📄 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া কারো থু থু দ্বারা বরকত হাসিল করার বিধান
প্রশ্ন: কিতাবুল ফাতওয়া পৃ: ১০৭, ১০৮ থেকে একটি ফাতওয়া নং ৪৬ সম্পর্কে শাইখ ইবন উসাইমীনের দৃষ্টি আর্কষণ করা হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের থু থু ছাড়া আর কারো থু থু দ্বারা বরকত হাসিল করা হারাম এবং এক প্রকারের শির্ক। তবে কুরআন দ্বারা ফুঁ দেয়ার কথাটি ভিন্ন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত একটি হাদীসের সাথে বিষয়টির অসঙ্গতি পরিলক্ষিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঝাঁড়-ফুঁকে বলতেন- بِسْمِ اللَّهِ تُرْبَةُ أَرْضِنَا بِرِيقَةِ بَعْضِنَا يُشْفَى سَقِيمُنَا "বিছমিল্লাহী, আমাদের জমিনের মাটি দ্বারা, আমাদের অনেকের থু থু দ্বারা, আল্লাহর অনুমতিতে আমাদের রোগীদের সুস্থতা দান করা হোক।"⁷⁷ বিষয়টিকে স্পষ্ট করার জন্য আপনার নিকট আমরা আশাবাদী।
উত্তর: কোন কোন আলেমগণ বলেছেন, বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এবং মদীনার মাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। যদি বিষয়টি এমন হয়ে থাকে তাহলে কোন প্রশ্ন নেই। কিন্তু জামহুর আলেমগণ বলেন, বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বা মদীনার মাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য কথাটি সঠিক নয়। বরং বিষয়টি প্রতিটি ঝাঁড়-ফুঁকদাতা এবং যে কোন জায়গার মাটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ও ব্যাপক। তবে বিষয়টি শুধু থু থু বা মাটি দ্বারা বরকত হাসিল করার বিষয় নয়। বরং বিষয়টি থু থু বা মাটির সাথে কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত আরোগ্য লাভ করার দো'য়ার সাথে সম্পৃক্ত। প্রশ্নে উল্লিখিত পূর্বের ফাতওয়ায় আমাদের উত্তর ছিল শুধু থু থু দ্বারা বরকত হাসিল করা প্রসঙ্গে। সুতরাং দু'টি উত্তরের ধরন দুই রকম হওয়ার কারণে এখন প্রশ্ন করার আর কোন সুযোগ নেই। আল্লাহই ভালো জানেন।
শাইখ মুহাম্মাদ বিন উসাইমীন রহ.
টিকাঃ
⁷⁷ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৭৪৫
📄 যে ব্যক্তি ইসলামে ভালো কোন আদর্শ স্থাপন করল, তার জন্য রয়েছে তার সাওয়াব আলোচনা
প্রশ্ন: রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন,,مَنْ سَنَّ فِي الإِسْلَامِ سُنَّةٌ حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا إلى يوم القيامة “যে ব্যক্তি ইসলামে ভালো কোন আদর্শ স্থাপন করল, তার জন্য রয়েছে তার সাওয়াব এবং কিয়ামত অবধি যত মানুষ তার ওপর আমল করবে তার সাওয়াব।” এটি কি হাদীস? যদি হাদীস হয় তাহলে ইসলামে কারো জন্য কোন একটি সুন্নাত চালু করার সুযোগ কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রেখে গিয়েছেন? আশা করি বিষয়টি বিস্তারিত জানাবেন।
উত্তর: হাদীসটি বিশুদ্ধ। হাদীসটি সুন্নাতকে জীবিত করা, সুন্নাতের প্রতি মানুষকে দাওয়াত দেওয়া এবং বিদআত ও অন্যায়ের প্রচলন করা থেকে মানুষকে সতর্ক করার প্রমাণ। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ سَنَّ فِي الإِسْلَامِ سُنَّةٌ حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا بَعْدَهُ مِنْ غَيْرِ أَنْ ) يَنْقُصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْءٌ وَمَنْ سَنَّ فِي الإِسْلامِ سُنَّةً سَيِّئَةٌ كَانَ عَلَيْهِ وِزْرُهَا وَوِزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا له مِنْ بَعْدِهِ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَيْءٌ ) “যে ব্যক্তি ইসলামে ভালো কোন আদর্শ স্থাপন করল, তার জন্য রয়েছে তার সাওয়াব এবং তার পরবর্তী কিয়ামত অবধি যত মানুষ তার ওপর আমল করবে তার সাওয়াব। তাতে তার সাওয়াব থেকে কোন প্রকার ঘাটতি হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন খারাপ কর্ম চালু করল, তার জন্য রয়েছে তার কর্মে গুনাহ এবং তার পরবর্তী কিয়ামত অবধি যত মানুষ তার ওপর আমল করবে তাদের গুনাহ। তাতে তাদের গুনাহে কোন ঘাটতি হবে না।"⁷⁸
