📄 কুরাইশদের লোভনীয় প্রস্তাব
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা হামজা ইবনু আব্দিল মুত্তালিব ইসলামগ্রহণ করে ফেললেন। মূলত এর পরপরই কুরাইশ নেতারা নড়েচড়ে বসে উঠল। উতবা ইবন রাবিয়া ছিল তাদের নেতৃস্থানীয় লোক। সে নবিজিকে কাবাঘরে একাকী ইবাদত করতে দেখে কুরাইশদের মজলিশে জানান, ‘আমি মুহাম্মাদের কাছে কিছু প্রস্তাব নিয়ে যাব। সে তা গ্রহণ করতে পারে। সে যা চায়, তা-ই আমরা দেব। তাহলে সে আমাদের শান্তিতে থাকতে দেবে।’ উতবা তাই নবিজির কাছে গিয়ে বলল, ‘ভাতিজা, তুমি আমাদেরই একজন। আমাদের কওমে তোমার এবং তোমার বংশের উচ্চ মর্যাদা রয়েছে। তুমি এমন এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নিয়ে নিজের কওমের মাঝে আবির্ভূত হয়েছ, যা সমাজে বিভেদ তৈরি করেছে। তুমি তাদের দ্বীনকে অসত্য বলেছ। তাদের দেব-দেবী ও ধর্মের সমালোচনা করে তাদের পূর্বপুরুষদের কাফির বলে অভিহিত করেছ। সুতরাং আমার কথা মন দিয়ে শোনো। আমি কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করছি। হয়তো তুমি তাতে সায় দেবে।’
নবিজি এতে সম্মত হলে উতবা বলতে লাগল—
‘ভাতিজা, তুমি এগুলো করার মাধ্যমে আসলে কী চাও, সেটা স্পষ্ট করে বলো। তোমার কি ধন-সম্পদ লাগবে? তাহলে আমরা নিজেদের সব সম্পদ জমা করে তোমাকে সবচেয়ে বড় ধনবান বানিয়ে দেব। মর্যাদা লাগবে? লাগলে বলো। আমাদের নেতা বানিয়ে দেব তোমাকে। প্রত্যেকটা কাজ তোমার কথায় হবে। বাদশাহি চাও? বাদশাহ বানিয়ে দেব। আর যদি জিন-ভূতের আছর হয়ে থাকে, তাহলে বলো; চিকিৎসক খুঁজে আনি। প্রয়োজনে আমাদের সব মাল ব্যয় করে তোমাকে সারিয়ে তুলব।’
নবিজি ধৈর্য ধরে সব শোনার পর বললেন, ‘এখন আমি কী বলি, একটু শোনেন।’ তিনি কুরআনুল কারিম থেকে কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে শোনালেন—
تم تَنْزِيلٌ مِنَ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ كِتَابٌ فُصِّلَتْ آيَاتُهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ بَشِيرًا وَنَذِيرًا فَأَعْرَضَ أَكْثَرُهُمْ فَهُمْ لَا يَسْمَعُونَ وَقَالُوا قُلُوبُنَا فِي أَكِنَةٍ مِمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ وَفِي آذَانِنَا وَقْرٌ وَمِنْ بَيْنِنَا وَبَيْنِكَ حِجَابٌ فَاعْمَلْ إِنَّنَا عَامِلُونَ
হা-মিম। এটা অসীম দয়ালু পরম করুণাময়ের কাছ থেকে নাযিলকৃত। এমন এক কিতাব, যার আয়াতগুলো জ্ঞানীদের জন্য বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে কুরআনরূপে আরবি ভাষায়। সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে। অতঃপর তাদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, কাজেই তারা শুনবে না। আর তারা বলে, তুমি আমাদের যার প্রতি আহ্বান করছ, সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আচ্ছাদিত। আমাদের কানে রয়েছে বধিরতা আর তোমার ও আমাদের মধ্যে রয়েছে অন্তরায়। অতএব তুমি (তোমার) কাজ করো, নিশ্চয় আমরা (আমাদের) কাজ করব।[১]
উতবা শুনে চলল নবিজির তিলাওয়াত। সিজদার আয়াত তিলাওয়াত করার পর তিনি সিজদা করলেন এবং উতবাকে বললেন, 'যা শোনার, তা শুনেছেন। এখন বাকিটা আপনার ইচ্ছা।'[২]
টিকাঃ
১. সুরা হা-মিম (ফুসসিলাত), আয়াত : ১-৫
২. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 293-94. ইংরেজি অনুবাদের ক্ষেত্রে রেভারেন্ড গিয়োমের অনুবাদকে বিবেচনা করা হয়েছে।
📄 একঘরে করে শাস্তিদান
নবিজিকে লোভ দেখিয়েও ব্যর্থ হলো কুরাইশ নেতারা। এরপর তারা আবু তালিবের শরণাপন্ন হলো। তিনি ছিলেন নবিজির চাচা। বয়োজ্যেষ্ঠ গোত্রপতি হিসেবে কুরাইশদের কাছে সম্মানের পাত্র। কুরাইশরা তার কাছে নবিজির চালচলনের বিপক্ষে অভিযোগ দায়ের করল। সব শুনে ভাতিজার কাছে অভিযোগগুলো উপস্থাপন করলেন আবু তালিব। চাচার সহযোগিতা হারানোর সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরে নবিজি জবাব দিলেন-
আল্লাহর শপথ, চাচাজান। তারা আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চাঁদ এনে দিলেও আমি আমার কাজ বন্ধ করব না। হয় আল্লাহ আমাকে জয়ী করবেন, নতুবা আমি শেষ হয়ে যাব; কিন্তু এ কাজ থেকে বিচ্যুত হব না।
