📄 ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অবস্থা
তিন মহাদেশের মধ্যস্থলে দাঁড়িয়ে আছে আরব উপদ্বীপ। পুরোনো বিশ্ব-মানচিত্রে একদম প্রাণকেন্দ্রে তার অবস্থান। তাকালে মনে হবে নিজের অনন্য পরিচয় স্বমহিমায় প্রকাশ করছে যেন। পশ্চিমে সীমানা বেঁধেছে লোহিত সাগর, পূর্বে পারস্য উপসাগর, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর এবং উত্তরে সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়া। রুক্ষ-শুষ্ক এ অঞ্চলের পশ্চিম উপকূলে আছে সারাওয়াত পর্বতমালা আর কিছু সবুজের সমারোহ। ভূগর্ভস্থ পানির উৎস সেখানকার পানির অভাব কিছুটা লাঘব করে। ফলে বেড়ে ওঠা মরুদ্যানকে ঘিরে টিকে আছে জনবসতি এবং যাযাবর কাফেলা।
ইতিহাসের শুরু থেকেই আরব উপদ্বীপে মানববসতি গড়ে উঠেছে। তৃতীয় শতাব্দীর আগেই। সেখানে নগররাষ্ট্র গড়ে তোলে পারস্য উপসাগর এলাকার অধিবাসীরা। বহু গবেষক একে সকল সেমিটিক জাতির উৎপত্তিস্থল বলে অভিহিত করেছেন। অ্যালয়স প্রেঙ্গার, আর্চিবল্ড হেনরি সেস, মাইকেল ডা গোয়ে, কার্ল ব্রকেলম্যান-সহ আরও অনেকেই এ ব্যাপারে একমত। [১] ভিন্নমতও আছে। যেমন: ফন ক্রেমার, গাইড ও হোমেল ব্যাবিলনের কথা বলেছেন।[২] নোয়েলডেক ও অন্যদের মতে আফ্রিকা,[৩] এ.টি. ক্লের মতে আমুরু,[৪] জন পিটার্সের মতে আরমেনিয়া,[৫] জোহরি ফিলিপির মতে আরব উপদ্বীপের দক্ষিণাংশ[৬] আর উংনান্ডের মতে ইউরোপ[৭]।
ফিলিপ হিটি তার History of Arabs গ্রন্থে লিখেছেন— 'আমেরিকায় ব্যাপক ইহুদি উপস্থিতির প্রভাবে বর্তমানে পশ্চিমাধারায় সেমিটিক বলতে শুধু ইহুদিদেরই বোঝানো হয়। কিন্তু তা মূলত অন্য যেকোনো জাতির তুলনায় আরবদের ক্ষেত্রে অধিক প্রযোজ্য। তাদের শারীরিক গঠন, রীতিনীতি, আচার-আচরণ, ভাষা ও চিন্তাধারায় সেমিটিক বৈশিষ্ট্য এখনও অটুট রয়েছে। ফলত ইতিহাসের পাতায় সকল যুগে একই রকম রয়ে গেছে আরবরা।[৮]
জাতিগত উৎপত্তিস্থল-সংক্রান্ত মতবাদগুলোর অধিকাংশই এসেছে ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকেও কিছু তথ্য পাওয়া যায়।[৯] তবে এর অধিকাংশের কোনো ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতা নেই এবং তা বিজ্ঞানসম্মতও নয়। যেমন : এলামাইট, লুডিমের মতো জাতিগুলোকেও সেমিটিক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যারা কিনা মূলত সেমাইট নয়। আবার ফিনিকান, ক্যানানাইটের মতো অনেক সেমিটিক জাতিকে উপেক্ষা করা হয়েছে।[১০] তাই সেমিটিকদের উৎপত্তিস্থল আরব বলেই আমার মতামত। আরবীয় এবং বনি ইসরাইল উভয় জাতিই ইবরাহিম আলাইহিস সালামের বংশধর। কোন জাতি সেমিটিক আর কোনটি এর বহির্ভূত তা এখান থেকে বোঝা যাবে।[১১]
টিকাঃ
১. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৩১-২৩২
২. জাওয়াদ আলি, আল-মুফাসসাল ফি তারিখিল আরব কবলাল ইসলাম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৫৬৯