একই ধরনের হাদীস আবু হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا وَمَنْ دَعَا إِلَى ضَلَالَةٍ كَانَ عَلَيْهِ مِنَ الْإِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ تَبِعَهُ لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ آثَامِهِمْ شَيْئًا وَمَنْ سَنَّ سُنَّةً سَيِّئَةً فَعُمِلَ بِهَا بَعْدَهُ كَانَ عَلَيْهِ مِنْ وِزْرِهِ وَمِثْلُ أَوْزَارِهِمْ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَيْئًا». হিদায়াতের প্রতি দাওয়াত দেয়, যে তার অনুসরণ করে তার সাওয়াবের মধ্যে কম করা ছাড়া তার সমপরিমাণ সাওয়াব তাকে দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি কোন গোমরাহীর দিকে কাউকে আহ্বান করে, তার অনুসরণ কারীর গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহ হবে। তবে তার গুনাহের মধ্যে কোন কমতি করা হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন খারাপ কর্ম চালু করল, তার জন্য রয়েছে তার কর্মের গুনাহ এবং তার পরবর্তী কিয়ামত অবধি যত মানুষ তার অনুসরণ করবে তাদের গুনাহ। তাতে তার গুনাহ একটুও কমানো হবে না।"⁷⁹
অনুরূপভাবে আবু মাসউদ আল-আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ » فَاعِلِهِ “যে ব্যক্তি কোন মানুষকে ভালো কর্মের প্রতি পথ দেখালো, তার জন্য ঐ ভালো কর্মটি করার সমপরিমাণ সাওয়াব মিলবে।”⁸⁰ এর অর্থ, যে সুন্নাতটি মানুষের কাছ থেকে হারিয়ে বা বিলুপ্ত হয়ে গেছে এমন একটি সুন্নাতকে পুনর্জীবিত করলো, প্রচার করল এবং তুলে ধরল। সে মানুষকে তার প্রতি আহ্বান করতে থাকে, তার প্রচার করে, গুরুত্ব বর্ণনা করে। তখন যারা তার কথায় অনুসরণ করবে তাদের সমপরিমাণ সাওয়াব পাবে। এর অর্থ এ নয় যে, কোন একটি সুন্নাতকে আবিষ্কার করা। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদআত থেকে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেন, وان كل بدعة ضلالة “সব বিদআতই গোমরাহী।”⁸¹ সমস্ত আহলে ইলমদের মতৈক্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী একটি অপরটির সত্যায়ন কারী একটি অপরটির বিরোধী নয়। হাদীস দ্বারা জানা গেল হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য পুনর্জীবিত করা, প্রচার করা।
এর দৃষ্টান্ত: যে দেশে কুরআন বা হাদীসের শিক্ষা চালু নেই সে দেশে একজন আলেম কুরআন ও হাদীসের শিক্ষা চালু করল, মানুষকে কুরআন ও হাদীস শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে অবস্থান করল এবং দেশের মধ্যে শিক্ষার সুন্নাতটি চালু করল। অথবা এ দেশে বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষকদের উপস্থিত করে কুরআন ও সুন্নাহ শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করল। অথবা কোন দেশের মানুষ তাদের দাড়ি মুন্ডায় বা ছোট করে। তখন লোকটি ঐ দেশে গিয়ে দাড়ি লম্বা করা এবং দাড়ি না কাটার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করল। দেশটির মানুষ যে সুন্নাত সম্পর্কে জানতো না লোকটি সে মহান সুন্নাতকে পুনর্জীবিত করল। তার কারণে যে সব লোকেরা এ মহান সুন্নাতটির অনুসরণ করবে সে তাদের সমপরিমাণ সাওয়াব পাবে। আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, خَالِفُوا الْمُشْرِكِينَ قُصُّوا الشَّوَارِبَ وَأَعْفُوا اللَّحَى “তোমরা গোপ ছোট কর এবং দাড়ি লম্বা কর মুশরিকদের বিরোধিতা করা।”⁸²
মানুষ যখন দেখল, লোকটি নিজে দাড়ি রেখেছে এবং মানুষকে দাড়ি রাখার প্রতি দাওয়াত দিয়েছে তখন তার অনুসরন করল। ফলে তাদের মাঝে সুন্নাতটি চালু করার কারণে তাদের আমল করার সাওয়াব তিনি পেয়ে যাবেন। ওপরে উল্লিখিত হাদীস এবং একই অর্থের আরো অন্যান্য হাদীসের কারণে সুন্নাতটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ওয়াজিব যা ছেড়ে দেওয়া কোন ক্রমেই বৈধ নয়।
