📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 সালাত পঞ্চাশ ওয়াক্ত থেকে পাঁচ ওয়াক্তে নামিয়ে নিয়ে আসা বিষয়ক হাদীস

📄 সালাত পঞ্চাশ ওয়াক্ত থেকে পাঁচ ওয়াক্তে নামিয়ে নিয়ে আসা বিষয়ক হাদীস


আল্লাহ তা'আলার বাণী: [ق: ۲۹] ﴿ مَا يُبَدَّلُ الْقَوْلُ لَدَيَّ﴾ “আমার কাছে কথা রদবদল হয় না।” মিরাজের রাতে সালাত পঞ্চাশ ওয়াক্ত থেকে পাঁচ ওয়াক্তে নামিয়ে নিয়ে আসা পরিবর্তন নয় কি?।
প্রশ্ন: আল্লাহ তা'আলার বাণী : ]ق: ۲۹] ﴿ مَا يُبَدَّلُ الْقَوْلُ لَدَيَّ وَمَا أَنَا بِظَلَّمٍ لِلْعَبِيدِ ‘আমার কাছে কথা রদবদল হয় না, আর আমি বান্দার প্রতি যুলুমকারীও নই’। [সূরা কাফ, আয়াত: ২৯] এবং মি'রাজের হাদীসের মধ্যে বিরোধ কিভাবে নিরসন করব, যাতে রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আল্লাহর নিকট বার বার যাতায়াত করার মাধ্যমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতকে কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্তে নিয়ে আসেন? আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।
উত্তর: আল্লাহ তা'আলার বাণী: :﴿ مَا يُبَدَّلُ الْقَوْلُ لَدَيَّ وَمَا أَنَا بِظَلَّهِ لِلْعَبِيدِ﴾ [ق [২৭ "আমার কাছে কথা রদবদল হয় না, আর আমি বান্দার প্রতি যুলুমকারীও নই'।” [সূরা আল-কাফ, আয়াত: ২৯] এর মধ্যে এবং উল্লিখিত হাদীসের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। আল্লাহ তা'আলা কি এ কথা বলেছেন আমি কথা পরিবর্তন করি না? না, আল্লাহ এ কথা বলেননি। বরং আল্লাহ বলেছেন, ﴿مَا يُبَدَّلُ الْقَوْلُ لدى﴾। কারণ, ﴿لا تبديل لكلمات الله﴾ কেউ আল্লাহর বাণীসমূহের পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে না। আমরা যখন এ কথা বলি যে, আয়াতের বর্ণনা হলো, এমন কর্মের যার কর্তার নাম উল্লেখ করা হয়নি। আর তিনি যা বলেন, তা তিনি নিজে পরিবর্তন করেন না। তাহলে আপনার প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলব, সালাত বিষয়ে রাসূলের বার বার যাতায়াতের যা সংঘটিত হয়েছে তা ছিল প্রথম থেকে যে কথার প্রতি তার সম্মতি ও সন্তুষ্টি ছিল অর্থাৎ সালাত পাঁচ ওয়াক্ত হওয়া তা পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে ছিল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তার স্বীয় নবীর জন্য প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেন বিশেষ কোন হিকমত বা প্রজ্ঞার কারণে। বিশেষ কারণ একাধিক হতে পারে। যেমন-
প্রথম কারণ হলো, আল্লাহ তা'আলা তার রাসূলের ওপর যাই ফরয করেন তাই মানা ও কবুল করা।
দ্বিতীয় কারণ হলো, এ উম্মতের জন্য পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের সাওয়াব লিপিবদ্ধ করা। কারণ, বর্তমানে আমরা পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করি। কিন্তু আমরা সাওয়াব পাবো সে ব্যক্তি ন্যায় যে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে। এটি যে কোন নেক আমলের সাওয়াব দশগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার অধ্যায়ের নয়। বরং এ হলো এক ওয়াক্ত সালাতের অনুকূলে দশ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা লিপিবদ্ধ হবে। এটি অনেক বড় নে'আমত এবং আল্লাহ তা'আলা বড় হিকমত ও অপার রহমত। সুতরাং আসল কারণ, প্রথম কারণ, অর্থাৎ, আল্লাহ তা'আলা যার প্রতি সন্তুষ্ট তিনি সেটাই ফায়সালা করেছেন যে, সালাত পাঁচ ওয়াক্তই হবে। তবে তিনি পঞ্চাশ ওয়াক্ত ফরয করেছেন হিকমতের কারণে।
প্রথমত: আল্লাহ তা'আলা যা ফরয করেন যদিও তাতে অনেক কষ্ট হয় তা সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর ফরযকে কবুল করেন এবং মেনে নেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে যা বাধ্য করা হয় তা মানা ও কবুল করার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাধিক আনুগত্য শীল ও অনুগামী ব্যক্তি।
দ্বিতীয়ত: উম্মতের জন্য বাস্তবে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা সত্ত্বেও পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায় করার সাওয়াব লিপিবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে। এটি এ উম্মতের প্রতি আল্লাহর বিশেষ দয়া রহমত। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা।
শাইখ মুহাম্মদ বিন উসাইমীন রহ.

📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 শির্কের গুনাহ ক্ষমা না করা সম্পর্কীয় আয়াত ও অপর একটি আয়াত সম্পর্কে আলোচনা

📄 শির্কের গুনাহ ক্ষমা না করা সম্পর্কীয় আয়াত ও অপর একটি আয়াত সম্পর্কে আলোচনা


আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ ﴾ [النساء : ১১৬﴿ “নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা করেন না তাঁর সাথে শরীক করাকে...।" আল্লাহর বাণী: ﴿وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِمَنْ تَابَ وَءَامَنَ ﴾ [ত্বহা: ৮২ "আর অবশ্যই আমি তার প্রতি ক্ষমাশীল, যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে অতঃপর সৎ পথে চলতে থাকে।"
প্রশ্ন: আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ ﴾ [নিসা : ১১৬﴿ “নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা করেন না তাঁর সাথে শরীক করাকে এবং এ ছাড়া যাকে চান ক্ষমা করেন।” [সূরা নিসা, আয়াত: ১১৬]
তিনি আরও বলেন, :ab[ ﴾وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِّمَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ صَلِحًا ثُمَّ اهْتَدَى [৮২ "আর অবশ্যই আমি তার প্রতি ক্ষমাশীল, যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে অতঃপর সৎ পথে চলতে থাকে।” [সূরা তা-হা, আয়াত: ৮২]
উভয় আয়াতের মাঝে কি কোন বিরোধ আছে? আল্লাহ তা'আলার এ বাণী: ﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ "নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা করেন না তাঁর সাথে শরীক করাকে" দ্বারা কি উদ্দেশ্য? [সূরা নিসা, আয়াত: ১১৬]
উত্তর: উভয় আয়াতের মধ্যে পরস্পর কোন বিরোধ নেই। প্রথম আয়াত যে ব্যক্তি তাওবা না করে শির্ক অবস্থায় মারা যায় তার সম্পর্কে। কারণ, তাকে ক্ষমা করা হবে না এবং তার ঠিকানা জাহান্নাম। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَنهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ ) ]المائدة: ٧٢[ “নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, তার উপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই।” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৭২] আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন, ]۸۸ :وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُم مَّا كَانُواْ يَعْمَلُونَ ﴾ [الانعام "আর যদি তারা শির্ক করত, তবে তারা যা আমল করছিল তা অবশ্যই বরবাদ হয়ে যেত।" [সূরা আল-আন'আম আয়াত: ৮৮] একই বিষয়ক আয়াত আরও অনেক রয়েছে।
আর দ্বিতীয় আয়াত যাতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِمَن تَابَ وَءَامَنَ ]وَعَمِلَ صَلِحًا ثُمَّ أَهْتَدَى ) [طه: ٨٢ "আর অবশ্যই আমি তার প্রতি ক্ষমাশীল, যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে অতঃপর সৎ পথে চলতে থাকে।” [সূরা তা-হা, আয়াত: ৮২] এটি তাওবাকারীদের বিষয়ে। অনুরূপ আল্লাহ তা'আলার বাণী: قُلْ يَعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ الالمان إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ ) [الزمر: ٥٢] বান্দাগণ, যারা নিজদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৫২]
উলামাগণ এ ব্যাপারে একমত যে, এ আয়াতটি তাওবাকারীদের সম্পর্কে। আল্লাহ তা'আলার বাণী: ]وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاءُ ﴾ [النساء : ١١٦﴿ “এবং এ ছাড়া যাকে চান ক্ষমা করেন” [সূরা নিসা, আয়াত: ১১৬]-এ আয়াতটি যারা শির্ক করা ছাড়া অন্য কোন গুনাহ করে তাওবা করা ছাড়া মারা গিয়েছে তাদের সম্পর্কে। তার বিষয়টি আল্লাহর নিকট সোপর্দ। তিনি যদি চান শাস্তি দেবেন যদি চান ক্ষমা করে দেবেন। যদি শাস্তি দেন তবে সে কাফিরদের মতো চির জাহান্নামী হবে না। যেমনটি বলে খারেজী, মু'তাযিলা এবং তাদের অনুসারীরা। বরং গুনাহ থেকে পবিত্র হওয়া ও শাস্তি ভোগ করার পর একদিন অবশ্যই সে জাহান্নাম থেকে বের হবে। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত মুতাওয়াতের হাদীস এবং উম্মতের সালাফদের ইজমা এ কথাটি প্রমাণ করে। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা।
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.

📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 কুরআনের আয়াতে এ উম্মতকে নিরক্ষর বলে সম্বোধন করা

📄 কুরআনের আয়াতে এ উম্মতকে নিরক্ষর বলে সম্বোধন করা


আল্লাহর তা'আলার বাণী: ﴿هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ﴾ [الجمعة :٢] [ "তিনিই উম্মীদের মাঝে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে” [সূরা আল-জুমু'আ, আয়াত: ২] আয়াতে নিরক্ষর বলা হয়েছে। অথচ নিরক্ষর হওয়া অনগ্রসর ও অনুন্নত জাতির নিদর্শন।
প্রশ্ন: আমরা বিভিন্ন পেপার পত্রিকা অধিকাংশ সময় পড়ি এবং রাস্তায় বিল বোর্ডে নিরক্ষরতার প্রতি ভৎসনা ও তিরস্কার দেখতে পাই এবং নিরক্ষরতাকে পশ্চাদপদতার আলামত বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। অথচ আল্লাহ তা'আলা এ উম্মাতকে নিরক্ষর উম্মাত বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ﴾ [الجمعة :২] “তিনিই উম্মীদের¹⁴ মাঝে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে।” [সূরা আল-জুমু'আ, আয়াত: ২] আশা করি বিষয়টি স্পষ্ট করবেন।
উত্তর: আরব ও আজম থেকে নিয়ে সারা বিশ্বের মানুষ জানে যে, উম্মতে মুহাম্মদী লেখা-পড়া জানত না। এ কারণে তাদের নাম করণ করা হয়েছে উম্ম-নিরক্ষর উম্মত। তাদের মধ্যে যারা পড়া লেখা জানত অন্য জাতীদের তুলনায় তাদের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লেখা-পড়া জানতেন না। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿وَمَا كُنتَ تَتْلُواْ مِن قَبْلِهِ مِن كِتَابٍ وَلَا تَخُطُّهُ بِيَمِينِكَ إِذًا لَّارْتَابَ الْمُبْطِلُونَ﴾ [العنكبوت :٤٨]
“আর তুমি তো এর পূর্বে কোন কিতাব তিলাওয়াত করনি এবং তোমার নিজের হাতে তা লিখনি যে, বাতিলপন্থীরা এতে সন্দেহ পোষণ করবে।” [সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত: ৪৮] আর এটি ছিল তার নবুওয়াত ও রিসালাতের সত্য হওয়ার অপর একটি অকাট্য প্রমাণ। কারণ, তিনি এমন একটি কিতাব তাদের কাছে নিয়ে আসেন যে কিতাবটি আরব অনারব-সমগ্র বিশ্বকে অক্ষম ও স্তম্বিত করে দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা এ কিতাবকে ওহী হিসেবে প্রেরণ করেন।
জিবরীল আমীন কুরআন নিয়ে তার কাছে অবতরণ করেন। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র সুন্নাত এবং পূর্বের লোকদের বিষয়ে অনেক জ্ঞানকে তার নিকট অহী হিসেবে প্রেরণ করেন। পূর্বে লোকদের অনেক অজানা ঘটনা এবং ভবিষ্যতে যা ঘটবে এ ধরনের অনেক জ্ঞানই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে জানিয়ে দেন। তিনি মানুষকে কিয়ামত সম্পর্কে অবহিত করেন জান্নাত জাহান্নام যারা জান্নাতী হবে এবং যারা জাহান্নামী হবে তাদের সম্পর্কে জানিয়ে দেন। এ গুলো সবই ছিল এমন বিষয় যার দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তাকে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা দান করেন। আর তিনি এ দ্বারা মানুষকে উচ্চ মান-মর্যাদার প্রতি দিক নির্দেশনা দেন এবং তার রিসালাতের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। এ উম্মতকে নিরক্ষর আখ্যায়িত করা দ্বারা উদ্দেশ্য এ নয় যে, তাদেরকে নিরক্ষর থাকতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বরং উদ্দেশ্য হল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমনের সময়ের অবস্থা তুলে ধরা এবং তখনকার সময়ের বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত করা। অন্যথায় নিরক্ষরতা থেকে বের হয়ে লেখা-পড়া করা ও জ্ঞান অর্জন করা বিষয়ে কুরআন ও হাদীসে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে যাতে নিরক্ষরতা থেকে বের হয়ে জ্ঞান অর্জনের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ ﴾ [الزمر: ٩ “বল, 'যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান?'।" ]সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৯] আল্লাহ তা'আলা বলেন, يَأْيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا إِذَا قِيلَ لَكُمْ تَفَسَّحُوا فِي الْمَجَالِسِ فَأَفْسَحُوا يَفْسَحِ اللَّهُ لَكُمْ وَإِذَا قِيلَ انْشُرُوا فَانشُزُوا يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ ءَامَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ ﴾ [المجادلة: ١١] "হে মুমিনগণ, তোমাদেরকে যখন বলা হয়, 'মজলিসে স্থান করে দাও', তখন তোমরা স্থান করে দেবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য স্থান করে দেবেন। আর যখন তোমাদেরকে বলা হয়, 'তোমরা উঠে যাও', তখন তোমরা উঠে যাবে। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় সমুন্নত করবেন। আর তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।” [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ১১] আল্লাহ তা'আলা বলেন, ]۲۸ :إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمْؤُا ﴾ [فاطر "বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে।” [সূরা ফাতির, আয়াত: ২৮] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, من سلك طريقا يلتمس فيه علما سهل الله له طريقا إلى الجنة "যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য জান্নাতের পথকে সহজ করে দেয়। "¹⁵ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, مَنْ يُرِدُ اللهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقَّهُ فِي الدين “আল্লাহ তা'আলা যখন কারো প্রতি কল্যাণ কামনা করেন তাকে তিনি দীনের জ্ঞান দান করেন।”¹⁶ এ বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের অসংখ্য বর্ণনা বিদ্যমান। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা।
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.।

