📄 “যে ব্যক্তি আমার দিক এক বিঘত অগ্রসর হয় আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই” হাদীসটি বিষয়ে আলোচনা
প্রশ্ন: সাইয়্যেদ আলোভী আল-মালেকী এবং মাহমুদ আমীন আন-নাবাবীর সম্পদনায় রচিত রিয়াদুস সালেহীন কিতাবে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে কুদসী পড়েছি, যাতে আল্লাহর দৌড়ে আসার কথা রয়েছে। হাদীসটি এই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে বর্ণনা দিয়ে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, إِذَا تَقَرَّبَ الْعَبْدُ إِلَيَّ شِبْرًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ ذِرَاعًا وَإِذَا تَقَرَّبَ مِنِّي ذِرَاعًا تَقَرَّبْتُ مِنْهُ بَاعًا وَإِذَا أَتَانِي مَشْيًا أَتَيْتُهُ هَرْوَلَهُ "যখন কোন ব্যক্তি আমার দিক এক বিঘাত অগ্রসর হয় আমি তার দিক এক হাত অগ্রসর হই আর যখন কোন বান্দা আমার প্রতি এক বাহু পরিমাণ অগ্রসর হয় আমি তার প্রতি বাহু পরিমাণ অগ্রসর হই যখন কোন ব্যক্তি আমার দিক পায়ে হেটে অগ্রসর হয় আমি তার দিকে দৌড়ে অগ্রসর হই।"⁸⁶
উভয় সম্পাদনকারী তাদের সম্পাদনায় লিখেছেন- এটি একটি দৃষ্টান্ত অধ্যায়ের এবং বিষয়টিকে অধিক স্পষ্ট করার জন্য আধ্যাতিক বিষয়কে বস্তুবাদ দ্বারা চিত্রায়ন করা হয়েছে। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি কোন নেক আমল করল তা যতই কম হোক না কেন আল্লাহ তা'আলা তার সাওয়াবকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেবেন এবং তার প্রতি অধিক অনুগ্রহ করবেন। অন্যথায় অকাট্য ও সু-স্পষ্ট প্রমাণাদি এ বিষয়ে বিদ্যমান যে, এখানে আল্লাহর কাছে আসা, হেটে আসা এবং দৌড়ে আসা বলতে কিছু নেই। কারণ, এ গুলো সবই হলো মাখলুকের গুন যা ক্ষণস্থায়ী। আর আল্লাহ তা'আলা ক্ষণস্থায়ী মাখলুকের গুনে গুনান্বিত হওয়া থেকে পবিত্র ও উর্ধ্বে। এখানে যেহেতু অকাট্য ও সু-স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে আল্লাহর হাঁটা বা দৌড় বলতে কিছু নেই, তাহলে আল্লাহর হাঁটা ও দৌড়া সম্পর্কে তারা উভয়জন যা বলেছেন তা কি আল্লাহর সিফাতকে প্রমাণ করার ক্ষেত্রে এবং সিফাতগুলো বর্ণনা যেভাবে এসেছে সে ভাবে বহাল রাখা সম্পর্কে সালাফদের মতের সাথে তাদের কথার মিল রয়েছে? আশা করি বিষয়টি স্পষ্ট করলে কৃতজ্ঞ হবো।
উত্তর: আলহামদু লিল্লাহ! সমস্ত প্রসংশা আল্লাহর জন্যই। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীদের ওপর এবং হিদায়াতের অনুসারীদের ওপর। অতঃপর: নি:সন্দেহে বলা যায় যে, প্রশ্ন উল্লিখিত হাদীসটি বিশুদ্ধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ أَنَا عِنْدَ ظَنَّ عَبْدِي بِي وَأَنَا مَعَهُ حِينَ يَذْكُرُنِي إِنْ ذَكَرَنِي فِي نَفْسِهِ ذَكَرْتُهُ فِي نَفْسِي وَإِنْ ذَكَرَنِي فِي مَلا ذَكَرْتُهُ فِي مَلا هُمْ خَيْرٌ مِنْهُمْ وَإِنْ تَقَرَّبَ مِنِّي شِبْرًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ ذِرَاعًا وَإِنْ تَقَرَّبَ إِلَى ذِرَاعًا تَقَرَّبْتُ مِنْهُ بَاعًا وَإِنْ أَتَانِي يَمْشِي أَتَيْتُهُ هَرْوَلَةً ».
