল-আমিন’ (বিশ্বস্তজন) খেতাব চিরকাল অটুট ছিল।[২]
টিকাঃ
১. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 350-51; ইবনু ইসহাক, আস-সিয়ার ওয়াল-মাগাযি, সংস্করণ: ইবনু বুখাইর, পৃষ্ঠা: ১৫৪-১৬৭
২. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, p. 433.
📄 নবিজি এলেন মদিনায়
আল্লাহর রহমতে কাফিরদের হত্যা-পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করলেন। আর সঙ্গী হিসেবে ছিলেন তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু এবং একান্ত অনুসারী আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু। সাওর পর্বতের অন্ধকারে তারা তিনদিন আত্মগোপনে থাকেন।[১]
নবিজির আগমনে সমগ্র মদিনায় আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল। সময়টা ছিল রবিউল আউয়াল মাস। মদিনার অলিগলিতে সাজসাজ রব পড়ে যায়। ভেসে আসে কাব্য আর আনন্দ ধ্বনি। সীমাহীন নির্যাতন থেকে মুক্তি পেয়ে নবিজি সরাসরি কাজে লেগে পড়েন। খুব সাধারণ একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। তবে ইলম শিক্ষা গ্রহণকারী এবং অতিথিদের জন্য যথেষ্ট জায়গা ছিল সেখানে। জুমআর দিনসহ প্রতিদিন মুসল্লিরা সেখানে সালাত আদায় করতেন। অবিলম্বে একটি সংবিধানও রচিত হলো। মুহাজির[২] ও আনসারদের[৩] একে অপরের প্রতি দায়িত্ব নির্ধারণ করে দেওয়া হয় সেই সংবিধানে। একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ইহুদিদের অবস্থান ও কর্তব্য সম্পর্কেও উল্লেখ ছিল তাতে। এটি বিশ্বের সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান।[৪]
মদিনার জনসংখ্যার অল্প কিছু ছিল ইহুদি জাতি। বাকি পুরোটাই আওস ও খাজরায গোত্র। এই গোত্রদুটো একই বংশভুক্ত হলেও তাদের সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলে। মাঝে মাঝে তাই দাঙ্গা-হাঙ্গামাও হতো। এদিকে ইহুদিরা একবার এদিক তো আবার ওদিক। ফলে আরও ভয়ানক রূপ নিত পরিস্থিতি। নবিজির আগমনের ফলে আওস ও খাজরাযের প্রায় প্রতিটি ঘরে ইসলাম প্রবেশ করে। আর এতে করে একটি নতুন রাজনৈতিক অবস্থার আগমন অবধারিত হতে দাঁড়ায়।
সংবিধান প্রণয়নের দ্বারা সকল মুসলিম ও ইহুদি নাগরিকের ওপর কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব লাভ করেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। যারা তাকে মেনে নিতে পারেনি, তারাও প্রকাশ্য বিরোধিতার বিপদ বুঝতে পারে। দ্বিমুখিতা তাদের স্বভাবে পরিণত হয়। তারাই ছিল মুনাফিক। এই মুনাফিকরা একসময় নবিজি ও সাহাবিদের বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করে। নবিজীবনের অধিকাংশ জুড়ে অব্যাহত ছিল তাদের এ অপচেষ্টা।
মুসলিম-মুশরিক বৈরিতার এক পর্যায়ে বেশ কয়েকটি ছোটখাটো অভিযান ও যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো বদরের যুদ্ধ (রামাদান, দ্বিতীয় হিজরি); উহুদের যুদ্ধ (শাওয়াল, তৃতীয় হিজরি); আহযাব বা খন্দকের যুদ্ধ (শাওয়াল, পঞ্চম হিজরি); বনি কুরাইজার যুদ্ধ (পঞ্চম হিজরি); খাইবারের যুদ্ধ (রবিউল আউয়াল, সপ্তম হিজরি); মুতআর যুদ্ধ (জুমাদাল উলা, অষ্টম হিজরি); মক্কা বিজয় (রামাদান, অষ্টম হিজরি); হুনাইন ও তায়েফের যুদ্ধ (শাওয়াল, অষ্টম হিজরি); তাবুকের যুদ্ধ (রজব, নবম হিজরি)।
