📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 দুনিয়াতে বিপদ-আপদ ও বিপর্যয় বিষয়ক দু‘টি আয়াত

📄 দুনিয়াতে বিপদ-আপদ ও বিপর্যয় বিষয়ক দু‘টি আয়াত


আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴿قُل لَّن يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَنَا "বলুন, আল্লাহ আমাদের জন্য যা লিপিবদ্ধ করেছেন তাই আমাদের পৌঁছবে।" আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴿وَمَا أَصَابَكَ مِن سَيِّئَةٍ فَمِن نَّفْسِكَ ﴾ [النساء: ۷৯] “আর যে অকল্যাণ তোমার কাছে পৌঁছে তা তোমার নিজের পক্ষ থেকে।"
প্রশ্ন: আল্লাহর তা'আলা বলেন, ﴿قُل لَّن يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَنَا "বলুন, আল্লাহ আমাদের জন্য যা লিপিবদ্ধ করেছেন তাই আমাদের পৌঁছবে।” যে সব বিপদ-আপদ আসে তা কি আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্য লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে আল্লাহ তা'আলার এ বাণী- ﴿مَّا أَصَابَكَ مِنْ حَسَنَةٍ فَمِنَ اللَّهِ وَمَا أَصَابَكَ مِن سَيِّئَةٍ فَمِن نَّفْسِكَ ﴾ [النساء : ৭৯] “তোমার কাছে যে কল্যাণ পৌঁছে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর যে অকল্যাণ তোমার কাছে পৌঁছে তা তোমার নিজের পক্ষ থেকে।” [সূরা নিসা, আয়াত: ৭৯] -এর অর্থ কি?
উত্তর: বান্দা যে সব নেক ও বদ আমল করে থাকে সবই আল্লাহর কুদরতে হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ ﴾ [القمر: ৪৯] “নিশ্চয় আমি সব কিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাণ অনুযায়ী।” [সূরা আল-কামার, আয়াত: ৪৯] আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন, ﴿مَا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِّن قَبْلِ أَن نَّبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ ﴾ [الحديد: ২২] "জমিনে এবং তোমাদের নিজদের মধ্যে এমন কোন মুসীবত আপতিত হয় না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখি না। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে খুবই সহজ।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ২২] আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿قُل لَّن يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَنَا﴾ তারপরও নেক আমলসমূহ আল্লাহর করুণা। কারণ, আল্লাহই তা লিপিবদ্ধ করেছে এবং বান্দাকে তা করার তাওফীক দিয়েছেন। তাই এ সবের ওপর সকল প্রশংসা আল্লাহরই।
আর বদ আমলসমূহ আল্লাহরই নির্ধারণ। তবে তা সংঘটিত হওয়ার কারণ, বান্দার কর্ম ও গুনাহসমূহ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿وَمَا أَصَبَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُوا عَن كَثِيرٍ ﴾ [الشورى: ٣٠] “আর তোমাদের প্রতি যে মুসীবত আপতিত হয়, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল। আর অনেক কিছুই তিনি ক্ষমা করে দেন।” [সূরা আশ-শুরা, আয়াত: ৩০] আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন, ﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُواْ مَا بِأَنفُسِهِمْ ﴾ [الرعد: 11] “নিশ্চয় আল্লাহ কোন কওমের অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” [সূরা আর-রা'আদ, আয়াত: ১১]
নেক আমল ও বদ আমল আল্লাহ তা'আলারই নির্ধারণ। ভালো বান্দাদের ভালো কর্ম করার তাওফীক দিয়ে থাকেন। আর বিভিন্ন কারণ যে গুলো বান্দা নিজেই সৃষ্টি করেছেন এবং বিশেষ কোন হিকমতের কারণে অপরাধীদের অসৎ কর্ম ছাড়ার তাওফীক তিনি দেননি। আল্লাহ তা'আলা তার পরিপূর্ণ ইলম, স্বয়ংসম্পূর্ণতা, মহা প্রজ্ঞা-হিকমত ও ইনসাফের কারণে সর্বাবস্থায় প্রশংসিত। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা।
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.

📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 সালাত পঞ্চাশ ওয়াক্ত থেকে পাঁচ ওয়াক্তে নামিয়ে নিয়ে আসা বিষয়ক হাদীস

📄 সালাত পঞ্চাশ ওয়াক্ত থেকে পাঁচ ওয়াক্তে নামিয়ে নিয়ে আসা বিষয়ক হাদীস


আল্লাহ তা'আলার বাণী: [ق: ۲۹] ﴿ مَا يُبَدَّلُ الْقَوْلُ لَدَيَّ﴾ “আমার কাছে কথা রদবদল হয় না।” মিরাজের রাতে সালাত পঞ্চাশ ওয়াক্ত থেকে পাঁচ ওয়াক্তে নামিয়ে নিয়ে আসা পরিবর্তন নয় কি?।
প্রশ্ন: আল্লাহ তা'আলার বাণী : ]ق: ۲۹] ﴿ مَا يُبَدَّلُ الْقَوْلُ لَدَيَّ وَمَا أَنَا بِظَلَّمٍ لِلْعَبِيدِ ‘আমার কাছে কথা রদবদল হয় না, আর আমি বান্দার প্রতি যুলুমকারীও নই’। [সূরা কাফ, আয়াত: ২৯] এবং মি'রাজের হাদীসের মধ্যে বিরোধ কিভাবে নিরসন করব, যাতে রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আল্লাহর নিকট বার বার যাতায়াত করার মাধ্যমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতকে কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্তে নিয়ে আসেন? আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।
উত্তর: আল্লাহ তা'আলার বাণী: :﴿ مَا يُبَدَّلُ الْقَوْلُ لَدَيَّ وَمَا أَنَا بِظَلَّهِ لِلْعَبِيدِ﴾ [ق [২৭ "আমার কাছে কথা রদবদল হয় না, আর আমি বান্দার প্রতি যুলুমকারীও নই'।” [সূরা আল-কাফ, আয়াত: ২৯] এর মধ্যে এবং উল্লিখিত হাদীসের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। আল্লাহ তা'আলা কি এ কথা বলেছেন আমি কথা পরিবর্তন করি না? না, আল্লাহ এ কথা বলেননি। বরং আল্লাহ বলেছেন, ﴿مَا يُبَدَّلُ الْقَوْلُ لدى﴾। কারণ, ﴿لا تبديل لكلمات الله﴾ কেউ আল্লাহর বাণীসমূহের পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে না। আমরা যখন এ কথা বলি যে, আয়াতের বর্ণনা হলো, এমন কর্মের যার কর্তার নাম উল্লেখ করা হয়নি। আর তিনি যা বলেন, তা তিনি নিজে পরিবর্তন করেন না। তাহলে আপনার প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলব, সালাত বিষয়ে রাসূলের বার বার যাতায়াতের যা সংঘটিত হয়েছে তা ছিল প্রথম থেকে যে কথার প্রতি তার সম্মতি ও সন্তুষ্টি ছিল অর্থাৎ সালাত পাঁচ ওয়াক্ত হওয়া তা পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে ছিল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তার স্বীয় নবীর জন্য প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেন বিশেষ কোন হিকমত বা প্রজ্ঞার কারণে। বিশেষ কারণ একাধিক হতে পারে। যেমন-
প্রথম কারণ হলো, আল্লাহ তা'আলা তার রাসূলের ওপর যাই ফরয করেন তাই মানা ও কবুল করা।
দ্বিতীয় কারণ হলো, এ উম্মতের জন্য পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের সাওয়াব লিপিবদ্ধ করা। কারণ, বর্তমানে আমরা পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করি। কিন্তু আমরা সাওয়াব পাবো সে ব্যক্তি ন্যায় যে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে। এটি যে কোন নেক আমলের সাওয়াব দশগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার অধ্যায়ের নয়। বরং এ হলো এক ওয়াক্ত সালাতের অনুকূলে দশ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা লিপিবদ্ধ হবে। এটি অনেক বড় নে'আমত এবং আল্লাহ তা'আলা বড় হিকমত ও অপার রহমত। সুতরাং আসল কারণ, প্রথম কারণ, অর্থাৎ, আল্লাহ তা'আলা যার প্রতি সন্তুষ্ট তিনি সেটাই ফায়সালা করেছেন যে, সালাত পাঁচ ওয়াক্তই হবে। তবে তিনি পঞ্চাশ ওয়াক্ত ফরয করেছেন হিকমতের কারণে।
প্রথমত: আল্লাহ তা'আলা যা ফরয করেন যদিও তাতে অনেক কষ্ট হয় তা সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর ফরযকে কবুল করেন এবং মেনে নেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে যা বাধ্য করা হয় তা মানা ও কবুল করার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাধিক আনুগত্য শীল ও অনুগামী ব্যক্তি।
দ্বিতীয়ত: উম্মতের জন্য বাস্তবে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা সত্ত্বেও পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায় করার সাওয়াব লিপিবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে। এটি এ উম্মতের প্রতি আল্লাহর বিশেষ দয়া রহমত। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা।
শাইখ মুহাম্মদ বিন উসাইমীন রহ.

📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 শির্কের গুনাহ ক্ষমা না করা সম্পর্কীয় আয়াত ও অপর একটি আয়াত সম্পর্কে আলোচনা

📄 শির্কের গুনাহ ক্ষমা না করা সম্পর্কীয় আয়াত ও অপর একটি আয়াত সম্পর্কে আলোচনা


আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ ﴾ [النساء : ১১৬﴿ “নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা করেন না তাঁর সাথে শরীক করাকে...।" আল্লাহর বাণী: ﴿وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِمَنْ تَابَ وَءَامَنَ ﴾ [ত্বহা: ৮২ "আর অবশ্যই আমি তার প্রতি ক্ষমাশীল, যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে অতঃপর সৎ পথে চলতে থাকে।"
প্রশ্ন: আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ ﴾ [নিসা : ১১৬﴿ “নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা করেন না তাঁর সাথে শরীক করাকে এবং এ ছাড়া যাকে চান ক্ষমা করেন।” [সূরা নিসা, আয়াত: ১১৬]
তিনি আরও বলেন, :ab[ ﴾وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِّمَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ صَلِحًا ثُمَّ اهْتَدَى [৮২ "আর অবশ্যই আমি তার প্রতি ক্ষমাশীল, যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে অতঃপর সৎ পথে চলতে থাকে।” [সূরা তা-হা, আয়াত: ৮২]
উভয় আয়াতের মাঝে কি কোন বিরোধ আছে? আল্লাহ তা'আলার এ বাণী: ﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ "নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা করেন না তাঁর সাথে শরীক করাকে" দ্বারা কি উদ্দেশ্য? [সূরা নিসা, আয়াত: ১১৬]
উত্তর: উভয় আয়াতের মধ্যে পরস্পর কোন বিরোধ নেই। প্রথম আয়াত যে ব্যক্তি তাওবা না করে শির্ক অবস্থায় মারা যায় তার সম্পর্কে। কারণ, তাকে ক্ষমা করা হবে না এবং তার ঠিকানা জাহান্নাম। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَنهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ ) ]المائدة: ٧٢[ “নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, তার উপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই।” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৭২] আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন, ]۸۸ :وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُم مَّا كَانُواْ يَعْمَلُونَ ﴾ [الانعام "আর যদি তারা শির্ক করত, তবে তারা যা আমল করছিল তা অবশ্যই বরবাদ হয়ে যেত।" [সূরা আল-আন'আম আয়াত: ৮৮] একই বিষয়ক আয়াত আরও অনেক রয়েছে।
আর দ্বিতীয় আয়াত যাতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِمَن تَابَ وَءَامَنَ ]وَعَمِلَ صَلِحًا ثُمَّ أَهْتَدَى ) [طه: ٨٢ "আর অবশ্যই আমি তার প্রতি ক্ষমাশীল, যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে অতঃপর সৎ পথে চলতে থাকে।” [সূরা তা-হা, আয়াত: ৮২] এটি তাওবাকারীদের বিষয়ে। অনুরূপ আল্লাহ তা'আলার বাণী: قُلْ يَعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ الالمان إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ ) [الزمر: ٥٢] বান্দাগণ, যারা নিজদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৫২]
উলামাগণ এ ব্যাপারে একমত যে, এ আয়াতটি তাওবাকারীদের সম্পর্কে। আল্লাহ তা'আলার বাণী: ]وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاءُ ﴾ [النساء : ١١٦﴿ “এবং এ ছাড়া যাকে চান ক্ষমা করেন” [সূরা নিসা, আয়াত: ১১৬]-এ আয়াতটি যারা শির্ক করা ছাড়া অন্য কোন গুনাহ করে তাওবা করা ছাড়া মারা গিয়েছে তাদের সম্পর্কে। তার বিষয়টি আল্লাহর নিকট সোপর্দ। তিনি যদি চান শাস্তি দেবেন যদি চান ক্ষমা করে দেবেন। যদি শাস্তি দেন তবে সে কাফিরদের মতো চির জাহান্নামী হবে না। যেমনটি বলে খারেজী, মু'তাযিলা এবং তাদের অনুসারীরা। বরং গুনাহ থেকে পবিত্র হওয়া ও শাস্তি ভোগ করার পর একদিন অবশ্যই সে জাহান্নাম থেকে বের হবে। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত মুতাওয়াতের হাদীস এবং উম্মতের সালাফদের ইজমা এ কথাটি প্রমাণ করে। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা।
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.

📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 কুরআনের আয়াতে এ উম্মতকে নিরক্ষর বলে সম্বোধন করা

📄 কুরআনের আয়াতে এ উম্মতকে নিরক্ষর বলে সম্বোধন করা


আল্লাহর তা'আলার বাণী: ﴿هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ﴾ [الجمعة :٢] [ "তিনিই উম্মীদের মাঝে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে” [সূরা আল-জুমু'আ, আয়াত: ২] আয়াতে নিরক্ষর বলা হয়েছে। অথচ নিরক্ষর হওয়া অনগ্রসর ও অনুন্নত জাতির নিদর্শন।
প্রশ্ন: আমরা বিভিন্ন পেপার পত্রিকা অধিকাংশ সময় পড়ি এবং রাস্তায় বিল বোর্ডে নিরক্ষরতার প্রতি ভৎসনা ও তিরস্কার দেখতে পাই এবং নিরক্ষরতাকে পশ্চাদপদতার আলামত বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। অথচ আল্লাহ তা'আলা এ উম্মাতকে নিরক্ষর উম্মাত বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ﴾ [الجمعة :২] “তিনিই উম্মীদের¹⁴ মাঝে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন তাদের মধ্য থেকে।” [সূরা আল-জুমু'আ, আয়াত: ২] আশা করি বিষয়টি স্পষ্ট করবেন।
উত্তর: আরব ও আজম থেকে নিয়ে সারা বিশ্বের মানুষ জানে যে, উম্মতে মুহাম্মদী লেখা-পড়া জানত না। এ কারণে তাদের নাম করণ করা হয়েছে উম্ম-নিরক্ষর উম্মত। তাদের মধ্যে যারা পড়া লেখা জানত অন্য জাতীদের তুলনায় তাদের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লেখা-পড়া জানতেন না। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿وَمَا كُنتَ تَتْلُواْ مِن قَبْلِهِ مِن كِتَابٍ وَلَا تَخُطُّهُ بِيَمِينِكَ إِذًا لَّارْتَابَ الْمُبْطِلُونَ﴾ [العنكبوت :٤٨]
“আর তুমি তো এর পূর্বে কোন কিতাব তিলাওয়াত করনি এবং তোমার নিজের হাতে তা লিখনি যে, বাতিলপন্থীরা এতে সন্দেহ পোষণ করবে।” [সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত: ৪৮] আর এটি ছিল তার নবুওয়াত ও রিসালাতের সত্য হওয়ার অপর একটি অকাট্য প্রমাণ। কারণ, তিনি এমন একটি কিতাব তাদের কাছে নিয়ে আসেন যে কিতাবটি আরব অনারব-সমগ্র বিশ্বকে অক্ষম ও স্তম্বিত করে দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা এ কিতাবকে ওহী হিসেবে প্রেরণ করেন।
জিবরীল আমীন কুরআন নিয়ে তার কাছে অবতরণ করেন। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র সুন্নাত এবং পূর্বের লোকদের বিষয়ে অনেক জ্ঞানকে তার নিকট অহী হিসেবে প্রেরণ করেন। পূর্বে লোকদের অনেক অজানা ঘটনা এবং ভবিষ্যতে যা ঘটবে এ ধরনের অনেক জ্ঞানই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে জানিয়ে দেন। তিনি মানুষকে কিয়ামত সম্পর্কে অবহিত করেন জান্নাত জাহান্নام যারা জান্নাতী হবে এবং যারা জাহান্নামী হবে তাদের সম্পর্কে জানিয়ে দেন। এ গুলো সবই ছিল এমন বিষয় যার দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তাকে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা দান করেন। আর তিনি এ দ্বারা মানুষকে উচ্চ মান-মর্যাদার প্রতি দিক নির্দেশনা দেন এবং তার রিসালাতের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। এ উম্মতকে নিরক্ষর আখ্যায়িত করা দ্বারা উদ্দেশ্য এ নয় যে, তাদেরকে নিরক্ষর থাকতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বরং উদ্দেশ্য হল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমনের সময়ের অবস্থা তুলে ধরা এবং তখনকার সময়ের বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত করা। অন্যথায় নিরক্ষরতা থেকে বের হয়ে লেখা-পড়া করা ও জ্ঞান অর্জন করা বিষয়ে কুরআন ও হাদীসে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে যাতে নিরক্ষরতা থেকে বের হয়ে জ্ঞান অর্জনের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ ﴾ [الزمر: ٩ “বল, 'যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান?'।" ]সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৯] আল্লাহ তা'আলা বলেন, يَأْيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا إِذَا قِيلَ لَكُمْ تَفَسَّحُوا فِي الْمَجَالِسِ فَأَفْسَحُوا يَفْسَحِ اللَّهُ لَكُمْ وَإِذَا قِيلَ انْشُرُوا فَانشُزُوا يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ ءَامَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ ﴾ [المجادلة: ١١] "হে মুমিনগণ, তোমাদেরকে যখন বলা হয়, 'মজলিসে স্থান করে দাও', তখন তোমরা স্থান করে দেবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য স্থান করে দেবেন। আর যখন তোমাদেরকে বলা হয়, 'তোমরা উঠে যাও', তখন তোমরা উঠে যাবে। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় সমুন্নত করবেন। আর তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।” [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ১১] আল্লাহ তা'আলা বলেন, ]۲۸ :إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمْؤُا ﴾ [فاطر "বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে।” [সূরা ফাতির, আয়াত: ২৮] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, من سلك طريقا يلتمس فيه علما سهل الله له طريقا إلى الجنة "যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য জান্নাতের পথকে সহজ করে দেয়। "¹⁵ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, مَنْ يُرِدُ اللهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقَّهُ فِي الدين “আল্লাহ তা'আলা যখন কারো প্রতি কল্যাণ কামনা করেন তাকে তিনি দীনের জ্ঞান দান করেন।”¹⁶ এ বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের অসংখ্য বর্ণনা বিদ্যমান। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা।
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.।

টিকাঃ
¹⁴ উম্মী দ্বারা আরবের লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে。
¹⁵ বর্ণনায় আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৬৪৩; তিরমিযি, হাদীস নং ২৬৪৬
¹⁶ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৩৯。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00