📄 সূরা আল-কাহাফের তিনটি আয়াতের ব্যাখ্যা
প্রশ্ন: প্রশ্নকারী বলেন, সূরা আল-কাহফে মুসা আলাইহিস সালামের সাথে একজন নেককার লোকের ঘটনায় লোকটি বলেন- أَمَّا السَّفِينَةُ فَكَانَتْ لِمَسَاكِينَ يَعْمَلُونَ فِي الْبَحْرِ فَأَرَدتُ أَنْ أَعِيبَهَا وَكَانَ وَرَاءَهُم مَّلِكٌ يَأْخُذُ كُلَّ سَفِينَةٍ غَصْبًا * وَأَمَّا الْغُلَامُ فَكَانَ أَبَوَاهُ مُؤْمِنَيْنِ فَخَشِينَا أَن يُرْهِقَهُمَا طُغْيَنَا وَكُفْرًا فَأَرَدْنَا أَن يُبْدِلَهُمَا رَبُّهُمَا خَيْرًا مِنْهُ زَكَاةً وَأَقْرَبَ رُحْمًا وَأَمَّا الْجِدَارُ فَكَانَ لِغُلَامَيْنِ يَتِيمَيْنِ فِي الْمَدِينَةِ وَكَانَ تَحْتَهُ كَنزٌ لَّهُمَا وَكَانَ أَبُوهُمَا صَالِحًا فَأَرَادَ رَبُّكَ أَن يَبْلُغَا أَشُدَّهُمَا وَيَسْتَخْرِجَا كَنزَهُمَا رَحْمَةً مِّن رَّبِّكَ وَمَا فَعَلْتُهُ عَنْ أَمْرِي ذَلِكَ تَأْوِيلُ مَا لَمْ تَسْطِع عَلَيْهِ صَبْرًا ﴾ [الكهف: ۷۹، ৮২]
"নৌকাটির বিষয় হল, তা ছিল কিছু দরিদ্র লোকের যারা সমুদ্রে কাজ করত। আমি নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করতে চেয়েছি কারণ তাদের পেছনে ছিল এক রাজা, যে নৌকাগুলো জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিচ্ছিল'। 'আর বালকটির বিষয় হল, তার পিতা-মাতা ছিল মুমিন। অতঃপর আমি আশংকা²¹ করলাম যে, সে সীমালংঘন ও কুফরী দ্বারা তাদেরকে অতিষ্ঠ করে তুলবে'। 'তাই আমি চাইলাম, তাদের রব তাদেরকে তার পরিবর্তে এমন সন্তান দান করবেন, যে হবে তার চেয়ে পবিত্রতায় উত্তম এবং দয়ামায়ায় অধিক ঘনিষ্ঠ। 'আর প্রাচীরটির বিষয় হল, তা ছিল শহরের দু'জন ইয়াতীম বালকের এবং তার নিচে ছিল তাদের গুপ্তধন। আর তাদের পিতা ছিল সৎকর্মপরায়ণ। তাই আপনার রব চাইলেন যে, তারা দু'জন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে তাদের গুপ্তধন বের করে নেবে। এ সবই আপনার রবের রহমত স্বরূপ। আমি নিজ থেকে তা করিনি। এ হলো সে বিষয়ের ব্যাখ্যা, যে সম্পর্কে আপনি ধৈর্য ধারণ করতে পারেননি।” [সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ৭৯, ৮২]
আয়াতে দেখা যাচ্ছে, সে নৌকাটির নিকটে গিয়ে বলল, فَأَرَدْتُ أَنْ أَعِيبَهَا “আমি নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করতে চেয়েছি" আর মু'মিন দুই মাতা-পিতার উল্লেখের সময় বলল, فَأَرَدْنَا أَن يُبْدِلَهُمَا رَبُّهُمَا "তাই আমি চাইলাম, তাদের রব তাদেরকে তার পরিবর্তে এমন সন্তান দান করবেন, যে হবে তার চেয়ে পবিত্রতায় উত্তম এবং দয়ামায়ায় অধিক ঘনিষ্ঠ।” এবং প্রাসাদের মালিক দুই ইয়াতীমের আলোচনার সময় বলল, فَأَرَادَ رَبُّكَ "তাই আপনার রব চাইলেন” এ তিনটি অভিব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য কি? আল্লাহর ইচ্ছার সাথে এ নেককার লোকটিরও কি ইচ্ছা রয়েছে?
