📄 বিশ্বস্তজন
এদিকে কাবাঘরের সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দেয়। কুরাইশের প্রতিটি উপগোত্র যে যার মতো কাজ ভাগ করে নেয়। তারা পাথর দিয়ে কাবার কোনো না কোনো অংশ পুনঃনির্মাণে সাহায্য করে। কিন্তু হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করা নিয়ে বিপত্তি দেখা দেয়। সকলেই এ মহিমান্বিত পাথরটি সুস্থানে বসানোর মর্যাদা পেতে চায়। তর্ক-বিতর্ক একপর্যায়ে রীতিমতো যুদ্ধাবস্থায় রূপ নেয়। বয়োজ্যেষ্ঠ আবু উমাইয়া একটি পরামর্শ প্রদান করেন। পরদিন কাবাচত্বরে একেবারে প্রথমে যিনি প্রবেশ করবেন, তার বিচার মেনে নিতে আহ্বান জানান সবাইকে। প্রত্যেকে এতে সম্মত হয়।
পরদিন দেখা গেল প্রথম প্রবেশ করা ব্যক্তি আর কেউ নন; তিনি হলেন তাদের প্রিয় মুহাম্মাদ। তাকে দেখে সবাই বলে উঠল, ‘এই যে আল-আমিন। তাকে বিচারক হিসেবে পেয়ে আমরা সন্তুষ্ট। ইনি যে মুহাম্মাদ!’ তাদের মতানৈক্যের কথা শুনে তিনি একটি চাদর আনতে বলেন। এর মাঝে হাজরে আসওয়াদ রেখে গোত্রপতিদের চাদরের কিনারা ধরতে বলা হলো। এরপর সবাই মিলে সেটি তুলে নির্ধারিত স্থানে আনলে নবিজি নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করেন। এভাবে সবার সন্তুষ্টিতে বিবাদের নিষ্পত্তি হলো। নির্বিঘ্নে চলতে থাকল নির্মাণকাজ।[১]
টিকাঃ
১. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, p. 196-7.
📄 নবুয়তের দায়িত্ব
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন অনুপম আদর্শ এবং অনন্য চরিত্রের অধিকারী। মূর্তিপূজার প্রতি কখনোই কোনো অনুরাগ ছিল না তার। না কোনোদিন কুরাইশদের প্রতিমার সামনে মাথানত করেছেন, না কখনো যোগ দিয়েছেন তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে। তিনি তাওহিদে বিশ্বাসী ছিলেন। চেষ্টা করতেন সর্বোত্তম পন্থায় আল্লাহর ইবাদত করতে। অক্ষরজ্ঞান না থাকায় ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টধর্মের দীক্ষাও তার ছিল না। এভাবে দ্রুতই তার নবুয়ত লাভের সময় এগিয়ে আসে। আর সেজন্যই মহান আল্লাহ তাআলা তাকে প্রস্তুত করছিলেন ধাপে ধাপে।
উম্মুল মুমিনিন আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে জানা যায়, এই প্রস্তুতির শুরুটা হয়েছে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে।[১] তিনি দেখলেন, পাথর তাকে সালাম জানাচ্ছে।[২]
তিনি জিবরিল আমিনকে দেখলেন, আসমান থেকে তার নাম ধরে ডাকছেন[৩] এবং একটি আলো এসে পড়ছে।[৪]
ছয় মাস পর্যন্ত তার দেখা স্বপ্নগুলো যেন ছিল দিনের আলোর মতো বাস্তব। এরপর হঠাৎ একদিন ওহি নাযিলের সময় এল। তিনি তখন হেরা গুহায় একাকী ধ্যানমগ্ন। এসময় জibril আলাইহিস সালাম এলেন। বারবার তাকে আহ্বান জানালেন পড়ার জন্য। নবিজি বারবারই বলছিলেন, তিনি নিরক্ষর। তবুও নিজ দাবির পুনরাবৃত্তি করতে লাগলেন ফেরেশতা। অবশেষে নবিজির ওপর অবতীর্ণ হলো প্রথম ওহি, সুরা আলাকের কিছু আয়াত-
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَى اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ ) الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمُ *
