📄 সাহাবীগণের মধ্যে সংঘটিত বিবাদ সম্পর্কে মুসলিমদের অবস্থানের ব্যাখ্যা
সাহাবীগণের মধ্যে সংঘটিত হতাহত এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী- إِذَا الْتَقَى الْمُسْلِمَانِ بِسَيْفَيْهِمَا فَالْقَاتِلُ وَالْمَقْتُولُ فِي النَّارِ “যখন দুইজন মুসলিম একে অপরকে তরবারি দ্বারা হত্যা করে, হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামে যাবে”-এর মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি।
প্রশ্ন: আমি একটি মাদরাসার ইতিহাসের শিক্ষক। মাধ্যমিকের প্রথম ক্লাসে আমি সিফ্ফীন ও জামাল দুই যুদ্ধের ইতিহাস পড়ানোর সময় ছাত্রদের থেকে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হই। তারা বলে কীভাবে সাহাবীগণ পরস্পর একে অপরকে হত্যা করল? তারা রাসূলের হাদীস— إِذَا الْتَقَى الْمُسْلِمَانِ بِسَيْفَيْهِمَا فَالْقَاتِلُ وَالْمَقْتُولُ فِي النَّارِ “যখন দুইজন মুসলিম একে অপরকে তরবারি দ্বারা হত্যা করে,⁶⁹ হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামে যাবে।" তুলে ধরে। এ অবস্থায় আমাদের অবস্থান কি হবে?।
উত্তর: সাহাবীগণের মধ্যে সংঘটিত হতাহতের বিষয়ে আমাদের অবস্থান আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতেরই অবস্থান। আর তা হলো আমরা এ বিষয়ে এ কথাই বলব যে, আল্লাহ তা'আলা আমাদের তলোয়ারকে তা থেকে বিরত রেখেছেন আমারাও তাদের বিষয়ে মুখ খোল থেকে বিরত থাকব। এ বিষয়ে একজন কবি বলেন,
সাহাবীগণ সবাই মুজতাহিদ। মুতাজাহিদ হলেই সব বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত সঠিক হবে এমন কোন কথা নেই। মানুষ অনেক সময় ইজতিহাদে ভুল করে। তাদের থেকে যে বিবাদ সংঘটিত হয়েছে নিঃসন্দেহে বলা যায় তা তাদের ইজতিহাদের ভুলের কারণেই সংঘটিত হয়েছে। তারা অবশ্যই ক্ষমা প্রাপ্ত। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ "যখন কোন বিচারক সঠিক রায় প্রদানের জন্য চেষ্টা করে তারপর সে সঠিক রায় প্রদান করে তখন তার জন্য দ্বিগুণ সাওয়া মিলবে। আর যদি কোন বিচারক সঠিক ফায়সালা দেওয়ার উদ্দেশ্যে চেষ্টা করে কিন্তু রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে সে ভুলও করে তারপরও সে একগুণ সাওয়াব পাবে।"⁷⁰
ছাত্রদের থেকে যখন এ প্রশ্ন আসে যে এ ধরনের ঘটনা কীভাবে সাহাবীগণের থেকে সংঘটিত হয়? তখন তার উত্তর হলো-আমাদের ওপর ওয়াজিব হলো,
আমরা আমাদের জবানকে এ থেকে বিরত রাখবো এবং কোন প্রশ্ন তুলবো না। আর আমরা এ কথা বলব, তারা প্রত্যেকেই মুজতাহিদ। যার ইজতিহাদ সঠিক ছিল তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সাওয়াব আর যার ইজতিহাদ সঠিক ছিল না সে এক গুণ সাওয়াব পাবে। আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন।
শাইখ মুহাম্মদ বিন উসাইমীন রহ.