অনুরূপভাবে কোন দেশের মানুষ জুমুআর সালাত আদায় করত না। একজন লোক সেখানে গিয়ে জুমু'আর সালাত চালু করল। তাহলে তিনি তাদের জু'মুআর সালাত আদায় করা সাওয়াব পেয়ে যাবেন। অনুরূপভাবে কোন এলাকার মানুষ সালাতুল ভিতির সম্পর্কে অজ্ঞ। তখন তিনি তাদের সালাতুল ভিতির শেখালেন এবং তার অনুসরণে সালাতুল ভিতির আদায় করল। অথবা এ ধরনের অন্য কোন ইবাদত বা শরী'আতের জরুরী কোন বিধান কোন দেশে চালু করল। সুতরাং, যে ব্যক্তি তাদের মধ্যে সুন্নাতটি প্রচার করল, পুনর্জীবিত করল এবং মানুষের মধ্যে তুলে ধরল, তাকে বলা হবে, ইসলামে সে একটি ভালো রীতি চালু করল। অর্থাৎ, ইসলামের বিধান প্রচার করল এবং সে এমন লোকদের অর্ন্তভুক্ত হবে যারা ইসলামের মধ্যে একটি ভালো রীতি চালু করলেন।
এ দ্বারা দীনের মধ্যে এমন কিছু আবিষ্কার করা উদ্দেশ্য নয়, যার অনুমতি আল্লাহ তা'আলা দেননি। সব ধরনের বিদআতি গোমরাহী। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশুদ্ধ হাদীসে বলেছেন - وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ “তোমরা নব আবিষ্কৃত বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাক। কারণ প্রতিটি নব আবিষ্কৃত বস্তু বিদআত, আর প্রতিটি বিদআত গোমরাহী।”⁸³ অপর একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ “যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করল যার ওপর আমাদের কোন নির্দেশনা নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” অপর শব্দে مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدُّ “যে ব্যক্তি আমাদের এ দীনের মধ্যে এমন কোন কর্ম আবিষ্কার করল যা এ দীনের বিষয় নয় তা প্রত্যাখ্যাত। "⁸⁴
জুমু'আর সালাতের খুতবায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, أَمَّا بَعْدُ فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللهِ وَخَيْرُ الْهُدَى هُدَى مُحَمَّd وَشَرُّ الْأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ “অতঃপর সবোত্তম কথা হলো, আল্লাহ কিতাব, আর সবোত্তম আদর্শ হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো নব আবিষ্কৃত বিষয়। এবং প্রতিটি নব আবিষ্কৃত বিষয় গোমরাহী।"⁸⁵ যে ইবাদতের প্রচলন আল্লাহ তা'আলা করেননি, তার প্রতি মানুষকে আহ্বান করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও অবৈধ। এ ধরনের লোককে সাওয়াব দেওয়া হবে না বরং এ ধরনের কর্ম করা এবং তার প্রতি দাওয়াত দেওয়া সম্পূর্ণ বিদআত এবং আহ্বানকারী গোমরাহীর প্রতি দাওয়াত দাতা হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ধরনের লোকদের দুর্নাম করে আল্লাহ তা'আলা বলেন, لَهُمْ شُرَكُوا شَرَعُوا لَهُم مِّنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَنَ بِهِ اللَّهُ ﴾ [الشورى: ٢١] “তাদের জন্য কি এমন কিছু শরীক আছে, যারা তাদের জন্য দীনের বিধান দিয়েছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি”? [সূরা আশ-শুরা, আয়াত: ২১]। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা।
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.
টিকাঃ
⁷⁸ বর্ণনায় সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৩৯৮
⁷⁹ বর্ণনায় সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৯৮০
⁸⁰ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫০০৭
⁸¹ ইবনু মাযা, হাদীস নং ৪২
⁸² সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৮৯২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬২৫
⁸³ সহীহ বুখারী, হাদীন নং ৭২৫০
⁸⁴ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫৫০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৫৮৯
⁸⁵ বর্ণনায় সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০৪২
📄 “যে ব্যক্তি আমার দিক এক বিঘত অগ্রসর হয় আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই” হাদীসটি বিষয়ে আলোচনা
