📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 নবীদের মর্যাদার স্তর

📄 নবীদের মর্যাদার স্তর


আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴾لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ [البقرة: ٢٨٥ “আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না" [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ২৮৫] এবং আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴿تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ [البقرة: ٢৫৩] “ঐ রাসূলগণ, আমি তাদের কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ২৫৩]
প্রশ্ন: আল্লাহ তা'আলার এ বাণী- : ﴿تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ ﴾ [البقرة: ২০৩ “ঐ রাসূলগণ, আমি তাদের কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ২৫৩] এবং অপর বাণী- ﴿لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ [البقرة: ٢৮৫] "আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না।” [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ২৮৫] উভয় আয়াতের মাঝে পরিলক্ষিত বিরোধ কিভাবে দূর করব?
উত্তর: আল্লাহ তা'আলার বাণী - : ﴿تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ [البقرة: ২০৩ "ঐ রাসূলগণ, আমি তাদের কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি” [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ২৫৩] টি আল্লাহ তা'আলার অপর বাণী: ﴿وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّنَ عَلَى بَعْضٍ﴾ [الاسراء: ٥٥] “উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি” [সূরা আল-ইসরাহ, আয়াত: ৫৫]-এর মতো। নবী ও রাসূলগণ অবশ্যই একজন অপর জন অপেক্ষায় শ্রেষ্ঠ। রাসূলগণ নবীদের অপেক্ষায় শ্রেষ্ঠ। উলুল-আযম রাসূলগণ অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। উলুল-আযম রাসূলগণ হলেন পাঁচ জন যাদের আলোচনা আল্লাহ তা'আলা কুরআনের দু'টি আয়াতে করেছেন।
প্রথম আয়াত সূরা আল-আহযাবে, যাতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ ﴿ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنكَ وَمِن نُوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَأَخَذْنَا مِنْهُم مِّيثَاقًا ﴾غَلِيظًا ﴾ [الاحزاب : ٧] “আর স্মরণ কর, যখন আমি অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম নবীদের থেকে এবং তোমার থেকে, নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও মারইয়াম পুত্র ঈসা থেকে। আর আমি তাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৭] মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নূহ আলাইহিস সালাম ইবরাহীম আলাইহিস সালাম মূসা আলাইহিস সালাম এবং ঈসা ইবন মারইয়াম আলাইহাস সালাম প্রমুখদের কথা এ আয়াতে বলা হয়েছে।
দ্বিতীয় আয়াত সূরা আশ-শূরা, যাতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿ شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ﴾ [الشورى : ١٣] “তিনি তোমাদের জন্য দীন বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন; যে বিষয়ে তিনি নূহকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, আর আমি তোমার কাছে যে ওহী পাঠিয়েছি এবং ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে যে নির্দেশ দিয়েছিলাম তা হল, তোমরা দীন কায়েম করবে এবং এতে বিচ্ছিন্ন হবে না।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১৩] সুতরাং, উভয় আয়াতে পাঁচ জনের আলোচনা রয়েছে। আর এরা পাঁচজন অন্যদের তুলনায় উত্তম।
মু'মিনদের সম্পর্কে আল্লাহর বাণী: ﴿كُلُّ ءَامَنَ بِاللَّهِ وَمَلَيْكَتِهِ، وَكُتُبِهِ، وَرُسُلِهِ، لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ ﴾ [البقرة: ٢٨٥] প্রত্যেক ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাকুল, কিতাবসমূহ ও তাঁর রাসূলগণের উপর, আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না।” [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ২৮৫] এর অর্থ, ঈমান আনার বিষয়ে আমরা তাদের মধ্যে কোন প্রকার পার্থক্য বা ব্যবধান করব না। বরং আমরা ঈমান আনব যে, তারা সবাই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সত্য রাসূল, তারা কখনোই মিথ্যা বলেননি, তারা সত্যবাদী ও বিশ্বাস্য। আর এটি হলো আল্লাহ তা'আলার বাণী- لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ ﴾ [البقرة: ٢٨٥] “আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না” [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ২৮৫]-এর মর্ম অর্থ। অর্থাৎ, ঈমানের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে কোন ব্যবধান করব না। বরং তারা সবাই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সত্য রাসূল এ কথার প্রতি ঈমান আনব এবং বিশ্বাস স্থাপন করব। কিন্তু ঈমানের দাবী অনুসরণ করা। যারা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর পরে দুনিয়াতে এসেছে তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর অনুকরণই খাস বা নির্ধারিত। কারণ, তিনিই অনুকরণ যোগ্য। তার আনিত শরী'আত পূর্বের সব শরী'আতকে রহিত করে দিয়েছেন। এ দ্বারা আমরা বুঝতে পারলাম যে, ঈমান হবে সব নবী ও রাসূলগণের প্রতি, আমরা তাদের সবাইকে বিশ্বাস করি, তারা সবাই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সত্য রাসূল এবং তারা যে শরী'আত নিয়ে আগমন করেছেন তা সত্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুনিয়াতে প্রেরণের পর পূর্বের সব দীন ও শরী'আত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী'আতের দ্বারা রহিত। বর্তমানে সমগ্র মানুষের ওপর ওয়াজিব হলো, কেবল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী'আতের অনুকরণ করা এবং তার সাহায্য করা। আল্লাহর তার প্রজ্ঞা ও হিকমত দ্বারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীন ছাড়া পূর্বে নবী ও রাসূলদের সব দীন ও শরী'আতকে রহিত করে দিয়েছেন। এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা বলেন, قُلْ يَأْيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ يُحْيِ وَيُمِيتُ فَتَامِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الْأُتِيَ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَكَلِمَاتِهِ، وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
[الأعراف: ١٥৭] “বল, ‘হে মানুষ, আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রাসূল, যার রয়েছে আসমানসমূহ ও জমিনের রাজত্ব। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু দেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আন ও তাঁর প্রেরিত উম্মী নবীর প্রতি, যে আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহের প্রতি ঈমান রাখে। আর তোমরা তার অনুসরণ কর, আশা করা যায়, তোমরা হিদায়াত লাভ করবে।” [সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ১৫২] সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীন ছাড়া বাকী সব দীন রহিত। কিন্তু রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস করা ও ঈমান আনা এবং তাদের সত্য বলে জ্ঞান করা খুবই জরুরি। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দেয়ার মালিক ও অভিবাবক।
শাইখ মুহাম্মদ ইবন উসাইমীন রহ.

📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 শির্কের গুনাহ ক্ষমা সম্পর্কে দু‘টি আয়াতের বিরোধ নিরসন

📄 শির্কের গুনাহ ক্ষমা সম্পর্কে দু‘টি আয়াতের বিরোধ নিরসন


আল্লাহ তা'আলার বাণী: ]۸۲ ) [طه﴿ :وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِمَن تَابَ "আমি তার প্রতি ক্ষমাশীল, যে তাওবা করে" [সূরা তা-হা, আয়াত: ২৮৫] আল্লাহ তা'আলার অপর বাণী: ]إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ ﴾ [النساء : ٤٨ "নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না।” [সূরা নিসা, আয়াত: ৪৮]
প্রশ্ন: আল্লাহ তা'আলার বাণী: إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن﴿ ]يَشَاءُ ﴾ [النساء : ٤٨ “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান।” [সূরা আন- নিসা, আয়াত: ৪৮] এবং আল্লাহ তা'আলার অপর বাণী: وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِمَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَى ﴾ [طه: ٨٢] ক্ষমাশীল, যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে অতঃপর সৎ পথে চলতে থাকে।” [সূরা তা-হা, আয়াত: ৮২] এ দু'টি আয়াতের মাঝে (একটিতে ক্ষমা করার ঘোষণা এবং অপটিতে শির্কের গুণাহ ক্ষমা না করার কথা বলা হয়েছে) কীভাবে একত্র করব এবং বিরোধ নিরসন করব। বাস্তবে উভয় আয়াতের মধ্যে কোন বৈপরীত্য বা বিরোধ আছে কি?
উত্তর: উভয় আয়াতের মধ্যে কোন বিরোধ বা বৈপরীত্য নেই। প্রথম আয়াত ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে যে শির্কের ওপর তাওবা ছাড়া মারা গেছে। আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করবেন না তার ঠিকানা জাহান্নাম। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَلَهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ ﴾ ﴿أَنصَارِ ﴾ [المائدة: ٧২] “নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, তার উপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই।” [সূরা মায়েদাহ, আয়াত: ৭২] আল্লাহ আরও বলেন, ﴿وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُم مَّا كَانُواْ يَعْمَلُونَ﴾ [الانعام : ৮৮] “আর যদি তারা শির্ক করত, তবে তারা যা আমল করছিল তা অবশ্যই বরবাদ হয়ে যেত।” [সূরা আল-আনআম, আয়াত: ৮৮]
আর দ্বিতীয় আয়াত: আল্লাহ তা'আলার বাণী: وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِّمَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ ﴿صَلِحًا ثُمَّ اهْتَدَى ﴾ [طه: ٨২] “আর অবশ্যই আমি তার প্রতি ক্ষমাশীল, যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে অতঃপর সৎ পথে চলতে থাকে।” [সূরা তা-হা, আয়াত: ৮২] (এ সম্পর্কীয় আয়াত কুরআনে কারীমে আরও অনেক রয়েছে।) দ্বিতীয় আয়াত যাতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, তা হলো তাদের সম্পর্কে যারা তাওবা করেছেন। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলার বাণী: قُلْ يَعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُসِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ ﴿هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ ﴾ [الزمر: ৫২] “বল, 'হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু'।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৫২] সমস্ত উম্মত এ বিষয়ে একমত যে, এ আয়াতটি তাওবাকারীদের বিষয়ে অবতীর্ণ। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা。
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.

📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 রাসূলের কবরে যাওয়া ও তার নিকট কোন কিছু চাওয়ার বিধান

📄 রাসূলের কবরে যাওয়া ও তার নিকট কোন কিছু চাওয়ার বিধান


আল্লাহর বাণী: وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ "আর আমি যে কোন রাসূল প্রেরণ করেছি তা কেবল এ জন্য...।" আল্লাহর বাণী: فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ "অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না...।"
প্রশ্ন: আল্লাহ তা'আলার বাণী: وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذ ظَّلَمُوا أَنفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴾ [النساء: ٦٤ ، ٦٥]
তা কেবল এ জন্য, যেন আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাদের আনুগত্য করা হয়। আর যদি তারা- যখন নিজদের প্রতি যুলম করেছিল তখন তোমার কাছে আসত অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইত এবং রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা চাইত তাহলে অবশ্যই তারা আল্লাহকে তাওবা কবুলকারী, দয়ালু পেত। অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়।” [সূরা নিসা, আয়াত: ৬৪, ৬৫] এখানে প্রশ্ন হলো কতক মুসলিম এ আয়াত দ্বারা প্রমাণ পেশ করে বলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা এবং তার কবরে গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য তার কাছে প্রার্থনা করাতে কোন অসুবিধা নেই। এ আমলটি আল্লাহ তা'আলার বাণী অনুযায়ী বিশুদ্ধ। আর এর অর্থ অভিধানে বেঁচে থাকা অবস্থায় নাকি মারা যাওয়ার পর? যখন কোন মুসলিম আল্লাহর রাসূলের সুন্নাতকে ফায়সালা কারী মনে না করে সে কি মুরতাদ হয়ে যাবে? আর বিবাদটি দুনিয়ার ওপর নাকি দীনের ওপর?
উত্তর: যখন কোন বান্দা গুনাহ করে তার নিজেদের ওপর জুলুম করে অথবা শির্কের চেয়েও কোন ভয়াবহ গুনাহ করে বসে, এ আয়াতটি সে বান্দাকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার প্রতি উৎসাহ প্রদান করে। যাতে সে তাওবা করে এবং লজ্জিত হয়ে আল্লাহর রাসূলের দিকে ফিরে আসে যাতে তিনি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আয়াতে 'তার দিকে ফিরে আসা' দ্বারা উদ্দেশ্য তার জীবদ্দশায় তার নিকট ফিরে আসা। তিনি মুনাফিক ও অন্যান্যদের তার নিকট ফিরে আসার ঘোষণা দিতেন যাতে তাদের তাওবা ও আল্লাহর দিকে ফিরে আসার ঘোষণা দেন। তারা রাসূলুল্লাহ থেকে এ কামনা করতেন যে, তিনি যেন আল্লাহর কাছে তাদের তাওবা কবুল করার এবং তাদের অবস্থা সংশোধন করে দেয়ার জন্য প্রার্থনা করেন। এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَمَا أَرْسَلْنَا مِن ﴿ رَسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ ﴾ [النساء : ٦٤]
করেছি তা কেবল এ জন্য, যেন আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাদের আনুগত্য করা হয়।” [সূরা নিসা, আয়াত: ৬৪] সুতরাং, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্যতা আল্লাহর অনুমতিতেই হয়। আল্লাহ যাকে অনুমতি দেন এবং যার হিদায়াতের ইচ্ছা করেন সে হিদায়েত লাভ করেন। আর যাকে আল্লাহ তা'আলা হিদায়েত দেন না সে হিদায়েত প্রাপ্ত হয় না। ক্ষমতা আল্লাহরই হাতে। তিনি যা চান তা হয় আর তিনি যা চান না তা হয় না। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ ﴾ [التكوير: ٢٩] “আর তোমরা ইচ্ছা করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ ইচ্ছা করেন।” [সূরা তাকবীর, আয়াত: ২৯]