উত্তর: সহীহ কথা হলো, লোকটি মূসা আলাইহিস সালামের সাথী খিযির আলাইহিস সালাম। বিশুদ্ধ মতানুসারে তিনি কেবল একজন নেককার লোক নয় তিনি একজন নবী। এ কারণেই তিনি বলেন, وَمَا فَعَلْتُهُ عَنْ أَمْرِى “আমি নিজ থেকে তা করিনি” অর্থাৎ, বরং আল্লাহর নির্দেশেই আমি কাজটি করি। একই ঘটনায় বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত যে, তিনি মূসা আলাইহিস সালামকে বলেন, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে এমন ইলম শিক্ষা দিয়েছেন যা আপনি জানেন তা আমি জানি না। আর আল্লাহ আমাকে এমন ইলম শিক্ষা দিয়েছেন যা আমি জানি তবে আপনি জানেন না। এ কথা দ্বারা প্রমাণিত হয়, নিশ্চয় তিনি একজন নবী ছিলেন। এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَأَرَادَ رَبُّكَ أَن يَبْلُغَا أَشُدَّهُمَا “তাই আপনার রব চাইলেন যে, তারা দু'জন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে তাদের গুপ্তধন বের করে নেবে।” আর একজন রাসূল যেহেতু তার কাছে অহী আসে, সে অবশ্যই আল্লাহর ইচ্ছা সম্পর্কে অবগত থাকেন।
আর নৌকার কাহিনীতে বিষয়টি সে তার নিজের দিকে সম্বোধন করে বলেন, فَأَرَدْتُ أَنْ أَعِيبَهَا “আমি নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করতে চেয়েছি।” এর কারণ- আল্লাহই ভালো জানেন-ভালো কর্মগুলোই আল্লাহর দিকে সম্বোধন করা হয়।
আর এখানে নৌকাটি নষ্ট করা স্পষ্টত কোন ভালো কর্ম নয়। তাই আল্লাহর সম্মানার্থে কর্মটিকে তিনি নিজের দিকে নিসবত-সম্বোধন করেন। ফলে তিনি বলেন, فَأَرَدْتُ أَنْ أَعِيبَهَا "আমি নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করতে চেয়েছি" এ খারাপ কর্মটির উদ্দেশ্য হলো, নৌকাটি নিরাপদ থাকা যাতে যালিম বাদশা জোর করে নিয়ে না যায়। কারণ, অত্যাচারী বাদশা সব ভালো, দোষ-ত্রুটি মুক্ত ও নিরাপদ নৌকাগুলো জোর করে নিয়ে যায়। তাই খিযির আলাইহিস সালাম যালিম বাদশার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ভালো নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করে দেয়ার ইচ্ছা করলেন। যখন সে দেখতে পাবে নৌকাটি ত্রুটিযুক্ত ও ফাঁটা তখন যালিম বাদশার পাকড়াও, যুগ্ম ও অনিষ্ঠতা থেকে নৌকাটি থেকে বেচে যাবে। যেহেতু বাহ্যিক বিষয়টি আল্লাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় তাই তিনি কর্মটিকে তার নিজের দিকেই নিসবত-সম্বোধন করেন এবং বলেন, فَأَرَدْتُ أَنْ أَعِيبَهَا “আমি নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করতে চেয়েছি" আর মু'মিন মাতা-পিতার উল্লেখের সময় বলেন, فَأَرَدْنَا أَن يُبْدِلَهُمَا رَبُّهُمَا "তাই আমি চাইলাম, তাদের রব তাদেরকে তার পরিবর্তে এমন সন্তান দান করবেন, যে হবে তার চেয়ে পবিত্রতায় উত্তম এবং দয়ামায়ায় অধিক ঘনিষ্ঠ।” কর্মটি ভালো হওয়ার কারণে তিনি তার নিজের দিকে সম্বোধন করেন। কারণ, তিনি এ ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট। বহুবচন শব্দ ব্যবহার করার কারণ, তিনি নবী। আর নবীরা সাধারণ মানুষ নয় তারা মহান তাই তাদের ক্ষেত্রে বহুবচন ব্যবহার করাই হলো শ্রেয়। এ ছাড়াও কর্মটি আল্লাহর আদেশে এবং তার দিক- নির্দেশনায় হয়েছে। ফলে বহুবচন ব্যবহার করে আল্লাহর দিকে কর্মের সম্বোধন করাটাই ছিল উত্তম। এ ছাড়াও কর্মটি ভালো, কল্যাণকর ও উপকারী। এ ধরনের কর্মের সম্বোধন আল্লাহর দিকেই হয়ে থাকে। ইয়াতীম বালক দু'টির বিষয়টিতে ছিল তাদের সংশোধন, উপকার ও মহা কল্যাণ। এ কারণেই তিনি বলেন, فَأَرَادَ رَبُّكَ "তাই তোমার রব চাইলেন যে,” এখানে কল্যাণকে আল্লাহ তা'আলা তার নিজের দিকে সম্বোধন করেছেন। এটি সূরা আল-জ্বীনের মধ্যে আল্লাহর অপর একটি বাণীর মতো। যাতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَأَنَّا لَا نَدْرِى ا مَا أُشَرُ أُرِيدَ بِمَن فِي الْأَرْضِ أَمْ أَرَادَ بِهِمْ رَبُّهُمْ رَشَدًا ﴾ [الجن: ١٠]
