📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 একজনের অপরাধের কারণে অন্য জনকে পাঁকড়াও করা যাবে কিনা

📄 একজনের অপরাধের কারণে অন্য জনকে পাঁকড়াও করা যাবে কিনা


আল্লাহর কথা [৩৮: النجم] ﴿ أَلَّا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى ﴾ "তা এই যে, কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।" [সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩৮] দ্বারা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রমাণ পেশ করা। আর রাসূলুল্লাহ
إِنَّ الْمَيِّتَ لَيُعَذِّبُ بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ : “নিশ্চয় মৃত ব্যক্তিকে তার পরিবারের লোক জনের কান্নার কারণে শাস্তি দেওয়া হয়।"
প্রশ্ন: ইমাম বুখারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণনা করেন-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, إِنَّ الْمَيِّتَ لَيُعَذِّبُ بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ “নিশ্চয় মৃত ব্যক্তিকে তার পরিবারের লোক জনের কান্নার কারণে শাস্তি দেওয়া হয়।" অপর একটি হাদীস আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, যা এ হাদীসটিকে প্রত্যাখ্যান করে যাতে তিনি বলেন, তোমাদের জন্য কুরআনই যথেষ্ট। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴾ أَلَّا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى ﴿ [৩৮ : النجم] "তা এই যে, কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।” [সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩৮] উভয়ের মধ্যে যে বিরোধ পরিলক্ষিত সে বিষয়ে আপনাদের উত্তর কি? মৃত ব্যক্তিকে তার পরিবার পরিজনের কান্নার কারণে কি শাস্তি দেওয়া হবে? নাকি মানুষের জন্য তাই রয়েছে যা সে অর্জন করে। ﴾ أَلَّا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى ﴿ [النجم : ৩৮] “তা এই যে, কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।” [সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩৮]
উত্তর: আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা যে আয়াত উল্লেখ করেছেন এবং উল্লিখিত হাদীসগুলোর মধ্যে কোন বিরোধ নেই। আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু মুগীরা রা. সহ অন্যান্যদের থেকেও সহীহ বুখারী ও মুসলিমে একই হাদীস বর্ণিত রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, إِنَّ الْمَيِّتَ لَيُعَذِّبُ بِمَا يُنَاحُ بِهِ عَلَيْهِ “মৃত ব্যক্তিকে তার ওপর উচ্চ আওয়াজে কান্না-কাটির কারণে শাস্তি দেওয়া হয়।" বুখারীর অপর একটি বর্ণনায় বর্ণিত, بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ “তার ওপর তার পরিবারের কান্নার কারণে” নিয়াহা অর্থ উচ্চ আওয়াজ। কিন্তু চোখের পানি ফেলানোতে কোন ক্ষতি নেই। ক্ষতি হলো উচ্চ আওয়াজে কান্নাকাটি করাতে। আর উচ্চ আওয়াজে কান্নাকাটি করাকেই নিয়াহা বলা হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ কথা দ্বারা উদ্দেশ্য মানুষকে মৃত ব্যক্তিদের জন্য উচ্চ আওয়াজে কান্নাকাটি করা থেকে বিরত রাখা এবং তারা যেন ধৈর্য অবলম্বন করে। তবে চোখের পানি বা অন্তরের ব্যথাতে কোন ক্ষতি নেই। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছেলে ইবরাহীম মারা গেলে তিনি বললেন, ﴿إِنَّ الْعَيْنَ تَدْمَعُ وَالْقَلْبَ يَحْزَنُ وَلَا نَقُولُ إِلَّا مَا يَرْضَى رَبُّنَا وَإِنَّا بِفِرَاقِكَ يَا إِبْرَاهِيمُ لَمَحْزُونُونَ﴾ “চোখ অশ্রু শিক্ত হয়, অন্তর ব্যথিত হয় আল্লাহ তা'আলা যে কথায় খুশি হন সে কথাই বলব। হে ইব্রাহীম আমি তোমার বিচ্ছেদে অত্যন্ত ব্যথিত।”⁵³
সুতরাং, মৃত ব্যক্তিকে তার পরিবারের উচ্চ আওয়াজে কান্নার কারণে শাস্তি দেওয়া হয়। কান্নাকাটি করার কারণে তার যে শাস্তি হয় তার ধরণ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন। বিষয়টি আল্লাহ তা'আলার এ ﴿أَلَّا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى﴾ [النجم: ৩৮] “তা এই যে, কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।” [সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩৮] বিধান থেকে বাদ রাখা হয়েছে। কারণ, কুরআন ও সুন্নাহের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। বরং একটি অপরটির সত্যায়ন ও ব্যাখ্যা। আয়াতটি এখানে ব্যাপক আর হাদীসটি খাস। সুন্নাহ সাধারণত কুরআনের ব্যাখ্যা ও বর্ণনা হয়। সুতরাং পরিবারের লোকদের কান্নার কারণে মৃত ব্যক্তির শাস্তির আয়াত থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
ফলে আয়াতের মধ্যে এবং হাদীসগুলো মধ্যে কোন বিরোধ নেই। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কথাটি তার ইজতিহাদ ও গবেষণা এবং ভালো কর্মের প্রতি তার অধির আগ্রহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা তার কথার ওপর এবং অন্যদের কথার ওপর অবশ্যই প্রাধান্য। কারণ, আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِن شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبِّي عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ ﴾ [الشورى: ١٠] “আর যে কোন বিষয়েই তোমরা মতবিরোধ কর, তার ফয়সালা আল্লাহর কাছে; তিনিই আল্লাহ, আমার রব; তাঁরই উপর আমি তাওয়াক্কুল করেছি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী হই।” [সূরা আশ-শুরা, আয়াত: ১০] আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ﴾ [النساء : ٥٩] “অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যার্পণ করাও- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৯] একই অর্থে আরো অনেক আয়াত রয়েছে। আল্লাহই ভালো জানেন।
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.

