📄 ভূমিকা
মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়ের সাক্ষ্যদাতা হিসেবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান থাকো; কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা তোমাদের যেন ইনসাফ বর্জনে প্ররোচিত না করে। ইনসাফ করো, এটা তাকওয়ার অধিকতর নিকটবর্তী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা যা করো, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত।¹
কুরআনুল কারিম একজন মুসলিমের জন্য পথনির্দেশ, স্বস্তি, সৌন্দর্য কিংবা এর চেয়েও বেশি কিছু। এটি বিশ্বাসের হৃৎস্পন্দন, আনন্দ-বেদনার সঙ্গী। এতে আছে অনিন্দ্য কাব্যিকতা, নির্ভুল বাস্তব জ্ঞান; আছে প্রজ্ঞা ও দুআর রত্নভান্ডার। ঘরে-বাইরে দেওয়ালে দেওয়ালে এর আয়াতগুলো শোভা পায়। বৃদ্ধ-যুবা সবার মনে যেন সেগুলো খোদাই করা। মিনারগুলো থেকে রাতের আঁধার ভেদ করে পৃথিবীজুড়ে ভেসে চলে তার প্রতিধ্বনি। অথচ স্যার উইলিয়াম মুইর² কুরআনকে গোঁয়ারের মতো 'পৃথিবীর ইতিহাসে স্বাধীনতা, সভ্যতা এবং সত্যের সবচেয়ে কঠিন শত্রুদের একটি ³ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার পথের পথিক আরও অনেকেই আছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা কুৎসা ও সন্দেহ ছড়িয়েছে। আজও অনেক বুদ্ধিজীবী ও মিশনারি এ কাজ করে যাচ্ছে।
ইদানীং এই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে রাজনীতিবিদদের নামও। এরকম চরম পরস্পরবিরোধী অবস্থান একদিকে মুসলিমদের জন্য যেমন কষ্টদায়ক, অন্যদিকে অমুসলিমদের কাছে তেমনই বিভ্রান্তিকর। তাদের কাছে মনে হবে, দুই পক্ষ যেন একেবারেই আলাদা দুটি কিতাবের কথা বলছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য কী? প্রমাণই-বা কী? খুবই স্পর্শকাতর ও গভীর এই প্রসঙ্গে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। অনেকভাবে বিশ্লেষণ করা গেলেও শুরুটা করছি ‘What is the Koran?’⁴ শীর্ষক প্রবন্ধ দিয়ে। প্রবন্ধটি প্রকাশের আগে লেখকের নাম আগে কোনোদিন শুনিনি।
The Atlantic Monthly ম্যাগাজিনের ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি সংখ্যার প্রধান প্রবন্ধ ছিল এটি। কুরআনের উৎপত্তি ও বিশুদ্ধতা প্রসঙ্গে নানারকম বিষয় উত্থাপন করা হয় সেখানে। টোবি লেস্টার সম্পর্কে জানতে পারি লেখক-পরিচিতি থেকে। যা বুঝলাম, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনে কিছুকাল বসবাস করা ছাড়া ইসলাম সম্পর্কে তার আর কোনো জ্ঞান নেই। অথচ এমন একটি হঠকারী বিতর্ক উসকে দিতে তিনি পিছপা হননি। তিনি বলেছেন, ‘পশ্চিমাদের কোরান-বিষয়ক অধ্যয়ন মূলত খ্রিষ্টানধর্ম ও ইসলামের উন্মুক্ত বিরোধ থেকে গড়ে উঠেছে... বিশেষ করে খ্রিষ্টান ও ইহুদি পণ্ডিতরা কোরানে ঈশ্বরদ্রোহের গন্ধ পান...।’⁵
কুরআনের বিরুদ্ধে উইলিয়াম মুইরের বক্তব্য উদ্ধৃত করার পর তিনি বলেন, শুরুর দিকের সোভিয়েত পণ্ডিতরাও ইসলামকে নিজেদের মতাদর্শ-প্রভাবিত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতেন। এন. এ. মরোজোভ যেমন জোরেসোরে বলেছেন, ‘ক্রুসেডযুদ্ধের আগে ইসলামকে ইহুদিধর্ম থেকে আলাদা করার উপায় ছিল না এবং... এর পরেই তা একটি নিজস্ব রূপ লাভ করে। আর মুহাম্মাদ ও প্রথম খলিফাগণ কাল্পনিক চরিত্র ছাড়া কিছু নয়।’⁶
কারও কারও কাছে মনে হতে পারে লেস্টার সাহেব বুঝি একদম অ্যাকাডেমিক পন্থায় অগ্রসর হয়েছেন। কৌতূহলী অনুসন্ধানীর মতো বস্তুনিষ্ঠ একটা ফলাফল উপস্থাপন করছেন যেন। আশ-শারক আল-আওসাত⁷ পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি মুসলিমদের প্রতি কোনো কুমতলব, বিরূপ প্রতিক্রিয়া কিংবা অন্যায় আচরণ করা থেকে নিজেকে মুক্ত বলেও দাবি করেন। শুধু সত্যই নাকি তার লক্ষ্য। অথচ বহু কাঠখড় পুড়িয়ে শুধু মূলধারা বিরোধী শ্রেণির থেকেই তিনি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। এটা একেবারে স্পষ্ট। (তিনি মুসলিমদের ধর্মগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করেছেন অথচ সেক্যুলার দৃষ্টিকোণ থেকে) ফলে তা কেবল নতুন সেক্যুলার ব্যাখ্যার পথে হেঁটেছে।
সেই প্রবন্ধের বেশ বড় অংশ জুড়ে ড. গার্ড জোসেফ পুইনের মতামত তুলে ধরা হয়েছে। তিনি সান‘আ⁸ থেকে কুরআনের কিছু প্রাচীন খণ্ডাংশ পুনরুদ্ধার-কর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। সম্প্রতি আমি সেগুলো দেখেছি। পুইন এবং তার কর্মীরা এর জন্য যথাযোগ্য কৃতজ্ঞতা পাওয়ার দাবিদার। তবে বিজ্ঞানের বই অতি চমৎকারভাবে বাঁধাই করার কারণে কিন্তু কেউ বিজ্ঞানী বনে যান না। অথচ পুরোনো পাণ্ডুলিপির অংশ পুনরুদ্ধারের জন্য পুইনকে রীতিমতো কুরআনের ইতিবৃত্ত প্রসঙ্গে বিশ্বমানের বিশেষজ্ঞ মনে করা হচ্ছে। পুইনের বক্তব্য লেস্টার উদ্ধৃত করেছেন—‘অসংখ্য মুসলিম কোরানের দুই মলাটের মধ্যকার সবকিছুকে ঈশ্বরের অপরিবর্তিত বাণী মনে করে... যেসব গবেষণাকর্ম থেকে দেখা যায়, বাইবেল সরাসরি আকাশ থেকে পড়েনি; বরং তার একটি অতীত ইতিহাস আছে, সেগুলো উদ্ধৃত করা মুসলিমদের খুবই প্রিয় একটা কাজ। কিন্তু কোরানের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এই জাতীয় আলোচনা করা হয়নি। এ থেকে উত্তরণের একমাত্র পন্থা হলো কোরানেরও যে একটি ইতিহাস আছে, তা প্রমাণ করা। সানআর খণ্ডাংশগুলো সে কাজেই আমাদের সাহায্য করবে।’⁹