"আমি আমার প্রতি আমার বান্দার ধারণার কাছাকাছি থাকি। যখন সে আমার যিকির করে আমি তার সাথেই থাকি। যখন সে আমাকে স্বীয় অন্তরে স্মরণ করে আমি স্বীয় অন্তরে তার স্মরণ করি। যখন সে কোন জামাতের মধ্যে আমার স্মরণ করে আমিও তার চেয়ে উত্তম জামাতে তার স্মরণ করি। আর যখন কোন ব্যক্তি আমার দিক এক বিঘাত অগ্রসর হয় আমি তার দিক এক হাত অগ্রসর হই আর যখন কোন বান্দা আমার প্রতি এক হাত পরিমাণ অগ্রসর হয় আমি তার প্রতি বাহু পরিমাণ অগ্রসর হই। যখন কোন ব্যক্তি আমার দিক পায়ে হেটে অগ্রসর হয় আমি তার দিকে দৌড়ে অগ্রসর হই।"⁸⁷
এ বিশুদ্ধ হাদীসটি আল্লাহর অপার অনুগ্রহ ও মহত্বের প্রমাণ। আল্লাহ তা'আলা তার বান্দাদের প্রতি কতনা কল্যাণকামী ও হিতাকাঙ্খি, তা এ হাদীস দ্বারা স্পষ্ট। বান্দার আমল করা এবং নেক আমলের প্রতি দ্রুত অগ্রসর হওয়া থেকেও আল্লাহর রহমত, দয়া ও অনুগ্রহ বহুগুণে অগ্রসরমান।
সালাফদের মত অনুযায়ী হাদীসটি বাহ্যিক অর্থের ওপর প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে কোন প্রকার বাধা-বিপত্তি নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ রাসূলের মুখ থেকে হাদীসটি শুনেছেন। তারা সর্বত্তোম উম্মত এবং উম্মতের কর্ণধার হওয়া সত্বেও হাদীসটি শোনার পর কোন প্রশ্ন বা আপত্তি করেননি এবং কোন ব্যাখ্যা করেননি। তারা আরবী ভাষা সম্পর্কে সর্বাধিক অভিজ্ঞ। আল্লাহর জন্য যা প্রযোজ্য এবং যা প্রযোজ্য নয় এ সম্পর্কে সমগ্র মানুষের তুলনায় তারাই সর্বাধিক জ্ঞাত। সুতরাং, ওয়াজিব হলো যেভাবে বর্ণিত সেভাবে কবুল করা এবং উত্তম ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা। এ ধরনের সিফাত আল্লাহর ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রযোজ্য। তবে তাতে তিনি তার সৃষ্টি বা মাখলুকের সদৃশ নয়। ফলে আল্লাহর নিকটে আসা একজন বান্দা অপর বান্দার নিকটে আসার মতো নয়। আল্লাহর হাঁটা বান্দার হাঁটার মতো নয় এবং আল্লাহর দৌড়ে আসা বান্দার দৌড়ে আসার মতো নয়। অনুরূপভাবে আল্লাহর ক্ষুব্ধ হওয়া, সন্তুষ্ট হওয়া, কিয়ামত দিবসে আল্লাহর আগমন, বান্দার মাঝে বিচার ফায়সালা করান জন্য কিয়ামতের দিন আল্লাহর উপস্থিত হওয়া, প্রতি রাতের শেষাংশে আল্লাহর দুনিয়ার আকাশে অবতরণ এবং আল্লাহর আরশের উপর উঠা ইত্যাদি। এ গুলো সবই আল্লাহর সিফাত যা তার শানের সাথে প্রযোজ্য। কোন মাখলুকের সাথে এর কোন সদৃশ নেই।
সুতরাং যেমনিভাবে আল্লাহর আরশের উপর উঠা, শেষ রাতের এক তৃতীয়াংশে দুনিয়য়ার আকাশে অবতরণ করা, কিয়ামতের দিন আগমন করা মাখলুকের উঠা, আসা, অবতরণ করার সাথে সদৃশ নয় অনুরূপভাবে তার ইবাদত কারী আবেদ বান্দা এবং তার আনুগত্যের প্রতি দ্রুত অগ্রসর হওয়া বান্দাদের নিকট হওয়া এবং তাদের কাছে হওয়া বান্দার কাছে হওয়ার সদৃশ নয়। আল্লাহর কাছে হওয়া বান্দাদের একে অপরের কাছে হওয়ার মতো নয়, আল্লাহর হেঁটে আসা তার বান্দাদের হেঁটে আসার মতো নয় এবং তার দৌড়ে আসা তার বান্দাদের দৌড় আসার মতো নয়। বরং এটি এমন একটি বিষয় যা আল্লাহর শানের সাথে প্রযোজ্য। আল্লাহর অন্যান্য সিফাতের মতো এ ক্ষেত্রেও কোন মাখলুক তার সাথে সদৃশ নয়। আর তিনি তার সিফাত সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত এবং তার ধরণ-প্রকৃতি সম্পর্কে অধিক অভিজ্ঞ।