প্রশ্ন: সাইয়্যেদ আলোভী আল-মালেকী এবং মাহমুদ আমীন আন-নাবাবীর সম্পদনায় রচিত রিয়াদুস সালেহীন কিতাবে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে কুদসী পড়েছি, যাতে আল্লাহর দৌড়ে আসার কথা রয়েছে। হাদীসটি এই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে বর্ণনা দিয়ে বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, إِذَا تَقَرَّبَ الْعَبْدُ إِلَيَّ شِبْرًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ ذِرَاعًا وَإِذَا تَقَرَّبَ مِنِّي ذِرَاعًا تَقَرَّبْتُ مِنْهُ بَاعًا وَإِذَا أَتَانِي مَشْيًا أَتَيْتُهُ هَرْوَلَهُ "যখন কোন ব্যক্তি আমার দিক এক বিঘাত অগ্রসর হয় আমি তার দিক এক হাত অগ্রসর হই আর যখন কোন বান্দা আমার প্রতি এক বাহু পরিমাণ অগ্রসর হয় আমি তার প্রতি বাহু পরিমাণ অগ্রসর হই যখন কোন ব্যক্তি আমার দিক পায়ে হেটে অগ্রসর হয় আমি তার দিকে দৌড়ে অগ্রসর হই।"⁸⁶
উভয় সম্পাদনকারী তাদের সম্পাদনায় লিখেছেন- এটি একটি দৃষ্টান্ত অধ্যায়ের এবং বিষয়টিকে অধিক স্পষ্ট করার জন্য আধ্যাতিক বিষয়কে বস্তুবাদ দ্বারা চিত্রায়ন করা হয়েছে। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি কোন নেক আমল করল তা যতই কম হোক না কেন আল্লাহ তা'আলা তার সাওয়াবকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেবেন এবং তার প্রতি অধিক অনুগ্রহ করবেন। অন্যথায় অকাট্য ও সু-স্পষ্ট প্রমাণাদি এ বিষয়ে বিদ্যমান যে, এখানে আল্লাহর কাছে আসা, হেটে আসা এবং দৌড়ে আসা বলতে কিছু নেই। কারণ, এ গুলো সবই হলো মাখলুকের গুন যা ক্ষণস্থায়ী। আর আল্লাহ তা'আলা ক্ষণস্থায়ী মাখলুকের গুনে গুনান্বিত হওয়া থেকে পবিত্র ও উর্ধ্বে। এখানে যেহেতু অকাট্য ও সু-স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে আল্লাহর হাঁটা বা দৌড় বলতে কিছু নেই, তাহলে আল্লাহর হাঁটা ও দৌড়া সম্পর্কে তারা উভয়জন যা বলেছেন তা কি আল্লাহর সিফাতকে প্রমাণ করার ক্ষেত্রে এবং সিফাতগুলো বর্ণনা যেভাবে এসেছে সে ভাবে বহাল রাখা সম্পর্কে সালাফদের মতের সাথে তাদের কথার মিল রয়েছে? আশা করি বিষয়টি স্পষ্ট করলে কৃতজ্ঞ হবো।
উত্তর: আলহামদু লিল্লাহ! সমস্ত প্রসংশা আল্লাহর জন্যই। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীদের ওপর এবং হিদায়াতের অনুসারীদের ওপর। অতঃপর: নি:সন্দেহে বলা যায় যে, প্রশ্ন উল্লিখিত হাদীসটি বিশুদ্ধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ أَنَا عِنْدَ ظَنَّ عَبْدِي بِي وَأَنَا مَعَهُ حِينَ يَذْكُرُنِي إِنْ ذَكَرَنِي فِي نَفْسِهِ ذَكَرْتُهُ فِي نَفْسِي وَإِنْ ذَكَرَنِي فِي مَلا ذَكَرْتُهُ فِي مَلا هُمْ خَيْرٌ مِنْهُمْ وَإِنْ تَقَرَّبَ مِنِّي شِبْرًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ ذِرَاعًا وَإِنْ تَقَرَّبَ إِلَى ذِرَاعًا تَقَرَّبْتُ مِنْهُ بَاعًا وَإِنْ أَتَانِي يَمْشِي أَتَيْتُهُ هَرْوَلَةً ».
"আমি আমার প্রতি আমার বান্দার ধারণার কাছাকাছি থাকি। যখন সে আমার যিকির করে আমি তার সাথেই থাকি। যখন সে আমাকে স্বীয় অন্তরে স্মরণ করে আমি স্বীয় অন্তরে তার স্মরণ করি। যখন সে কোন জামাতের মধ্যে আমার স্মরণ করে আমিও তার চেয়ে উত্তম জামাতে তার স্মরণ করি। আর যখন কোন ব্যক্তি আমার দিক এক বিঘাত অগ্রসর হয় আমি তার দিক এক হাত অগ্রসর হই আর যখন কোন বান্দা আমার প্রতি এক হাত পরিমাণ অগ্রসর হয় আমি তার প্রতি বাহু পরিমাণ অগ্রসর হই। যখন কোন ব্যক্তি আমার দিক পায়ে হেটে অগ্রসর হয় আমি তার দিকে দৌড়ে অগ্রসর হই।"⁸⁷
এ বিশুদ্ধ হাদীসটি আল্লাহর অপার অনুগ্রহ ও মহত্বের প্রমাণ। আল্লাহ তা'আলা তার বান্দাদের প্রতি কতনা কল্যাণকামী ও হিতাকাঙ্খি, তা এ হাদীস দ্বারা স্পষ্ট। বান্দার আমল করা এবং নেক আমলের প্রতি দ্রুত অগ্রসর হওয়া থেকেও আল্লাহর রহমত, দয়া ও অনুগ্রহ বহুগুণে অগ্রসরমান।