লেস্টারের পরবর্তী তথ্যসূত্র অ্যান্ড্রু রিপিন। ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিলিজাস স্টাডিজের এই অধ্যাপক বলেন—‘আয়াতের ক্রম ও পঠনরীতির (কিরাতের) ভিন্নতার ব্যাপারটিকে গুরুত্বের দৃষ্টিতে দেখতে হবে। এ বিষয়ে সকলেই একমত। প্রাপ্ত পাণ্ডুলিপি থেকে বোঝা যায়— কোরানের ইতিহাসকে যতটা (বিশুদ্ধ) মনে করা হতো, এর চেয়েও অনেক বেশি প্রশ্নবিদ্ধ। যেরকমটা দাবি করা হয়, সে তুলনায় এর টেক্সট কম নির্ভরযোগ্য।’¹⁰
অধ্যাপক রিপিনের মন্তব্যে হতবাক না হয়ে পারি না। প্রথমত নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় থেকেই আলিমগণ ‘পঠনরীতির ভিন্নতা’ (মূলত একই আয়াতের বিকল্প পঠনরীতি) প্রসঙ্গে আলোচনা করে এসেছেন। এটি মোটেও নতুন কোনো আবিষ্কার নয়। দ্বিতীয়ত পুইন কুরআনের ব্যাপারে আধুনিক সংশোধনবাদী (Modern revisionist) দৃষ্টিভঙ্গি লালন করেন। কিন্তু (আমার জানামতে) তিনি নিজেও প্রাপ্ত পাণ্ডুলিপিগুলোর আয়াতের ক্রমধারায় কোনো পার্থক্য থাকার দাবি করেননি। (অথচ রিপিন করেছেন)।
পুইন বলেছেন, ‘আমার ধারণা কোরআন এমন সব টেক্সটের মিশ্রণ, যা স্বয়ং মুহাম্মাদের যুগেও সম্পূর্ণ বোধগম্য ছিল না। তা-র অনেকাংশ হয়তো ইসলামের চেয়েও শতাব্দী খানেক পুরোনো। এমনকি ইসলামি মহলেও বহু সাংঘর্ষিক তথ্য বিদ্যমান। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য মাত্রার খ্রিষ্টীয় ভিত্তিও আছে। কেউ চাইলে সেখান থেকে ইসলামের একেবারে উল্টো একটা ইতিহাসও বের করতে পারবে।’
প্যাট্রিসিয়া ক্লোন এ জাতীয় চিন্তাধারার উদ্দেশ্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন—‘অন্য যেকোনো ধর্মগ্রন্থের মতো কোরআনেরও একটি ইতিহাস আছে। তবে আমরা সেই ইতিহাস জানি না এবং জানার চেষ্টা করলে আপত্তির সুর ওঠে।’ ¹¹
আরবিভাষীদের কাছে দীর্ঘকাল পর্যন্ত কুরআন অনিন্দ্যসুন্দর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। এর কাব্যিকতায় মক্কার মূর্তিপূজারীরাও ভাষা হারিয়ে ফেলেছিল। কুরআনুল কারিমের মতো কিছুই তারা তৈরি করতে পারেনি। অথচ এরকম একটি কিতাবের ব্যাপারে পুইনের অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য পরিলক্ষিত হয়, ‘কোরআন নিজেকে মুবিন বা সুস্পষ্ট বলে দাবি করে... কিন্তু ভালো করে খতিয়ে দেখলে খেয়াল করবেন, এর প্রত্যেক পঞ্চম বাক্যের কোনো অর্থ হয় না। মুসলিম ও প্রাচ্যবিদদের মধ্যেও অনেকেই হয়তো এতে দ্বিমত পোষণ করবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো কোরআনের এক পঞ্চমাংশ কেবল অবোধ্য।’ ¹²
পুইন শব্দ সমাহার বুনেছেন ঠিকই, কিন্তু কোনো উদাহরণ পেশ করেননি। ব্যাপারটি দুঃখজনক বটে। কারণ কুরআনের এই অবোধ্য এক পঞ্চমাংশের অস্তিত্ব ও অবস্থান সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ অন্ধকারে আছি।
কুরআনের প্রচলিত ব্যাখ্যা মেনে না নেওয়ার এ ধ্যান-ধারণা বিংশ শতাব্দীতে¹³ এসে জন্ম নেওয়ার কথা এরপর লেস্টার ব্যক্ত করেছেন। প্যাট্রিসিয়া ক্লোনের তথ্যসূত্র দিয়ে আর. এস. হামফ্রেসের¹⁴ উদ্ধৃতি টেনে ওয়ান্সব্রোহতে এসে থেমেছেন তিনি। ওয়ান্সব্রোহর প্রধান বক্তব্য মূলত দুটি—এক. দুই শতকের পরিক্রমায় মুসলিমদের বিভিন্ন সম্প্রদায় মিলিত হয়ে হাদিস ও কুরআনের উদ্ভব ঘটিয়েছে। দুই. ইহুদিদের ধর্মীয় শিক্ষার আলোকে ইসলামি মতধারা গঠিত হয়েছে।
পুইনকে হয়তো এখন নিজের কাজ পুনরায় পর্যবেক্ষণ করতে হচ্ছে। কারণ ধীরে ধীরে তার তত্ত্বগুলো চিহ্নিত কিছু মহলে গজিয়ে উঠছে ঠিক, কিন্তু 'অনেক মুসলিম স্বাভাবিকভাবেই সেগুলো আপত্তিকর মনে করে।¹⁵ কুক, ক্রোন এবং ওয়ান্সব্রোহর নাম গত শতাব্দীর সিকিভাগ পর্যন্ত পরিচিতি লাভ করেছে। পুইন এর মাঝে নতুন। তার গবেষণাই লেস্টারের প্রবন্ধের মূল ভিত।
ইয়েমেন থেকে প্রাপ্ত পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে কয়েকটি খণ্ডাংশ ইসলামের প্রথম দুই শতাব্দীর। সেগুলো থেকে 'ছোটখাটো হলেও কৌতূহলজাগানিয়া কিছু বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়; যা প্রমাণিত কোরানের টেক্সট থেকে আলাদা। ইতিহাসবিদদের কাছে এরকম বিচ্যুতি বিস্ময়কর কিছু না হলেও মূলধারার মুসলিম বিশ্বাসের সাথে তা একবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ তারা আজকের কোরানকে একদম নির্ভুল, চিরন্তন এবং স্রষ্টার অপরিবর্তিত বাণী বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু কোরানকে নতুন করে ব্যাখ্যা করার সেক্যুলার উদ্যোগ প্রধানত টেক্সটভিত্তিক প্রমাণের উপর দাঁড়ানো। আর ইয়েমেনি খণ্ডাংশগুলো তারই একটি উদাহরণ।¹⁶
