📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 বৃষ্টি না হওয়া বা অনাবৃষ্টির কারণ বান্দার গুনাহ

📄 বৃষ্টি না হওয়া বা অনাবৃষ্টির কারণ বান্দার গুনাহ


প্রশ্ন: আমরা অধিকাংশই এ কথা শুনে থাকি যে, বৃষ্টি না হওয়া বা অনাবৃষ্টির কারণ বান্দার গুনাহ। যদি বিষয়টি এমনই হয়ে থাকে তাহলে যারা হিন্দুস্থান বা অমুসলিম দেশে রয়েছে দেখা যায় তাদের দেশে বৃষ্টি বন্যাতে পরিণত হয় অথচ আমাদের দেশে বৃষ্টি নেই। তবে তারা কি গুনাহ করে না এবং তারা কি আমাদের চেয়ে বেশি ইবাদত করে থাকে? নাকি বৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির বিষয়টি নির্ভর করে পৃথিবীর অবস্থানের ওপর? যেহেতু বিষয়টি নিয়ে মানুষ বলাবলি করে তাই বিষয়টিকে স্পষ্ট করলে কৃতজ্ঞ হবো।
উত্তর: প্রত্যেক মুসলিমকে এ কথা অবশ্যই জানতে হবে যে, আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মাখলুক সৃষ্টি করেছেন এবং মুসলিম অমুসলিম সবাই রিযিকের দায়িত্ব তিনি নিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَا مِن دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا ﴾ [هود: ٦] "আর জমিনে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণীর রিষ্কের দায়িত্ব আল্লাহরই এবং তিনি জানেন তাদের আবাসস্থল ও সমাধিস্থল।”⁹² [সূরা হূদ, আয়াত: ৬]
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ مَا أُرِيدُ مِنْهُم مِّن رِزْقٍ وَمَا أُرِيدُ أَن يُطْعِمُونِ إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ ﴾ [الذاريات: ٥٦، ٥٨] "আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদাত করবে। আমি তাদের কাছে কোন রিযিক চাই না; আর আমি চাই না যে, তারা আমাকে খাবার দিবে। নিশ্চয় আল্লাহই রিযিকদাতা, তিনি শক্তিধর, পরাক্রমশালী।” [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৬, ৫৮]
وَكَأَيِّن مِّن دَابَّةٍ لَّا تَحْمِلُ رِزْقَهَا اللَّهُ يَرْزُقُهَا وَإِيَّاكُمْ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ ﴾ [العنكبوت: ٦٠] "আর এমন কত জীব-জন্তু রয়েছে, যারা নিজদের রিযিক নিজেরা সঞ্চয় করে না, আল্লাহই তাদের রিযিক দেন এবং তোমাদেরও। আর তিনি সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী।” [সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত: ৬০] আল্লাহ তা'আলা জীন ইনসান কাফের মুশরিক মুসলিম অমুসলিম সবাইকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের রিযিকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন নদী নালা সাগর সমুদ্র প্রবাহিত করেন। তিনি মুসলিম অমুসলিম সবাইকে রিযিক দেন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তার মুসলিম বান্দাগণ যখন শরী'আত বিরোধী কোন কর্ম করেন এবং তার নির্দেশ অমান্য করেন, তখন তিনি তাদের শাস্তি দেন যাতে তারা তা থেকে বিরত থাকে এবং আযাব ও গযবের কারণসমূহ থেকে সতর্ক থাকে। শাস্তি স্বরূপ আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য বৃষ্টি বন্ধ করে দেন। যেমন-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবচেয়ে বড় সংস্কারক, তার যুগ সবচেয়ে উত্তম যুগ, তার সাহাবীগণ নবীদের পর সবচেয়ে উত্তম মানব হওয়া স্বত্বেও তার যুগে অনাবৃষ্টি দেখা দিয়েছিল, দুর্ভিক্ষ ও খরায় তারা আক্রান্ত হয়েছিল মানুষ। ফলে মুসলিমগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বৃষ্টির জন্য দো'য়া কামনা করলেন। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