সালাফদের মত অনুযায়ী হাদীসটি বাহ্যিক অর্থের ওপর প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে কোন প্রকার বাধা-বিপত্তি নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ রাসূলের মুখ থেকে হাদীসটি শুনেছেন। তারা সর্বত্তোম উম্মত এবং উম্মতের কর্ণধার হওয়া সত্বেও হাদীসটি শোনার পর কোন প্রশ্ন বা আপত্তি করেননি এবং কোন ব্যাখ্যা করেননি। তারা আরবী ভাষা সম্পর্কে সর্বাধিক অভিজ্ঞ। আল্লাহর জন্য যা প্রযোজ্য এবং যা প্রযোজ্য নয় এ সম্পর্কে সমগ্র মানুষের তুলনায় তারাই সর্বাধিক জ্ঞাত। সুতরাং, ওয়াজিব হলো যেভাবে বর্ণিত সেভাবে কবুল করা এবং উত্তম ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা। এ ধরনের সিফাত আল্লাহর ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রযোজ্য। তবে তাতে তিনি তার সৃষ্টি বা মাখলুকের সদৃশ নয়। ফলে আল্লাহর নিকটে আসা একজন বান্দা অপর বান্দার নিকটে আসার মতো নয়। আল্লাহর হাঁটা বান্দার হাঁটার মতো নয় এবং আল্লাহর দৌড়ে আসা বান্দার দৌড়ে আসার মতো নয়। অনুরূপভাবে আল্লাহর ক্ষুব্ধ হওয়া, সন্তুষ্ট হওয়া, কিয়ামত দিবসে আল্লাহর আগমন, বান্দার মাঝে বিচার ফায়সালা করান জন্য কিয়ামতের দিন আল্লাহর উপস্থিত হওয়া, প্রতি রাতের শেষাংশে আল্লাহর দুনিয়ার আকাশে অবতরণ এবং আল্লাহর আরশের উপর উঠা ইত্যাদি। এ গুলো সবই আল্লাহর সিফাত যা তার শানের সাথে প্রযোজ্য। কোন মাখলুকের সাথে এর কোন সদৃশ নেই।
সুতরাং যেমনিভাবে আল্লাহর আরশের উপর উঠা, শেষ রাতের এক তৃতীয়াংশে দুনিয়য়ার আকাশে অবতরণ করা, কিয়ামতের দিন আগমন করা মাখলুকের উঠা, আসা, অবতরণ করার সাথে সদৃশ নয় অনুরূপভাবে তার ইবাদত কারী আবেদ বান্দা এবং তার আনুগত্যের প্রতি দ্রুত অগ্রসর হওয়া বান্দাদের নিকট হওয়া এবং তাদের কাছে হওয়া বান্দার কাছে হওয়ার সদৃশ নয়। আল্লাহর কাছে হওয়া বান্দাদের একে অপরের কাছে হওয়ার মতো নয়, আল্লাহর হেঁটে আসা তার বান্দাদের হেঁটে আসার মতো নয় এবং তার দৌড়ে আসা তার বান্দাদের দৌড় আসার মতো নয়। বরং এটি এমন একটি বিষয় যা আল্লাহর শানের সাথে প্রযোজ্য। আল্লাহর অন্যান্য সিফাতের মতো এ ক্ষেত্রেও কোন মাখলুক তার সাথে সদৃশ নয়। আর তিনি তার সিফাত সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত এবং তার ধরণ-প্রকৃতি সম্পর্কে অধিক অভিজ্ঞ।
পূর্বসূরীগণ এ ব্যাপারে একমত যে, আল্লাহর সিফাত ও নাম সম্পর্কে আমাদের ওপর ওয়াজিব হলো, যেভাবে বর্ণনা এসেছে তার ওপর বহাল রাখা এবং তার শাব্দিক অর্থকে বিশ্বাস করা যে, তা অবশ্যই সত্য যা কেবল আল্লাহর শানের সাথে খাস। যেমনিভাবে তার সত্বা সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না অনুরূপভাবে তার সিফাতসমূহের ধরণ প্রকৃতি সম্পর্কেও তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না। যেমনিভাবে কামিল ও পরিপূর্ণ সত্বাকে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা ওয়াজিব অনুরূপভাবে আল্লাহর সিফাতসমূহ পরিপূর্ণ ও উন্নত এ কথা বিশ্বাস করে এবং এর প্রতি ঈমান রেখে আল্লাহর জন্য তার সিফাতসমূহ সাব্যস্ত করাও ওয়াজিব। আর আল্লাহর সিফাত মাখলুকের সিফাতের মতো নয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ اللَّهُ الصَّمَدُ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ ﴾ [الاخلاص: ١، ٤] “বল, তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। আর তাঁর কোন সমকক্ষও নেই। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি।” [সূরা আল-ইখলাস, আয়াত: ১, ৪]
আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴾فَلَا تَضْرِبُوا لِلَّهِ الْأَمْثَالَ إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ﴿ [النحل: ٧٤] “সুতরাং তোমরা আল্লাহর জন্য অন্য কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ জানেন আর তোমরা জান না।” [সূরা আন-নাহাল, আয়াত: ৭৪]
আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ، شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ﴾ [الشورى: ۱۱] “তাঁর মত কিছু নেই আর তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শুরা, আয়াত: ১১] সাদৃশ্যবাদীরা এ কথা لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ "তাঁর মত কিছু নেই” এবং ﴿فَلَا تَضْرِبُوا لِلَّهِ الْأَمْثَالَ إِنَّ اللَّهَ "সুতরাং তোমরা আল্লাহর জন্য অন্য কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করো না।” দ্বারা প্রতিহত করেন।