পূর্বসূরীগণ এ ব্যাপারে একমত যে, আল্লাহর সিফাত ও নাম সম্পর্কে আমাদের ওপর ওয়াজিব হলো, যেভাবে বর্ণনা এসেছে তার ওপর বহাল রাখা এবং তার শাব্দিক অর্থকে বিশ্বাস করা যে, তা অবশ্যই সত্য যা কেবল আল্লাহর শানের সাথে খাস। যেমনিভাবে তার সত্বা সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না অনুরূপভাবে তার সিফাতসমূহের ধরণ প্রকৃতি সম্পর্কেও তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না। যেমনিভাবে কামিল ও পরিপূর্ণ সত্বাকে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা ওয়াজিব অনুরূপভাবে আল্লাহর সিফাতসমূহ পরিপূর্ণ ও উন্নত এ কথা বিশ্বাস করে এবং এর প্রতি ঈমান রেখে আল্লাহর জন্য তার সিফাতসমূহ সাব্যস্ত করাও ওয়াজিব। আর আল্লাহর সিফাত মাখলুকের সিফাতের মতো নয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ اللَّهُ الصَّمَدُ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ ﴾ [الاخلاص: ١، ٤] “বল, তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। আর তাঁর কোন সমকক্ষও নেই। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি।” [সূরা আল-ইখলাস, আয়াত: ১, ৪]
আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴾فَلَا تَضْرِبُوا لِلَّهِ الْأَمْثَالَ إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ﴿ [النحل: ٧٤] “সুতরাং তোমরা আল্লাহর জন্য অন্য কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ জানেন আর তোমরা জান না।” [সূরা আন-নাহাল, আয়াত: ৭৪]
আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ، شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ﴾ [الشورى: ۱۱] “তাঁর মত কিছু নেই আর তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শুরা, আয়াত: ১১] সাদৃশ্যবাদীরা এ কথা لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ "তাঁর মত কিছু নেই” এবং ﴿فَلَا تَضْرِبُوا لِلَّهِ الْأَمْثَالَ إِنَّ اللَّهَ "সুতরাং তোমরা আল্লাহর জন্য অন্য কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করো না।” দ্বারা প্রতিহত করেন।
মু'আত্তালাদের এ কথা قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ "বল, তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়।” দ্বারা জবাব দেন। আলেম হোক বা সাধারণ মানুষ হোক প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ওয়াজিব হলো আল্লাহ তা'আলা তার নিজের জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন তা কোন প্রকার দৃষ্টান্ত ছাড়া পরিপূর্ণ সাব্যস্ত করা এবং তিনি তার জন্য যা না করেছেন, তা না করা। আর যে সব থেকে তিনি তাকে পবিত্র বলে ঘোষণা করেছেন তা কোন প্রকার অকার্যকর করা ছাড়া তার জন্য হুবহু সাব্যস্ত করা।