টিকাঃ
⁶⁹ বুখারী হাদীস নং 31
⁷⁰ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭৩৫২
📄 জানাযার সালাতে তাড়াহুড়া করা
হাদীস: "জানাযার সালাতে তাড়াহুড়া করা" এবং "তিন সময়ে সালাত ও দাফন করা নিষিদ্ধ হওয়া" বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস。
প্রশ্ন: "তিন সময়ে সালাত ও দাফন করা নিষেধ করা" বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস এবং "জানাযার সালাতে তাড়াহুড়া করা" করার হাদীসের মধ্যে কীভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি করা যাবে? আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।
উত্তর: উভয় হাদীসের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। জানাযার সালাত ও দাফনে তাড়াহুড়া করা সময় ক্ষেপণ না করা সুন্নাত। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, " أسرعوا بالْجَنَازَةِ فَإِنْ تَكُ صَالِحَةً فَخَيْرٌ تُقَدِّمُونَها إليه وإن تَكُ سِوَى ذَلِكَ فَشَرٌّ تَضَعُونَهُ عَنْ رِقَابِكُمْ "জানাযায় তোমরা তাড়াহুড়া কর। যদি ভালো হয় তাহলে উত্তমকে তোমরা যথাস্থানে পেশ করলে আর যদি খারাপ হয় তখন অকল্যাণকে তোমরা তোমাদের গাড় - দায়িত্ব থেকে সরালে।”⁷¹
তবে যদি জানাযা হুবহু ঐ তিন মুহূর্তে উপস্থিত হয় তাহলে জানাযা ও দাফনে কিছু সময় অপেক্ষা করবে।
উকবা ইবন আমের রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসের কারণে। তিনি বলেন, “ثلاث ساعات كان رسول الله صلى الله عليه وسلم ينهانا أن نصلي فيهن أو أن نقبر فيهن موتانا حين تطلع الشمس بازغة حتى ترتفع وحين يقوم قائم الظهيرة حتى تميل الشمس وحين تضيف الشمس للغروب حتى تغرب “তিন সময়ে সালাত আদায় করতে এবং মৃতদের কবরস্ত করতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিষেধ করেছেন। যখন সূর্য উদয় হয় যতক্ষণ পর্যন্ত সূর্য উপরে না উঠে। ঠিক দুপুরের সময় যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পড়ে এবং যখন সূর্য ডুবে।”⁷²
এ তিনটি সময় খুবই অল্প সময়। এ তিন সময়ে জানাযার সালাত ও দাফন-কাফন সামান্য সময় দেরি করাতে কোন অসুবিধা নেই। এ সব বিষয়ে যাবতীয় হিকমাত ও প্রজ্ঞা কেবল আল্লাহরই। তিনিই পরম দয়ালু এবং আহকামুল হাকেমীন। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা।
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.
টিকাঃ
⁷¹ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩১৫
⁷² সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮৩১
📄 প্রথম ওয়াক্তে সালাত আদায় বিষয়ক হাদীস
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “প্রথম ওয়াক্তের সালাত আদায় করা” এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী أَسْفِرُوا بِالْفَجْرِ فَإِنَّهُ أَعْظَمُ لِلْأَجْرِهِ “তোমরা ফজরের সালাত আদায়ে দেরি কর কারণ, তা তোমাদের জন্য সাওয়াবে মহান।”⁷³
প্রশ্ন: ফজরের সালাতকে আকাশ হলুদ হওয়া পর্যন্ত দেরি করতে অনেককে দেখা যায়। তারা বলে যে, হাদীসে এসেছে-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أَسْفِرُوا بِالْفَجْرِ فَإِنَّهُ أَعْظَمُ لِلْأَجْرِ "তোমরা ফজরের সালাত আদায়ে দেরি কর, কারণ, তা তোমাদের জন্য সাওয়াবে মহান।” হাদীসটি বিশুদ্ধ কিনা? এ হাদীস এবং অপর হাদীস- الصَّلَاةُ عَلَى وَقْتِهَا "প্রথম ওয়াক্তের মধ্যে সালাত আদায় করা।"⁷⁴ এর মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি কীভাবে?
উল্লিখিত হাদীসটি বিশুদ্ধ। ইমান আহমদ রহ, এবং সুনানে গ্রন্থকারগণ তাদের স্বীয় সুনানে হাদীসটি রাফে' ইবনে খুদাইজ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বিশুদ্ধ সনদে উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সালাত অন্ধকারে আদায় করেছেন বলে বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদীসসমূহের সাথে এ হাদীসের কোন বিরোধ নেই এবং "প্রথম ওয়াক্তের মধ্যে সালাত আদায় করার হাদীসের সাথেও কোন বিরোধ নেই। জামহুরে উলামাদের মতে এ হাদীসের অর্থ হলো, ফজরের সালাতকে ফজর স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত দেরি করা। তারপর অন্ধকার দূর হওয়ার আগে তা আদায় করা। যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফা ছাড়া অন্য সব জায়গায় নিজেই এরূপ করতেন। কারণ, মুযদালিফাতে উত্তম হলো, ফজর উদয় হওয়ার সাথে সাথে দ্রুত ফজরের সালাত আদায় করা। কারণ, রাসলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজে এমনই করেছেন। এ দ্বারা ফজরের সালাত আদায়ের সময় বিষয়ক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত সমস্ত বিশুদ্ধ হাদীসসমূহের মধ্যে সামঞ্জস্যতা সাধন করা সম্ভব। আর এখানে সালাত আদায়ের উত্তম সময়ই আলোচ্য বিষয়। অন্যথায় ফজরের সালাতকে সূর্য উদয়ের পূর্ব পর্যন্ত আদায় করা বৈধ। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "ফজরের ওয়াক্ত ফজর উদয় হওয়া থেকে নিয়ে সূর্য উদয়ের আগ পর্যন্ত।” হাদীসটি আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে ইমাম মুসলিম স্বীয় কিতাব সহীহ মুসলিমে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা। শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.