৩. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৩৫
৪. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৩৮
৫. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৩৮
৬. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৩২-২৩৩
৭. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৩৮
৮. M. Mohar Ali, Sirat an-Nabi, vol. 1A, pp. 30-31, quoting P.K. Hitti, History of the Arabs, pp. 8-9.
৯. জাওয়াদ আলি, আল-মুফাসসাল, পৃষ্ঠা: ২২৩
১০. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২২৪
১১. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৬৩০। পুরাতন নিয়ম অনুযায়ীও আরবীয় এবং বনি ইসরাইল উভয় জাতিই ইবরাহিম আলাইহিস সালামের বংশধর। পুরাতন নিয়ম অনুযায়ীও আরবীয় এবং ইহুদিরা নোয়াহর (নুহ আলাইহিস সালামের) পুত্র শেমের (সাম) উত্তরসূরি।
📄 ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এবং মক্কা
ইবরাহিম আলাইহিস সালামের বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহ তাআলা তাকে একজন পুত্রসন্তান দান করেন। নাম তার ইসমাইল আলাইহিস সালাম। ইসমাইলের মা হাজার[১] ছিলেন একজন দাসী। ফেরোস[২] তাকে সারার[৩] জন্য উপহারস্বরূপ পাঠায়। বাইবেল অনুযায়ী, ইসমাইলের জন্মের পর হাজারের প্রতি হিংসার বশবর্তী হন সারা। নির্দেশ দেন মা ও সন্তান উভয়কেই নির্বাসনে পাঠানোর। পারিবারিক এই অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি হয়ে ইসমাইল ও হাজারকে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম মক্কার রুক্ষ প্রান্তরে নিয়ে আসেন। জনমানবহীন তপ্ত মরুভূমি, খাদ্য-পানি কিছুই নেই। চারদিকের শূন্যতা দেখে হতবিহ্বল হয়ে পড়লেন হাজার। এরপর ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ফিরে যেতে গেলে তিনি তিনবার তাকে এই নির্বাসনের কারণ জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু ইবরাহিম কোনো উত্তরই দিলেন না। তাই তিনি জিজ্ঞেস করলেন তা আল্লাহর নির্দেশ কি না। এবার ইবরাহিম বললেন, 'হ্যাঁ'। এ কথা শুনে হাজার উত্তর দিলেন, 'তাহলে তিনি আমাদের ধ্বংস করবেন না।' আর হয়েছিলও তা-ই। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে খাদ্য-বস্ত্রহীন অসহায় অবস্থায় একাকী ছেড়ে দিয়ে ধ্বংস করেননি। মরু ফুঁড়ে তিনি জমজমের ধারা বের করলেন। শিশু ইসমাইলের পদযুগলের কাছ থেকে প্রবাহিত হলো সে ধারা। আর এই জমজমকে ঘিরেই গড়ে উঠল এ অঞ্চলের সর্বপ্রথম বসতি। জুরহুম গোত্র এ অঞ্চল অতিক্রমকালে জমজমের পানি দেখে সেখানে থাকার ইচ্ছা পোষণ করল, অতঃপর হাজারের অনুমতি নিয়ে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে লাগল।[৪]
কয়েক বছর পর ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এসে তার পুত্রকে একটি স্বপ্নের কথা জানালেন-
فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلُ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ . وَفَدَيْنَاهُ بِذِنْحٍ عَظِيمٍ