এটিই রাসূলের সাহাবী এবং তাদের অনুসারি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা। এ ছাড়াও উম্মতের পূর্বসূরী ইমামগণ, যেমন সাতজন ফকীহ, মালেক বিন আনাস, আওযাঈ, সুরী, শাফেঈ, আহমদ ইবন হাম্বল, আবু হানীফা এবং অন্যান্য ইমামদের বিশ্বাস। তারা বলেন, কোন প্রকার বিকৃতি, অকার্যকর করা, ধরণ প্রকৃতি বর্ণনা করা এবং দৃষ্টান্ত স্থাপন ছাড়া যেভাবে বর্ণনা এসেছে সেভাবে তা বহাল রাখা।
তবে প্রশ্নে বর্ণিত আলোভী ও তার সাথী মাহমুদ এ বিষয়ে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা সঠিক নয়। কিন্তু এ হাদীসের দাবি হলো আল্লাহ তা'আলা তাদের কল্যাণের প্রতি তাদের ছেয়ে অধিক দ্রুত এবং তাদের প্রতি দয়া ও রহমত করার দিকে তিনি অধিক অগ্রসরমান। কিন্তু এটি হাদীসের দাবি তবে এটি অর্থ নয়। অর্থ এক জিনিষ আর এটি আরেক জিনিষ। হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, তিনি তাদের প্রতি খুব দ্রুত কিন্তু এটি হাদীসের অর্থ নয়। বরং অর্থ হলো আল্লাহর জন্য আল্লাহর মাখলুকের সাথে সাদৃশ্য বা তুলনা না করে তার শান অনুযায়ী নিকট হওয়া, হাঁটা ও দৌড়কে সাব্যস্ত করা। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার উদ্দেশ্য অনুযায়ী কোন প্রকার বিকৃতি, ধরণ প্রকৃতি এবং সাদৃশ্য বা তুলনা করা ছাড়া তার জন্য আমরা সিফাতগুলোকে সাব্যস্ত করব।
আর তাদের কথা সম্পূর্ণ ভুল। বিদআতীরা অসংখ্য বিষয়ে এ ধরনের কথা বলে থাকেন। তারা আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। অথচ মুলনীতি হলো, আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে কোন প্রকার ব্যাখ্যা না দেওয়া, ধরণ বর্ণনা না করা, তুলনা না করা এবং বিকৃতি না করা। সুতরাং সিফাত সম্বোলিত আয়াত ও হাদীসের ক্ষেত্রে যেভাবে বর্ণনা এসেছে তা বহাল রাখবে ব্যাখ্যা দেবে না। অর্থাৎ কোন প্রকার ধরণ বর্ণনা না করা, তুলনা না করা এবং বিকৃতি না করা। বরং তার অর্থ আল্লাহর জন্য তার শান অনুযায়ী সাব্যস্থ করা যেভাবে আল্লাহ তা'আলা তার নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন এবং সম্বোধন করেছেন। এ সব কোন কিছুতেই তিনি তার কোন মাখলুকের সদৃশ নয়। যেমন, আমরা আল্লাহর রাগ, হাত, চেহারা, আঙ্গুল, অপছন্দ, অবতরণ, উঠা ইত্যাদি সিফাত সম্পর্কে উল্লেখিত বিশ্বাস স্থাপন করে থাকি। অধ্যায়তো একই। আর মনে রাখবে সিফাতের অধ্যায় একই এ ক্ষেত্রে বিশ্বাসের কোন তারতম্য নেই। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা।
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায।
টিকাঃ
⁸⁶ সহীহ বুখারী হাদীস নং ৭৫৩৬
⁸⁷ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৯৮১
📄 আল্লাহর অবস্থান সম্পর্কে ভ্রান্তির নিরসন
হাদীসঃ- لو دليتم بحبل من الأرض السابعة لوقع على الله “যদি তোমরা একটি রশিকে আকাশ থেকে জমিনে ছেড়ে দাও, তা আল্লাহর উপর গিয়ে পড়বে।”
হাদীসঃ- لو دليتم بحبل من الأرض السابعة لوقع على الله “যদি আকাশ থেকে জমিনে ছেড়ে দাও, তার আল্লাহর উপর গিয়ে পড়বে।” এর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলো। হাদীসটি শুদ্ধ কিনা? হাদীসটির অর্থ কি?