টিকাঃ
⁵³ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩০৩

📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 সাক্ষ্য প্রদান বিষয়ক দু‘টি হাদীস

📄 সাক্ষ্য প্রদান বিষয়ক দু‘টি হাদীস


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী : الذي يأتي بالشهادة قبل أن يسألها “সে সাক্ষ্য প্রদান করে তার কাছে সাক্ষ্য প্রদান তলব করার পূর্বে।”
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: إِنَّ بَعْدَكُمْ قَوْمًا يَشْهَدُونَ وَلَا يُسْتَشْهَدُونَ “তোমাদের এমন এক সম্প্রদায়ের লোকদের আগমন ঘটবে যারা তাদের কাছে সাক্ষ্য তলব করার পূর্বে সাক্ষ্য প্রদান করবে।”
প্রশ্ন: হাফেয আল-মুনযিরী রহ, সংক্ষিপ্ত সহীহ মুসলিমে পৃষ্ঠা নং ২৮১, হাদীস নং ১০৫৯ যায়েদ ইবন খালেদ আল-জুহানী থেকে হাদীস বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, قال ألا أخبركم بخير الشهداء ؟ الذي يأتي بالشهادة قبل أن يسألها "আমি কি তোমাদের সর্বোত্তম সাক্ষ্যগণ কারা সে বিষয়ে সংবাদ দেব? তারা হলো, যারা তাদের নিকট সাক্ষ্য তলব করার পূর্বে সাক্ষ্য প্রদান করে।”⁵⁴ এ হাদীসটির মাঝে এবং পরবর্তী হাদীস – إِنَّ بَعْدَكُمْ قَوْمًا يَشْهَدُونَ وَلَا يُسْتَشْهَدُونَ "তোমাদের পর এমন এক সম্প্রদায়ে আগমন ঘটবে তারা সাক্ষ্য দেবে অথচ তাদের নিকট সাক্ষ্য চাওয়া হয়নি।”⁵⁵ এর মধ্যে বিরোধ নিরসন কীভাবে?
উত্তর: যে সব হাদীসে আগে আগে সাক্ষ্য প্রদানকে নিন্দা করা হয়েছে, ঐ হাদীসগুলো দ্বারা উদ্দেশ্য ঐ সব যারা সাক্ষ্য প্রদানকে হালকা করে দেখে। তাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় নেই এবং ঈমানের দুর্বলতার কারণে যারা সাক্ষ্য প্রদানের ক্ষেত্রে সত্যবাদিতা বজায় রাখে না।
আর যে সব হাদীসে আগ বাড়িয়ে সাক্ষ্য প্রদানকে প্রশংসা করা হয়েছে তারা হলো ঐ সব লোক যারা সাক্ষ্য হিসেবে নির্ধারিত হয়েছেন। তারা ছাড়া আর কেউ সাক্ষ্য দেয়ার নেই এবং তাদের উদ্দেশ্য হলো সত্যকে প্রমাণ করা যাতে সত্য চাপা পড়ে না যায়। এ বিষয়ে আরো জানার জন্য দেখুন-ফাতহুল বারী এবং ফাতহুল মাজীদ। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা।

