📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 একঘরে করে শাস্তিদান

📄 একঘরে করে শাস্তিদান


নবিজিকে লোভ দেখিয়েও ব্যর্থ হলো কুরাইশ নেতারা। এরপর তারা আবু তালিবের শরণাপন্ন হলো। তিনি ছিলেন নবিজির চাচা। বয়োজ্যেষ্ঠ গোত্রপতি হিসেবে কুরাইশদের কাছে সম্মানের পাত্র। কুরাইশরা তার কাছে নবিজির চালচলনের বিপক্ষে অভিযোগ দায়ের করল। সব শুনে ভাতিজার কাছে অভিযোগগুলো উপস্থাপন করলেন আবু তালিব। চাচার সহযোগিতা হারানোর সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরে নবিজি জবাব দিলেন-
আল্লাহর শপথ, চাচাজান। তারা আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চাঁদ এনে দিলেও আমি আমার কাজ বন্ধ করব না। হয় আল্লাহ আমাকে জয়ী করবেন, নতুবা আমি শেষ হয়ে যাব; কিন্তু এ কাজ থেকে বিচ্যুত হব না।
এরপর তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন। তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। তার কথায় আবু তালিবের মন গলে যায়। ভাতিজাকে ছেড়ে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এরকমভাবে সহযোগিতার আশ্বাস দেয় বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের কিছু উপগোত্র। নিজেরা মূর্তিপূজারি হলেও একজন স্বগোত্রীয়কে বর্জন করতে অস্বীকৃতি জানায় তারা। এবারও ব্যর্থ হয়ে কুরাইশরা আরও কঠোর হয়। বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবকে একঘরে করে রাখার আজ্ঞা জারি করে তারা। তাদের সাথে বাকি কুরাইশদের কোনো রকম ব্যাবসা-বাণিজ্য, বিয়ে-শাদি ও লেনদেন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এমনকি মৌলিক প্রয়োজনাদি পূরণেও অস্বীকৃতি জানানো হয়। দীর্ঘ তিন বছর পর্যন্ত এই নির্মম নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকে। ফলে নবিজি এবং তার সহযোগী গোত্রগুলো কঠিন দুর্ভোগে পতিত হয়। কোনোরকমে বেঁচে থাকে মরুভূমির গাছের পাতা খেয়ে [১]

টিকাঃ
১. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 350-51; ইবনু ইসহাক, আস-সিয়ার ওয়াল-মাগাযি, সংস্করণ: ইবনু বুখাইর, পৃষ্ঠা: ১৫৪-১৬৭

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 আকাবার বাইআত

📄 আকাবার বাইআত


১০ বছর ধরে দ্বীন প্রচারের ফলে কয়েকশ দৃঢ়পদ অনুসারী তৈরি হয়। যত রকম অত্যাচার-নিপীড়ন আছে, তার সবই সহ্য করেছেন তারা। ইতোমধ্যে মদিনাবাসীর কাছেও ইসলামের বার্তা পৌঁছায় এবং তাদের অন্তরে স্থান করে নেয়। মদিনা ছিল মক্কা থেকে ৪৫০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত একটি মরুদ্বীপ। সেখান থেকে কিছু মুসলিম হজের মৌসুমে নবিজিকে দেখতে আসতেন। এভাবে সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে পেতে একসময় তারা নবিজির সাথে আকাবায় গোপনে দেখা করে এবং বাইআত (শপথ) গ্রহণ করে। আকাবা মিনার কাছেই অবস্থিত। রাতের আঁধারে কৃত সেই বাইআতের শর্তগুলো হলো[২]
১. এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক না করা
২. ধর্মীয় সকল বিষয়ে নবিজিকে মান্য করা
৩. চুরি না করা
৪. ব্যভিচার থেকে বিরত থাকা
৫. শিশুহত্যা না করা
৬. কাউকে অপবাদ না দেওয়া।
পরের বছর আরও বড় একটি প্রতিনিধি দল আসে হজের মৌসুমে। তারা নবিজিকে মদিনায় হিজরত করতে আহ্বান জানায়। এবার ৭০ জনের অধিক মদিনাবাসী জড়ো হয়, যার মাঝে দুজন ছিল নারী। সে রাতেই তারা দ্বিতীয়বার আকাবায় বাইআত গ্রহণ করে। এবার সাথে আরেকটি দফা যুক্ত হয়।[১] তা হলো—
৭. নিজেদের স্ত্রী-সন্তানদের মতো আল্লাহর রাসুলকে রক্ষা করতে হবে।
এভাবে নির্যাতিত মুসলিম সম্প্রদায় অবশেষে একটি রাস্তা খুঁজে পায়। নতুন বাসস্থানে তারা সাদরে আমন্ত্রিত হতে থাকে।