উত্তর: হাদীসটির শুদ্ধতা নিয়ে উলামাদের মধ্যে মত প্রার্থক্য রয়েছে। যারা হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, তারা বলেছেন, হাদীটির অর্থ, যদি তোমরা রশি ছাড় তা আল্লাহর উপর পড়বে। কারণ, আল্লাহ তা'আলা সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন। প্রতিটি বস্তু আল্লাহর হাতের মুঠে। কোন কিছুই আল্লাহ থেকে অনুপস্থিত নয়। এমনকি সাত স্তর বিশিষ্ট আসমানসমূহ ও জমিন আল্লাহর কবযিতে একটি দানার মতো। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَوَاتُ مَطْوِيَّتٌ بِيَمِينِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ ﴾ [الزمر: ٦٦ “আর তারা আল্লাহকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি। অথচ কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবীই থাকবে তাঁর মুষ্টিতে এবং আকাশসমূহ তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে। তিনি পবিত্র, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের ঊর্ধ্বে।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬৭] এ দ্বারা কোন অবস্থাতেই এ কথা প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে, আল্লাহ তা'আলা সর্বত্র বিরাজমান, অথবা আল্লাহ তা'আলা সপ্ত জমিনের নীচে আছে। কারণ, এটি শরী'আত, যুক্তি ও ফিতরাতের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আল্লাহর কিতাব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত, ইজমা, যুক্তি ও মানব স্বভাব আল্লাহ তা'আলা উপরে হওয়াকে প্রমাণ করে।
আল্লাহর কিতাব যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿وَهُوَ الْقَاهِرُ فَوْقَ عِبَادِهِ، وَهُوَ الْحَكِيمُ الْخَبِيرُ ﴾ [الانعام: ١٨] “আর তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর ক্ষমতাবান; আর তিনি প্রজ্ঞাময়, সম্যক অবহিত।” [সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১৮] আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى ﴾ [الاعلى: ١] “তুমি তোমার সুমহান রবের নামের তাসবীহ পাঠ কর।” [সূরা আল-আ'লা, আয়াত: ১] এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহর আয়াত অনেক। প্রতিটি আয়াত এ কথা প্রমাণ করে যে, প্রতিটি বস্তু আল্লাহর দিকে ওঠে, বস্তুকে আল্লাহর দিকে তুলে নেওয়া হয় এবং আল্লাহ উপর থেকে নিচে অবতরণ করেন। ফলে আয়াতগুলো আল্লাহ তা'আলার উপরে হওয়াকেই প্রমাণ করে। বিভিন্ন আয়াতের মর্মবাণীগুলো দ্বারা আল্লাহর উপরে হওয়াই প্রমাণিত।
আর সুন্নাত: আল্লাহ তা'আলা যে, উপরে এ বিষয়ে সুন্নাতগুলো মুতাওয়াতের পর্যায়ের। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কর্ম ও স্বীকৃতি আল্লাহর উপরে হওয়াকে প্রমাণ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “ ﺃَﻻَ ﺗَﺄْﻣَﻨُﻮﻧِﻲ ﺃَﻧَﺎ ﺃَﻣِﻴﻦٌ ﻣِﻦْ ﻓِﻲ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀِ তোমরা কি আমাকে আমানতদার মনে করো না, আমি যিনি আসমানে রয়েছেন তার পক্ষ থেকে আমানতদার।” এ হাদীসটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখের কথা যদ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা উপরে। আরাফার দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মাতের মধ্যে ভাষণ দেন। তাতে তিনি বলেন, ألا هل بلغت؟ "আমি কি তোমাদের নিকট পৌছিয়েছি"? উত্তরে তারা বললেন হ্যাঁ। তারপর আকাশের দিকে আঙ্গুল উঠালেন এবং বললেন, اللهم اشهد "হে আল্লাহ তুমি সাক্ষী থাক" এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্ম যা আল্লাহর উপর হওয়াকে প্রমাণ করে। আর রাসূলের স্বীকৃতি সম্পর্কে হাদীস-বাদীর হাদীস, যখন বাদীকে জিজ্ঞাসা করা হলো أين الله আল্লাহ কোথায়? সে বলল, في السماء "আল্লাহ আসমানে।” তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, أعتقها فإنها مؤمنة "তুমি তাকে আযাদ করে দাও কারণ সে মু'মিন। ⁴⁴