এটি অনেক মুসলিমের কাছেই অস্বস্তিকর ও আপত্তিজনক। ঠিক যেমন রক্ষণশীল খ্রিষ্টানদের কাছে বাইবেল ও যিশুর জীবন-সংক্রান্ত নতুন ব্যাখ্যা অস্বস্তিকর ও আপত্তিজনক... তবে (এই সেক্যুলার ব্যাখ্যা) অনেক শক্তিশালী হতে পারে এবং তা বড় মাপের সামাজিক পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। এর উত্তম দৃষ্টান্ত ইউরোপীয় রেনেসাঁ এবং রিফরমেশনের ইতিহাস। মনে রাখতে হবে, কুরআন হলো বর্তমান বিশ্বে মতাদর্শিকভাবে সবচেয়ে প্রভাবশালী টেক্সট।¹⁷
তাহলে পুরো ব্যাপারটি এরকম দাঁড়ায়—
» মতাদর্শগতভাবে বর্তমান কুরআন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী গ্রন্থ।
» বাইবেলকে যেভাবে খ্রিষ্টানরা একসময় স্রষ্টার অপরিবর্তিত বাণী মনে করত, অনেক মুসলিম কুরআনকেও তা-ই মনে করে।
» সেক্যুলার উদ্যোগে কুরআন নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে ইয়েমেনি খণ্ডাংশগুলো কাজে আসবে।
» অসংখ্য মুসলিমের কাছে আপত্তিকর হলেও এই পুনঃব্যাখ্যা বড়সড় সামাজিক পরিবর্তনের খোরাক হতে পারে, যেমনটা খ্রিষ্টানসমাজে বহু শতাব্দী আগে ঘটেছে।
» প্রাথমিক যুগের কুরআন পরিবর্তনশীল হিসেবে 'দেখাতে' পারলে এই সামাজিক সংস্কারগুলো ঘটানো সম্ভব। মুসলিমসমাজ উন্মুক্তভাবে কুরআন পুনঃসজ্জিত করেছে। কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত তারা এ কাজ করেছে। অর্থাৎ কুরআনকে আজ যতটা পবিত্র ভাবা হয়, ততটা পবিত্রতা এতে ছিল না।
প্রসঙ্গক্রমে লেস্টার যাদের নাম নিয়েছেন, তাদের অধিকাংশই অমুসলিম: জোসেফ পুইন, বথমার, রিপিন, স্টিফেন হামফ্রেস, গান্টার লালিং, ইয়েহুদা ডি. নেভো, প্যাট্রিশিয়া ক্রোন, মাইকেল কুক, জেমস বেলামি, উইলিয়াম মুইর, ল্যাম্বটন, টলস্টয়, মরোজোভ এবং ওয়ান্সহব্রো।
মুসলিমবিশ্বে রিভিশনিজম (সংশোধনবাদ) ছড়িয়ে পড়ার সুসংবাদও জানিয়েছেন তিনি। এক্ষেত্রে তিনি নাসর আবু জাহিদ, তহা হুসাইন, আলি দাশতি, মুহাম্মাদ আব্দুহ, আহমাদ আমিন, ফজলুর রহমানের নাম নিয়েছেন। সবশেষে উল্লেখ করেছেন প্রথাগত রক্ষণশীল মতবিশ্বাসের বিরুদ্ধে মুহাম্মাদ আরকুনের পক্ষ থেকে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জোরালো উপদেশ।¹⁸ ইসলামি চিন্তাদর্শের পরিচিত মহলকে একপাশে সরিয়ে কেবল উপেক্ষা করে যাওয়া হয়েছে। সংযুক্ত করা হয়েছে শুধু মুহাম্মাদ আব্দুহর বিতর্কিত নামটি।
কিন্তু এই সংশোধনবাদী বা রিভিশনিস্ট মতাদর্শ আসলে কী? লেস্টার এর কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা দিতে ব্যর্থ। তার প্রবন্ধে ইয়েহুদা নেভোর নামখানা উল্লেখ আছে। সংজ্ঞাটি তাই নেভোর কাছ থেকেই জানা যাক—'রিভিশনিস্ট পন্থা মোটেও একমুখী কোনো বিষয় নয়... (কিন্তু) মুসলিম উৎস থেকে এককভাবে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গঠিত ইতিহাসের প্রামাণ্যতা অস্বীকারের ব্যাপারে (রিভিশনিস্টরা) একমত... মুসলিমদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যকে অবশ্যই বিদ্যমান উপাদানের প্রত্যক্ষ উপাত্তের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে... (লিখিত উৎসগুলোকে) অবশ্যই আলাদা প্রমাণের (External evidence) ভিত্তিতে নিরীক্ষণ করতে হবে। আর এ দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য দেখা দিলে শেষেরটি প্রাধান্য পাবে।' ¹⁹ মানে প্রত্যেকটি মুসলিম সূত্রকে যাচাই করতে হলে এর বিপরীতে মুসলিম বাদে অন্য প্রমাণ লাগবেই। আর সেরকম প্রমাণ যদি পাওয়া না যায়, তার মানে ওই মুসলিম সূত্রটাই বাতিল। উক্ত ঘটনা যেন কোনোদিন ঘটেনি।
'(মুসলিম) সনাতন সূত্রের বাইরে যদি ওই ঘটনার কোনো প্রমাণ না থাকে, তাহলে তা আদৌ না ঘটার ধারণাকে সমর্থন করবে। একটি চিন্তা উদ্রেক করার মতো উদাহরণ হলো—মুসলিম সূত্রের বাইরে আর কোনো প্রমাণ না থাকা। কারণ বিজয় লাভের সময় আরবরা মুসলিম ছিল।' ²⁰
এই রিভিশনিস্ট পন্থা দ্বারা ইসলামি ইতিহাসের পরিপূর্ণ নাশ এবং একটি ভ্রান্তিপূর্ণ ইতিহাসের প্রবর্তন ঘটানো সম্ভব। এর দ্বারা প্রাক-ইসলামি মক্কার পৌত্তলিকতা, মদিনার ইহুদি বসতি, সিরিয়ায় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মুসলিমদের বিজয় ইত্যাদি সব ইতিহাস ধূলিসাৎ করা হবে। এমনকি রিভিশনিজমের দাবি অনুযায়ী, প্রাক-ইসলামি যুগের মক্কায় যে পৌত্তলিকতা ছিল বলে দাবি করা হয়, তা মূলত দক্ষিণ ফিলিস্তিনের পৌত্তলিক সভ্যতার একটি কাল্পনিক চিত্রায়ন ²¹
মূল ব্যাপারটি ধরতে হবে। তাদের সকল আবিষ্কারের পেছনে স্পষ্ট উদ্দেশ্য বিদ্যমান। এ বিষয়টি পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করা জরুরি। এ সকল উপাত্ত শূন্য থেকে আসে না, আকাশ থেকেও গবেষকদের কোলে এসে পড়ে না। এগুলো সবই একটি নির্দিষ্ট আদর্শ ও রাজনীতি প্রণোদিত গোষ্ঠীর চিন্তার ফসল। প্রতিপক্ষের দুর্গ ভাঙতে এখন তারা অ্যাকাডেমিক গবেষণার গুপ্তবেশ ধারণ করেছে।²²