টিকাঃ
⁵⁴ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭১৯; তিরমিযি, হাদীস নং ২২৯৫
⁵⁵ বর্ণনায় সহীহ বুখারী হাদীস নং ৩৬৫০, মুসলিম, তিরমিযি, ইবনু মাযাহ, মুয়াত্তা মালেক, মুসনাদে আহমদেও হাদীসটি রয়েছে। যেমনটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় মিফতাহু কুনূযুস সূন্নাহ কিতাবে।

📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 আযাজ্রা সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহের নির্দেশনা

📄 আযাজ্রা সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহের নির্দেশনা


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী - "অলক্ষ্মী ও অযাত্রা বলতে কিছু নেই।" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী — "ইন কান ফী শাইইন ফীল মারআতি ওয়াল ফারসি ওয়াল মাসকান — কিছু থাকতো তবে তা ঘোড়া, নারী বা বাড়ীতে থাকত।"⁵⁶
প্রশ্ন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী- "অলক্ষ্মী ও অযাত্রা বলতে কিছু নেই।"⁵⁷-এর মধ্যে এবং অপর বাণী যাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,- "ইন কান ফী শাইইন ফীল মারআতি ওয়াল ফারসি ওয়াল মাসকান "অযাত্রা বলতে যদি কোন কিছু থাকতো তবে তা ঘোড়া, নারী ও ঘরের মধ্যে থাকতো" উভয় হাদীসের বিরোধ নিরসন কীভাবে?
উত্তর: ভাগ্য নিরূপণ দুই প্রকার। একটি হলো শির্ক দ্বারা। দৃশ্যমান ও শ্রবণযোগ্য বস্তু দ্বারা অযাত্রা বা যাত্রা ভঙ্গ বলে বিশ্বাস করা। একে তিয়ারাহ বলা হয়। এ ধরণের ভাগ্য নিরূপণ করা শির্ক যা সম্পূর্ণ হারাম।
দ্বিতীয় প্রকার হলো কিছু জিনিষকে উল্লিখিত বিষয়সমূহ থেকে বাদ দিয়ে রাখা হয়েছে। এ ধরনের বিষয়গুলো নিষিদ্ধ নয়। এ কারণেই বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, — ওয়াল শিউমু ফী সালাসিন ফীল মারআতি ওয়াদ্দার ওয়াল দাব্বা "অযাত্রা তিনটি বস্তুর মধ্যে হয়। নারীর মধ্যে, ঘরের মধ্যে এবং বাহনের মধ্যে।"⁵⁸ এ ধরনের বিষয়ের মধ্যে বদ-ফালী গ্রহণ করা নিষিদ্ধ বদ-ফালী নয়। কারণ, অনেকে বলেন, কতক নারী, বাহন এমন আছে যাদের মধ্যে আল্লাহর হুকুমে অযাত্রা রয়েছে। এ হলো, কাদারী-ভাগ্যের অকল্যাণ। যখন কোন ব্যক্তি এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হবে তখন সে যদি অনুপযোগী ঘরকে ছেড়ে দেয়, স্ত্রীকে তালাক দেয় এবং আরোহণকে ছেড়ে দেয় তাতে তার কোন গুনাহ হবে না। এটি কোন বদ-ফালী বা অযাত্রা গ্রহণ করা নয়।
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.

