📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 আবু বকরের ইসলামগ্রহণ

📄 আবু বকরের ইসলামগ্রহণ


নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবার-বহির্ভূত প্রথম ইসলাম কবুলকারী ব্যক্তি হলেন আবু বকর ইবনু কুহাফা। পরে তাকে সিদ্দিক (মহা সত্যবাদী) উপাধি দেওয়া হয়। তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী এবং সকলের শ্রদ্ধার পাত্র। আর ছিলেন নবিজির সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তিনি তাকে একদিন জিজ্ঞেস করলেন, 'মুহাম্মাদ, আপনার নামে কুরাইশরা যা বলছে, তা কি সত্যি? আপনি নাকি দেব-দেবীদের পরিত্যাগ করেছেন? আমাদের চিন্তাকে হেয় প্রতিপন্ন করে পূর্বপুরুষদের পথকে অবিশ্বাস করেছেন?'
নবিজি উত্তর দিলেন, 'আবু বকর, আমি আল্লাহর নবি এবং তাঁর রাসুল। আমাকে তাঁর বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছে... সত্যকে সাথে নিয়ে আমি আপনাকে আল্লাহর দিকে ডাকছি। এই সত্যের জন্যই আমি আপনাকে তাঁর পথে আহ্বান করছি যার কোনো অংশীদার নেই।'
এরপর তিনি তাকে কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান। এতে আবু বকর এতটাই মুগ্ধ হলেন, কালবিলম্ব না করে ইসলাম কবুল করে নেন।[১]
সম্মানিত ব্যবসায়ী হওয়ার পাশাপাশি কুরাইশদের মাঝে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মর্যাদা অনেক উচ্চ পর্যায়ের ছিল। দ্বীন প্রচারের লক্ষ্যে তিনি এর সদ্ব্যবহার করলেন। তার কাছে যারাই আসত, তাদের মধ্য থেকে বিশ্বস্তদের তিনি ইসলামের দাওয়াত দিতেন। তার এই ডাকে সাড়া দেন অনেকেই। তাদের মধ্যে আছেন—
যুবাইর ইবনুল আওয়াম, উসমান ইবনু আফফান, তালহা ইবনু উবাইদিল্লাহ, সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস এবং আব্দুর রাহমান ইবনু আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুম।
তিনি হয়ে উঠলেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একনিষ্ঠ সমর্থক। যেকোনো বিপদে তিনি নবিজির পক্ষে অবিচল অবস্থান গ্রহণ করতেন। তার ঈমান তাকে এই ব্যাপারে সহযোগিতা করত। ইসরা ও মিরাজের ঘটনার বিবরণ শুনে শুরুর দিককার কিছু মুসলিম একে অবিশ্বাস্য ভেবে ইসলাম ত্যাগ করে। যুক্তি দিয়ে ব্যাপারটিকে মেলাতে পারেনি তারা। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে মক্কার মুশরিকরা আবু বকরকে ফুসলানোর পরিকল্পনা করল। রাতে জেরুযালেম গিয়ে ভোরের আগেই আবার মক্কায় ফিরে আসার ঘটনা তিনি বিশ্বাস করেন কি না, সেটা জানতে চাইল। আবু বকরও সাফ জানিয়ে দিলেন, 'হ্যাঁ, বিশ্বাস করি। এর চেয়েও বড় আশ্চর্যজনক বিষয়ে আমি ঈমান এনেছি। যখন তিনি আসমান থেকে ওহি পাওয়ার কথা বলেছেন, তা-ও আমি বিশ্বাস করেছি।' [২]

টিকাঃ
১. ইবনু ইসহাক, আস-সিয়ার ওয়াল-মাগাযি, ইবনু বুখাইরের সংস্করণ, পৃষ্ঠা: ১৩৯; এখানে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রশ্নের অর্থ এই না, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এককালে মুশরিকদের স্বীতিনীতি অনুসরণ করতেন। এর অর্থ-'আপনি কি প্রকাশ্যে অস্বীকার করেছেন?'
২. আশ-শামি, সুবুলুল হুদা, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ১৩৩