ইসলাম ও এর পবিত্র গ্রন্থগুলোকে কলঙ্কিত করার পাঁয়তারা গোটা ধর্মের বয়সের মতোই পুরোনো। শুধু উদ্দেশ্য অনুযায়ী কৌশল পালটেছে সময়ে সময়ে। শুরুর যুগ থেকে ত্রয়োদশ হিজরি (৭-১৮ তম খ্রিষ্টীয় শতাব্দী) পর্যন্ত তাদের লক্ষ্য ছিল ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিশর, লিবিয়া প্রভৃতি স্থানে দ্রুত ছড়াতে থাকা ইসলামি বিশ্বাসের বিরুদ্ধে খ্রিষ্টানদের রক্ষা করা। জন অব দামাস্কাস (৩৫-১৩৩ হিজরি/৬৭৫-৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ), পিটার দ্য ভেনারেবল (১০৮৪-১১৫৬ খ্রিষ্টাব্দ), রবার্ট অব কেটন, রেমন্ড লাল (১২৩৫-১৩১৬ খ্রিষ্টাব্দ), মার্টিন লুথার (১৪৮৩-১৫৪৬ খ্রিষ্টাব্দ) এবং লুডোভিকো মারাকি (১৬১২-১৭০০ খ্রিষ্টাব্দ) প্রমুখ ছিলেন সেই যুগের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ। মিথ্যাচার এবং ইচ্ছাকৃত অজ্ঞতার স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছিল তাদের কলমে।
এরপর রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ঔপনিবেশিক শাসনের দ্বারা দ্বিতীয় পর্যায়ের আক্রমণের শুরু হয়। এবার তারা রক্ষণাত্মক খোলস ছেড়ে আক্রমণাত্মক ঢঙে প্রতীয়মান হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল মুসলিমদের গণহারে ধর্মান্তরিত করা; অন্ততপক্ষে ইসলাম নিয়ে গর্ববোধ বা আল্লাহর প্রতি আস্থা থেকে উদ্ভূত প্রতিরোধের দেওয়ালে চিড় ধরানো।
এব্রাহাম গাইগার (১৮১০-১৮৭৪) ছিলেন এই দ্বিতীয় পর্যায়কালীন পণ্ডিত। ১৮৩৩ সালে Was hat Mohammed aus den Judentum aufgenommen? (ইহুদিধর্ম থেকে মুহাম্মাদ কী কী ধার করেছেন?) শীর্ষক অভিসন্দর্ভে তিনি কুরআনের ওপর বাইরের উৎসের প্রভাব অনুসন্ধানের সূচনা করেন। পরবর্তী সময়ে কুরআনকে বাইবেল থেকে নকল করা একটি দুর্বল গ্রন্থ হিসেবে অভিহিত করে অসংখ্য বই ও নিবন্ধ রচনা করেন। অথচ সেগুলো ছিল প্রচন্ডরকম ভুলে ভরপুর।
পরের অধ্যায়গুলোতে আরও কজনের নাম আনব, যারা এই দ্বিতীয় পর্যায়ের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। যেমন: নোয়েলডেক (১৮৩৬-১৯৩০), গোল্ডজিহার (১৮৫০-১৯২১), হারগ্রোনয়ে (১৮৫৭-১৯৩৬), বার্গস্ট্রেসার (১৮৮৬-১৯৩৩), টিসডাল (১৮৫৯-১৯২৮), জেফরি (মৃত্যু: ১৯৫২) এবং শাখট (১৯০২-১৯৬৯)।
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পথে আক্রমণের তৃতীয় পর্যায় শুরু হয়। এ পর্বে ইহুদিদের স্বার্থবিরোধী আয়াতগুলো অপসারণ করার জোরালো প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। রিপিন, ক্রোন, পাওয়ার, ক্যালডার হলেন এই চিন্তাধারার অনুসারী। এখানে সবচেয়ে বড় নাম ওয়ানসব্রোহ। তার তত্ত্বানুযায়ী কুরআন ও হাদিস মুসলিম-সমাজের দুই শতকের প্রচেষ্টার ফসল। ইহুদি আদর্শ পুঁজি করে একজন আরব নবির নামে সেগুলো নিজেদের মতো করে বানানো হয়েছে। কুরআনের পবিত্রতা হরণে এটিই সর্বাধিক চরমপন্থি পদ্ধতি।
বিগত দশকগুলোতে শেষ দুটি পর্যায় আরও বহুভাবে শক্তপোক্ত হয়েছে। কুরআনকে কেবল একটি সাংস্কৃতিক গ্রন্থ হিসেবে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে সম্প্রতি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি সকল জাতির জন্য নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট যুগের সৃষ্টি। কাজেই তা এখন আর প্রযোজ্য নয়।
'ঐশী প্রত্যাদেশের মাঝে সেসময়কার পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রতিফলন থাকে। প্রথাগত ইসলাম এটি অস্বীকার করে না... কিন্তু প্রথাগত ইসলাম সবসময় একে দেখে এসেছে সংশ্লিষ্ট সমাজকে পরিচালনাকারী গ্রন্থ হিসেবে। এটিকে ওই সমাজের ফসল হিসেবে দেখা কখনোই এর পক্ষে সম্ভব হয়নি। আধুনিক বিশ্বের মুসলিমরাও এ ধরনের চিন্তা লালন করে না। ভবিষ্যতেও চিন্তার সম্ভাবনা ক্ষীণ।'²³
এখান থেকে নাসর আবু যাইদ অনুপ্রেরণা কুড়িয়েছেন। মিশরের সর্বোচ্চ আদালত তাকে মুরতাদ এবং কুক তাকে 'মুসলিম সেক্যুলারিস্ট' বলে আখ্যায়িত করেছেন।²⁴ কুরআনের ব্যাপারে তার কেন্দ্রীয় চিন্তা হলো-'গ্রন্থটি যদি সপ্তম শতাব্দীর আরবদের জন্য বার্তা হিসেবে এসে থাকে, তাহলে তা তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জরুরি। কাজেই কোরান একটি মানবোচিত পরিবেশে গড়ে উঠেছে। তাই আবু যাইদ এটিকে প্রায়ই সংস্কৃতিজাত সৃষ্টি হিসেবে অভিহিত করেছেন। ক্যাসেশন কোর্টে তাকে অবিশ্বাসী হিসেবে রায় দেওয়ার সময় এ ব্যাপারটিই সামনে আনা হয়।²⁵
কুরআনকে পাঠাগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণের চেষ্টা সাধারণ মানুষদের কাছে নিরীহ উদ্যোগ বলেই মনে হবে। 'বানানতত্ত্ব' আর 'পাঠ্যভিত্তিক ভাষাতত্ত্ব' বিষয়ের মতো জিনিস অধ্যয়নে কীই-বা এমন ক্ষতি? কিন্তু এগুলোর মূল আগ্রহ মূলত টেক্সটের অধ্যয়নকে ঘিরে কম এবং এর ক্রমবিকাশকে ঘিরে বেশি। লক্ষ্য হলো কুরআনের রূপ-গঠনের উৎপত্তি সপ্তম/অষ্টম শতাব্দী অর্থাৎ অনেক পরের আরবি সাহিত্যকর্ম থেকে খুঁজে বের করা।²⁶ এর দ্বারা টেক্সটের বিশুদ্ধতা হরণ এবং সেক্যুলারকরণের পথ প্রশস্ত হয়।
বাইবেল পণ্ডিত ফন বুরেনের ব্যাপারে অধ্যাপক ই. এল. মাসক্যাল বলেছেন, 'খ্রিষ্টধর্মকে সেক্যুলারকরণের মূলমন্ত্র তিনি ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নামক দার্শনিক মতাদর্শে খুঁজে পেয়েছেন।'²⁷ এই যদি হয় বাইবেল অধ্যয়নে ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের লক্ষ্য, তাহলে কুরআনের ক্ষেত্রে ভিন্ন কী থাকতে পারে?