সাহাবীগণ এবং ইহসানের সাথে তাদের অনুসারী উম্মতের তাবেঈগণ এবং উলামায়ে কেরামগণ এ ব্যাপারে একমত যে, আল্লাহ তা'আলা সবকিছুর উপর। তাদের কারো থেকে এ বিষয়ে একটি শব্দও বর্ণিত নয় যে, তারা বলেছেন আল্লাহ তা'আলা আসামানে নয়, অথবা তিনি মাখলুকের সাথে সংমিশ্রণ, অথবা তিনি জগতের ভিতরেও নয় বাহিরেও নয়, তিনি মিলিতও নয় এবং আলাদাও নয়, তিনি পৃথকও নয় কাছেও নয় ইত্যাদি। তাদের থেকে যত বর্ণনা এ পর্যন্ত পাওয়া যায়, তা থেকে জানা যায় যে, তারা সবাই এ বিষয়ে একমত যে, আল্লাহ তা'আলা উর্ধ্বে এবং তিনি সবকিছুর উপর।
যুক্তি দ্বারা প্রমাণ: যুক্তিও এ কথা প্রমাণ করে যে আল্লাহ তা'আলা সবকিছুর উপর। যেমন আমরা যদি জিজ্ঞাসা করি যে, উর্ধ্বে থাকা এ পরিপূর্ণতার সিফাত নাকি অপরিপূর্ণতার? তখন জাওয়াব হবে উর্ধ্বে থাকাই পরিপূর্ণতা। আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেছেন, ﴿وَلِلَّهِ الْمَثَلُ الْأَعْلَى ﴾ [النحل: ٦০] “এবং আল্লাহর জন্য রয়েছে মহান উদাহরণ।” [সূরা আন-নাহাল, আয়াত: ৬০] যে সব সিফাত পূর্ণতার অর্থকে বহন করে, সে সব সিফাত আল্লাহর জন্য অবশ্যই সাব্যস্ত হবে।
যখন উপরে বা উর্ধ্বে হওয়া পূর্ণতা বলে যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত, তখন তা আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করাই ওয়াজিব। কারণ, আল্লাহ তা'আলা হয়তো উপরে হবেন অথবা নীচে হবেন অথবা মাঝখানে হবেন। নীচে হওয়া অসম্ভব। কারণ, তাতে রয়েছে অসম্পূর্ণতা। আর মাঝখানে হওয়াও অসম্ভব। কারণ, এটিও একটি অসম্পূর্ণ সিফাত যাতে আল্লাহ তা'আলা ও তার মাখলুক বরাবর হওয়াকে বাধ্য করে। দু'টি সিফাত যখন আল্লাহর জন্য হওয়া অসম্ভব হয়ে গিয়েছে বাকীটা অর্থাৎ উর্ধ্বে হওয়া তার জন্য অবধারিত। সুতরাং, আল্লাহ তা'আলা উর্ধ্বে হওয়া প্রমাণিত, তিনি প্রতিটি বস্তুর উর্ধ্বে।
মানব স্বভাব দ্বারা প্রমাণ: আল্লাহ তা'আলা উর্ধ্বের হওয়ার বিষয়টি প্রতিটি মানুষের স্বভাব ও সৃষ্টির সাথে জড়িত। প্রতিটি মানুষ যখন বলে ‘হে আল্লাহ’ তখন সে আকাশের দিক তাকায়। তার অন্তরে উপরের দিক মনোযোগী হয়, তার অন্তরে আর কোন দিক ভ্রুক্ষেপ করার প্রয়োজন অনুভূত হয় না। সুতরাং আমরা এ কথা নির্বিঘ্নে বলতে পারি যে, আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি বস্তুর উপর।
আল্লাহ তা'আলা প্রতি বস্তুর উপর হওয়া প্রমাণিত হওয়ার পর হাদীস - لو دلیتم ات بحبل من الأرض السابعة لوقع على الله থেকে জমিনে ছেড়ে দাও, তার আল্লাহর উপর গিয়ে পড়বে।” -টি দ্বারা আল্লাহ তা'আলা জমিনে এ কথা প্রমাণ করার কোন সুযোগ নেই।
যদি বলা হয়, আল্লাহ তা'আলা এ বাণী: ﴿ وَهُوَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ إِلَهٌ وَفِي الْأَرْضِ إِلَهٌ وَهُوَ الْحَكِيمُ الْعَلِيمُ ﴾ [الزخرف: ٨٤] “আর তিনিই আসমানে ইলাহ এবং তিনিই জমিনে ইলাহ; আর তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তা'আলা যেমনিভাবে আসমানে এমনিভাবে তিনি জমিনেও।" [সূরা আয-যুখরফ, আয়াত: ৮৪]
উত্তর: না, আয়াতে আল্লাহ তা'আলা নিজের ইলাহ হওয়া বিষয়ে সংবাদ দেন। তিনি আকাশ বা জমিনে তার অবস্থান জানানো সংবাদ দেননি। বরং তিনি বলছেন তিনি আসামানেও ইলাহ এবং জমিনেও ইলাহ। যেমন আমরা বলে থাকি অমুক মক্কায়ও গভর্নর এবং মদীনায়ও গভর্নর। এর অর্থ, তার কর্তৃত্ব মক্কা ও মদীনা উভয় শহরেই বিস্তৃত। যদিও সে যে কোন একটি শহরে সুনিদিষ্ট স্থানে বসবাস করে থাকে। দু'টি শহরে সে থাকে না। এ আয়াতটিও এ কথা প্রমাণ করে যে, আল্লাহর উলুহিয়্যাত জমিন ও আসমান উভয় স্থানে বিস্তৃত।
যদিও তিনি থাকেন আসমানে। আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন।
শাইখ মুহাম্মদ বিন উসাইমীন রহ.
