📄 আরবের ধর্মীয় পরিস্থিতি
নবি-পূর্ববর্তী আরব কোনো প্রকার ধর্মীয় সংস্কারের জন্য তৈরি ছিল না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেখানে অব্যাহত ছিল পৌত্তলিকতা চর্চার ধারা। আরবের ইহুদি বসতি হোক কিংবা সিরিয়া ও মিশর থেকে আসা খ্রিষ্টধর্মের প্রচারণা—কোনো কিছুই তাদের পৌত্তলিকতা থেকে টলাতে পারেনি।
উইলিয়াম মুইরের মতে, ইহুদি বসতির ফলেই খ্রিষ্টানদের বিস্তৃতি প্রতিহত হয়। আর তা সংঘটিত হয় দুভাবে-
এক. আরবের উত্তর সীমান্তবর্তী এলাকায় ইহুদিদের বসবাস। ফলে খ্রিষ্টানরা উত্তর দিক থেকে আর প্রবেশ করতে সক্ষম হয়নি। এ সুযোগে দক্ষিণে পৌত্তলিকরা একচ্ছত্র আধিপত্য লাভ করে।
দুই. ইহুদিধর্মের সাথে আরবের প্রতিমাপূজা একপ্রকার আপসেই চলে আসে। বহিরাগত খ্রিষ্টধর্মের দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য যথেষ্ট উপাদান তারা ইহুদিদের ধর্মীয় আখ্যানগুলোতে পেয়ে গিয়েছিল।[১]
মুইরের এ ধারণার সাথে আমি মোটেই একমত নই। আরবদের অনুসৃত প্রথাগুলো মূলত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও ইসমাইল আলাইহিস সালামের তাওহিদি ধর্মের বিকৃতাংশ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেগুলো অজ্ঞতা আর কুসংস্কারের জালে অপভ্রষ্ট হয়েছে। তাই ইহুদি ও আরবরা যেসব বর্ণনার ব্যাপারে সহমত ছিল, তা মূলত অভিন্ন সূত্রে পাওয়া।
সপ্তম শতাব্দীর খ্রিষ্টান ধর্ম এমনিতেই দুর্নীতি ও লোককথায় ডুবে ছিল। পরিণত হয়েছিল স্থবির এক ধর্মীয় মতবাদে। গোটা আরবকে তাই ধর্মীয় দিক দিয়ে খ্রিষ্টধর্মের দিকে প্ররোচিত করা সম্ভব ছিল না। এর জন্য দরকার ছিল খ্রিষ্টীয় রাজনৈতিক পরাশক্তির।[২] কিন্তু এমন কোনো শক্তির আবির্ভাব না ঘটায় মূর্তিপূজার শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত হয়।
৫০০ বছর ধরে চলা খ্রিষ্টানদের দাওয়াত খুব একটা কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। নাজরানের বনু হারিস, ইয়ামামার বনু হানিফা এবং তাইমার বনু তায়ি ছাড়া আর কোথাও খ্রিস্টান ধর্মের প্রভাব তেমন একটা পরিলক্ষিত হয় না। তবে তাদের মিশনারিদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের নজিরও পাওয়া যায় না এই ৫০০ বছরের ইতিহাসে। কিন্তু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবিদের ভাগ্য মোটেও এমনটি ছিল না। আরবদের চোখে খ্রিষ্টধর্ম ছিল কেবল ছোটখাটো ও সহনীয় গোলযোগ মাত্র। বিপরীতে ইসলামকে দেখা হতো পৌত্তলিক আরবের প্রাতিষ্ঠানিক বুনন ছিন্নভিন্ন করতে সক্ষম এক মহা হুমকি হিসেবে।
টিকাঃ
১. Wilham Muir, The Life of Mahomet, pp. lxxxii-lxxxiii.
২. ibid. p. lxxxiv. সাম্প্রতিককালের ক্ষেত্রে এ কথা আরও বেশি প্রযোজ্য। খ্রিষ্টধর্মের প্রসার প্রায় আয়গায়ই হয়েছে উপনিবেশবাদী অত্যাচারের মাধ্যমে।