কিন্তু মুসলিমরা এ পন্থা গ্রহণ করবে না। তাই ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা জরুরি। তা হলো স্বদেশী ভাষায় কুরআন অনুবাদ এবং সেটিকে মূল আরবির সমান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা। মুসলিমজাতির তিন চতুর্থাংশ অনারব। কাজেই উক্ত পন্থা অবলম্বন করে তাদের আল্লাহর প্রত্যক্ষ বাণী থেকে দূরে রাখা সম্ভব।
'দেশীয় শিক্ষার্জনের ভাষা এবং কুরআনের ভাষার মধ্যে অমিল রয়েছে... উদ্বেগ দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ আধুনিকতার কল্যাণে এখন বিশ্বাসী জনসাধারণের কাছে ধর্মগ্রন্থের দুর্বোধ্যতা একটি চিন্তার বিষয়। তুরস্কের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ জিয়া গোকাল্প (মৃত্যু : ১৯২৪) বলেছেন, যে দেশে তুর্কি ভাষায় (দেশীয় ভাষায়) কোরান পড়া হয়, সে দেশে ছোট-বড় সবাই ঈশ্বরের নির্দেশ জানে।'²⁸
তুরস্কে আরবি কুরআনকে তুর্কি অনুবাদ দ্বারা প্রতিস্থাপন করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা বর্ণনা করা শেষে মাইকেল কুক উপসংহার টানেন—'ষোড়শ শতাব্দীর প্রোটেস্ট্যান্ট বা বিংশ শতাব্দীর ক্যাথলিকরা যেভাবে নিজেদের ভাষাকেই ধর্মগ্রন্থের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছিল, সেরকমটা অনারব মুসলিমবিশ্ব আজ পর্যন্ত করেনি।' ²⁹
তবে সব চেষ্টা ব্যর্থ হলেও একটি শেষ অস্ত্র রয়েছে। কুক বলেছেন—'মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল এবং প্রয়োজনে শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে (ধর্মীয়ভাবে অনুপ্রাণিত সকল আচরণের প্রতি নয়)। আধুনিক পশ্চিমা-সমাজে এটি মোটামুটি স্বতঃসিদ্ধ একটি বিষয়। অন্যদের বিশ্বাসকে ভুল এবং নিজেরটাকে সঠিক মনে করলে তা অবশ্যই অন্যায় এবং সংকীর্ণ চিন্তা হিসেবে পরিগণিত হবে... ধর্মের ক্ষেত্রে পরম সত্যের পুরো ধারণাটি খুবই সেকেলে শোনায়। কিন্তু এটা মূলধারার ইসলামের একদম কেন্দ্রীয় বিশ্বাস ছিল। সনাতন খ্রিষ্টান ধর্মেও এ বিশ্বাস কার্যরত ছিল। কিন্তু বিগত শতাব্দীগুলোর দিকে তাকালে তা ইসলামের মাঝে প্রকটভাবে টিকে এসেছে বলে দেখা যায়।' ³⁰
শিরোনামে 'অন্যের বিশ্বাসের প্রতি সহনশীলতা' লেখা থাকলেও কুক মূলত এখানে ইউনিভার্সালিজম বা সর্বজনীনতাবাদের বীজ ছড়াচ্ছেন। ইসলামে অমুসলিমদের অধিকার নিশ্চিতকরণে দৃঢ় ও স্পষ্ট নির্দেশনা আছে। সেখানে সহনশীলতার উপস্থিতি তো সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু কুক মূলত এখানে যা ঢোকাতে চাচ্ছেন, তা হলো সন্দেহ ও আপেক্ষিকতাবাদ। অর্থাৎ সব ধর্মকে একাধারে সঠিক ভাবতে হবে; না হলে তা সংকীর্ণমনা এবং মূর্খদের মতো আচরণ হয়ে যাবে। দুঃখজনকভাব ইসলামের জ্ঞান বিবর্জিত এবং কুশিক্ষায় শিক্ষিত সামসময়িক অনেক মুসলিমই এসব ধারণার ফাঁদে পা দিচ্ছেন। এ সকল ধ্যানধারণার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে— 'বর্তমানে কুরআন- অধ্যয়ন শাস্ত্রে একজন মুসলিম ও একজন অমুসলিমের গবেষণার মধ্যে পার্থক্য করার চেষ্টা প্রায় সর্বসম্মতভাবে প্রত্যাখ্যাত।' ³¹
পশ্চিমা পণ্ডিত মহল এখন তাফসীর শাস্ত্রের রক্ষণশীলতাকে আক্রমণ করার লক্ষ্যে নতুন সুর তুলেছে। তাদের আবদার হলো একদমই নতুন জিনিস নিয়ে আসা। মুসলিমদের পূর্ববর্তী গবেষণাকে উপেক্ষা করে ধর্মগ্রন্থ ব্যাখ্যায় নিজেদের একচ্ছত্র কর্তৃত্বের যৌক্তিকতা দাঁড় করাতে প্রাচ্যবিদরা যুক্তি দেয়—'মুসলিমরা যেহেতু (কুরআনকে) ঐশীগ্রন্থ ভেবে ধোঁকা খেয়েছে, তাই এর টেক্সটকে তারা যথাযথভাবে বুঝতে পারেনি। কিন্তু পশ্চিমা বিশেষজ্ঞগণের সেই সীমাবদ্ধতা নেই।'³²
ব্যাসেটি-সানি এবং ইয়োউয়াকিম মুবারাক উভয়েই কুরআনের ব্যাখ্যাকে খ্রিষ্টানদের সত্যচিন্তার সাথে এক করে দেওয়ার আহ্বান করেছেন, যার প্রতি আবার প্রাচ্যবিদ ডাব্লিও. সি. স্মিথ এবং কেনেথ ব্র্যাগ সমর্থনও জানিয়েছেন।³³
শেষোক্ত ব্যক্তি একজন অ্যাংলিকান বিশপ। মদিনায় অবতীর্ণ আয়াতগুলোকে তিনি ছাঁটাই করার আহ্বান জানান। তার অবস্থান কেবল মক্কায় অবতীর্ণ হওয়া পূর্বেকার আয়াতগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অংশটুকু রেখে দেওয়ার পক্ষে।³⁴ কারণ মদিনার আয়াতগুলোতে রাজনৈতিক এবং আইন-সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। এদিকে মক্কায় অবতীর্ণ অংশে রয়েছে শুধু তাওহিদ সংক্রান্ত মৌলিক বিষয়াদি। মাদানি অংশ বাদ দিলে মুখে 'লা ইলাহা ইলাল্লাহ' ছাড়া ধর্মের বেশি কিছু বাকি থাকে না।
এই সকল ধ্যানধারণার লক্ষ্য হলো দুর্বল মুসলিমের বিশ্বাসের ভিতকে আরও নাড়িয়ে দেওয়া। বিভ্রান্ত মুসলিমের হাতে প্রাচ্যবিদদের তৈরি অস্ত্র তুলে দিয়ে তাকে কুরআন থেকে দূরে এবং পশ্চিমা ধ্যানধারণার অনুগামী করে তোলা। এভাবে নিজেদের কিতাবকেই তারা প্রশ্ন করা শুরু করবে এবং পশ্চিমকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবে।