টিকাঃ
⁵⁶ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৭০৪
⁵⁷ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৩৮০
⁵⁸ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৪২১, ৫৭৫৩

📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 রাতের শেষাংশে দুনিয়ার আসমানে আল্লাহর অবতরণ

📄 রাতের শেষাংশে দুনিয়ার আসমানে আল্লাহর অবতরণ


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী - يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَة "আমাদের রব প্রতি রাতে অবতরণ করেন।" বাস্তবতা হলো, আমাদের এখানে যখন রাত তখন আমেরিকাতে দিন।
প্রশ্ন: আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে অবতরণ বিষয়ক হাদীস এবং বাস্তবতা- আমাদের এখানে যখন রাত আমেরিকাতে তখন দিন-হাদীসের মধ্যে এবং বাস্তবতার মাঝে কীভাবে বিরোধ নিরসন করব?
ইমাম বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য ইমামগণ কর্তৃক আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসটি বিশুদ্ধ। যাতে রাসূলুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি وَسَلَّم বলেন, يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلْتُ اللَّيْلِ الْآخِرُ يَقُولُ مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ. "রাতের শেষাংশের এক তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকা অবস্থায় আল্লাহ তা'আলা প্রতি রাতে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন। অতঃপর বলে কে আছ আমার কাছে চাইবে আমি তাকে দিবো। কে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আমি তাকে ক্ষমা করব।"⁵⁹ ইমাম বুখারী দো'য়া এবং শেষ রাতের সালাত পরিচ্ছেদে উল্লিখিত শব্দে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
হাদীসটি সম্পর্কে প্রশ্ন হলো, এ হাদীস ও বাস্তবতা- অর্থাৎ আমাদের এখানে যখন রাত তখন আমেরিকাতে দিন-এর মধ্যে সামঞ্জস্যতা কি?
উত্তর: আলহামদু লিল্লাহ, বিষয়টিকে কেন্দ্র করে তেমন কোন প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। কারণ, হাদীসটি আল্লাহর কর্মগত সিফাতসমূহের অর্ন্তভুক্ত একটি হাদীস। আল্লাহর সিফাত বিষয়ে সত্বাগত হোক, যেমন-চেহারা, দুই হাত অথবা আধ্যাত্মিক হোক যেমন-হায়াত, ইলম অথবা কর্মগত হোক যেমন-আরশে আরোহন করা, দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করা ইত্যাদি সর্বাবস্থায় আমাদের ওপর নিম্ন বিষয়গুলো মেনে নেয়া ওয়াজিব।
এক- কুরআন ও সুন্নাহে এর বর্ণনা যেভাবে এসেছে, সেভাবে তার অর্থ ও যথাযোগ্য বাস্তবতার প্রতি ঈমান আনা।
দুই-অন্তরে বা মুখে কোন একটি ধরণ চিন্তা বা ব্যক্ত করে তার জন্য কোন আকৃতি বা ধরণ সাব্যস্ত করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা। কারণ, এটি আল্লাহর ওপর এমন কথা বলা যে সম্পর্কে তার কোন ইলম বা জ্ঞান নেই। আল্লাহ তা'আলা একে হারাম ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَن تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلُ به سُلْطَنًا وَأَن تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ ﴾ [الاعراف: ٣٣] “বল, আমার রব তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ- যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে, আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহর সাথে তোমাদের শরীক করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর উপরে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না।” [সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ৩৩] অপর আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا ﴾ [الإسراء: ٣৬] “আর যে বিষয়ে তোমার জানা নাই তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তকরণ- এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৬]
মাখলুকের জন্য আল্লাহর সিফাতের ধরণ জানা ও বাস্তবতা আয়ত্ত করা কোন ক্রমেই সম্ভব নয়। তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে ও মহান। কোন কিছু হুবহু বা তার দৃষ্টান্ত দেখা ছাড়া অথবা যিনি দেখেছেন তার সত্য সংবাদ ছাড়া আয়ত্ত করা যায় না। আর আল্লাহর সিফাতের ধরণ বিষয়ে এর কোনটিই আমাদের নিকট উপস্থিত নেই।