أن رجلا دخل المسجد ورسول الله صلى الله عليه وسلم قائم يخطب فاستقبل رسول الله صلى الله عليه وسلم قائما وقال يا رسول الله هلكت الأموال وانقطعت السبل فادع الله أن يغيثنا فرفع رسول الله صلى الله عليه وسلم يديه وقال اللَّهُمَّ أَعْثَنَا اللَّهُمَّ أَغْثَنَا اللَّهُمَّ أَغثنا قال أنس ولا والله ما نرى في السماء سحابة ولا قزعة وما بيننا وبين سلع من بيت ولا دار قال فطلعت سحابة مثل الترس فلما توسطت السماء انتشرت ثم أمطرت قال أنس فلا والله ما رأينا الشمس ستا قال ثم دخل رجل من ذلك الباب في الجمعة المقبلة ورسول الله صلى الله عليه وسلم قائم يخطب فاستقبله قائما فقال يا رسول الله هلكت الأموال وانقطعت السبل فادع الله أن يمسكها عنا قال فرفع رسول الله صلى الله عليه وسلم يديه فقال اللهم حولنا ولا علينا اللهم على الآكام والظراب وبطون الأودية ومنابت الشجر قال فأقلعت وخرجنا نمشي في الشمس قال شريك سألت أنسا أهو الرجل الأول قال لا
"এক লোক মসজিদে প্রবেশ করে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, ধন-সম্পদ ধ্বংস প্রায়, রাস্তা-ঘাট বন্ধ আপনি আল্লাহকে ডাকেন যেন আমাদের বৃষ্টি দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমু'আর সালাতের খুতবায় দুই হাত তুলে বলেন, হে আল্লাহ আপনি আমাদের বৃষ্টি দেন। হে আল্লাহ আপনি আমাদের বৃষ্টি দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বার থেকে নামার আগেই বৃষ্টি বর্ষণ শুরু হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা আকাশে মেঘমালা সৃষ্টি করলেন। তারপর তা আকাশে ছড়িয়ে দিলেন এবং বৃষ্টি নাযিল করলেন।
লোকেরা মসজিদ থেকে বের হলে তারা সবাই বৃষ্টি থেকে নিজেদের বাঁচাতে চেষ্টা করছেন। এভাবে এক সপ্তাহ-পরবর্তী জুমু'আর দিন পর্যন্ত লাগাতার মুশলধারে বৃষ্টি হতে লাগল। লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আবার এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ধন-সম্পদ ধ্বংস প্রায়, রাস্তা-ঘাট বন্ধ। আপনি আল্লাহকে ডাকেন যেন বৃষ্টি বন্ধ করে দেয়। এ কথা শোনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদম সন্তানের দূর্বলতার কথা চিন্তা করে মুচকি হাঁসি দিলেন এবং দুই হাত তুলে বললেন, হে আল্লাহ আমাদের আশ-পাশে, আমাদের ওপর নয়, হে আল্লাহ পাহাড়ে জঙ্গলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। হাদীসের বর্ণনাকারী আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সাথে সাথে আকাশে মেঘমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল এবং মদীনা আলোকিত হয়ে গেল।