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 প্রকাশ্যে দ্বীনের দাওয়াত

📄 প্রকাশ্যে দ্বীনের দাওয়াত


প্রায় তিন বছর ধরে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গোপনে ইসলাম প্রচার করেন। এরপর হুকুম আসে প্রকাশ্যে দ্বীন প্রচারের-
فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ إِنَّا كَفَيْنَاكَ الْمُسْتَهْزِنِينَ *
কাজেই প্রকাশ্যে ঘোষণা করুন যা আপনাকে আদেশ করা হয়েছে; আর মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। নিশ্চয় বিদ্রূপকারীদের বিরুদ্ধে আমিই আপনার জন্য যথেষ্ট [১]
প্রাথমিকভাবে নবিজি সফলভাবে তার কাজ করতে থাকেন। তখন গোত্রপতিরা ছিল মক্কার বাইরে। কিন্তু ফিরে এসে তারা পরিস্থিতি টের পায়। ইসলাম তাদের কাছে হুমকিস্বরূপ মনে হয়। তাই তারা এই নওমুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে লাগে। দুর্বলদেরকে জোরপূর্বক ফিরিয়ে নেওয়া হয় তাদের আগের ধর্মে। বাকিরা নিজেদের ঈমানে অটুট রয়। এদিকে তাদের নিষ্ঠুরতা আর লাঞ্ছনার পরিমাণ দিনদিন শুধু বেড়েই চলছিল। প্রায় দুই বছর ধরে এই দুঃসহনীয় কষ্ট বহন করার পর প্রাণ ওষ্ঠাগত সাহাবিদের ইথিওপিয়ায়[২] হিজরত করার পরামর্শ দেন নবিজি। [৩] নবুয়তের পঞ্চম বছরে ২০ জনেরও কম মুসলিম হিজরত করে সেখানে।[৪] এদিকে বেড়েই চলেছে মুশরিকদের অত্যাচার এবং ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা। [৫] এভাবে দ্বিতীয় কাফেলাও হিজরত করল। নিজেদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে দেখে এরপর এক ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে মুশরিকরা।

টিকাঃ
১. সূরা হিজর, আয়াত: ৯৪-৯৫
২. ইথিওপিয়ার প্রাচীন নাম হাবাশা। শারয়ি সম্পাদক
৩. উরওয়া, আল-মাগাযি, পৃষ্ঠা: ১০৪
৪. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 322-323; ইবনু সাইয়্যিদিন নাস, উযুনুল আসার, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১১৫
৫. উরওয়া, আল-মাগাযি, পৃষ্ঠা: ১১১

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 কুরাইশদের লোভনীয় প্রস্তাব

📄 কুরাইশদের লোভনীয় প্রস্তাব


নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা হামজা ইবনু আব্দিল মুত্তালিব ইসলামগ্রহণ করে ফেললেন। মূলত এর পরপরই কুরাইশ নেতারা নড়েচড়ে বসে উঠল। উতবা ইবন রাবিয়া ছিল তাদের নেতৃস্থানীয় লোক। সে নবিজিকে কাবাঘরে একাকী ইবাদত করতে দেখে কুরাইশদের মজলিশে জানান, ‘আমি মুহাম্মাদের কাছে কিছু প্রস্তাব নিয়ে যাব। সে তা গ্রহণ করতে পারে। সে যা চায়, তা-ই আমরা দেব। তাহলে সে আমাদের শান্তিতে থাকতে দেবে।’ উতবা তাই নবিজির কাছে গিয়ে বলল, ‘ভাতিজা, তুমি আমাদেরই একজন। আমাদের কওমে তোমার এবং তোমার বংশের উচ্চ মর্যাদা রয়েছে। তুমি এমন এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নিয়ে নিজের কওমের মাঝে আবির্ভূত হয়েছ, যা সমাজে বিভেদ তৈরি করেছে। তুমি তাদের দ্বীনকে অসত্য বলেছ। তাদের দেব-দেবী ও ধর্মের সমালোচনা করে তাদের পূর্বপুরুষদের কাফির বলে অভিহিত করেছ। সুতরাং আমার কথা মন দিয়ে শোনো। আমি কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করছি। হয়তো তুমি তাতে সায় দেবে।’
নবিজি এতে সম্মত হলে উতবা বলতে লাগল—
‘ভাতিজা, তুমি এগুলো করার মাধ্যমে আসলে কী চাও, সেটা স্পষ্ট করে বলো। তোমার কি ধন-সম্পদ লাগবে? তাহলে আমরা নিজেদের সব সম্পদ জমা করে তোমাকে সবচেয়ে বড় ধনবান বানিয়ে দেব। মর্যাদা লাগবে? লাগলে বলো। আমাদের নেতা বানিয়ে দেব তোমাকে। প্রত্যেকটা কাজ তোমার কথায় হবে। বাদশাহি চাও? বাদশাহ বানিয়ে দেব। আর যদি জিন-ভূতের আছর হয়ে থাকে, তাহলে বলো; চিকিৎসক খুঁজে আনি। প্রয়োজনে আমাদের সব মাল ব্যয় করে তোমাকে সারিয়ে তুলব।’
নবিজি ধৈর্য ধরে সব শোনার পর বললেন, ‘এখন আমি কী বলি, একটু শোনেন।’ তিনি কুরআনুল কারিম থেকে কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে শোনালেন—
تم تَنْزِيلٌ مِنَ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ كِتَابٌ فُصِّلَتْ آيَاتُهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ بَشِيرًا وَنَذِيرًا فَأَعْرَضَ أَكْثَرُهُمْ فَهُمْ لَا يَسْمَعُونَ وَقَالُوا قُلُوبُنَا فِي أَكِنَةٍ مِمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ وَفِي آذَانِنَا وَقْرٌ وَمِنْ بَيْنِنَا وَبَيْنِكَ حِجَابٌ فَاعْمَلْ إِنَّنَا عَامِلُونَ
হা-মিম। এটা অসীম দয়ালু পরম করুণাময়ের কাছ থেকে নাযিলকৃত। এমন এক কিতাব, যার আয়াতগুলো জ্ঞানীদের জন্য বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে কুরআনরূপে আরবি ভাষায়। সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে। অতঃপর তাদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, কাজেই তারা শুনবে না। আর তারা বলে, তুমি আমাদের যার প্রতি আহ্বান করছ, সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আচ্ছাদিত। আমাদের কানে রয়েছে বধিরতা আর তোমার ও আমাদের মধ্যে রয়েছে অন্তরায়। অতএব তুমি (তোমার) কাজ করো, নিশ্চয় আমরা (আমাদের) কাজ করব।[১]
উতবা শুনে চলল নবিজির তিলাওয়াত। সিজদার আয়াত তিলাওয়াত করার পর তিনি সিজদা করলেন এবং উতবাকে বললেন, 'যা শোনার, তা শুনেছেন। এখন বাকিটা আপনার ইচ্ছা।'[২]