জানি না, জমিনে যারা রয়েছে তাদের জন্য অকল্যাণ চাওয়া হয়েছে, নাকি তাদের রব তাদের ব্যাপারে মঙ্গল চেয়েছেন।” [সূরা আল-জীন, আয়াত: ১০] এ আয়াতে খারাপ কর্মটিকে আল্লাহর দিকে সম্বোধন করা হয়নি। কিন্তু যখন হিদায়াতের আলোচনা আসল, তারা বলল, أَمْ أَرَادَ بِهِمْ رَبُّهُمْ رَشَدًا "নাকি তাদের রব তাদের ব্যাপারে মঙ্গল চেয়েছেন।" হিদায়াত কল্যাণকর হওয়ার কারণে হিদায়েকে তারা আল্লাহর দিকে সম্বোধন করলেন। খারাপ কর্ম তার প্রতি সম্বোধন করা যাবে না। যেমন, বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, والشر ليس إليك "খারাপ কর্ম তোমার দিকে নয়।” এটি একটি ভালো শিষ্টাচার এবং মু'মিন জ্বীনদের আদব। আর খিযির আলাইহিস সালাম খারাপ কর্ম বিষয়ের সম্বোধনের শিষ্টাচার থেকে তিনি বলেন, فَأَرَدْتُ أَنْ أَعِيبَهَا “আমি নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করতে চেয়েছি” আর দুই ইয়াতীমের বিষয়ে বলেন, فَأَرَادَ رَبُّكَ "তাই তোমার রব চাইলেন" এ গুলো সবই আল্লাহ সুবহানাহুর সাথে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা।
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ
টিকাঃ
²¹ তাঁর আশংকা নিছক ধারণা ভিত্তিক ছিল না, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি নিশ্চিত জানতে পেরেছিলেন。
📄 আল্লাহই মানুষের অন্তর পরিবর্তনকারী
আল্লাহর বাণী: ﴾ وَأَعْلَمُواْ أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ "জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ মানুষ ও তার হৃদয়ের মাঝে অন্তরায় হন। আর নিশ্চয় তাঁর নিকট তোমাদেরকে সমবেত করা হবে।"
প্রশ্ন: একজন প্রশ্নকারী প্রশ্ন করেন যে, আল্লাহ তা'আলার এ বাণী: وَاعْلَمُوا أَنَّ﴿ ]اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ ﴾ [الانفال: ২৪ “জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ মানুষ ও তার হৃদয়ের মাঝে অন্তরায় হন। আর নিশ্চয় তাঁর নিকট তোমাদেরকে সমবেত করা হবে।” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ২৪] এর অর্থ কি?
উত্তর: আয়াতটির বাহ্যিক অর্থ হলো, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের যাবতীয় সবকিছুর পরিচালনা করেন। তিনি কাউকে ভালো কর্মের তাওফীক দেন, কারো অন্তরকে ঈমানের জন্য খুলে দেন এবং কাউকে তিনি ইসলামের দিকে হিদায়াত দেন। আবার কারো অন্তরে আল্লাহর দীনের প্রতি সংকীর্ণতা ও কাঠিণ্যতা ঢেলে দেন যা তার ও ইসলামের মাঝে এবং মানুষ ও তার অন্তরের মাঝে আবরণ সৃষ্টি করেন। যেমন- আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَمَن يُرِدِ اللَّهُ أَن يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ وَمَن يُرِدْ أَن يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا كَأَنَّمَا يَصَّعَدُ فِي السَّمَاءِ ) ]الانعام: ১২৫[ "সুতরাং যাকে আল্লাহ হিদায়াত করতে চান, ইসলামের জন্য তার বুক উন্মুক্ত করে দেন। আর যাকে ভ্রষ্ট করতে চান, তার বুক সঙ্কীর্ণ-সঙ্কুচিত করে দেন, যেন সে আসমানে আরোহণ করছে।" [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১২৫] এমনিভাবে আল্লাহ অকল্যাণ দেন তাদের উপর, যারা ঈমান আনে না।
সুতরাং, আল্লাহ তা'আলাই তার বান্দাদের মধ্যে যেভাবে চান পরিবর্তন করেন। কারো অন্তরকে তিনি ঈমান ও হিদায়াতের জন্য খুলে দেন আবার কাইকে তিনি তাওফীক দেন না। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা।
শাইখ আব্দুল আযীয আব্দুল্লাহ বিন বায রহ.,
📄 ইসলামে প্রবেশের স্বাধীনতা বলতে কি বুঝায়?