মোট কথা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এবং তার সাহাবীগণ সর্ব উত্তম মানব হওয়া সত্বেও আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের শিক্ষা দেওয়া, তাদের ও অন্যান্যদের আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি ও তার রহমতের কামনা করার প্রতি উৎসাহ প্রদান এবং যাবতীয় অপকর্ম ও গুনাহ থেকে ফিরে এসে তার নিকট তাওবা করার দিক নির্দেশনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তারাও মুসিবতে আক্রান্ত হয়েছেন। কারণ, বিভিন্ন বিপদ-আপদে তাদের আক্রান্ত হওয়াতে রয়েছে মুক্তির উপায় ও কারণসমূহের প্রতি দিক নির্দেশনা। যাতে তারা তার কাছে কান্না-কাটি করে এবং তারা এ কথা বিশ্বাস স্থাপন করে যে, আল্লাহ তা'আলাই রিযিক দাতা এবং তিনিই যা ইচ্ছা করে থাকেন।
যখন আল্লাহর নিকট ফিরে আসবে না আল্লাহ তা'আলা তাদের মহামারি, দুর্ভিক্ষ, দুশমনদের চাপিয়ে দেওয়া, অনাবৃষ্টি ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের মুসিবত দ্বারা শাস্তি দেবেন, যাতে তারা গুনাহ থেকে বিরত থাকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে এবং তার দিকে ফিরে যায়। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَمَا ا أَصَبَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُوا عَن كَثِيرٍ ﴾ [الشورى: ٣٠] “আর তোমাদের প্রতি যে মুসীবত আপতিত হয়, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল। আর অনেক কিছুই তিনি ক্ষমা করে দেন।” [সূরা আশ-শুরা, আয়াত: ৩৭]
অহুদের যুদ্ধে মুসলিমগণ পরাজিত হলেন এবং তাদের কতক নিহত আবার কতক আহত হলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, أَوَلَمَّا أَصَبَتْكُم مُّصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُم مِثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّى هَذَا قُلْ هُوَ مِنْ عِندِ أَنفُسِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ﴾ [آل عمران: [١٦٥ "আর যখন তোমাদের উপর বিপদ এল, (অথচ) তোমরা তো এর দ্বিগুণ বিপদে আক্রান্ত হলে (বদর যুদ্ধে)। তোমরা বলেছিলে এটা কোথেকে? বল, 'তা তোমাদের নিজদের থেকে'। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।” [সূরা আলে, ইমরান, আয়াত: ১৬৫]
পক্ষান্তরে বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয় হলো এবং কাফেরদের পরাজয়। কাফেরদের সত্তরজনকে হত্যা এবং সত্তরজনকে বন্দি করা হলো। কিন্তু অহুদের যুদ্ধে মুসলিমগণ তাদের নিজেদের কর্মের কারণে মহা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলো। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবন জুবাইরের নেতৃত্বে পঞ্চাশজন তীরান্দায যোদ্ধাকে মুসলিম বাহিনীর পেছনের পাহাড়ের উপর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি তাদের বলেন, আমাদের যদি পাখি এসে নিয়েও যায় এবং বিজয়ী হই বা পরাজিত হই সর্ব অবস্থায় তোমরা তোমাদের জায়গা ছাড়বে না।
আল্লাহ তা'আলা যখন মুসলিমদের বিজয়ী এবং কাফেরদের পরাজিত করলেন তীরান্দায সাহাবীগণ ভাবলেন যে যুদ্ধের নিষ্পতি ও মীমাংসা হয়ে গেছে। এবং ফলাফল মুসলিমদের অনুকুলে চলে এসেছে। এখন শুধু গণিমতের মাল একত্র করা অবশিষ্ট আছে। তারা তাদের অবস্থান ছেড়ে মাঠে গণিমতের মালা একত্র করার লক্ষে নেমে পড়লেন। তাদের আমীর আব্দুল্লাহ ইবন জুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী স্মরণ করিয়ে দিলেন এবং তাদের জায়গা না ছাড়ার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তারা তার কথা গুরুত্ব দেয়নি তারা বলল, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে কাফেররা পরাজিত হয়েছে। এ যখন অবস্থা ছিল, মুসলিমদের পেছন থেকে যে সুরঙ্গটি মুসলিমগণ ছেড়ে দিয়েছিল তার প্রবেশ পথ দিয়ে কাফের বাহিনী প্রবেশ করল। মুসলিমগণ তাদের নিজেদের ভুলের কারণে মহা বিপদে আক্রান্ত হলো।
মোট কথা, মুসলিমগণ অনেক সময় বিভিন্ন মুসিবতে আক্রান্ত হয়। তাতে তাদের জন্য রয়েছে শিক্ষা ও সতর্কতা এবং তাদের গুনাহের মার্যনা। এ ছাড়াও রয়েছে তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের কল্যাণ। যাতে তারা বুঝতে পারে যে, বিজয় কেবল আল্লাহর হাতে। তাদের এক আল্লাহর ইবাদত করা এবং তাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবস্থান তাদের মুক্তির জন্য যথেষ্ট নয়। বরং তাদের অবশ্যই আল্লাহর আনুগত্যতা ও বশ্বতা মেনে নিতে হবে। আল্লাহর আদেশ নিষেধের পাবন্দী করতে হবে। আল্লাহর দুশমনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। এ কারণে এ কথা- ﴿أَوَلَمَّآ أَصَـٰبَتۡكُم مُّصِيبَةٞ قَدۡ أَصَبۡتُم مِّثۡلَيۡهَا قُلۡتُمۡ أَنَّىٰ هَـٰذَاۖ قُلۡ هُوَ مِنۡ عِندِ أَنفُسِكُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٞ ﴾ [آل عمران: ١٦٥ “আর যখন তোমাদের উপর বিপদ এল, (অথচ) তোমরা তো এর দ্বিগুণ বিপদে আক্রান্ত হলে (বদর যুদ্ধে)। তোমরা বলেছিলে এটা কোত্থেকে? বল, 'তা তোমাদের নিজদের থেকে'। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।” [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৬৫] দ্বারা তাদের সতর্ক করা হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সাহাবীগণকে যদি গুনাহের শাস্তি সম্মুখীন হতে হয় এবং অন্যান্যদের মতো তাদেরও আক্রান্ত হতে হয়, তাহলে অন্যদের অবস্থা কেমন হতে পারে?
প্রক্ষান্তরে কাফির, মুশরিকদের বিষয়ে আল্লাহর দুশমন শয়তান অবসর গ্রহণ করেছেন। কারণ, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ও দেশে তারা এমনিতেই শয়তানের অনুসরণ করে এবং আনুগত্যতা স্বীকার করে। তাদের ওপর আল্লাহর যে সব নি'আমত-রিযিক ও বৃষ্টি ইত্যাদির ধারাবাহিকতা আদৌ বজায় রয়েছে তা হলো তাদের জন্য অবকাশ মাত্র। অন্যথায় তাদের পরিণতি খুবই ভয়াবহ। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَلَمَّا نَسُواْ مَا ذُكِّرُوا بِهِ، فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى إِذَا فَرِحُوا بِمَا أُوتُوا أَخَذْنَاهُم بَغْتَةً فَإِذَا هُم مُّبْلِسُونَ﴾ [الانعام: ٤٤] “অতঃপর তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল, তারা যখন তা ভুলে গেল, আমি তাদের উপর সব কিছুর দরজা খুলে দিলাম। অবশেষে যখন তাদেরকে যা প্রদান করা হয়েছিল তার কারণে তারা উৎফুল হল, আমি হঠাৎ তাদেরকে পাকড়াও করলাম। ফলে তখন তারা হতাশ হয়ে গেল।" [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৪৪] আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّلِمُونَ إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَرُ ﴾ [ابراهيم: ٤٢] “আর যালিমরা যা করছে, আল্লাহকে তুমি সে বিষয়ে মোটেই গাফেল মনে করো না, আল্লাহ তো তাদের অবকাশ দিচ্ছেন, ঐ দিন