টিকাঃ
⁴⁴ সহীহ মুসলিম হাদীস নং ১২২৭
📄 প্রত্যেক শতাব্দি শুরুতে এ উম্মতের মধ্যে আল্লাহ তা‘আলা একজন সংস্কারক প্রেরণ করেন
প্রশ্ন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, « إِنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ لِهَذِهِ الأُمَّةِ عَلَى رَأْسِ كُلِّ مِائَةِ سَنَةٍ مَنْ يُجَدِّدُ لَهَا دِينَهَا ». প্রতি শতাব্দির শুরুতে এ উম্মতের মধ্যে এমন একজনকে প্রেরণ করবেন, যিনি দীনের বিধানগুলো সংস্কার করবেন।” হাদীসটির বিশুদ্ধ সনদ, মতন কি এবং বর্ণনাকারী কে? আর দীনের বিধানগুলো সংস্কার করবেন" এ কথার অর্থ কি? অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সু-স্পষ্ট ও অকাট্য দলীল প্রমাণের ওপর রেখে গেছেন। এ ধরনের প্রশ্ন যারা করে আমরা তাদের কিভাবে জাওয়াব দেবো?
উত্তর: প্রথমত: ইমাম আবু দাউদ স্বীয় সুনানে সালমান ইবন দাউদ আল-মাহরী থেকে, তিনি বলেন, আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ বিন ওহাব, তিনি বলেন, আমাকে সংবাদ দিয়েছেন সা'ঈদ ইবন আবু আইউব এবং তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন শারাহীল ইবন ইয়াযীদ আল-মু'আফিরী থেকে এবং তিনি বর্ণনা করেছেন আবু আলকামা থেকে আর তিনি বর্ণনা করেছেন আবু হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এবং তিনি বর্ণনা করেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তিনি বলেন, إِنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ لِهَذِهِ الْأُمَّةِ عَلَى رَأْسُ كُلِّ مِائَةِ سَنَةٍ مَنْ يُجَدِّدُ لَهَا دِيْنَهَا ". উম্মতের মধ্যে এমন একজনকে প্রেরণ করবেন, যিনি দীনের বিধানগুলো সংস্কার করবেন।"⁸⁹
দ্বিতীয়ত: হাদীসটি বিশুদ্ধ এবং হাদীসটির প্রত্যেক বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য।
তৃতীয় ও চতুর্থত: "দীনকে সংস্কার করবেন” এ বাণীর অর্থ, যখন অধিকাংশ মানুষ প্রকৃত দীন যে দীনকে আল্লাহ তা'আলা তার বান্দাদের জন্য পরিপূর্ণ করেছেন, যে দীনের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা তাদের ওপর তার নি'আমতকে পরিপূর্ণ করেছেন এবং তাদের জন্যে ইসলামকে দীন হিসেবে মনোনিত করেছেন, সে দীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। তাদের নিকট ইসলাম বিষয়ে একজন বিচক্ষন আলেম বা দা'ঈ প্রেরণ করবেন যিনি মানুষকে আল্লাহর কিতাব এবং রাসূল থেকে প্রমাণিত সুন্নাতের প্রতি পথ দেখাবেন এবং বিদ'আত থেকে দূরে সরাবেন এবং নব আবিষ্কৃত বস্তু থেকে তাদের সতর্ক করবেন। সঠিক পথ-আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাত থেকে যারা বিচ্যুত হবেন তাদেরকে তাদের বিচ্যুতি থেকে ফিরিয়ে রাখবেন। উম্মতের অবস্থার সংস্কার ও সংশোধন হিসেবে একে তাজদীদ বা সংস্কার বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তার বান্দাদের জন্য যে দীনকে চালু করেছেন এবং পরিপূর্ণ করেছেন, সে দীনের সংস্কার বা সংশোধন হিসেবে একে সংস্কার বলে আখ্যায়িত করা হয়নি। কারণ, একের একের পর পরিবর্তন, দূর্বলতা ও বিকৃতি উম্মাতের ওপরই চেপে বসে। অন্যথায় ইসলামের সংরক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহর হাতেই। আল্লাহ তা'আলা কুরআন ও সুন্নাতের হিফাযতের দায়িত্ব নেয়ার মাধ্যমে ইসলামকে হিফাযত করবেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ ﴾ [الحجر: 9] “নিশ্চয় আমি কুরআন নাযিল করেছি, আর আমিই তার হেফাযতকারী।”⁹⁰ [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৯]