অতঃপর তিনি যখন তার পিতার সাথে কাজ করার মতো বয়সে উপনীত হলেন, তখন ইবরাহিম বললেন, 'প্রিয় ছেলে, স্বপ্নে দেখলাম তোমাকে আমি জবাই করছি। এখন তোমার অভিমত কী, বলো।' তিনি বললেন, 'বাবা, আপনি যা আদেশপ্রাপ্ত হয়েছেন, তা-ই করেন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।'... আর আমি তাকে মুক্ত করলাম এক বড় কুরবানির বিনিময়ে। [৫]
এই ঘটনায় খুশি হয়ে আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম ও ইসমাইলকে একটি মহান দায়িত্ব প্রদান করলেন। তাদেরকে পৃথিবীর বুকে প্রথম ঘর নির্মাণের দায়িত্ব অর্পণ করা হলো যেখানে শুধু আল্লাহরই ইবাদত হবে।
إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبَارَكًا وَهُدًى لِلْعَالَمِينَ
মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর নির্মিত হয়েছিল, তা বাক্কায় অবস্থিত। তা বরকতময় ও বিশ্বজগতের জন্য পথের দিশারী [৬]
বাক্কা হলো মক্কার আরেক নাম। সেই পাথুরে উপত্যকায় পিতা-পুত্র মিলে একসাথে কাজ করতে লাগলেন। তাদের মনের মধ্যে তখন ছিল মাত্রই আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করা তাকওয়া। এভাবে গড়ে উঠল পবিত্র কাবা। কাজ পরিসমাপ্ত করে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম একটি দুআ করেছিলেন-
رَبَّنَا إِنِّي أَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلاةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ وَارْزُقُهُمْ مِنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ
হে আমাদের রব, আমি আমার কিছু বংশধরকে ফসলহীন উপত্যকায় আপনার পবিত্র ঘরের নিকট বসতি স্থাপন করালাম; হে আমাদের রব, যাতে তারা সালাত কায়েম করে। সুতরাং কিছু মানুষের হৃদয় আপনি তাদের দিকে ঝুঁকিয়ে দেন এবং তাদেরকে রিজিক প্রদান করেন ফল-ফলাদি থেকে—আশা করা যায় তারা শুকরিয়া আদায় করবে।[৭]
এই দুআর ফল দ্রুতই বাস্তবে রূপ নিতে লাগল। ঘুচে গেল মক্কার জনমানবহীনতা। বাইতুল্লাহ, জমজম এবং ক্রমবর্ধমান জনবসতির ফলে প্রাণ সঞ্চারিত হলো সেখানে। সিরিয়া, ইয়েমেন, নাজদ এবং তায়েফের উদ্দেশ্যে বের হওয়া বণিকদের জন্য একসময় তা একটি সংযোগস্থলে পরিণত হয়।[৮] এজন্য ইউলিয়াস গ্যালাস থেকে নিরো পর্যন্ত সকল সম্রাট মক্কার গুরুত্বপূর্ণ এ স্থান পর্যন্ত তাদের প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিলেন। সেই চেষ্টাও করেছিলেন তারা।[৯][১০]
আরব উপদ্বীপজুড়ে তখন স্বাভাবিকভাবেই অন্য জাতিগুলোর আনাগোনা শুরু হয়। এর মধ্যে ইহুদি শরণার্থীদের কথা উল্লেখযোগ্য। ইরাকের ব্যাবিলনে নির্বাসনকালে আরববাসীর সাথে ইহুদি ধর্মের পরিচয় ঘটে। ইহুদিরা ইয়াসরিব (বর্তমান মদিনা), খাইবার, তাইমা এবং ফাদায় বসতি স্থাপন করে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৭ এবং ৭০ খ্রিষ্টাব্দে।[১১] অনেক যাযাবর তখন বাসস্থান গড়তে থাকে আরবেও।
কায়তানি বংশের বনু সালামা বসতি গড়ে মদিনায়। তাদেরই উত্তরপুরুষ হলো আউস ও খাজরায গোত্র। একত্রে এদের আনসার[১২] বলা হয়। বনু হারিসা বা পরবর্তী সময়ে বনু খুজাআ পূর্ববর্তীদের সরিয়ে হিজাযে বসবাস শুরু করে। বাইতুল্লাহর তত্ত্বাবধায়করূপে অধিষ্ঠিত হয় বনু জুরহুম।[১৩] পরবর্তীকালে অবশ্য তারাই সেখানে মূর্তিপূজার প্রচলন ঘটায়।[১৪] কাহতানি বংশের বনু লাখম হিরায়[১৫] বসতি গড়ে তোলে (২০০-৬০২ খ্রিষ্টাব্দ)। আরব আর পারস্যের মাঝে একটি বাফার স্টেট[১৬] প্রতিষ্ঠা করে তারা। সিরিয়ার নিম্নভূমিতে গাসসানীয় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে বনু গাসসান। ৬১৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তা বাইজেন্টাইন ও আরবদের মাঝে একটি বাফার স্টেট হিসেবে থেকে যায়। [১৭] তায়ি পাহাড় বnu তায়ির বাসস্থান হয়ে ওঠে। আর বnu কিন্দা বসতি স্থাপন করে মধ্য আরবে।