পর্যন্ত যে দিন চোখ পলকহীন তাকিয়ে থাকবে।” [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৪২] আল্লাহ তা'আলা কখনো কখনো সময় দুনিয়াতেই তাদের শাস্তি দিয়ে থাকেন। যেমন, তাদের কুফরী ও গুনাহের কারণে তারা মহা যুদ্ধে আক্রান্ত হয়েছিল। অনুরূপভাবে বিভিন্ন প্রকার ব্যাধিতে দুনিয়াতে তাদের শাস্তি দেওয়া হয়ে থাকে যাতে তারা তা থেকে ফিরে আসেন। হিকমতের কারণে আল্লাহ তা'আলা কখনো সময় অবকাশ দেন। তবে তিনি একেবারে ছেড়ে দেন না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا يَعْمَلُونَ ﴾ [البقرة: ١٤٤]
"এবং তারা যা করে, সে ব্যাপারে আল্লাহ গাফিল নন।" [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৪৪] আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿ وَالَّذِينَ كَذَّبُوا بِناياتِنَا سَنَسْتَدْرِجُهُم مِّنْ حَيْثُ لا يَعْلَمُونَ وَأُمْلِي لَهُمْ إِنَّ كَيْدِى مَتِينُ ﴾ [الاعراف: ۱৮১, ১৮২]
আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, অচিরেই আমি তাদেরকে ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করব যে, তারা জানতেও পারবে না। আর আমি তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছি। নিশ্চয় আমার কৌশল শক্তিশালী।” [সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ১৮১, ১৮২]
আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের সুযোগ দেন এবং ফলফলাদি, রিযিক, নদীনালা বৃষ্টি ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার নি'আমতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার মাধ্যমে তাদের সময় দেন। তারপর তিনি যখন চান তাদের কঠিন পাকড়া করেন। যেমনটি আল্লাহ তা'আলা অসংখ্য অগণিত অপরাধ ও গুনাহ করা স্বত্বেও একজন মুসলিমকে সুযোগ ও অবকাশ দিয়ে থাকেন। তারপর তাকে শিক্ষা দেওয়া ও সতর্ক করার জন্য পাকড়াও করেন এবং শাস্তি দেন।
সুতরাং মুসলিমদের ওপর ওয়াজিব হলো সতর্ক হওয়া এবং আল্লাহর সুযোগ ও অবকাশ দেওয়াতে ধোঁকায় না পড়া। তারা যেন গুনাহের ওপর স্থায়ী না হয়ে খুব দ্রুত শাস্তি আসার পূর্বে খাটি তাওবাহ করে। আল্লাহর নিকট আমাদের কামনা তিনি যেন আমাদের ক্ষুব্ধতার কারণসমূহ এবং তার শাস্তির যন্ত্রণা থেকে নিরাপদ রাখেন। আল্লাহই তাওফীক দাতা।
শাইখ আব্দুল আব্দুল আযীয বিন বায রহ.

টিকাঃ
⁹² এখানে مُسْتَقَرّ বা আবাসস্থল বলতে মাতৃগর্ভে অবস্থান মতান্তরে মৃত্যু পর্যন্ত দুনিয়ায় অবস্থানকে বুঝানো হয়েছে। আর مُسْتَوْدَع দ্বারা কবরস্থ করার স্থান মতান্তরে জন্মের পূর্বে পিতৃমেরুদন্ডে অবস্থান কিংবা মৃত্যুর সময় বা স্থান বুঝানো হয়েছে।

📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 বংশ সম্পর্কে কটাক্ষ করা এবং মৃত ব্যক্তির ওপর কান্নাকাটি করা কুফরী হওয়ার অর্থ

📄 বংশ সম্পর্কে কটাক্ষ করা এবং মৃত ব্যক্তির ওপর কান্নাকাটি করা কুফরী হওয়ার অর্থ


«اثْنَتَانِ فِي النَّاسِ هُمَا بِهِمْ كُفْرُ الطَّعْنُ فِي النَّسَبِ وَالنِّيَاحَةُ عَلَى الْمَيِّتِ» : প্রশ্ন: হাদীস—
“মানুষের মধ্যে দুইটি বিষয় যা তাদের সাথে কুফর। এক, বংশ সম্পর্কে কটাক্ষ করা এবং মৃত ব্যক্তির ওপর উচ্চ স্বরে কান্নাকাটি করা।”⁹³ হাদীসে কুফরের অর্থ কি?