পড়ুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন; সৃষ্টি করেছেন মানুষকে রক্তপিণ্ড থেকে। পড়ুন; আর আপনার রব মহামহিমান্বিত। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন; শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।[৫]
এই ছিল ওহির শুরু, কুরআন নাযিলের সূচনা।
অপ্রত্যাশিতভাবে ৪০ বছর বয়সী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পরিষ্কার এক বার্তা প্রচারের দায়িত্ব পেলেন। আর তা হলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ; অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর প্রেরিত রাসুল। আর তাকে প্রদান করা হলো কুরআন। যা কিনা একটি জলজ্যান্ত বিস্ময়! মনকে এটি বশ করে নেয়, চিন্তাকে পরিপূর্ণ করে দেয়, মৃত অন্তরেও ঘটায় প্রাণ সঞ্চার।
টিকাঃ
১. সহিহুল বুখারি: ৩, ৪৯৫৩, ৪৯৫৫, ৪৯৫৬, ৬৯৮২; সহিহ মুসলিম: ১৬০
২. সহিহ মুসলিম: ২২৭৭; সুনানুত তিরমিযি: ৩৬২৪; সুনানুদ দারিমি: ২০
৩. উরওয়া ইবনু যুবাইর, আল-মাগাযি, এম. এম. আল-আযমি সংকলিত, মাকতাবাতুত তারবিয়া আল-আরাবিয়া লিদুওয়ালিল খালিজ, ১ম সংস্করণ, রিয়াদ, ১৪০১ (১৯৮১), পৃষ্ঠা: ১০০
৪. ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৩
৫. সূরা আলাক, আয়াত: ১-৫
📄 আবু বকরের ইসলামগ্রহণ
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবার-বহির্ভূত প্রথম ইসলাম কবুলকারী ব্যক্তি হলেন আবু বকর ইবনু কুহাফা। পরে তাকে সিদ্দিক (মহা সত্যবাদী) উপাধি দেওয়া হয়। তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী এবং সকলের শ্রদ্ধার পাত্র। আর ছিলেন নবিজির সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তিনি তাকে একদিন জিজ্ঞেস করলেন, 'মুহাম্মাদ, আপনার নামে কুরাইশরা যা বলছে, তা কি সত্যি? আপনি নাকি দেব-দেবীদের পরিত্যাগ করেছেন? আমাদের চিন্তাকে হেয় প্রতিপন্ন করে পূর্বপুরুষদের পথকে অবিশ্বাস করেছেন?'
নবিজি উত্তর দিলেন, 'আবু বকর, আমি আল্লাহর নবি এবং তাঁর রাসুল। আমাকে তাঁর বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছে... সত্যকে সাথে নিয়ে আমি আপনাকে আল্লাহর দিকে ডাকছি। এই সত্যের জন্যই আমি আপনাকে তাঁর পথে আহ্বান করছি যার কোনো অংশীদার নেই।'
এরপর তিনি তাকে কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান। এতে আবু বকর এতটাই মুগ্ধ হলেন, কালবিলম্ব না করে ইসলাম কবুল করে নেন।[১]
সম্মানিত ব্যবসায়ী হওয়ার পাশাপাশি কুরাইশদের মাঝে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মর্যাদা অনেক উচ্চ পর্যায়ের ছিল। দ্বীন প্রচারের লক্ষ্যে তিনি এর সদ্ব্যবহার করলেন। তার কাছে যারাই আসত, তাদের মধ্য থেকে বিশ্বস্তদের তিনি ইসলামের দাওয়াত দিতেন। তার এই ডাকে সাড়া দেন অনেকেই। তাদের মধ্যে আছেন—
যুবাইর ইবনুল আওয়াম, উসমান ইবনু আফফান, তালহা ইবনু উবাইদিল্লাহ, সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস এবং আব্দুর রাহমান ইবনু আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুম।