মু'আত্তালাদের এ কথা قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ "বল, তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়।” দ্বারা জবাব দেন। আলেম হোক বা সাধারণ মানুষ হোক প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ওয়াজিব হলো আল্লাহ তা'আলা তার নিজের জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন তা কোন প্রকার দৃষ্টান্ত ছাড়া পরিপূর্ণ সাব্যস্ত করা এবং তিনি তার জন্য যা না করেছেন, তা না করা। আর যে সব থেকে তিনি তাকে পবিত্র বলে ঘোষণা করেছেন তা কোন প্রকার অকার্যকর করা ছাড়া তার জন্য হুবহু সাব্যস্ত করা।
এটিই রাসূলের সাহাবী এবং তাদের অনুসারি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা। এ ছাড়াও উম্মতের পূর্বসূরী ইমামগণ, যেমন সাতজন ফকীহ, মালেক বিন আনাস, আওযাঈ, সুরী, শাফেঈ, আহমদ ইবন হাম্বল, আবু হানীফা এবং অন্যান্য ইমামদের বিশ্বাস। তারা বলেন, কোন প্রকার বিকৃতি, অকার্যকর করা, ধরণ প্রকৃতি বর্ণনা করা এবং দৃষ্টান্ত স্থাপন ছাড়া যেভাবে বর্ণনা এসেছে সেভাবে তা বহাল রাখা।
তবে প্রশ্নে বর্ণিত আলোভী ও তার সাথী মাহমুদ এ বিষয়ে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা সঠিক নয়। কিন্তু এ হাদীসের দাবি হলো আল্লাহ তা'আলা তাদের কল্যাণের প্রতি তাদের ছেয়ে অধিক দ্রুত এবং তাদের প্রতি দয়া ও রহমত করার দিকে তিনি অধিক অগ্রসরমান। কিন্তু এটি হাদীসের দাবি তবে এটি অর্থ নয়। অর্থ এক জিনিষ আর এটি আরেক জিনিষ। হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, তিনি তাদের প্রতি খুব দ্রুত কিন্তু এটি হাদীসের অর্থ নয়। বরং অর্থ হলো আল্লাহর জন্য আল্লাহর মাখলুকের সাথে সাদৃশ্য বা তুলনা না করে তার শান অনুযায়ী নিকট হওয়া, হাঁটা ও দৌড়কে সাব্যস্ত করা। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার উদ্দেশ্য অনুযায়ী কোন প্রকার বিকৃতি, ধরণ প্রকৃতি এবং সাদৃশ্য বা তুলনা করা ছাড়া তার জন্য আমরা সিফাতগুলোকে সাব্যস্ত করব।
আর তাদের কথা সম্পূর্ণ ভুল। বিদআতীরা অসংখ্য বিষয়ে এ ধরনের কথা বলে থাকেন। তারা আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। অথচ মুলনীতি হলো, আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে কোন প্রকার ব্যাখ্যা না দেওয়া, ধরণ বর্ণনা না করা, তুলনা না করা এবং বিকৃতি না করা। সুতরাং সিফাত সম্বোলিত আয়াত ও হাদীসের ক্ষেত্রে যেভাবে বর্ণনা এসেছে তা বহাল রাখবে ব্যাখ্যা দেবে না। অর্থাৎ কোন প্রকার ধরণ বর্ণনা না করা, তুলনা না করা এবং বিকৃতি না করা। বরং তার অর্থ আল্লাহর জন্য তার শান অনুযায়ী সাব্যস্থ করা যেভাবে আল্লাহ তা'আলা তার নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন এবং সম্বোধন করেছেন। এ সব কোন কিছুতেই তিনি তার কোন মাখলুকের সদৃশ নয়। যেমন, আমরা আল্লাহর রাগ, হাত, চেহারা, আঙ্গুল, অপছন্দ, অবতরণ, উঠা ইত্যাদি সিফাত সম্পর্কে উল্লেখিত বিশ্বাস স্থাপন করে থাকি। অধ্যায়তো একই। আর মনে রাখবে সিফাতের অধ্যায় একই এ ক্ষেত্রে বিশ্বাসের কোন তারতম্য নেই। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা।
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায।
টিকাঃ
⁸⁶ সহীহ বুখারী হাদীস নং ৭৫৩৬
⁸⁷ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৯৮১
📄 আল্লাহর অবস্থান সম্পর্কে ভ্রান্তির নিরসন
হাদীসঃ- لو دليتم بحبل من الأرض السابعة لوقع على الله “যদি তোমরা একটি রশিকে আকাশ থেকে জমিনে ছেড়ে দাও, তা আল্লাহর উপর গিয়ে পড়বে।”
হাদীসঃ- لو دليتم بحبل من الأرض السابعة لوقع على الله “যদি আকাশ থেকে জমিনে ছেড়ে দাও, তার আল্লাহর উপর গিয়ে পড়বে।” এর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলো। হাদীসটি শুদ্ধ কিনা? হাদীসটির অর্থ কি?