টিকাঃ
⁷³ আহমদ, হাদীস নং ১৭২৮৬
⁷⁴ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫২৭
📄 সালাত আপকারীর বিধান
সালাত ত্যাগকারী কাফের হওয়া বিষয়ক হাদীসসমূহ এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী- أقوام يدخلون الجنة ولم يسجدوا الله سجدة “এমন সম্প্রদায়ের লোকেরা জান্নাতে প্রবেশ করবে যারা আল্লাহর জন্য একটি সেজদাও কখনো করেনি。
প্রশ্ন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী- إنهم يدخلون الجنة ولم يسجدوا الله سجدة “এমন সম্প্রদায়ের লোকেরা জান্নাতে প্রবেশ করবে যারা আল্লাহর জন্য একটি সেজদাও কখনো করেনি” ঐ সব লোকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা সালাত ওয়াজিব হওয়া সম্পর্কে অজ্ঞ। যেমন, যদি কোন ব্যক্তি ইসলামী রাষ্ট্র থেকে দূরবর্তী স্থানে অথবা প্রত্যন্ত গ্রামে থাকে যেখানে সালাতের দাও'আত পৌঁছেনি। অথবা বাণীটি ঐ সব লোকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা ইসলাম গ্রহণ করার পর সাথে সাথে মারা গেছেন- আল্লাহর জন্য একটি সেজদাও করতে পারেননি। এ কথাটি বলার কারণ, মূলত: হাদীসটি ঐ সব হাদীসের অর্ন্তভুক্ত যেগুলোকে মুতাসাবেহ বলা হয়। আর সালাত ত্যাগকারী হাদীস স্পষ্ট ও মুহকাম। কুরআন ও সুন্নাত দ্বারা দলীল দেয়ার ক্ষেত্রে একজন মু'মিনের ওপর ওয়াজিব হলো মুতাসাবেহকে মুহকামের ওপর প্রয়োগ করা। মুহকামকে বাদ দিয়ে মুতাশাবেহের অনুসরণ করা তাদের স্বভাব যাদের অন্তরে রয়েছে বক্রতা ও কপটতা। আল্লাহ আমাদের তা থেকে হেফাযত করুন। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, هُوَ الَّذِي أَنزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ ءَايَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْعٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَبَهَ مِنْهُ ابْتِغَاءَ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاءَ تَأْوِيلِهِ، وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ وَ إِلَّا اللهُ وَالرَّسِخُونَ فِي الْعِلْمِ يَقُولُونَ ءَامَنَّا بِهِ كُلٌّ مِّنْ عِندِ رَبِّنَا وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُوا الْأَلْبَابِ ﴾ [ال عمران: ٧]
নাযিল করেছেন, তার মধ্যে আছে মুহকাম আয়াতসমূহ। সেগুলো কিতাবের মূল, আর অন্যগুলো মুতাশাবিহ্। ফলে যাদের অন্তরে রয়েছে সত্যবিমুখ প্রবণতা, তারা ফিতনার উদ্দেশ্যে এবং ভুল ব্যাখ্যার অনুসন্ধানে মুতাশাবিহ্ আয়াতগুলোর পেছনে লেগে থাকে। অথচ আল্লাহ ছাড়া কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা জ্ঞানে পরিপক্ক, তারা বলে, আমরা এগুলোর প্রতি ঈমান আনলাম, সবগুলো আমাদের রবের পক্ষ থেকে। আর বিবেক সম্পন্নরাই উপদেশ গ্রহণ করে।” [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৮] আব্দুল আসহাল গোত্রের আসীরমের ঘটনা কারো অজানা নয়। তিনি ওহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং শহীদ হন। তার স্বজাতি লোকেরা ময়দানের এক প্রান্তে সর্বশেষ শহীদদের মধ্যে রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে পান। তারা জিজ্ঞাসা করল, তুমি কেন তোমার স্বজাতির বিরুদ্ধে গেলে নাকি ইসলামের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলে? বলল, না বরং আমি আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনলাম। তখন তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বিষয়টি অবহিত করলে, তিনি বললেন, নিশ্চয় তিনি জান্নাতী। অথচ লোকটি আল্লাহর জন্য একটি সেজদাও করেননি। কিন্তু তার উত্তম পরিণতি দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি দয়া করেছেন। আল্লাহর নিকট আমাদের ও তোমাদের জন্য উত্তম পরিণতি কামনা করি।
শাইখ মুহাম্মদ বিন উসাইমীন রহ.