তিন-মাখলুকের সিফাতের সাথে দৃষ্টান্ত স্থাপন থেকে বিরত থাকা। চাই অন্তরে চিন্তা করে হোক অথবা মুখে উচ্চারণ করে হোক। আল্লাহ তা'আলা বলেন, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ﴾ [الشورى: ١١] “তাঁর মত কিছু নেই আর তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১]
আল্লাহর সিফাত বিষয়ে আমাদের করনীয় কি তা জানার পর আল্লাহর সিফাত সম্পর্কীয় অবতরণের হাদীস ও অন্যান্য হাদীস বিষয়ে আর কোন প্রশ্ন অবশিষ্ট থাকার কথা নয়।
পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্ত থেকে নিয়ে পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত সমগ্র উম্মতকে সম্বোধন করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সংবাদ দেন যে, আল্লাহ তা'আলা রাতের এক তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকতে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন। তার সংবাদ দেওয়াটি গাইবী বিষয়ে সংবাদ যা আল্লাহ তা'আলা তার কাছে প্রকাশ করেছেন। আর যিনি তাকে এ সংবাদ জানিয়েছেন তিনি মহান আল্লাহ যিনি সময়ের ব্যবধান অর্থাৎ এক দেশে দুপুর বারোটা হয়ে পৃথিবীর অন্য দেশে তখন রাত বারোটা-এ সম্পর্কে অবশ্যই অবগত রয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সমস্ত উম্মতকে সম্বোধন করে এ হাদীস বলেছেন, যাতে শেষ রাতের এক তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকতে আল্লাহর অবতরণ করার কথা বিশেষভাবে রয়েছে, তাতে সমস্ত উম্মতকে এ হাদীসটি সামিল করেছে। ফলে যে উম্মতের মধ্যে রাতের এক তৃতীয়াংশ সাব্যস্ত হবে তাদের কাছে আল্লাহর অবতরণও সাব্যস্ত হবে। আমরা তাদের বলব, তোমাদের ক্ষেত্রে এটিই হলো আল্লাহর অবতরণের সময় এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। আর যাদের নিকট রাতের শেষাংশ এখনো আসেনি সেখানে তাদের ক্ষেত্রে আল্লাহর অবতরণও সাব্যস্ত হয়নি। দুনিয়ার আকাশে আল্লাহর অবতরণের বিশেষ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্ধারণ করেছেন। যখন ঐ সময় আসবে তখন অবতরণ পাওয়া যাবে। আর যখন ঐ সময়টি শেষ হবে তখন আর অবতরণও অবশিষ্ট থাকবে না। এ বিষয়ে অস্পষ্টতা ও আপত্তির কোন সুযোগ নেই। মাখলুকের অবতরণের ক্ষেত্রে যদিও বিষয়টি চিন্তা করা বা মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু আল্লাহর অবতরণ ও মাখলুকের অবতরণ এক নয়, যার ওপর কিয়াস করা যেতে পারে এবং বলা যায় যে, মাখলুকের ক্ষেত্রে যেটি অসম্ভব আল্লাহর ক্ষেত্রেও সেটি অসম্ভব।
যেমন-আমাদের দেশে যখন ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয় তখন পশ্চিমাদের দেশে রাতের এক তৃতীয়াংশ শুরু হয়। তখন আমরা বলব, আল্লাহর অবতরণের সময় আমাদের ক্ষেত্রে শেষ হয়ে গেছে এবং তাদের ক্ষেত্রে শুরু হয়েছে। আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে এটি একেবারেই সাধারণ ব্যাপার মাত্র। কারণ, আল্লাহ তা'আলা বলেন, ]۱۱ :لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ﴾ [الشوری “তাঁর মত কিছু নেই আর তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১]
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. অবতরণের হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের লোকদের জন্য আল্লাহর অবতরণ তাদের দেশের রাতের পরিমাণ অনুযায়ী। পশ্চিম প্রান্ত ও পূর্ব প্রান্তের ন্যায় উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তেও রাতের পরিমাণ অনুযায়ী আল্লাহর অবতরণের নির্ধারিত সময়ের ব্যবধান হবে।
এ ছাড়াও যখন কোন সম্প্রদায়ের নিকট রাতের এক তৃতীয়াংশ সাব্যস্ত হলো এবং তাদের নিকটবর্তী অন্য দেশে একটু পরেই রাতের এক তৃতীয়াংশ পাওয়া গেল, তখন তাদের নিকটও আল্লাহর অবতরণ সাব্যস্ত হবে, যে সম্পর্কে মহা সত্যবাদী আমাদের প্রিয় নবী সংবাদ দিয়েছেন। এভাবেই পৃথিবীর সর্বত্র আল্লাহর অবতরণ পাওয়া যাবে ও সাব্যস্ত হবে।
শাইখ মুহাম্মদ বিন উসাইমীন রহ.

টিকাঃ
সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১১৪৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00