উক্ত সকল গোত্রের মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল। তারা সকলেই ইসমাইল ইবনু ইবরাহিমের বংশধর। [১৮]
এই অধ্যায়ের মূল আলোচনা কিন্তু মক্কার প্রাক-ইসলামি ইতিহাস নয়। মূলত এর দ্বারা নবিজির নিকটতম পূর্বপুরুষ নির্ণয়ই মূল উদ্দেশ্য। আলোচনা সংক্ষিপ্ত করার জন্য বিস্তারিত বিবরণে না গিয়ে নবিজির পরদাদা কুসাই থেকে শুরু করা যাক।
টিকাঃ
১. ইসমাইল আলাইহিস সালামের সম্মানিতা মাতার নাম হাজার। তিনি ছিলেন নবি ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দ্বিতীয় স্ত্রী। আমাদের দেশে তিনি 'হাজেরা' নামে প্রসিদ্ধ। তবে এ উচ্চারণটি বিশুদ্ধ নয়, সঠিক ও শুদ্ধ উচ্চারণ হবে 'হাজার'। —শারয়ী সম্পাদক
২. এ ছিল মিশরের এক জালিম বাদশাহ। সেসময়কার মিশরের বাদশাহদের উপাধি ছিল ফারাও বা ফিরাউন। ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সময় যে ফিরাউনের রাজত্ব চলছিল, তার নাম ছিল আমর ইবনু ইমরিইল কাইস ইবনি সাবা। (ইবনু হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৩৯২)—শারয়ী সম্পাদক
৩. সারা হলেন ইবরাহিম আলাইহিস সালামের প্রথম স্ত্রী। তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নারী, যাকে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় খলিলের জীবনসঙ্গিনী হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। (সহিহুল বুখারি: ৩৩৫৮; ফাতহুল বারি, ইবনু হাজার আসকালানি, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা: ৩৯২)—শারয়ী সম্পাদক
৪. King James Version, Genesis: 21:10.
৫. সহিহুল বুখারি: ৩৩৬৪, ৩৩৬৫
৬. সূরা সফফাত, আয়াত: ১০২-১০৭
৭. সুরা আলি-ইমরান, আয়াত: ৯৬
৮. সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৩৭
৯. M. Hamidullah, "The City State of Mecca', Islamic Culture, vol. 12 (1938), p. 258. Cited thereafter as The City State of Mecca.
১০. কিন্তু কোনো সম্রাট প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হননি। মক্কার অধিবাসীরা চিরায়ত মুক্ত; স্বাধীন জীবন যাপন করেছে। গোষ্ঠী ও গোত্রবন্ধ জীবনব্যবস্থায় গোত্রপ্রধানের শাসন ছাড়া বহিরাগত কোনো শক্তি-বলয় তাদের বশে আনতে পারেনি কখনো। কুরআন সংরক্ষণের ইতিহাসের সাথে এর রয়েছে গভীর সম্পর্ক। এভাবে যে, কুরআন নাযিল করার জন্য উপযুক্ত এমন এক জাতিকে নির্বাচন করা প্রয়োজন ছিল যারা কোনো কালে অন্য কোনো সভ্যতা-সংস্কৃতি-বলয়ের অধীন ছিল না। অতএব কুরআনকে তারা প্রথম ও শেষ সভ্যতা হিসেবে হৃদয়ঙ্গম করেছে। একে তারা একমাত্র জীবনবিধান হিসেবে গ্রহণ করেছে। শারয়ি সম্পাদক
১১. ibid, p. 256, quoting Lammens, La Mecque a La ViIle de L'Hegire (pp. 234- 239) and others.