টিকাঃ
¹⁴ উম্মী দ্বারা আরবের লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে。
¹⁵ বর্ণনায় আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৬৪৩; তিরমিযি, হাদীস নং ২৬৪৬
¹⁶ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৩৯。

📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাতা-পিতা জান্নাতে যাবে নাকি জাহান্নামে যাবে? এ বিষয়ে আলোচনা

📄 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাতা-পিতা জান্নাতে যাবে নাকি জাহান্নামে যাবে? এ বিষয়ে আলোচনা


আল্লাহর বাণী: ﴿وَما كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولاً﴾ [الاسراء: ১৫] “আর রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত আমি আযাবদাতা নই।" [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ১৫] আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামর বাণী: "আমার পিতা ও তোমার পিতা জাহান্নামে"
প্রশ্ন: আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কারীমে বলেন ﴿وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولاً﴾ [الاسراء: ১৫] "আর রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত আমি আযাবদাতা নই।" [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ১৫] বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দেন যে, তার মাতা-পিতা জাহান্নামী। প্রশ্ন হলো, তারা কি ফিতরাতের যুগের ছিল না? যারা ফিতরাতের যুগে ছিল তাদের বিষয়ে কুরআন স্পষ্ট করেছেন যে, তারা নাজাত প্রাপ্ত। বিষয়টি স্পষ্ট করুন।
উত্তর: ফিতরাতের যুগের মানুষ নাজাত প্রাপ্ত নাকি ধ্বংসপ্রাপ্ত এ বিষয়টি কুরআন স্পষ্ট করেননি। আল্লাহ তা'আলা শুধু এ কথা বলেছেন, ﴿وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولاً﴾ [الاسراء: ১৫] "আর রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত আমি আযাবদাতা নই।" [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ১৫]
আল্লাহ তা'আলার স্বীয় ইনসাফের কারণে শুধু রাসূল প্রেরণের পরই কাউকে শাস্তি দেবেন। ফলে যাদের নিকট দাও'আত পৌঁছে নাই তাদের ওপর দলীল প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া তিনি তাদের শাস্তি দেবেন না। আর দলীল প্রতিষ্ঠা কখনো কিয়ামতের দিন হবে। যেমন হাদীসে বর্ণিত আছে ফিতরাতের যুগের লোকদের কিয়ামদের দিন ঈমানের দাও'আত দেয়ার মাধ্যমে পরীক্ষা করা হবে। যারা সেদিনের পরীক্ষার উত্তীর্ণ হবে ঈমান গ্রহণ করবে এবং দাওয়া সাড়া দেবে তারা নাজাত পাবে আর যারা সেদিন দাও'আত গ্রহণ করবে না এবং নাফরমানী করবে তারা জাহান্নামে যাবে। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদীস বর্ণিত, তিনি বলেন এক লোক বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমারা পিতা কোথায়? উত্তরে তিনি বলেন, «فِي النَّارِ» “তোমার পিতা জাহান্নামী। এ কথা শোনে লোকটির চেহারার মলিনতা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে বললেন, «إِنَّ أَبِي وَأَبَاكَ فِي النَّارِ» "আমার এবং তোমার পিতা জাহান্নামী। "¹⁷ এ কথাটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বলেছিলেন। তাকে এ কথা জানিয়ে দিলেন যে, তোমার পিতা একাই জাহান্নামী নয় এবং বিষয়টি তোমার পিতার জন্য খাস নয়। বরং আমার পিতারও একই হুকুম। হতে পারে এদের দুই জন অর্থাৎ লোকটির পিতা ও রাসূলের পিতা উভয়ের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে দলীল পৌঁছেছে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, «إِنَّ أَبِي وَأَبَاكَ فِي النَّارِ» "আমার এবং তোমার পিতা জাহান্নামী।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেনেই কথাটি বলেছেন। কারণ, তিনি তার নিজের পক্ষ থেকে কখনো কথা বলেন না। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَالنَّجْمِ إِذَا هَوَى مَا ضَلَّ
صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى ﴾ [النجم : ٤، ١] “কসম নক্ষত্রের, যখন তা অস্ত যায়। তাতো কেবল ওহী, যা তার প্রতি ওহীরূপে প্রেরণ করা হয়। আর সে মনগড়া কথা বলে না। তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্ট হয়নি এবং বিপথগামীও হয়নি।” [সূরা আন-নাজম, আয়াত: ১, ৪]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্বীয় পিতা সম্পর্কে যা বলেছেন, তাতে প্রমাণিত হয় যে রাসূলের পিতা আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুল মুত্তালিবের নিকট দলীল পৌঁছেছে। আর তারা ছিল ঐ সব কুরাইশদের দলভুক্ত যারা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দীন সম্পর্কে অবগত। কারণ, লুহাই ইবন আমর আল-খাযা'ঈর মূর্তি পূজা আবিষ্কার করার পূর্ব পর্যন্ত কুরাইশরা মিল্লাতে ইবরাহীমির ওপর ছিল। কিন্তু যখন সে মক্কার গভর্নর হল এবং তখন তার আবিষ্কৃত নতুন বিষয়টি অর্থাৎ মূর্তি পূজা মক্কায় ছড়িয়ে পড়ল। এবং সে আল্লাহকে বাদ দিয়ে মূর্তিগুলো ইবাদতের দাওয়াত দেওয়ার কাজটি মক্কার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। তখন রাসূলের পিতা আব্দুল্লাহর নিকট এ কথা পৌঁছেছিল যে, কুরাইশদের মূর্তি পূজা করা এবং তাদের মধ্যে মূর্তিপূজার যে প্রচলন আরম্ভ হয়েছে তা সম্পূর্ণ বাতিল। তা সত্ত্বেও তিনি তাদের বাতিল ইলাহদের অনুসরণ করেন। ফলে তার ওপর হুজ্জত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, رَأَيْتُ عَمْرَو بْنَ عَامِرٍ الْخُزَاعِيَّ يَجُرُّ قُصْبَهُ فِي النَّارِ وَكَانَ أَوَّلَ مَنْ سَيِّبَ السُّيُوبَ ». ইবন লুহাইকে দেখেছি জাহান্নামের আগুনের মধ্যে তার নাড়ি-বুড়িকে টেনে হেঁচড়ে বের করা হচ্ছে। কারণ, সেই মক্কায় সর্ব প্রথম শির্কের প্রচলনের কারণ হয় এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মিল্লাতের পরিবর্তন করে। অপর একটি হাদীসে এ বিষয়ে বর্ণিত আছে استأذن أن يستغفر لأمه فلم يؤذن، فاستأذن
"أن يزورها فأذن له "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি চাইলে, তাকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। তারপর তিনি যিয়ারত করার অনুমতি চাইলে আল্লাহ তাকে যিয়ারতের অনুমতি দেওয়া হয়।"¹⁸
