📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 মক্কা : গোত্রীয় সমাজব্যবস্থা

📄 মক্কা : গোত্রীয় সমাজব্যবস্থা


নগররাষ্ট্র হলেও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক মক্কা বিজয়ের আগপর্যন্ত মক্কায় গোত্রীয় সমাজব্যবস্থাই প্রচলিত ছিল। একই গোত্রের সকলে একে অপরের ভাই এবং অভিন্ন রক্তের—এ ধারণাকে ঘিরেই আবর্তিত হতো সকল সামাজিক কর্মকাণ্ড। গোত্রীয় ধারণার বাইরেও যে জাতিগত ঐক্যের অন্য কোনো মানদণ্ড থাকতে পারে, তা একজন আরবের পক্ষে কিছুতেই বোঝা সম্ভব ছিল না।
‘তাদের জাতিরাষ্ট্রের ধারণা ছিল বংশীয় সম্পর্কভিত্তিক। এমন এক রাষ্ট্র, যার ভিত্তি হলো রক্তের বাঁধন। ঐক্যের ভিত্তি ছিল আত্মীয়তা। রাষ্ট্র বলতে তারা এমনটিই বুঝত। এটিই ছিল স্বীকৃত এবং সর্বসম্মত নিয়ম।’ [১]
গোত্রের প্রত্যেক সদস্য গোত্রের জন্য একেকটি সম্পদ। বংশে একজন প্রসিদ্ধ কবি, নির্ভীক যোদ্ধা বা দানশীল ব্যক্তি থাকা মানে পুরো গোত্রের সম্মান ও কৃতিত্ব। প্রতিটি শক্তিশালী গোত্রের একটি প্রধান কাজ ছিল প্রতিরক্ষা। শুধু নিজেদের প্রতিরক্ষাই নয়; অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাও ছিল বিশাল মর্যাদার ব্যাপার। তাই তীর্থযাত্রা বা কোনো মেলায় যোগদান করতে আসা কিংবা মুসাফির কাফেলার সবাই মক্কা নগরীতে স্বাগত ছিল।[২] আর এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক ও সমন্বিত কার্যক্রম। এরকম বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য গড়ে ওঠে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। নদওয়া (সদর পরিষদ), মাশওয়ারা (নীতি-নির্ধারণ পরিষদ), কিয়াদা (দিকনির্দেশনা), সাদানা (কাবা প্রশাসন), হিজাবা (দ্বাররক্ষক), সিকায়া (হাজিদের পানি সংস্থান), ইমারাতুল বাইত (কাবার পবিত্রতা রক্ষা), ইফাদা (প্রস্থানের অনুমতি), ইজাযা, নাসি (দিনপঞ্জি নির্ধারণ), কুব্বা (জরুরি খাতে ব্যয়ের জন্য সাহায্য তহবিল গঠন), আয়িন্না (ঘোড়ার লাগাম), রিফাদা (দরিদ্র হাজিদের সাহায্যার্থে আরোপিত কর), আমওয়াল মুহাজ্জারা (অর্ঘ্য প্রদান), আয়সার, আশনাক (অর্থ-সংক্রান্ত দায়ভার হিসাব করা), হুকুমা, সিফারাহ (প্রতিনিধিত্ব), উকাব/রায়াহ (পতাকাবাহক), লিওয়া (নিশান) এবং হুলওয়ানুন নাফর (উপহার)। এর অনেকগুলো আবার প্রতিষ্ঠা করে গেছেন কুসাই নিজেই।[৩]

টিকাঃ
১. ইবনু হিশাম, সিরাত, খণ্ড: ৩-৪, পৃষ্ঠা: ৩১৫
২. ইতোমধ্যে কাবার চারপাশে শত শত মূর্তি গড়ে উঠেছিল।
৩. The City State of Mecca, pp. 261-276.

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 কুসাই থেকে নবিজি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম

📄 কুসাই থেকে নবিজি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম


সব মিলিয়ে কুসাইয়ের বংশধররা নানাবিধ দায়িত্ব পালন করতে থাকে। যেমন: আব্দুল দারের সন্তানেরা কাবা ও সভাকক্ষ রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি যুদ্ধের সময় পতাকা বহনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়। [১] এদিকে রোমান ও বনু গাসসানদের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করে চলে আব্দু মানাফ। আব্দু মানাফের পুত্র হাশিম নিজে একটি চুক্তি সম্পন্ন করেন। সম্রাটের পক্ষ থেকে কুরাইশরা সিরিয়ায় পূর্ণ নিরাপত্তায় ব্যবসা করার অনুমতিপ্রাপ্ত হয়। [২] এভাবে হাজিদের জন্য খাদ্য ও পানীয় সরবরাহের দায়িত্ব পালন করে যান হাশিম ও তার বংশ। হাজিদেরকে রাজকীয় আপ্যায়নে বরণ করে নেওয়ার মতো সম্পদ ছিলও বটে তার। [৩]
ব্যবসার কাজে মদিনায় অবস্থানকালে খাজরায গোত্রের এক নারীকে দেখে হাশিমের ভালো লেগে যায়। তার নাম ছিল সালমা বিনতু আমর। তাকে বিয়ে করে মক্কায় নিয়ে আসেন তিনি। তবে গর্ভে সন্তানধারণের পর সালমা আবার মদিনায় ফেরত আসেন। জন্ম দেন শাইবা নামের একটি পুত্রসন্তানের। হাশিম ব্যবসার কাজে গাযায় থাকাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন এবং সন্তানের দেখাশোনার দায়ভার তার ভাই মুত্তালিবের হাতে অর্পণ করে যান। [৪] শাইবা তখনো তার মায়ের কাছে। তাই তাকে নিজের তত্ত্বাবধানে আনার জন্য মুত্তালিব মদিনায় এলে শাইবার মায়ের সাথে তার মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। তবে শেষমেশ জয় হয় তারই। চাচা আর ভাতিজা মিলে মক্কায় ফেরত আসেন। এদিকে লোকেরা শাইবাকে মুত্তালিবের দাস (عبد) ভেবে বসে। এভাবে তার নাম হয়ে যায় আব্দুল মুত্তালিব (মুত্তালিবের দাস)। [৫]
চাচার মৃত্যুর পর সিকায়া[৬] ও রিফাদারণি[৭] দায়িত্ব আব্দুল মুত্তালিবের হস্তগত হয়। এদিকে দীর্ঘকাল ধরে বালুচাপা পড়ে থাকা জমজমকে আবার স্বরূপে ফিরিয়ে আনেন তিনি। ফলে তার মানমর্যাদা এত বেড়ে যায়—এর মাধ্যমে তিনি মক্কার প্রধান অধিপতি বনে যান।
একবার একটি মানত করেন আব্দুল মুত্তালিব। ১০ জন পুত্রসন্তানের জনক হতে পারলে তিনি তাদের একজনকে দেবতার নামে উৎসর্গ করবেন। সেই ইচ্ছাটি পূরণ হওয়ার পর মানত পূর্ণ করা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। সেসময় লটারির মতো একটি পদ্ধতি ছিল ভাগ্য-নির্ধারক তির। সম্ভাব্য প্রতিটি বিকল্পের নাম একেকটি তিরের গায়ে লিখে দৈবচয়নে যেকোনো একটি বেছে নেওয়া হতো। উৎসর্গের জন্য সন্তান নির্বাচন করতে আব্দুল মুত্তালিবও এ পদ্ধতি অনুসরণ করেন। এতে করে উঠে আসে কনিষ্ঠ পুত্র আব্দুল্লাহর নাম। এদিকে কুরাইশদের মাঝে মনুষ্য উৎসর্গের প্রচলন অপছন্দনীয় ছিল। তাই তিনি গণকের শরণাপন্ন হলে আব্দুল্লাহর বদলে উট উৎসর্গের অনুমতি পান। এভাবে ১০০টি উটের বদলে পুত্রের প্রাণ রক্ষা হয়।
এ সমস্ত ঘটনার পর খুশি মনে আব্দুল্লাহকে নিয়ে মদিনায় আত্মীয়দের সাথে দেখা করতে যান আব্দুল মুত্তালিব। সেখানে আব্দুল্লাহ বিয়ে করেন উহাইবের ভাতিজি আমিনাকে। উহাইব ছিল একই বংশভুক্ত এবং তাদের মেজবান।[৮] কিছুদিন ব্যক্তিগত জীবন উপভোগ করার পর আব্দুল্লাহ ব্যবসার কাজে সিরিয়া যান। পথিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। মৃত্যুবরণ করেন মদিনায় ফিরে এসেই। ততদিনে আমিনা গর্ভে ইতিহাস ধারণ করে ফেলেছেন, চলে এসেছেন মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

টিকাঃ
১. William Muir, The Life of Mahomet, 3rd edition, Smith, Elder, & Co., London, 1894, p. xcvi
২. ibid, p. xcvii.
৩. ibid, p. xcvi
৪. Ibn Hisham, Sira, Vol. 1-2, p. 137.
৫. ibid.
৬. হজের মৌসুমে হাজিদের পানি পান করাকে সিকায়া বলে।—শারয়ি সম্পাদক
৭. হজের মৌসুমে হাজিদের মেহমানদারি সুরূপ খাবারের ব্যবস্থাপনাকে রিফাদা বলে।—শারয়ি সম্পাদক
৮. আমিনার পিতার নাম ওয়াহব, আর তার চাচার নাম উহাইব। আমিনার কোনো ভাই-বোন ছিল না। আমিনা উহাইবের ভাতিজি ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর আমিনা তার চাচা উহাইবের তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হন। (আহমদ তাবারি, জাখায়িরুল উকবা ফি মানাকিবি জাবিল কুরবা, পৃষ্ঠা: ২৫৮; আস-সিরাতুল হালাবিয়্যা, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬৭)