আল্লাহ তা'আলার বাণী:: ﴿أَفَأَنتَ تُكْرِهُ النَّاسَ حَتَّى يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ ﴾ [ইউনুস : 99] “তবে কি তুমি মানুষকে বাধ্য করবে, যাতে তারা মুমিন হয়? আল্লাহ তা'আলা বাণী, ﴿لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ ﴾ [البقرة: ٢৫৬]
প্রশ্ন: অনেক সাথীরা বলে, যে ব্যক্তি ইসলামে প্রবেশ করেনি সে স্বাধীন। তাকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা যাবে না। তারা তাদের পক্ষে আল্লাহর কথা দ্বারা প্রমাণ দেয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿أَفَأَنتَ تُكْرِهُ النَّاسَ حَتَّى يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ ﴾ [ইউনুস: 99] “তবে কি তুমি মানুষকে বাধ্য করবে, যাতে তারা মুমিন হয়?” [সূরা-ইউনুস, আয়াত: ৯৯] আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, ﴿لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ ﴾ [البقرة: ২৫৬] | এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?
উত্তর: উলামাগণ বলেন, এ দু'টি আয়াত এবং একই অর্থে আরো যে সব আয়াত রয়েছে এ গুলো ইয়াহুদী, নাসারা ও অগ্নিপূজক যাদের থেকে ট্যাক্স গ্রহণ করা হবে তাদের সম্পর্কে। তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য বাধ্য করা হবে না। তারা ইসলাম গ্রহণ ও ট্যাক্স পরিশোধ করা বিষয়ে স্বাধীন।
আবার কোন কোন আলেম বলেন, এ বিধানটি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল। পরবর্তীতে যুদ্ধ ও জিহাদের বিধানের কারণে তা রহিত হয়ে যায়।
সুতরাং যে ইসলামে প্রবেশ করতে অস্বীকার করবে তার সাথে সামর্থ্য অনুযায়ী জিহাদ করা ওয়াজিব। যাতে সে হয় ইসলামে প্রবেশ করবে না হয় ট্যাক্স দেবে— যদি তা প্রযোজ্য হয়।
সুতরাং, কাফেরদের থেকে যদি ট্যাক্স গ্রহণ করার সুযোগ না থাকে তাহলে ইসলামে প্রবেশে বাধ্য করতে হবে। কারণ, ইসলামের প্রবেশ করার মধ্যে তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা, মুক্তি ও যাবতীয় কল্যাণ।
একজন মানুষের জন্য হক বা সত্য গ্রহণ করা যাতে তার হিদায়াত ও কল্যাণ রয়েছে, তা তার জন্য বাতিলের ওপর থাকা থেকে উত্তম। যেমনি ভাবে আদম সন্তানকে সত্য মানতে বাধ্য করা হবে চাই তা বন্দি করে হোক বা শাস্তি দিয়ে হোক। অনুরূপভাবে কাফেরদের আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করা এবং ইসলামে প্রবেশে বাধ্য করা হবে। যাতে তার কল্যাণ নিশ্চিত হয়। কারণ, দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ ইসলাম গ্রহণ করার মধ্যেই নিহিত। তবে আহলে কিতাব— ইয়াহুদী, খৃষ্টান ও অগ্নিপূজক এ তিনটি সম্প্রদায়ের লোকদের ইসলাম স্বাধীনতা দিয়েছেন। তারা চাইলে ইসলামে প্রবেশ করতে পারবে অন্যথায় তারা অপমান-অপদস্থ হয়ে নিজ হাতে ট্যাক্স প্রদান করবে।
কোন আলেম ট্যাক্স দেওয়া বা ইসলাম গ্রহণ করা উভয়ের যে কোন একটি গ্রহণ করার ব্যাপারে অন্যদেরও তাদের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। তবে গ্রহণযোগ্য কথা হলো, অন্যদের তাদের সাথে সম্পৃক্ত করা যাবে না। শুধু এ তিন জাতিকেই স্বাধীনতা দেওয়া হবে। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাযীরা এলাকায় ট্যাক্স গ্রহণ করেননি। বরং তাদের ইসলামে প্রবেশে বাধ্য করেছেন এবং ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু তিনি গ্রহণ করেননি।