১২. জাওয়াদ আলি, আল-মুফাসসাল ফি তারিখিল আরব কবলাল ইসলাম, i: ৫৫৮; প্রাগুক্ত, i: ৬১৪-১৮ ইয়াসরিব ও খাইবারে ইহুদি বসতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করা হয়েছে।
১৩. M. Mohar Ali, Sirat an-Nabi, vol. 1A, p. 32.
১৪. ibid, vol. 1A, p. 32.
১৫. ইবনু কুতাইবা, আল-মাআরিফ, পৃষ্ঠা: ৬৪০
১৬. বর্তমানে ইরাকের কুফা।-সম্পাদক
১৭. দুটি শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের মধ্যবর্তী দেশ। এটি কখনো কখনো উভয়ের মাঝে শান্তি বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। সম্পাদক
১৮. ibid, vol. 1A, p. 32.
১৯. ibid, vol. 1A, p. 32.
📄 মক্কায় কুসাইয়ের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা
কুসাই ইবনু কিলাব হলেন নবিজির প্রায় ২০০ বছর আগের পূর্বপুরুষ। তিনি ছিলেন প্রচণ্ড বুদ্ধিমান, শক্তিশালী এবং প্রশাসনিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তি। মক্কার রাজনীতির শীর্ষস্থানীয় নেতা। মক্কার প্রতি বাইজেন্টাইনদের আগ্রহ কাজে লাগিয়ে পুরো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ করায়ত্ত করেন তিনি। তবুও বাইজেন্টাইন প্রভাব এবং তাদের ভূ-সীমা থেকে মক্কাকে পৃথক রাখতে সক্ষম হন। [১]
খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার পর মক্কায় ক্ষমতা বিস্তার করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে বাইজেন্টাইনরা। এজন্য উসমানকে মুকুট পরিয়ে বাইজেন্টাইন সম্রাট তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে মক্কায় পাঠায়; যাতে সবাই তাকে রাজা বলে মেনে নেয়; কিন্তু তার নিজের গোত্র পর্যন্ত মেনে নেয়নি তাকে।
খুজাআ গোত্রের সর্দারের মেয়ে হুব্বা বিনতু হুলাইলকে বিয়ে করেন কুসাই। গোত্রপ্রধানের মৃত্যুর পর তিনি আরও ক্ষমতার অধিকারী বনে যান। এতে করে কাবাঘরের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বও এসে পড়ে তার বংশের ওপর।[২] বিক্ষিপ্ত কুরাইশ গোত্র অবশেষে মক্কায় তার নেতৃত্বে একতাবদ্ধ হয়।[৩] ওপরে কুসাইয়ের একটি সংক্ষিপ্ত বংশতালিকা প্রদান করা হয়েছে।[৪]
টিকাঃ
১. ইবনু কুতাইবা, আল-মাআরিফ, পৃষ্ঠা: ৬৪০-৪১
২. Ibn Hisham, Sira, ed. by M. Saqqa, I. al-Ibyari and ‘A. Shalabi, 2nd edition, Mustafa al-Babi al-Halabi publishers, Cairo, 1375 (1955), vol. 1-2, pp. 117-8; গ্রন্থটি দুইটি অংশে ছাপানো হয়েছে। প্রথমাংশে প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, এবং দ্বিতীয়াংশে তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ড রয়েছে। প্রতিটি অংশের পৃষ্ঠা নম্বর ধারাবাহিকভাবে চলে গেছে।