তিনি হয়ে উঠলেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একনিষ্ঠ সমর্থক। যেকোনো বিপদে তিনি নবিজির পক্ষে অবিচল অবস্থান গ্রহণ করতেন। তার ঈমান তাকে এই ব্যাপারে সহযোগিতা করত। ইসরা ও মিরাজের ঘটনার বিবরণ শুনে শুরুর দিককার কিছু মুসলিম একে অবিশ্বাস্য ভেবে ইসলাম ত্যাগ করে। যুক্তি দিয়ে ব্যাপারটিকে মেলাতে পারেনি তারা। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে মক্কার মুশরিকরা আবু বকরকে ফুসলানোর পরিকল্পনা করল। রাতে জেরুযালেম গিয়ে ভোরের আগেই আবার মক্কায় ফিরে আসার ঘটনা তিনি বিশ্বাস করেন কি না, সেটা জানতে চাইল। আবু বকরও সাফ জানিয়ে দিলেন, 'হ্যাঁ, বিশ্বাস করি। এর চেয়েও বড় আশ্চর্যজনক বিষয়ে আমি ঈমান এনেছি। যখন তিনি আসমান থেকে ওহি পাওয়ার কথা বলেছেন, তা-ও আমি বিশ্বাস করেছি।' [২]
টিকাঃ
১. ইবনু ইসহাক, আস-সিয়ার ওয়াল-মাগাযি, ইবনু বুখাইরের সংস্করণ, পৃষ্ঠা: ১৩৯; এখানে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রশ্নের অর্থ এই না, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এককালে মুশরিকদের স্বীতিনীতি অনুসরণ করতেন। এর অর্থ-'আপনি কি প্রকাশ্যে অস্বীকার করেছেন?'
২. আশ-শামি, সুবুলুল হুদা, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ১৩৩
📄 প্রকাশ্যে দ্বীনের দাওয়াত
প্রায় তিন বছর ধরে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গোপনে ইসলাম প্রচার করেন। এরপর হুকুম আসে প্রকাশ্যে দ্বীন প্রচারের-
فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ إِنَّا كَفَيْنَاكَ الْمُسْتَهْزِنِينَ *
কাজেই প্রকাশ্যে ঘোষণা করুন যা আপনাকে আদেশ করা হয়েছে; আর মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। নিশ্চয় বিদ্রূপকারীদের বিরুদ্ধে আমিই আপনার জন্য যথেষ্ট [১]
প্রাথমিকভাবে নবিজি সফলভাবে তার কাজ করতে থাকেন। তখন গোত্রপতিরা ছিল মক্কার বাইরে। কিন্তু ফিরে এসে তারা পরিস্থিতি টের পায়। ইসলাম তাদের কাছে হুমকিস্বরূপ মনে হয়। তাই তারা এই নওমুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে লাগে। দুর্বলদেরকে জোরপূর্বক ফিরিয়ে নেওয়া হয় তাদের আগের ধর্মে। বাকিরা নিজেদের ঈমানে অটুট রয়। এদিকে তাদের নিষ্ঠুরতা আর লাঞ্ছনার পরিমাণ দিনদিন শুধু বেড়েই চলছিল। প্রায় দুই বছর ধরে এই দুঃসহনীয় কষ্ট বহন করার পর প্রাণ ওষ্ঠাগত সাহাবিদের ইথিওপিয়ায়[২] হিজরত করার পরামর্শ দেন নবিজি। [৩] নবুয়তের পঞ্চম বছরে ২০ জনেরও কম মুসলিম হিজরত করে সেখানে।[৪] এদিকে বেড়েই চলেছে মুশরিকদের অত্যাচার এবং ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা। [৫] এভাবে দ্বিতীয় কাফেলাও হিজরত করল। নিজেদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে দেখে এরপর এক ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে মুশরিকরা।
টিকাঃ
১. সূরা হিজর, আয়াত: ৯৪-৯৫
২. ইথিওপিয়ার প্রাচীন নাম হাবাশা। শারয়ি সম্পাদক
৩. উরওয়া, আল-মাগাযি, পৃষ্ঠা: ১০৪
৪. Ibn Hisham, Sira, vol. 1-2, pp. 322-323; ইবনু সাইয়্যিদিন নাস, উযুনুল আসার, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১১৫
৫. উরওয়া, আল-মাগাযি, পৃষ্ঠা: ১১১