📘 কুরআন সংকলনের ইতিহাস > 📄 আরবের ধর্মীয় পরিস্থিতি

📄 আরবের ধর্মীয় পরিস্থিতি


নবি-পূর্ববর্তী আরব কোনো প্রকার ধর্মীয় সংস্কারের জন্য তৈরি ছিল না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেখানে অব্যাহত ছিল পৌত্তলিকতা চর্চার ধারা। আরবের ইহুদি বসতি হোক কিংবা সিরিয়া ও মিশর থেকে আসা খ্রিষ্টধর্মের প্রচারণা—কোনো কিছুই তাদের পৌত্তলিকতা থেকে টলাতে পারেনি।
উইলিয়াম মুইরের মতে, ইহুদি বসতির ফলেই খ্রিষ্টানদের বিস্তৃতি প্রতিহত হয়। আর তা সংঘটিত হয় দুভাবে-
এক. আরবের উত্তর সীমান্তবর্তী এলাকায় ইহুদিদের বসবাস। ফলে খ্রিষ্টানরা উত্তর দিক থেকে আর প্রবেশ করতে সক্ষম হয়নি। এ সুযোগে দক্ষিণে পৌত্তলিকরা একচ্ছত্র আধিপত্য লাভ করে।
দুই. ইহুদিধর্মের সাথে আরবের প্রতিমাপূজা একপ্রকার আপসেই চলে আসে। বহিরাগত খ্রিষ্টধর্মের দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য যথেষ্ট উপাদান তারা ইহুদিদের ধর্মীয় আখ্যানগুলোতে পেয়ে গিয়েছিল।[১]
মুইরের এ ধারণার সাথে আমি মোটেই একমত নই। আরবদের অনুসৃত প্রথাগুলো মূলত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও ইসমাইল আলাইহিস সালামের তাওহিদি ধর্মের বিকৃতাংশ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেগুলো অজ্ঞতা আর কুসংস্কারের জালে অপভ্রষ্ট হয়েছে। তাই ইহুদি ও আরবরা যেসব বর্ণনার ব্যাপারে সহমত ছিল, তা মূলত অভিন্ন সূত্রে পাওয়া।
সপ্তম শতাব্দীর খ্রিষ্টান ধর্ম এমনিতেই দুর্নীতি ও লোককথায় ডুবে ছিল। পরিণত হয়েছিল স্থবির এক ধর্মীয় মতবাদে। গোটা আরবকে তাই ধর্মীয় দিক দিয়ে খ্রিষ্টধর্মের দিকে প্ররোচিত করা সম্ভব ছিল না। এর জন্য দরকার ছিল খ্রিষ্টীয় রাজনৈতিক পরাশক্তির।[২] কিন্তু এমন কোনো শক্তির আবির্ভাব না ঘটায় মূর্তিপূজার শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত হয়।
৫০০ বছর ধরে চলা খ্রিষ্টানদের দাওয়াত খুব একটা কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। নাজরানের বনু হারিস, ইয়ামামার বনু হানিফা এবং তাইমার বনু তায়ি ছাড়া আর কোথাও খ্রিস্টান ধর্মের প্রভাব তেমন একটা পরিলক্ষিত হয় না। তবে তাদের মিশনারিদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের নজিরও পাওয়া যায় না এই ৫০০ বছরের ইতিহাসে। কিন্তু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবিদের ভাগ্য মোটেও এমনটি ছিল না। আরবদের চোখে খ্রিষ্টধর্ম ছিল কেবল ছোটখাটো ও সহনীয় গোলযোগ মাত্র। বিপরীতে ইসলামকে দেখা হতো পৌত্তলিক আরবের প্রাতিষ্ঠানিক বুনন ছিন্নভিন্ন করতে সক্ষম এক মহা হুমকি হিসেবে।

টিকাঃ
১. Wilham Muir, The Life of Mahomet, pp. lxxxii-lxxxiii.
২. ibid. p. lxxxiv. সাম্প্রতিককালের ক্ষেত্রে এ কথা আরও বেশি প্রযোজ্য। খ্রিষ্টধর্মের প্রসার প্রায় আয়গায়ই হয়েছে উপনিবেশবাদী অত্যাচারের মাধ্যমে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00