৩. ইবনু কুতাইবা, আল-মাআরিফ, পৃষ্ঠা: ৬৪০-৪১
৪. ইবনু হিশাম, সিরাত, খণ্ড: ১-২, পৃষ্ঠা: ১০৫-১০৮; তালিকার তারিখ নির্ণয় করতে দেখুন,
📄 মক্কা : গোত্রীয় সমাজব্যবস্থা
নগররাষ্ট্র হলেও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক মক্কা বিজয়ের আগপর্যন্ত মক্কায় গোত্রীয় সমাজব্যবস্থাই প্রচলিত ছিল। একই গোত্রের সকলে একে অপরের ভাই এবং অভিন্ন রক্তের—এ ধারণাকে ঘিরেই আবর্তিত হতো সকল সামাজিক কর্মকাণ্ড। গোত্রীয় ধারণার বাইরেও যে জাতিগত ঐক্যের অন্য কোনো মানদণ্ড থাকতে পারে, তা একজন আরবের পক্ষে কিছুতেই বোঝা সম্ভব ছিল না।
‘তাদের জাতিরাষ্ট্রের ধারণা ছিল বংশীয় সম্পর্কভিত্তিক। এমন এক রাষ্ট্র, যার ভিত্তি হলো রক্তের বাঁধন। ঐক্যের ভিত্তি ছিল আত্মীয়তা। রাষ্ট্র বলতে তারা এমনটিই বুঝত। এটিই ছিল স্বীকৃত এবং সর্বসম্মত নিয়ম।’ [১]
গোত্রের প্রত্যেক সদস্য গোত্রের জন্য একেকটি সম্পদ। বংশে একজন প্রসিদ্ধ কবি, নির্ভীক যোদ্ধা বা দানশীল ব্যক্তি থাকা মানে পুরো গোত্রের সম্মান ও কৃতিত্ব। প্রতিটি শক্তিশালী গোত্রের একটি প্রধান কাজ ছিল প্রতিরক্ষা। শুধু নিজেদের প্রতিরক্ষাই নয়; অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাও ছিল বিশাল মর্যাদার ব্যাপার। তাই তীর্থযাত্রা বা কোনো মেলায় যোগদান করতে আসা কিংবা মুসাফির কাফেলার সবাই মক্কা নগরীতে স্বাগত ছিল।[২] আর এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক ও সমন্বিত কার্যক্রম। এরকম বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য গড়ে ওঠে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। নদওয়া (সদর পরিষদ), মাশওয়ারা (নীতি-নির্ধারণ পরিষদ), কিয়াদা (দিকনির্দেশনা), সাদানা (কাবা প্রশাসন), হিজাবা (দ্বাররক্ষক), সিকায়া (হাজিদের পানি সংস্থান), ইমারাতুল বাইত (কাবার পবিত্রতা রক্ষা), ইফাদা (প্রস্থানের অনুমতি), ইজাযা, নাসি (দিনপঞ্জি নির্ধারণ), কুব্বা (জরুরি খাতে ব্যয়ের জন্য সাহায্য তহবিল গঠন), আয়িন্না (ঘোড়ার লাগাম), রিফাদা (দরিদ্র হাজিদের সাহায্যার্থে আরোপিত কর), আমওয়াল মুহাজ্জারা (অর্ঘ্য প্রদান), আয়সার, আশনাক (অর্থ-সংক্রান্ত দায়ভার হিসাব করা), হুকুমা, সিফারাহ (প্রতিনিধিত্ব), উকাব/রায়াহ (পতাকাবাহক), লিওয়া (নিশান) এবং হুলওয়ানুন নাফর (উপহার)। এর অনেকগুলো আবার প্রতিষ্ঠা করে গেছেন কুসাই নিজেই।[৩]
টিকাঃ
১. ইবনু হিশাম, সিরাত, খণ্ড: ৩-৪, পৃষ্ঠা: ৩১৫
২. ইতোমধ্যে কাবার চারপাশে শত শত মূর্তি গড়ে উঠেছিল।
৩. The City State of Mecca, pp. 261-276.