উত্তর: হাদীসটির শুদ্ধতা নিয়ে উলামাদের মধ্যে মত প্রার্থক্য রয়েছে। যারা হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, তারা বলেছেন, হাদীটির অর্থ, যদি তোমরা রশি ছাড় তা আল্লাহর উপর পড়বে। কারণ, আল্লাহ তা'আলা সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন। প্রতিটি বস্তু আল্লাহর হাতের মুঠে। কোন কিছুই আল্লাহ থেকে অনুপস্থিত নয়। এমনকি সাত স্তর বিশিষ্ট আসমানসমূহ ও জমিন আল্লাহর কবযিতে একটি দানার মতো। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَوَاتُ مَطْوِيَّتٌ بِيَمِينِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ ﴾ [الزمر: ٦٦ “আর তারা আল্লাহকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি। অথচ কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবীই থাকবে তাঁর মুষ্টিতে এবং আকাশসমূহ তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে। তিনি পবিত্র, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের ঊর্ধ্বে।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬৭] এ দ্বারা কোন অবস্থাতেই এ কথা প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে, আল্লাহ তা'আলা সর্বত্র বিরাজমান, অথবা আল্লাহ তা'আলা সপ্ত জমিনের নীচে আছে। কারণ, এটি শরী'আত, যুক্তি ও ফিতরাতের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আল্লাহর কিতাব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত, ইজমা, যুক্তি ও মানব স্বভাব আল্লাহ তা'আলা উপরে হওয়াকে প্রমাণ করে।
আল্লাহর কিতাব যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿وَهُوَ الْقَاهِرُ فَوْقَ عِبَادِهِ، وَهُوَ الْحَكِيمُ الْخَبِيرُ ﴾ [الانعام: ١٨] “আর তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর ক্ষমতাবান; আর তিনি প্রজ্ঞাময়, সম্যক অবহিত।” [সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১৮] আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى ﴾ [الاعلى: ١] “তুমি তোমার সুমহান রবের নামের তাসবীহ পাঠ কর।” [সূরা আল-আ'লা, আয়াত: ১] এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহর আয়াত অনেক। প্রতিটি আয়াত এ কথা প্রমাণ করে যে, প্রতিটি বস্তু আল্লাহর দিকে ওঠে, বস্তুকে আল্লাহর দিকে তুলে নেওয়া হয় এবং আল্লাহ উপর থেকে নিচে অবতরণ করেন। ফলে আয়াতগুলো আল্লাহ তা'আলার উপরে হওয়াকেই প্রমাণ করে। বিভিন্ন আয়াতের মর্মবাণীগুলো দ্বারা আল্লাহর উপরে হওয়াই প্রমাণিত।
আর সুন্নাত: আল্লাহ তা'আলা যে, উপরে এ বিষয়ে সুন্নাতগুলো মুতাওয়াতের পর্যায়ের। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কর্ম ও স্বীকৃতি আল্লাহর উপরে হওয়াকে প্রমাণ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “ ﺃَﻻَ ﺗَﺄْﻣَﻨُﻮﻧِﻲ ﺃَﻧَﺎ ﺃَﻣِﻴﻦٌ ﻣِﻦْ ﻓِﻲ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀِ তোমরা কি আমাকে আমানতদার মনে করো না, আমি যিনি আসমানে রয়েছেন তার পক্ষ থেকে আমানতদার।” এ হাদীসটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখের কথা যদ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা উপরে। আরাফার দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মাতের মধ্যে ভাষণ দেন। তাতে তিনি বলেন, ألا هل بلغت؟ "আমি কি তোমাদের নিকট পৌছিয়েছি"? উত্তরে তারা বললেন হ্যাঁ। তারপর আকাশের দিকে আঙ্গুল উঠালেন এবং বললেন, اللهم اشهد "হে আল্লাহ তুমি সাক্ষী থাক" এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্ম যা আল্লাহর উপর হওয়াকে প্রমাণ করে। আর রাসূলের স্বীকৃতি সম্পর্কে হাদীস-বাদীর হাদীস, যখন বাদীকে জিজ্ঞাসা করা হলো أين الله আল্লাহ কোথায়? সে বলল, في السماء "আল্লাহ আসমানে।” তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, أعتقها فإنها مؤمنة "তুমি তাকে আযাদ করে দাও কারণ সে মু'মিন। ⁴⁴