فَإِن تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَمَاتَوُا الزَّكَوٰةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ إِنَّ اللهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ “তবে যদি তারা তাওবা করে এবং সালাত কায়েম করে, আর যাকাত দেয়, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল অতিশয় দয়ালু।” [সূরা তাওবাহ, আয়াত: ৫] এখানে এ কথা বলা হয়নি যে, অথবা তোমরা ট্যাক্স আদায় কর। ইয়াহুদী, খৃষ্টান ও অগ্নিপূজকদের ইসলাম গ্রহণ করতে বলা হবে। তবে যদি তারা ইসলাম গ্রহণ না করে কর আদায় করবে।
আর যদি তারা কর আদায় করতে অস্বীকার করে তবে মুসলিমদের ওপর ফরয হলো তাদের বিরুদ্ধে সামর্থ্য অনুযায়ী যুদ্ধ করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন, قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَن يَدِوَهُمْ صَغِرُونَ * “তোমরা লড়াই কর আহলে কিতাবের সে সব লোকের সাথে যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম মনে করে না, আর সত্য দীন গ্রহণ করে না, যতক্ষণ না তারা স্বহস্তে নত হয়ে জিযিয়া দেয়।” [সূরা তাওবাহ, আয়াত: ২৯] এ ছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত যে, তিনি মুজুসদের থেকে কর গ্রহণ করেছেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীদের কারো থেকে প্রমাণিত নয় যে, তারা উল্লিখিত তিন সম্প্রদায় ছাড়া অন্য কারো থেকে কখনো কর গ্রহণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, আল্লাহ তা'আলার বাণী, তিনি বলেন, وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ 20 RPO له ﴾ [البقرة: ١٩٣] “আর তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর যে পর্যন্ত না ফিতনা খতম হয়ে যায় এবং দীন আল্লাহর জন্য হয়ে যায়।” [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৯৩] আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَإِذَا أَنسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ فَأَقْتُلُواْ الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدتُمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَاحْصُرُوهُمْ وَاقْعُدُوا لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ فَإِن تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَءَاتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ "অতঃপর যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো অতিবাহিত হয়ে যাবে, তখন তোমরা মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর এবং তাদেরকে পাকড়াও কর, তাদেরকে অবরোধ কর এবং তাদের জন্য প্রতিটি ঘাঁটিতে বসে থাক। তবে যদি তারা তাওবা করে এবং সালাত কায়েম করে, আর যাকাত দেয়, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৫] এ আয়াতটিকে তরবারির আয়াত বলা হয়। এ আয়াত এবং এ ধরনের আরো যে সব আয়াত রয়েছে তা ঐ সব আয়াতের জন্য রহিতকারী যেগুলোতে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য না করার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা।
শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বায রহ.
📄 ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে আপত্তির জবাব
আল্লাহ তা'আলার বাণী : فَنَفَخْنَا فِيهِ مِن رُّوحِنَا ফলে আমি তাতে আমার রূহ থেকে ফুঁকে দিয়েছিলাম।”
প্রশ্ন: যারা এ আয়াত فَنَفَخْنَا فِيهِ مِن رُّوحِنَا “ফলে আমি তাতে আমার রূহ থেকে ফুঁকে দিয়েছিলাম।” দ্বারা দলীল পেশ করে বলে ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর ছেলে-অথচ আল্লাহ তা'আলা এ থেকে অনেক ঊর্ধ্বে-তাদের কীভাবে উত্তর দেওয়া হবে?