উত্তর: হাদীসটি সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ। ইমাম মুসলিম স্বীয় সহীহতে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
বংশ সম্পর্কে কটাক্ষ করার অর্থ, কাউকে ছোট করা বা তিরস্কার করার উদ্দেশ্যে কারো বংশের দোষ ধরা ও দুর্নাম করা। আর তা যদি সংবাদ অধ্যায়ের হয়, যেমন বলল, অমুক তামীম গোত্রের লোক তারপর সে তাদের প্রকৃতি ও ধরনের বর্ণনা তুলে ধরল। অথবা বলল, অমুক কাহতান গোত্রের বা কুরাইশ গোত্রের বা বনী হাশেম গোত্রের লোক। তারপর সে তাদের হেয় বা খাট করার উদ্দেশ্য ছাড়া তাদের বংশের বাস্তব কোন বৈশিষ্ট্য তুলে ধরল, তাতে সে বংশ সম্পর্কে কটাক্ষাকারী বলে পরিগণিত হবে না।
আর মৃত ব্যক্তির ওপর কান্নাকাটি করার অর্থ হলো, মৃত ব্যক্তির ওপর উচ্চ আওয়াজে কান্না করা। এটি সম্পূর্ণ হারাম বা নিষিদ্ধ।
এখানে কুফর দ্বারা উদ্দেশ্য ছোট কুফর। এখানে কুফর দ্বারা সে কুফর উদ্দেশ্য নয় যার দ্বারা একজন মুসলিম ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী সত্যিকার কুফর ও বড় কুফরের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلَاةِ "একজন মানুষ ও কুফর-শির্কের মাঝে পার্থক্য হলো সালাত ত্যাগ করা।"⁹⁴ আলেমদের বিশুদ্ধ মতামত অনুযায়ী এটিই হলো বড় কুফর যা একজন মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়।
আলেমগণ বলেছেন, কুফর দুই প্রকার, যুলুম দুই প্রকার ফিস্ক দুই প্রকার। অনুরূপভাবে শির্ক দুই প্রকার—বড় শির্ক এবং ছোট শির্ক।
বড় শির্ক হলো, মৃত ব্যক্তির নিকট চাওয়া, তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া, তাদের জন্য মান্নত করা এবং মুর্তি, গাছপালা, পাথর, চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ নক্ষত্র ইত্যাদির জন্য মান্নত করা।
আর ছোট শির্ক যেমন, এ ধরনের কথা বলা, যদি আল্লাহ না হতো এবং অমুক না হতো। আল্লাহ যা চেয়েছেন এবং অমুক যা চেয়েছেন ইত্যাদি। বলা উচিত হলো, যদি আল্লাহ না হতো অতঃপর অমুক এবং আল্লাহ যা চেয়েছেন অতঃপর অমুক যা চেয়েছেন।
অনুরূপভাবে গাইরুল্লাহর নামে সপথ করা। যেমন, নবী রাসূলের নামে কসম করা অথবা কারো হায়াতের কসম করা অথবা আমানতের কসম করা ইত্যাদি। এ ধরনের কসম শির্কে আসগর বা ছোট শির্কের অর্ন্তভুক্ত। অনুরূপভাবে রিয়া বা লোকিকতা।
যেমন, ক্ষমা চাইল মানুষকে শুনানো উদ্দেশ্যে অথবা কুরআন পড়লো যাতে মানুষ তাকে কারী বলে। যুলুম দুই প্রকার-বড় যুলুম, আল্লাহর সাথে শির্ক করা, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿وَالْكَافِرُونَ هُمُ الظَّلِمُونَ ﴾ [البقرة: ٢٥٤﴿ “আর কাফিররাই যালিম।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৪৫] আল্লাহ তা'আলা বলেন, الَّذِينَ ءَامَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ أُولَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ ﴾ [الانعام: ٨٢]
এবং নিজ ঈমানকে যুলমের সাথে সংমিশ্রণ করেনি, তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত।” [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৮২] ছোট যুলম হলো, একজন মানুষ অপর মানুষের জান ও মালের ক্ষেত্রে যুলুম-অত্যাচার করা এবং আল্লাহর নাফরমানী ও গুনাহ করার মাধ্যমে বান্দা তার নিজের ওপর যুলম করা। যেমন যিনা-ব্যভিচার করা, মদ পান করা ইত্যাদি। আল্লাহর কাছে এ থেকে আশ্রয় কামনা করি। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা। শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.
وصلى الله وسلم على عبده ونبيه محمد ، وعلى آله وصحبه أجمعين

টিকাঃ
⁹³ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৩৬
⁹⁴ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00