পঞ্চমত: সংস্কারকগণ বারো বছরের মাথায় আসবেন এ কথাটি হাদীসে নেই। বরং হাদীসে এসেছে আল্লাহর আদেশে এবং তার প্রজ্ঞা অনুযায়ী তারা আসবেন প্রতি হিজরী শতাব্দির মাথায়। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তার বান্দাদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ ও দয়া এবং তাদের বিপক্ষে সু-স্পষ্ট দলীল ও প্রমাণ, যাতে তাদের নিকট দলীল প্রমাণ স্পষ্ট হওয়ার পর অপারগতা প্রকাশ করার কোন সুযোগ না থাকে। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা।
টিকাঃ
⁸⁹ আবূ দাউদ, হাদীস নং ৪২৯৩
⁹⁰ الذكر দ্বারা উদ্দেশ্য কুরআন।
📄 হায়াত ও রিযিক বৃদ্ধি
হাদীস- « مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ وَيُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ ». "যে ব্যক্তি তার রিযিকের মধ্যে প্রসস্থতা এবং হায়াতের মধ্যে দীর্ঘতাকে পছন্দ করে"
প্রশ্ন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাণী- « مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ وَيُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ ». "যে ব্যক্তি তার রিযিকের মধ্যে প্রসস্থতা এবং হায়াতের মধ্যে দীর্ঘতাকে পছন্দ করে, সে যেন আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখে।"⁹¹ এর অর্থ কি?। হাদীসটি সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। এ হাদীসের অর্থ কি এমন যে, মানুষ যখন আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখে তখন তার এক রকম বয়স হবে এবং যখন আত্মীয়তা বজায় না রাখে তখন তার অন্য রকম বয়স হবে?
উত্তর: এ হাদীসের অর্থ এমন নয় যে, মানুষের বয়স দুই ধরনের হবে। অর্থাৎ, আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখলে এক রকম বয়স হবে এবং আত্মীয়তা বজায় না রাখলে অন্য রকম বয়স। মানুষের বয়স এক ও অভিন্ন এবং পরিমাণও এক।
আল্লাহ তা'আলা যাকে তাওফীক দেন সে আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখেন আর যার ভাগ্যে সম্পর্ক ছিন্ন করা রাখে তিনি ছিন্ন করেন। এটিই হলো বাস্তবতা।
তবে হাদীস দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্য হলো, যে আমলে কল্যাণ রয়েছে তার প্রতি উম্মাতকে উৎসাহ প্রদান করা। যেমন, আমরা বলে থাকি, যে ব্যক্তি এ কথা পছন্দ করে যে, তার সন্তান হোক, সে যেন বিবাহ করে। অথচ বিবাহ ভাগ্যের ব্যাপার এবং সন্তান হওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার।
আল্লাহ তা'আলা যখন তোমার সন্তানের ইচ্ছা করবেন তখন তিনি তোমার বিবাহেরও ইচ্ছা করবেন। আর তা সত্ত্বেও বিবাহ ও সন্তান উভয়টি ভাগ্যের লিখন। অনুরূপভাবে মানুষের রিযিক এবং আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি গোড়া থেকেই নির্ধারিত ও মীমাংসিত। কিন্তু বিষয়টি তুমি জানো না।
এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে বিষয়টি সম্পর্কে উৎসাহ প্রদান করেন। তিনি বলছেন যে, যখন তুমি আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখবে তখন আল্লাহ তা'আলা তোমার রিযিক বৃদ্ধি করবেন, তোমার হায়াত বাড়িয়ে দেবেন ইত্যাদি। অন্যথায় সবকিছুই মীমাংসিত। তারপর মনে রাখতে হবে রিযিক ও হায়াত বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি আপেক্ষিক। অন্যথায় আমরা অনেক মানুষকে বাস্তবে দেখতে পাই সে আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখা সত্বেও এবং তার রিযিক বাড়িয়ে দেওয়া হলেও কিন্তু সে অল্প বয়সে মারা যায়। এ ব্যক্তি সম্পর্কে আমরা বলব, লোকটি যদি আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষণাকারী না হতো তা হলে সে আরো আগেই মারা যেত। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তার ভাগ্যে এ কথা পূর্বেই লিপিবদ্ধ করেছেন যে, সে আত্মীয়তা সম্পর্কে বজায় রাখবে এবং অমুক সময় তার জীবনের ইতি ঘটবে।
শাইখ মুহাম্মদ বিন উসাইমীন রহ.
টিকাঃ
⁹¹ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৬৮৮