এসব যুদ্ধে নবিজির মূল প্রতিপক্ষ মুশরিক বাহিনী হলেও ইহুদি ও খ্রিষ্টানরাও তাতে অংশ নেয়। কুরাইশদের হয়ে মুসলিমদের বিপক্ষে থেকেছে তারা। এখানে কয়েকটি যুদ্ধের বর্ণনা দিচ্ছি। তবে এর উদ্দেশ্য বিস্তারিত তথ্য প্রদান নয়; বরং একটি তুলনা দেখাতে চাই। মুসা আলাইহিস সালামের সময় মরুভূমিতে বনি ইসরাইল বিক্ষিপ্ত হয়ে নিরুদ্দেশ ঘুরে ফিরেছে। ঈসা আলাইহিস সালামের পর কঠিন বাধার মুখে পড়েছে তার ১২ হাওয়ারির অগ্রযাত্রা।[৫] পক্ষান্তরে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় ইসলাম কেবল তিরের বেগে ছুটে গেছে সম্মুখপানে।
টিকাঃ
১. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 485
২. মক্কা থেকে হিজরত করে আসা মুসলিমদের মুহাজির বলা হয়।
৩. মদিনার অধিবাসী মুসলিমদের আনসার বলা হয়।
৪. M. Hamidullah, The First Written Constitution in the World, Lahore, 1975
৫. অধ্যায় ১৪ ও ১৬ দ্রষ্টব্য।
📄 বদর যুদ্ধের পূর্ব-পরিস্থিতি
আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে একটি বিশাল কাফেলা মদিনার পার্শ্ববর্তী এলাকা দিয়ে যাচ্ছিল। এ খবর নবিজির কাছে পৌঁছুলে তিনি সেখানে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু আবু সুফিয়ান তা জেনে যায়। তাই সে তার রাস্তা পরিবর্তন করে এবং সৈন্য সাহায্য চেয়ে মক্কার উদ্দেশে একজন দূত পাঠায়। ফলে আবু জাহলের নেতৃত্বে রওনা হয় ১ হাজার যোদ্ধা এবং ৭০০ উট ও ঘোড়া সম্বলিত বাহিনী। শক্তি ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তারা মদিনার দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
ঘটনার এই পট পরিবর্তনের কথা জানতে পেরে নবিজি সাহাবিদের পরামর্শ চান। আবু বকর ও উমার চমৎকার পরামর্শ দেন। এরপর মিকদাদ ইবনু আমর উঠে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেন—
'আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ আপনাকে যে পথ দেখিয়েছেন, এর ওপর অবিচল থাকুন; আমরা আপনার সাথেই আছি। বনি ইসরাইল মুসা আলাইহিস সালামকে যা বলেছিল, আমরা আপনাকে তা বলব না;[১] বরং আমরা বলব, আপনি আপনার রবকে সাথে নিয়ে লড়াই করুন; আমরাও আপনার সঙ্গে লড়ব। যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, সেই মহান সত্তার কসম খেয়ে বলছি—আপনি যদি আমাদেরকে বার্কে গিমাদেওখি নিয়ে যান, তবুও আপনি তা জয় না করা পর্যন্ত আমরা আপনার সাথে দৃঢ়পদে লড়ে যাব।'
তার এ নিঃশঙ্ক বক্তব্য শুনে নবিজি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তার জন্য দুআ করলেন।
নবিজি আবারও বললেন, 'তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও।' মূলত তিনি এখানে আনসারদের পরামর্শ চেয়েছেন। এর মূলত দুটি কারণ ছিল—
এক. তাদের সংখ্যাধিক্য।
দুই. বাইআতে আকাবা অনুযায়ী, তারা মদিনার বাইরে নবিজিকে রক্ষা করতে বাধ্য নয়। তাই মদিনার সীমানার বাইরে আবু জাহলের শক্তিশালী যুদ্ধবহরের বিপরীতে তারা জিহাদ করতে আগ্রহী হবে কি না, সে ব্যাপারে নবিজি সন্দিহান ছিলেন।
কিন্তু নবির কথা শুনে সাদ ইবনু মুয়ায বলে উঠলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আপনি কি আমাদের মতামত জানতে চেয়েছেন?'