এরপর তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন। তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। তার কথায় আবু তালিবের মন গলে যায়। ভাতিজাকে ছেড়ে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এরকমভাবে সহযোগিতার আশ্বাস দেয় বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের কিছু উপগোত্র। নিজেরা মূর্তিপূজারি হলেও একজন স্বগোত্রীয়কে বর্জন করতে অস্বীকৃতি জানায় তারা। এবারও ব্যর্থ হয়ে কুরাইশরা আরও কঠোর হয়। বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবকে একঘরে করে রাখার আজ্ঞা জারি করে তারা। তাদের সাথে বাকি কুরাইশদের কোনো রকম ব্যাবসা-বাণিজ্য, বিয়ে-শাদি ও লেনদেন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এমনকি মৌলিক প্রয়োজনাদি পূরণেও অস্বীকৃতি জানানো হয়। দীর্ঘ তিন বছর পর্যন্ত এই নির্মম নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকে। ফলে নবিজি এবং তার সহযোগী গোত্রগুলো কঠিন দুর্ভোগে পতিত হয়। কোনোরকমে বেঁচে থাকে মরুভূমির গাছের পাতা খেয়ে [১]
টিকাঃ
১. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 350-51; ইবনু ইসহাক, আস-সিয়ার ওয়াল-মাগাযি, সংস্করণ: ইবনু বুখাইর, পৃষ্ঠা: ১৫৪-১৬৭
📄 আকাবার বাইআত
১০ বছর ধরে দ্বীন প্রচারের ফলে কয়েকশ দৃঢ়পদ অনুসারী তৈরি হয়। যত রকম অত্যাচার-নিপীড়ন আছে, তার সবই সহ্য করেছেন তারা। ইতোমধ্যে মদিনাবাসীর কাছেও ইসলামের বার্তা পৌঁছায় এবং তাদের অন্তরে স্থান করে নেয়। মদিনা ছিল মক্কা থেকে ৪৫০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত একটি মরুদ্বীপ। সেখান থেকে কিছু মুসলিম হজের মৌসুমে নবিজিকে দেখতে আসতেন। এভাবে সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে পেতে একসময় তারা নবিজির সাথে আকাবায় গোপনে দেখা করে এবং বাইআত (শপথ) গ্রহণ করে। আকাবা মিনার কাছেই অবস্থিত। রাতের আঁধারে কৃত সেই বাইআতের শর্তগুলো হলো[২]
১. এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক না করা
২. ধর্মীয় সকল বিষয়ে নবিজিকে মান্য করা
৩. চুরি না করা
৪. ব্যভিচার থেকে বিরত থাকা
৫. শিশুহত্যা না করা
৬. কাউকে অপবাদ না দেওয়া।
পরের বছর আরও বড় একটি প্রতিনিধি দল আসে হজের মৌসুমে। তারা নবিজিকে মদিনায় হিজরত করতে আহ্বান জানায়। এবার ৭০ জনের অধিক মদিনাবাসী জড়ো হয়, যার মাঝে দুজন ছিল নারী। সে রাতেই তারা দ্বিতীয়বার আকাবায় বাইআত গ্রহণ করে। এবার সাথে আরেকটি দফা যুক্ত হয়।[১] তা হলো—
৭. নিজেদের স্ত্রী-সন্তানদের মতো আল্লাহর রাসুলকে রক্ষা করতে হবে।
এভাবে নির্যাতিত মুসলিম সম্প্রদায় অবশেষে একটি রাস্তা খুঁজে পায়। নতুন বাসস্থানে তারা সাদরে আমন্ত্রিত হতে থাকে।
টিকাঃ
১. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 350-51; ইবনু ইসহাক, আস-সিয়ার ওয়াল-মাগাযি, সংস্করণ: ইবনু বুখাইর, পৃষ্ঠা: ১৫৪-১৬৭
২. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, p. 433.
📄 নবিজিকে হত্যার ষড়যন্ত্র
তিন বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা সহ্য করা মক্কার মুসলিমরা মদিনাবাসীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করে হিজরত শুরু করে। কুরাইশরা জানত, নবিজি মদিনায় গেলে তার কাজ আরও দৃঢ় হবে। খুব সহজেই এটা আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে। অদূর ভবিষ্যতে সংঘর্ষ অনিবার্য। আর এই অনিবার্য সংঘর্ষ এড়াতে শত্রুকে এখনই দমন করা চাই। এজন্য কুরাইশরা সর্বসম্মতিক্রমে নবিজিকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিলেন তাদের এই ষড়যন্ত্রের কথা। দ্রুততম সময়ে মদিনায় হিজরতের প্রস্তুতি গ্রহণের আদেশ এল। আবু বকর, তাঁর পরিবার এবং আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুম ছাড়া আর কেউ জানত না এই গোপন প্রস্তুতির কথা। আলিকে নবিজি মক্কায় থেকে যেতে বললেন দুটি কারণে—
এক. শত্রুপক্ষকে ধোঁকা দেওয়া। আলি চাদরমুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকেন নবিজির বিছানায়।[১]
দুই. নবিজির কাছে থাকা মানুষের গচ্ছিত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া।
কেননা এমন পরিস্থিতিতেও মানুষ তাদের জানমালের ব্যাপারে নবিজির ওপর ভরসা করত। মক্কাবাসীর কাছে নবিজির ‘আল-আমিন’ (বিশ্বস্তজন) খেতাব চিরকাল অটুট ছিল।[২]
টিকাঃ
১. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 350-51; ইবনু ইসহাক, আস-সিয়ার ওয়াল-মাগাযি, সংস্করণ: ইবনু বুখাইর, পৃষ্ঠা: ১৫৪-১৬৭
২. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, p. 433.