সাহাবীগণ এবং ইহসানের সাথে তাদের অনুসারী উম্মতের তাবেঈগণ এবং উলামায়ে কেরামগণ এ ব্যাপারে একমত যে, আল্লাহ তা'আলা সবকিছুর উপর। তাদের কারো থেকে এ বিষয়ে একটি শব্দও বর্ণিত নয় যে, তারা বলেছেন আল্লাহ তা'আলা আসামানে নয়, অথবা তিনি মাখলুকের সাথে সংমিশ্রণ, অথবা তিনি জগতের ভিতরেও নয় বাহিরেও নয়, তিনি মিলিতও নয় এবং আলাদাও নয়, তিনি পৃথকও নয় কাছেও নয় ইত্যাদি। তাদের থেকে যত বর্ণনা এ পর্যন্ত পাওয়া যায়, তা থেকে জানা যায় যে, তারা সবাই এ বিষয়ে একমত যে, আল্লাহ তা'আলা উর্ধ্বে এবং তিনি সবকিছুর উপর।
যুক্তি দ্বারা প্রমাণ: যুক্তিও এ কথা প্রমাণ করে যে আল্লাহ তা'আলা সবকিছুর উপর। যেমন আমরা যদি জিজ্ঞাসা করি যে, উর্ধ্বে থাকা এ পরিপূর্ণতার সিফাত নাকি অপরিপূর্ণতার? তখন জাওয়াব হবে উর্ধ্বে থাকাই পরিপূর্ণতা। আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেছেন, ﴿وَلِلَّهِ الْمَثَلُ الْأَعْلَى ﴾ [النحل: ٦০] “এবং আল্লাহর জন্য রয়েছে মহান উদাহরণ।” [সূরা আন-নাহাল, আয়াত: ৬০] যে সব সিফাত পূর্ণতার অর্থকে বহন করে, সে সব সিফাত আল্লাহর জন্য অবশ্যই সাব্যস্ত হবে।
যখন উপরে বা উর্ধ্বে হওয়া পূর্ণতা বলে যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত, তখন তা আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করাই ওয়াজিব। কারণ, আল্লাহ তা'আলা হয়তো উপরে হবেন অথবা নীচে হবেন অথবা মাঝখানে হবেন। নীচে হওয়া অসম্ভব। কারণ, তাতে রয়েছে অসম্পূর্ণতা। আর মাঝখানে হওয়াও অসম্ভব। কারণ, এটিও একটি অসম্পূর্ণ সিফাত যাতে আল্লাহ তা'আলা ও তার মাখলুক বরাবর হওয়াকে বাধ্য করে। দু'টি সিফাত যখন আল্লাহর জন্য হওয়া অসম্ভব হয়ে গিয়েছে বাকীটা অর্থাৎ উর্ধ্বে হওয়া তার জন্য অবধারিত। সুতরাং, আল্লাহ তা'আলা উর্ধ্বে হওয়া প্রমাণিত, তিনি প্রতিটি বস্তুর উর্ধ্বে।
মানব স্বভাব দ্বারা প্রমাণ: আল্লাহ তা'আলা উর্ধ্বের হওয়ার বিষয়টি প্রতিটি মানুষের স্বভাব ও সৃষ্টির সাথে জড়িত। প্রতিটি মানুষ যখন বলে ‘হে আল্লাহ’ তখন সে আকাশের দিক তাকায়। তার অন্তরে উপরের দিক মনোযোগী হয়, তার অন্তরে আর কোন দিক ভ্রুক্ষেপ করার প্রয়োজন অনুভূত হয় না। সুতরাং আমরা এ কথা নির্বিঘ্নে বলতে পারি যে, আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি বস্তুর উপর।
আল্লাহ তা'আলা প্রতি বস্তুর উপর হওয়া প্রমাণিত হওয়ার পর হাদীস - لو دلیتم ات بحبل من الأرض السابعة لوقع على الله থেকে জমিনে ছেড়ে দাও, তার আল্লাহর উপর গিয়ে পড়বে।” -টি দ্বারা আল্লাহ তা'আলা জমিনে এ কথা প্রমাণ করার কোন সুযোগ নেই।
যদি বলা হয়, আল্লাহ তা'আলা এ বাণী: ﴿ وَهُوَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ إِلَهٌ وَفِي الْأَرْضِ إِلَهٌ وَهُوَ الْحَكِيمُ الْعَلِيمُ ﴾ [الزخرف: ٨٤] “আর তিনিই আসমানে ইলাহ এবং তিনিই জমিনে ইলাহ; আর তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তা'আলা যেমনিভাবে আসমানে এমনিভাবে তিনি জমিনেও।" [সূরা আয-যুখরফ, আয়াত: ৮৪]
উত্তর: না, আয়াতে আল্লাহ তা'আলা নিজের ইলাহ হওয়া বিষয়ে সংবাদ দেন। তিনি আকাশ বা জমিনে তার অবস্থান জানানো সংবাদ দেননি। বরং তিনি বলছেন তিনি আসামানেও ইলাহ এবং জমিনেও ইলাহ। যেমন আমরা বলে থাকি অমুক মক্কায়ও গভর্নর এবং মদীনায়ও গভর্নর। এর অর্থ, তার কর্তৃত্ব মক্কা ও মদীনা উভয় শহরেই বিস্তৃত। যদিও সে যে কোন একটি শহরে সুনিদিষ্ট স্থানে বসবাস করে থাকে। দু'টি শহরে সে থাকে না। এ আয়াতটিও এ কথা প্রমাণ করে যে, আল্লাহর উলুহিয়্যাত জমিন ও আসমান উভয় স্থানে বিস্তৃত।
যদিও তিনি থাকেন আসমানে। আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন।
শাইখ মুহাম্মদ বিন উসাইমীন রহ.
টিকাঃ
⁴⁴ সহীহ মুসলিম হাদীস নং ১২২৭