জবাব এল, 'হ্যাঁ।'
সাদ এবার বললেন, 'আমরা আপনার ওপর ঈমান এনেছি, আপনাকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছি। আমরা সাক্ষ্য দিয়েছি-আপনি যা কিছু নিয়ে এসেছেন সব সত্য। আমরা আপনার আনুগত্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। কাজেই আপনি যা উত্তম মনে করেন, সেদিকেই অগ্রসর হন। আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করা সেই আল্লাহর শপথ, আপনি আমাদের নিয়ে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলে আমরাও ঝাঁপ দেব। আমাদের একজনও বাদ যাবে না। আগামীকাল আমাদের সাথে করে আপনি শত্রুর মুখোমুখি করলেও আমাদের কোনো রকম আপত্তি নেই। আমরা যুদ্ধে পারদর্শী এবং আস্থাভাজন। এমনও হতে পারে আল্লাহ আমাদের দ্বারা এমন বীরত্ব প্রকাশ করাবেন, যা দেখে আপনার নয়ন জুড়িয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা যে পথে বরকত রেখেছেন, আপনি আমাদের সেই পথে নিয়ে চলুন।' [২]
সাদের কথায় নবিজি আশ্বস্ত ও অনুপ্রাণিত হন। এরপর তারা বদর অভিমুখে যাত্রা করেন। তারা সংখ্যায় ছিলেন মাত্র ৩১৯ জন। আর সাথে ছিল ৭০টি উট এবং মাত্র দুটি ঘোড়া। এই সামান্য সম্বল আর এক আকাশ রহমত-ভরসা নিয়ে তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। ১ হাজার কুরাইশের সুসজ্জিত বিশাল বাহিনী; যার ভেতর ৬০০ আবার লৌহবর্ম পরিহিত সৈন্য। আর সাথে ছিল ১০০ করে উট এবং ঘোড়া।[৩] এই বিশাল বাহিনীর বিপরীতে সাহাবিগণ তাদের ক্ষুদ্র সামর্থ্য নিয়েই ক্ষুধার্ত সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন। দিনশেষে আল্লাহর অনুগ্রহ স্পষ্ট হয়ে গেল মুসলিমদের ওপর। মুশরিকরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো। আরবের মাটিতে একটি শক্তিশালী সত্তা হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিল ইসলামি রাষ্ট্র।
টিকাঃ
১. বনি ইসরাইল বলেছিল, 'আপনি এবং আপনার রব গিয়ে লড়াই করেন। আমরা এখানে বসে থাকব।' (সূরা মায়িদা, আয়াত: ২৪)
২. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 614-5.
৩. মাহদি রিযকল্লাহ, আস-সিরাহ, পৃষ্ঠা: ৩৩৭-৯.
📄 খুবাইব ইবনু আদি আনসারির হত্যাকাণ্ড
খুবাইব ইবনু আদি আনসারি রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন একজন মুসলিম বন্দী। সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া তাকে শুধু জনসম্মুখে শহিদ করার উদ্দেশ্যে বন্দী করে। এটা মূলত ছিল বদরে তার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ। সকলে ভিড় জমাল ঘটনা দেখার জন্য। আবু সুফিয়ানও ছিল সেখানে। সে খুবাইবকে বিদ্রুপ করে বলে—
'আল্লাহর শপথ করে বলো তো খুবাইব, তুমি কি চাও না, তোমার স্থলে আমরা মুহাম্মাদকে হত্যা করি আর তোমাকে নিজ পরিবারের কাছে ছেড়ে দিই?'
খুবাইবের উত্তর ছিল, 'আল্লাহর কসম! আমি নিজের পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদে থাকব আর আল্লাহর রাসুলের গায়ে একটি কাঁটার আঁচড়ও লাগবে—তা কিছুতেই হতে পারে না!
শুনে আবু সুফিয়ান গজগজ করে বলতে থাকে, ‘এই মুহাম্মাদের মতো আর কাউকে এভাবে অনুসারীদের ভালোবাসা পেতে দেখিনি।’
এরপর খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শিরচ্ছেদ করার আগে একটি একটি করে তার হাত-পা কেটে ফেলে তারা। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ থেকে ছুটতে থাকে রক্তের নহর।
টিকাঃ
১. উরওয়া, আল-মাগাযি, পৃষ্ঠা: ১৭৭
খুবাইব ইবনু আদি আনসারি রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন একজন মুসলিম বন্দী। সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া তাকে শুধু জনসম্মুখে শহিদ করার উদ্দেশ্যে বন্দী করে। এটা মূলত ছিল বদরে তার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ। সকলে ভিড় জমাল ঘটনা দেখার জন্য। আবু সুফিয়ানও ছিল সেখানে। সে খুবাইবকে বিদ্রুপ করে বলে—
'আল্লাহর শপথ করে বলো তো খুবাইব, তুমি কি চাও না, তোমার স্থলে আমরা মুহাম্মাদকে হত্যা করি আর তোমাকে নিজ পরিবারের কাছে ছেড়ে দিই?'
খুবাইবের উত্তর ছিল, 'আল্লাহর কসম! আমি নিজের পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদে থাকব আর আল্লাহর রাসুলের গায়ে একটি কাঁটার আঁচড়ও লাগবে—তা কিছুতেই হতে পারে না!
শুনে আবু সুফিয়ান গজগজ করে বলতে থাকে, ‘এই মুহাম্মাদের মতো আর কাউকে এভাবে অনুসারীদের ভালোবাসা পেতে দেখিনি।’
এরপর খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শিরচ্ছেদ করার আগে একটি একটি করে তার হাত-পা কেটে ফেলে তারা। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ থেকে ছুটতে থাকে রক্তের নহর।
টিকাঃ
১. উরওয়া, আল-মাগাযি, পৃষ্ঠা: ১৭৭