লেস্টারের প্রবন্ধটি সেই তুরুপেরই তাস। ইয়েমেনি খণ্ডাংশলিপির পেছনের গল্পগুলোকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র। খণ্ডাংশগুলোকে ঘিরে পুইনের নাম ব্যবহার করে লেস্টার কিছু দলিল পেশ করেছেন। অথচ বানানের বিচ্ছিন্ন কিছু ভিন্নতার বিষয়টি ছাড়া খোদ পুইনই সেগুলো প্রত্যাখ্যান করেন। কাযি ইসমাইল আকওয়ার প্রতি ড. পুইনের লিখিত চিঠির কিছু অংশ তুলে ধরছি। লেস্টারের প্রবন্ধটি প্রকাশের কিছুকাল পরেই এটি লেখা।³⁵
'গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঈশ্বরের কৃপায় অন্যান্য জাদুঘর ও লাইব্রেরিতে যেসব খণ্ডাংশ আছে, তার সাথে ইয়েমেনি কুরআন-খণ্ডাংশগুলোর কোনো পার্থক্য নেই। খুঁটিনাটি ব্যতিক্রম যেটুকু আছে তা মূল কুরআনের নয়; বরং বানানের পার্থক্য। এমনকি কায়রো থেকে প্রকাশিত কুরআনেও সুপরিচিত এই বৈশিষ্ট্যটি আছে— ইবরাহিমের (ابرهيم) পাশেই ইবরাহীম (ابرهیم) (দীর্ঘস্বরযুক্ত) কুরআনর (قرن) পাশে কুরআন (قرآن) সিমহুমের (سيهم) পাশে সীমাহুম (سيماهم) (দীর্ঘস্বরযুক্ত) প্রভৃতি।
আবার সবচেয়ে পুরোনো ইয়েমেনি খণ্ডাংশগুলোর ক্ষেত্রে সুরধ্বনি আলিফ না লেখার বৈশিষ্ট্যটি খুব সাধারণ।
কাজেই এর দ্বারা সব বিতর্কের অবসান ঘটল। পুইনের আবিষ্কারকে ঘিরে যে চক্রান্তের জাল বোনা হচ্ছিল, তাতে পানি ঢেলে দেওয়া হয়েছে। ফলে এ নিয়ে অযথা আর কোনোপ্রকার ভাবনা-চিন্তার প্রয়োজন নেই। তবে তর্কের খাতিরে যদি মন্তব্যগুলোকে সঠিক বলে ধরে নিতাম, তাহলে উত্তর কী হতো? সেক্ষেত্রে তিনটি প্রশ্ন আমাদের সামনে—
» কুরআন কী?
» কোনো পুরোনো আংশিক বা অখণ্ড পাণ্ডুলিপিকে যদি কুরআন হিসেবে দাবি করা হয়, যা বর্তমান কুরআন থেকে আলাদা, তাহলে মূল টেক্সটের ওপর কী প্রভাব পড়বে?
» কুরআনের দায়িত্বশীল কে বা কারা? অথবা ইসলাম এবং এর ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বিষয়াদিতে কাদের রায় চূড়ান্ত?
বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে এ সকল বিষয়ে আলোচনা করা হবে। প্রশ্নগুলোর উত্তর নিচে দেওয়া হলো। সেগুলোর যৌক্তিক ভিত্তিও চলমান গ্রন্থে দেখানো হবে—
» কুরআন স্বয়ং আল্লাহর কালাম। এটি মানবজাতির প্রতি প্রেরিত সর্বশেষ প্রত্যাদেশ। আল্লাহ তাআলা একে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নাযিল করেছেন। তিনি আল্লাহর মনোনীত সর্বশেষ বার্তাবাহক। কুরআন নির্দিষ্ট কোনো স্থান বা কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নাযিলকৃত ভাষায় কোনো রকম সংযোজন, বিয়োজন কিংবা সংশোধন ছাড়াই এটি মূলরূপে সংরক্ষিত আছে।
» সারাবিশ্বে সর্বসম্মতভাবে প্রচলিত কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো প্রকার আংশিক বা অখণ্ড কুরআন আবিষ্কার করা সম্ভব নয়। সাংঘর্ষিক হলে তা কুরআন হিসেবে প্রযোজ্যতা হারাবে। কারণ কোনোকিছুর কুরআন হিসেবে সাব্যস্ত হওয়ার একদম প্রাথমিক শর্ত হলো উসমানি মুসহাফের সাথে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকা।³⁶
» ইসলাম নিয়ে লিখতে পারে যেকেউ, কিন্তু ইসলাম এবং এ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে লেখার বৈধ অধিকার শুধু দ্বীনের অনুসারী মুসলিমের জন্য বরাদ্দ। কেউ কেউ এখানে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনতে পারেন। তাহলে প্রশ্ন হলো, অন্যরা কি পক্ষপাতিত্ব করে না? যারা অনুসারী নয়, তারা পক্ষপাতহীনতার দাবি করতে পারে না। কারণ নিজেদের বিশ্বাসের সাথে ইসলামের সামঞ্জস্য হওয়া কিংবা না হওয়ার ওপর তাদের ব্যক্তিগত অবস্থান নির্ভর করে। তাই খ্রিষ্টান, ইহুদি, নাস্তিক্যবাদী বা অবাধ্য মুসলিমদের কাছ থেকে আসা ব্যাখ্যা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হবে। উল্লেখ করা খুবই জরুরি, নবিজির মাধ্যমে পাওয়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নির্দেশনার সাথে সাংঘর্ষিক সকল মতবাদ বাতিল হিসেবে পরিগণিত। এ যুক্তি অনুযায়ী একজন ধার্মিক মুসলিমের বক্তব্যও প্রত্যাখ্যাত হতে পারে, যদি তা যথাযোগ্য জ্ঞানভিত্তিক না হয়। বাছাই করার এ নীতি মুহাম্মাদ ইবনু সিরিন রাহিমাহুল্লাহর³⁷ সেই অমূল্য উপদেশের মধ্যে নিহিত রয়েছে—নিশ্চয় এই ইলম হলো দ্বীন। কাজেই কার কাছ থেকে তোমরা দ্বীন গ্রহণ করছ, তা যাচাই করে নাও।³⁸
অমুসলিম মহল থেকে উৎসারিত পাণ্ডিত্য ও গবেষণার বিপরীতে মুসলিমদের যুক্তিসিদ্ধ কোনো জবাব নেই বলে অনেকেই দাবি করেন। কারণ মুসলিমদের ভিত্তি নাকি সম্পূর্ণ বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে—সেখানে বিচার-বিশ্লেষণের কোনো স্থান নেই। এই গ্রন্থখানির পৃষ্ঠাগুলোকে তাই আমি যুক্তির মঞ্চ হিসেবে বেছে নিলাম। তবে এর আগে প্রাক-ইসলামি ইতিহাসের কিছু অংশ তুলে ধরব। এতে করে কুরআনকে একদম কাছ থেকে দেখা অনেক সহজ হবে।
টিকাঃ
1. সুরা মায়িদা, আয়াত: ৮
2. উনিশ শতকের প্রসিদ্ধ প্রাচ্যবিদ এবং ঔপনিবেশিক প্রশাসক। জন্ম: ১৮১৯, মৃত্যু: ১৯০৫।