টিকাঃ
১. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 350-51; ইবনু ইসহাক, আস-সিয়ার ওয়াল-মাগাযি, সংস্করণ: ইবনু বুখাইর, পৃষ্ঠা: ১৫৪-১৬৭
২. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, p. 433.

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 নবিজিকে হত্যার ষড়যন্ত্র

📄 নবিজিকে হত্যার ষড়যন্ত্র


তিন বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা সহ্য করা মক্কার মুসলিমরা মদিনাবাসীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করে হিজরত শুরু করে। কুরাইশরা জানত, নবিজি মদিনায় গেলে তার কাজ আরও দৃঢ় হবে। খুব সহজেই এটা আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে। অদূর ভবিষ্যতে সংঘর্ষ অনিবার্য। আর এই অনিবার্য সংঘর্ষ এড়াতে শত্রুকে এখনই দমন করা চাই। এজন্য কুরাইশরা সর্বসম্মতিক্রমে নবিজিকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিলেন তাদের এই ষড়যন্ত্রের কথা। দ্রুততম সময়ে মদিনায় হিজরতের প্রস্তুতি গ্রহণের আদেশ এল। আবু বকর, তাঁর পরিবার এবং আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুম ছাড়া আর কেউ জানত না এই গোপন প্রস্তুতির কথা। আলিকে নবিজি মক্কায় থেকে যেতে বললেন দুটি কারণে—
এক. শত্রুপক্ষকে ধোঁকা দেওয়া। আলি চাদরমুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকেন নবিজির বিছানায়।[১]
দুই. নবিজির কাছে থাকা মানুষের গচ্ছিত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া।
কেননা এমন পরিস্থিতিতেও মানুষ তাদের জানমালের ব্যাপারে নবিজির ওপর ভরসা করত। মক্কাবাসীর কাছে নবিজির ‘আল-আমিন’ (বিশ্বস্তজন) খেতাব চিরকাল অটুট ছিল।[২]

টিকাঃ
১. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 350-51; ইবনু ইসহাক, আস-সিয়ার ওয়াল-মাগাযি, সংস্করণ: ইবনু বুখাইর, পৃষ্ঠা: ১৫৪-১৬৭
২. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, p. 433.