টিকাঃ
১. সুরা হা-মিম (ফুসসিলাত), আয়াত : ১-৫
২. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 293-94. ইংরেজি অনুবাদের ক্ষেত্রে রেভারেন্ড গিয়োমের অনুবাদকে বিবেচনা করা হয়েছে।

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 একঘরে করে শাস্তিদান

📄 একঘরে করে শাস্তিদান


নবিজিকে লোভ দেখিয়েও ব্যর্থ হলো কুরাইশ নেতারা। এরপর তারা আবু তালিবের শরণাপন্ন হলো। তিনি ছিলেন নবিজির চাচা। বয়োজ্যেষ্ঠ গোত্রপতি হিসেবে কুরাইশদের কাছে সম্মানের পাত্র। কুরাইশরা তার কাছে নবিজির চালচলনের বিপক্ষে অভিযোগ দায়ের করল। সব শুনে ভাতিজার কাছে অভিযোগগুলো উপস্থাপন করলেন আবু তালিব। চাচার সহযোগিতা হারানোর সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরে নবিজি জবাব দিলেন-
আল্লাহর শপথ, চাচাজান। তারা আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চাঁদ এনে দিলেও আমি আমার কাজ বন্ধ করব না। হয় আল্লাহ আমাকে জয়ী করবেন, নতুবা আমি শেষ হয়ে যাব; কিন্তু এ কাজ থেকে বিচ্যুত হব না।
এরপর তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন। তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। তার কথায় আবু তালিবের মন গলে যায়। ভাতিজাকে ছেড়ে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এরকমভাবে সহযোগিতার আশ্বাস দেয় বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের কিছু উপগোত্র। নিজেরা মূর্তিপূজারি হলেও একজন স্বগোত্রীয়কে বর্জন করতে অস্বীকৃতি জানায় তারা। এবারও ব্যর্থ হয়ে কুরাইশরা আরও কঠোর হয়। বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবকে একঘরে করে রাখার আজ্ঞা জারি করে তারা। তাদের সাথে বাকি কুরাইশদের কোনো রকম ব্যাবসা-বাণিজ্য, বিয়ে-শাদি ও লেনদেন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এমনকি মৌলিক প্রয়োজনাদি পূরণেও অস্বীকৃতি জানানো হয়। দীর্ঘ তিন বছর পর্যন্ত এই নির্মম নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকে। ফলে নবিজি এবং তার সহযোগী গোত্রগুলো কঠিন দুর্ভোগে পতিত হয়। কোনোরকমে বেঁচে থাকে মরুভূমির গাছের পাতা খেয়ে [১]

টিকাঃ
১. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 350-51; ইবনু ইসহাক, আস-সিয়ার ওয়াল-মাগাযি, সংস্করণ: ইবনু বুখাইর, পৃষ্ঠা: ১৫৪-১৬৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00