3. M. Broomhall, Islam in China, New Impression, London, 1987, 2.
4. লেস্টার ‘Qur’an’ না লিখে ‘Koran’ লিখেছেন, যা বানানের একটি ভুল প্রয়োগ। সরাসরি কাউকে উদ্ধৃত করার ক্ষেত্র ছাড়া আমি সঠিক বানানটিই ব্যবহার করব।
5. Lester, 46.
6. ibid. 46-47.
7. লন্ডন, ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯
8. ইয়েমেনের রাজধানী।
9. Lester, 44.
10. ibid. 45; উল্লেখ্য, পাণ্ডুলিপিগুলোর পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষণ সম্পন্ন হওয়ার আগেই উক্ত মন্তব্যগুলো করা হয়েছিল। এই হলো প্রাচ্যবিদদের গবেষণার হাল।
11. ibid, 46.
12. ibid. 54.
13. ibid, 54.
14. ibid, 55.
15. ibid, 55.
16. উল্লেখ্য, আমার মতে ইস্তাম্বুলে Tuerk ve Islam Eserleri Muezesi-এর সংগ্রহ ইয়েমেনের চেয়েও বেশি বড় হবে। তবে দুঃখজনকভাবে আমাকে এই সংগ্রহশালা পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাই ব্যাপারটি অনুমাননির্ভরই থেকে যাচ্ছে। তবে এফ. ডেরোশের তথ্য অনুযায়ী সেখানে প্রায় ২১০,০০০টি ফোলিও রয়েছে। ('The Qur'an of Amagur', Manuscripts of the Middle East, Leiden, 1990-91. vol. 5, p. 59.)
17. Lester, 44.
18. ibid, 56.
19. J. Koren and Y.D. Nevo, 'Methodological Approaches to Islamic Studies', Der Islam, Band 68, Heft 1, 1991, 89-90.
20. ibid. 92.
21. ibid. 100-102; এছাড়াও 'অধ্যায় ১৯.৪.ii দ্রষ্টব্য।
22. বিস্তারিত জানতে অধ্যায় ১৯ দ্রষ্টব্য।
23. Michael Cook, The Koran: A Very Short Introduction, Oxford Univ. Press, 2000, 44.
24. ibid. 46.
25. ibid, 46.
26. বিস্তারিত জানতে দেখুন—Stefan Wild’s (ed.) Preface to The Quran as Text, E.J. Brill. Leiden, 1996, vii-xi.
27. E.L. Mascall, The Secularization of Christianity, Darton, Longman & Todd Ltd. London, 1965, 41. Dr. Paul M. Van Buren is the author of “The Secular Meaning of the Gospel”, which is based on the analysis of Biblical language (ibid, 41.)
28. M. Cook, The Koran: A Very Short Introduction, 26. উল্লেখ্য ইসলাম গ্রহণের আগে জিয়া গোকাল্প একজন ধর্মান্তরিত ইহুদি ছিলেন। (M. Qutb, al-Mustashriqun wa al-Islam, 198).
29. M. Cook, The Koran: A Very Short Introduction, 27.
30. ibid, 33; 'মূলধারার ইসলামের... বিশ্বাস ছিল' কথাটির দ্বারা মনে হচ্ছে যেন বর্তমান ইসলামে তা আর প্রযোজ্য নয়।
31. Stefan Wild (ed.), The Qur'an as Text, x.; উল্লেখ্য, পশ্চিমা মহলে মুসলিম গবেষণাকে দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদায় দেখা হয়। কারণ পশ্চিমাদের উদ্দেশ্য হলো রিভিশনিজম আর মুসলিমরা অনুসরণ করে আদি সূত্র।
32. W.C. Smith, ‘The True Meaning of Scripture’, IJMES, vol. 11 (1980), 498.
33. Peter Ford, ‘The Qur’an as Sacred Scripture’, Muslim World, vol. lxxxiii, no. 2, April 1993, 151-53.
34. A. Saeed, ‘Rethinking “Revelation” as a Precondition for Reinterpreting the Qur’an: A Qur’anic Perspective’, IQS, 1:93-114.