উত্তর: আয়াতটি সূরা আত-তাহরীমের ১২ নং আয়াত। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَمَرْيَمَ ابْنَتَ عِمْرَانَ الَّتِي أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِيهِ مِن رُّوحِنَا ﴾ [التحريم: ١٢] "ইমরান কন্যা মারয়াম-এর, যে নিজের সতীত্ব রক্ষা করেছিল, ফলে আমি তাতে আমার রূহ থেকে ফুঁকে দিয়েছিলাম।” [সূরা আত-তাহরীম, আয়াত: ২৬] সূরা আম্বিয়া ৯১ নং আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَالَّتِي أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا ]فَنَفَخْنَا فِيهَا مِن رُّوحِنَا ﴾ [الانبياء: ٩١ "আর যে নিজের সতীত্ব রক্ষা করেছিল, ফলে আমি তাতে আমার রূহ থেকে ফুঁকে দিয়েছিলাম।" [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৯১] উল্লিখিত আয়াতে এ কথা স্পষ্ট যে, মারইয়ামকে ফুঁ দেওয়া হয় এবং ফুঁটি তার লজ্জা-স্থান পর্যন্ত পৌঁছে এবং সে ঈসা দ্বারা গর্ভবতী হয়ে পড়ে। আল্লাহ তা'আলা সূরা মারইয়ামে বলেন, فَأَرْسَلْنَا إِلَيْهَا رُوحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِيًّا ]۱۷ :مريم[ ﴾ "তখন আমি তার নিকট আমার রূহ (জিবরীল) কে প্রেরণ করলাম। অতঃপর সে তার সামনে পূর্ণ মানবের রূপ ধারণ করল।” [সূরা মারিয়াম, আয়াত: ১৭] তিনি হলেন ফিরিশতা যার সম্পর্কে তিনি বলেন, قَالَ ]١٩ : مريم ﴾ ﴿إِنَّمَا أَنَا رَسُولُ رَبِّكِ لِأَهَبَ لَكِ غُلَمًا زَكِيًّا "সে বলল, 'আমি তো কেবল তোমার রবের বার্তাবাহক, তোমাকে একজন পবিত্র পুত্রসন্তান দান করার জন্য এসেছি।" তাফসীরে বর্ণিত আছে ফিরিশতা তার জামার আস্তিনে ফুঁ দেয় এবং ফুঁটি তার লজ্জা-স্থান পর্যন্ত পৌঁছে। তারপর সে ঈসা আলাইহিস সালাম দ্বারা গর্ভ ধারণ করে।
রুহ দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহ তা'লার সৃষ্ট রূহসমূহ যার দ্বারা মানুষের হায়াত লাভ হয়। যেমন হায়াত লাভ হয়েছিল আদম আলাইহিস সালামের। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ ﴾ [الحجر: ٢٩] 'অতএব যখন আমি তাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেব এবং তার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তার জন্য সিজদাবনত হও'। [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ২৯]
আদম আলাইহিস সালামের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা রূহকে ডেলে দেন। অনুরূপভাবে ঈসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহর সৃষ্ট রুহ দ্বারা সৃষ্টি করেন। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, ﴿يَوْمَ يَقُومُ الرُّوحُ وَالْمَلَائِكَةُ صَفًّا ﴾ [النبأ: ٣٨] “সেদিন রূহ ও ফিরিশতাগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে।” [সূরা আন-নাবা, আয়াত: ২৯] সুতরাং ঈসা আলাইহিস সালাম এই ফুঁ এর মাধ্যমে সৃষ্টি যে ফুঁটি হলো আল্লাহর রূহসমূহের একটি রূহ যাকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন এবং যদ্বারা তিনি দুনিয়ার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সমস্ত মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আর সর্ব প্রথম মানুষ হলো, আদম আলাইহিস সালাম যার সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ثُمَّ سَوَّلَهُ وَنَفَخَ فِيهِ مِن رُّوحِهِ، وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَرَ وَالْأَفْئِدَةً قَلِيلًا مَّا تَشْكُرُونَ ﴾ [السجدة : [৭ "তারপর তিনি তাকে সুঠাম করেছেন এবং তাতে নিজের রূহ থেকে ফুঁকে দিয়েছেন। আর তিনি তোমাদের জন্য কান, চোখ ও অন্তরসমূহ সৃষ্টি করেছেন। তোমরা খুব সামান্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।” [সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ৯]
এ কথা দ্বারা বুঝা যায় যে, এ ধরনের রূহের কারণে ঈসা আলাইহিস সালামের বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্য নেই। বরং তিনিও অন্যান্য মাখলুকের মতো রক্তে মাংসে ঘটিত একজন মাখলুক। দুনিয়ার জীবনে সে নড়-চড় করে, কথা বলে এবং খাওয়া দাওয়া করে ইত্যাদি।
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.,
টিকাঃ
22 জিবরীল (আঃ)।