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 নবিজি এলেন মদিনায়

📄 নবিজি এলেন মদিনায়


আল্লাহর রহমতে কাফিরদের হত্যা-পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করলেন। আর সঙ্গী হিসেবে ছিলেন তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু এবং একান্ত অনুসারী আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু। সাওর পর্বতের অন্ধকারে তারা তিনদিন আত্মগোপনে থাকেন।[১]
নবিজির আগমনে সমগ্র মদিনায় আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল। সময়টা ছিল রবিউল আউয়াল মাস। মদিনার অলিগলিতে সাজসাজ রব পড়ে যায়। ভেসে আসে কাব্য আর আনন্দ ধ্বনি। সীমাহীন নির্যাতন থেকে মুক্তি পেয়ে নবিজি সরাসরি কাজে লেগে পড়েন। খুব সাধারণ একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। তবে ইলম শিক্ষা গ্রহণকারী এবং অতিথিদের জন্য যথেষ্ট জায়গা ছিল সেখানে। জুমআর দিনসহ প্রতিদিন মুসল্লিরা সেখানে সালাত আদায় করতেন। অবিলম্বে একটি সংবিধানও রচিত হলো। মুহাজির[২] ও আনসারদের[৩] একে অপরের প্রতি দায়িত্ব নির্ধারণ করে দেওয়া হয় সেই সংবিধানে। একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ইহুদিদের অবস্থান ও কর্তব্য সম্পর্কেও উল্লেখ ছিল তাতে। এটি বিশ্বের সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান।[৪]
মদিনার জনসংখ্যার অল্প কিছু ছিল ইহুদি জাতি। বাকি পুরোটাই আওস ও খাজরায গোত্র। এই গোত্রদুটো একই বংশভুক্ত হলেও তাদের সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলে। মাঝে মাঝে তাই দাঙ্গা-হাঙ্গামাও হতো। এদিকে ইহুদিরা একবার এদিক তো আবার ওদিক। ফলে আরও ভয়ানক রূপ নিত পরিস্থিতি। নবিজির আগমনের ফলে আওস ও খাজরাযের প্রায় প্রতিটি ঘরে ইসলাম প্রবেশ করে। আর এতে করে একটি নতুন রাজনৈতিক অবস্থার আগমন অবধারিত হতে দাঁড়ায়।
সংবিধান প্রণয়নের দ্বারা সকল মুসলিম ও ইহুদি নাগরিকের ওপর কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব লাভ করেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। যারা তাকে মেনে নিতে পারেনি, তারাও প্রকাশ্য বিরোধিতার বিপদ বুঝতে পারে। দ্বিমুখিতা তাদের স্বভাবে পরিণত হয়। তারাই ছিল মুনাফিক। এই মুনাফিকরা একসময় নবিজি ও সাহাবিদের বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করে। নবিজীবনের অধিকাংশ জুড়ে অব্যাহত ছিল তাদের এ অপচেষ্টা।
মুসলিম-মুশরিক বৈরিতার এক পর্যায়ে বেশ কয়েকটি ছোটখাটো অভিযান ও যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো বদরের যুদ্ধ (রামাদান, দ্বিতীয় হিজরি); উহুদের যুদ্ধ (শাওয়াল, তৃতীয় হিজরি); আহযাব বা খন্দকের যুদ্ধ (শাওয়াল, পঞ্চম হিজরি); বনি কুরাইজার যুদ্ধ (পঞ্চম হিজরি); খাইবারের যুদ্ধ (রবিউল আউয়াল, সপ্তম হিজরি); মুতআর যুদ্ধ (জুমাদাল উলা, অষ্টম হিজরি); মক্কা বিজয় (রামাদান, অষ্টম হিজরি); হুনাইন ও তায়েফের যুদ্ধ (শাওয়াল, অষ্টম হিজরি); তাবুকের যুদ্ধ (রজব, নবম হিজরি)।
এসব যুদ্ধে নবিজির মূল প্রতিপক্ষ মুশরিক বাহিনী হলেও ইহুদি ও খ্রিষ্টানরাও তাতে অংশ নেয়। কুরাইশদের হয়ে মুসলিমদের বিপক্ষে থেকেছে তারা। এখানে কয়েকটি যুদ্ধের বর্ণনা দিচ্ছি। তবে এর উদ্দেশ্য বিস্তারিত তথ্য প্রদান নয়; বরং একটি তুলনা দেখাতে চাই। মুসা আলাইহিস সালামের সময় মরুভূমিতে বনি ইসরাইল বিক্ষিপ্ত হয়ে নিরুদ্দেশ ঘুরে ফিরেছে। ঈসা আলাইহিস সালামের পর কঠিন বাধার মুখে পড়েছে তার ১২ হাওয়ারির অগ্রযাত্রা।[৫] পক্ষান্তরে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় ইসলাম কেবল তিরের বেগে ছুটে গেছে সম্মুখপানে।

টিকাঃ
১. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 485
২. মক্কা থেকে হিজরত করে আসা মুসলিমদের মুহাজির বলা হয়।
৩. মদিনার অধিবাসী মুসলিমদের আনসার বলা হয়।
৪. M. Hamidullah, The First Written Constitution in the World, Lahore, 1975
৫. অধ্যায় ১৪ ও ১৬ দ্রষ্টব্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00