35. চিঠির পূর্ণ আরবি প্রতিলিপির জন্য দ্রষ্টব্য ইয়েমেনি সংবাদপত্র আস-সাওরা, সংখ্যা ২৪.১১.১৪১৯ হিজরি/১১.৩.১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দ।
36. ১৮তম অধ্যায়ের ষষ্ঠ অনুচ্ছেদে পুইনের আবিষ্কার এবং সংশ্লিষ্ট দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে।
37. উল্লেখ্য, স্বরবর্ণের ক্ষেত্রে টেক্সটের গঠনে কিছু বৈচিত্র্য পাওয়া যাবে। ৯, ১০ এবং ১১ অধ্যায়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত দ্রষ্টব্য। এটি মাথায় রাখা চাই, সারাবিশ্বে কুরআনের প্রায় ২৫০,০০০ পাণ্ডুলিপি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। (অধ্যায় ৬. দ্রষ্টব্য) এতগুলোর মধ্যে তুলনা করতে গেলে অসংখ্য অনুলিপিকরণ-জনিত ভুল (Copying mistake) পাওয়া যেতে পারে। এটি খুবই মানবীয় একটি ত্রুটি। গবেষকগণ খুব ভালোভাবেই এসব অনিচ্ছাকৃত ভুল সম্পর্কে অবহিত। এগুলো কুরআন বিকৃতির (تعريف) আওতাভুক্ত নয়।
38. মুহাম্মাদ ইবনু সিরিন রাহিমাহুল্লাহর সেই অমূল্য উপদেশের মধ্যে নিহিত রয়েছে—
39. সহিহ মুসলিম, খণ্ড: ১, ১৪
📄 শেষ কথা
ইসলাম প্রসঙ্গে লেখার আগে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর দূত কি না, সেই সিদ্ধান্তে আসা আবশ্যক। তাকে প্রকৃত রাসুল ও শ্রেষ্ঠ নবি বলে জ্ঞান করা আলিম সমাজের কাছে রয়েছে ঐশী বাণী এবং হাদিসের সুবিশাল সংগ্রহ। স্বাভাবিকভাবেই তাদের গবেষণাগুলোর মধ্যে অজস্র মিল পরিলক্ষিত হয়। ইসলামের একদম মৌলিক বিষয়গুলোর ব্যাপারে তারা সবাই একই কাতারে। পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির কারণে যেসব ছোট-খাটো মতবৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়-তা পুরোপুরি স্বাভাবিক একটি বিষয়। পক্ষান্তরে, এর বিপরীত চিন্তার অনুসারীদের কাছে অবশ্যই মুহাম্মাদ একজন মিথ্যুক বা মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষ। এই দৃষ্টিকোণই অমুসলিম পণ্ডিতগোষ্ঠীর চেষ্টা ও কর্মের লক্ষ্য আগে থেকে ঠিক করে দেয়। মুহাম্মাদকে অসাধু বা কুরআনকে ভুল প্রমাণ করার উদ্দেশ্য না থাকলে তো তারা মুসলিমই হয়ে যেত।
ইসলামের ব্যাপারে পশ্চিমা গবেষণাগুলো নিছক পক্ষপাতিত্বের গণ্ডি অতিক্রম করে মূলত একটি ইসলামবিরোধী অন্ধবিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। এর দৃষ্টিভঙ্গির শেকড় সেই আদি পরম্পরা থেকেই শুরু: ধর্মীয় বিদ্বেষ, ক্রুসেডের ইতিহাস, মুসলিম-ভূমিতে উপনিবেশ স্থাপন এবং মুসলিমদের সংস্কৃতি, বিশ্বাস এবং ইতিহাসের প্রতি প্রকাশ্য তাচ্ছিল্যপূর্ণ ঔপনিবেশিক দম্ভ-দর্পণে এর জন্ম। এর সাথে সাম্প্রতিককালের লক্ষ্যগুলোও যুক্ত হয়েছে: সেক্যুলারিজমের পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্বব্যাপী ইহুদি-আত্মীকরণ ঘটানো এবং ইসরাইল রাষ্ট্রের ন্যায্যতা নিশ্চিত করা।
পূর্বপুরুষদের লেজ ধরে নতুনদের অনেক রকম আক্রমণ জারি থাকতে পারে। যেমন-কুরআনকে একটি সংঘবদ্ধ মানব-রচনা হিসেবে দেখানোর পাঁয়তারা করা। ঠিক তাদের পূর্ববর্তীরা যেভাবে 'মোহামেডান' শব্দটি ব্যবহার করেছে। শুনে মনে হয়
যেন মুসলিমরা মুহাম্মাদ নামের কোনো সোনার মূর্তির সামনে মাথা ঠেকাত।
ইমাম ইবনু সিরিনের বিখ্যাত বাণীটি আজ সব থেকে বেশি প্রযোজ্য-
নিশ্চয় এই ইলম হলো দ্বীন। কাজেই কার কাছ থেকে তোমরা দ্বীন গ্রহণ করছ, তা যাচাই করে নাও।
অর্থাৎ কুরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ, ইতিহাস প্রভৃতি সকল ইসলাম-সংক্রান্ত বিষয়ে শুধু একজন দ্বীনধারণকারী লেখকের গবেষণার প্রতিই আমরা নজর দেব। এরপর যোগ্যতা অনুযায়ী সেগুলো গ্রহণ বা নাকচ করা হবে। কিন্তু এই দলের বাইরে থাকা যেসব লোক আন্তরিকতার মুখোশের আড়ালে নিজেদের আসল উদ্দেশ্য লুকিয়ে রেখেছে, তাদের জন্য কেবল প্রত্যাখ্যানই আপ্যায়ন। তারা ইসলামের কর্তৃত্ব বহন করে নাগি এবং তাদের দাবিসমূহেরও কোনো বৈধতা নেই।
ক্লিনটনের অভিশংসন বিচারকার্য চলাকালীন কোনো টেনিস খেলোয়াড় বা মঞ্চনাটক সমালোচকের রায় জানতে চাওয়া হয়েছিল বলে মনে পড়ে না। আমেরিকার সংবিধানের কপি সবার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু বিধিবিধান-সংক্রান্ত আলোচনা ন্যায়সঙ্গতভাবেই শুধু আইনবিদ এবং সাংবিধানিক আইনের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অন্য দেশের আইনের অধ্যাপকরা পর্যন্ত এখানে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে না। কারণ তা আমেরিকার একান্ত অভ্যন্তরীণ বিষয়। দুঃখজনকভাবে, ইসলামের ক্ষেত্রে এই নীতি মোটেও অবলম্বন করা হয় না।
টিকাঃ
১. সহিহ মুসলিম-এর ভূমিকা, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৪
২. ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহী অমুসলিমদেরও উচিত হবে মুসলিম রচনাকর্মের মাধ্যমে পাঠযাত্রা আরম্ভ করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা সমাজতন্ত্র পড়তে গেলে আগে অবশ্যই জরুরি ইশতাহারগুলো জানতে হয়। এতে করে তারা মূল বিষয় সম্পর্কে আগে পরিষ্কার ধারণা লাভ করে। অন্তত সমাজতন্ত্রের ওপর সমালোচনামূলক প্রবন্ধগুলো পাঠের আগে এগুলো জানা অপরিহার্য। বাইবেলীয়-বিদ্যা অধ্যয়নের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কাজেই ইসলামিক স্টাডিজের শিক্ষার্থী হিসেবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা গবেষণার ওপর নির্ভর করার অর্থ হলো- মুসলিমদের বুনিয়াদি উৎসগুলো অগ্রাহ্য করে পশ্চিমা রিভিশনিষ্ট বা সংশোধনবাদী শিক্ষা লাভ করা। পুরো ব্যাপারটা খুব একটা যৌক্তিক প্রতিপন্ন হয় না।
৩. ৯০-এর দশকে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকালীন ইবনু সিরিনের উপদেশটি আবার নতুনভাবে অনুধাবন করেছিলাম। রিলিজাস স্টাডিজের প্রধান ছিলেন অধ্যাপক এল, ইউডোভিচ। একাধারে তিনি ছিলেন আরবি এবং ফিকহের ওপর ভালো দখল রাখা একজন ইহুদি বিশেষজ্ঞ। কাছের সহকর্মী হিসেবে তিনি একদিন মজা করে আমাকে বলেছিলেন, 'আরবি আর ফিকহ জানি। আমি তো তাহলে শাইখ হয়ে গেলাম।' ব্যাপারটি আমাকে বেশ চিন্তায় ফেলে দেয়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে, ভবিষ্যতে অমুসলিমদের কাছ থেকে ফতোয়া জানতে চাচ্ছে মুসলিমরা। এর কিছুদিন পরেই ঘাঁটতে ঘাঁটতে আবার এই অমূল্য উপদেশটি সামনে এসে দাঁড়ায়। সেই থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে তা স্মরণ রেখেছি।