এ কথা বলারও অবকাশ রয়েছে যে, দুনিয়াতে জাহিলিয়‍্যাতের যুগের মানুষের সাথে কাফেরদের মতোই আচরণ করা হবে। ফলে তাদের জন্য দো'য়া করা হবে না, ক্ষমা চাওয়া হবে না। কারণ, তারা কাফেরদের মতোই কাজ-কর্ম করে থাকে। ফলে তাদের সাথে সেই আচরণ করা হবে যে আচরণ কাফেরদের সাথে করা হয়। আর আখিরাতে তাদের বিষয়টি আল্লাহর হাতে সোপর্দ।
আর দুনিয়াতে যার ক্ষেত্রে দলীল প্রতিষ্ঠিত হয় নাই তাকে কিয়ামতের দিন ঈমান পেশ করে পরীক্ষা করা ছাড়া শাস্তি দেওয়া হবে না। কারণ, আল্লাহ তা'আলা বলেন, ]وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا ﴾ [الاسراء: ١٥ “আর রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত আমি আযাবদাতা নই।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ১৫] সুতরাং যারা ফিতরাতের যুগে বসবাস করছিল এবং তাদের নিকট তাওহীদের দা'ওয়াত পৌঁছেনি, কিয়ামতের দিন তাওহীদের প্রতি দা'ওয়াত দেওয়ার মাধ্যমে তাদের পরীক্ষা করা হবে। যদি তারা দা'ওয়াত গ্রহণ করে তারা জান্নাতে যাবে আর যদি গ্রহণ না করে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
অনুরূপভাবে অনুভূতিহীন বুড়ো, পাগল এবং তাদের মতো আরও যারা রয়েছে যেমন কাফেরদের বাচ্চা যারা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পূর্বে মারা গেছে— যাদের কাছে তাওহীদের দা'ওয়াত পৌঁছেনি। কারণ, হাদীসে বর্ণিত - سُئِلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ
عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ ذَرَارِيَّ الْمُشْرِكِينَ فَقَالَ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا كَانُوا عَامِلِينَ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন কাফেরদের বাচ্চাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, তখন তিনি উত্তরে বলেন, আল্লাহ তা'আলা তারা কি আমল করত সে সম্পর্কে অধিক অবগত আছেন।"
কাফেরদের বাচ্চাদের কিয়ামতের দিন ফিতরাতের যুগের মানুষদের মতো পরীক্ষা করা হবে। যদি তারা সঠিক উত্তর দেয়, তবে তারা নাজাত পাবে অন্যথা তারা ধ্বংস-শীলদের সাথে হবে।
এক জামা'আত আহলে ইলম বলেন, কাফেরদের বাচ্চারা নাজাত প্রাপ্ত- জান্নাতী। কারণ, তারা ফিতরাতের ওপর মারা গিয়েছে। এ ছাড়াও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জান্নাতে প্রবেশ করেন তখন মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের বাচ্চাদের জান্নাতের বাগানে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সাথে দেখেছেন।
দলীলের স্পষ্টতার কারণে এ মতামতটি অধিক শক্তিশালী। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মতৈক্যে মুসলিমদের বাচ্চারা অবশ্যই জান্নাতী হবে। আল্লাহ তা'আলা অধিক জ্ঞাত ও মহা প্রজ্ঞাবান।
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.

টিকাঃ
¹⁷ বর্ণনায় ইমাম মুসলিম স্বীয় সহীহতে হাদীস নং ৫২১।
¹⁸ বর্ণনায় সহীহ মুসলিম, হাদীস নং

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00