আর শর'য়ী অনুমতি আল্লাহ তা'আলা জীন ও ইনসান সবার জন্যই দিয়ে রেখেছেন যাতে তারা হিদায়াত প্রাপ্ত হয়। আল্লাহ তা'আলা তাদের থেকে শর'য়ীভাবে হিদায়েত প্রাপ্ত হওয়াকে চান এবং তাদের হিদায়েত গ্রহণ করার নির্দেশ দেন। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿يَأَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ ﴾ [البقرة: ٢١] “হে মানব সকল, তোমরা তোমাদের রবের ইবাদত কর।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২১] আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿يُرِيدُ اللَّهُ لِيُبَيِّنَ لَكُمْ وَيَهْدِيَكُمْ سُنَنَ الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ وَيَتُوبَ عَلَيْكُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ﴾ [النساء : ٢٦] “আল্লাহ চান তোমাদের জন্য বিস্তারিত বর্ণনা করতে, তোমাদেরকে তোমাদের পূর্ববর্তীদের আদর্শ প্রদর্শন করতে এবং তোমাদের তাওবা কবুল করতে। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা নিসা, আয়াত: ২৬] তারপর তিনি বলেন, ﴿وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا ﴾ [النساء : ٦٤] “আর যদি তারা- যখন নিজদের প্রতি যুলম করেছিল তখন তোমার কাছে আসত অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইত এবং রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা চাইত তাহলে অবশ্যই তারা আল্লাহকে তাওবা কবুলকারী, দয়ালু পেত।” [সূরা নিসা, আয়াত: ৬৪] অর্থাৎ, তাওবা করে ও লজ্জিত হয়, শুধু কথা নয়। وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ অর্থাৎ তিনি তাদের জন্য ক্ষমার দো'আ করেন। لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا "তারা আল্লাহকে তাওবা কবুলকারী, দয়ালু “পেত।” তিনি স্বীয় বান্দাদের রাসূলের নিকট এসে তাদের তাওবার ঘোষণা দেওয়ার প্রতি উৎসাহ দেন, যাতে তিনি আল্লাহর নিকট তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এটি তাদের জীবদ্দশায়, মৃত্যুর পর নয়। যেমনটি কোন কোন মূর্খরা ধারণা করে থাকে। সুতরাং, তার মৃত্যুর পর এ ধরনের উদ্দেশ্যে তার কাছে ফিরে আসা শরী'আত সম্মত নয়। যারা মদীনায় বসবাস করে বা মসজিদে নববীতে সালাত, যিকির বা কুরআন তিলাওয়াতের উদ্দেশ্যে যে সব লোক মদীনায় গমন করল সে শুধু রাসূলের কবরে সালাম দেবে। যখন কোন ব্যক্তি মসজিদে নববীতে আসবে সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাথীদ্বয়ের কবরেও সালাম দেবে। কিন্তু শুধু কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না বরং সফর করবে মসজিদের উদ্দেশ্যে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কবর এবং উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর কবরের যিয়ারত মসজিদের যিয়ারতের আওতাধীন হবে।
কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, لَا تُشَدُّ الرِّجَالُ إِلَّا إِلَى ثَلَاثَةِ مَسَاجِدَ مَسْجِدِى هَذَا وَمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَمَسْجِدِ الْأَقْصَى ».
"তিনটি মসজিদ ছাড়া আর কোন মসজিদের উদ্দেশ্য ভ্রমণ করা যাবে না। আমার এ মসজিদ, মসজিদে হারাম এবং মসজিদে আকসা।"²
মোট কথা, কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না। তবে যখন কোন ব্যক্তি মসজিদে নববীতে পৌঁছবে, তার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমার কবরে সালাম দেয়া বৈধ। কিন্তু শুধু যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না। যেমনটি উল্লিখিত হাদীস তার প্রমাণ। আর ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি জীবিত থাকার সাথে সম্পৃক্ত মৃত্যুর পর নয়। এর প্রমাণ- রাসূলের সাহাবীগণ দীন সম্পর্কে সবচেয়ে জ্ঞানী এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অবগত হওয়া সত্ত্বেও তারা এ ধরনের কর্ম করেননি। এ ছাড়াও মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোন ক্ষমতাই রাখেন না। যেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ ».
"যখন মানুষ মারা যায় তখন তার তিনটি আমল ছাড়া বাকী সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। তিনটি আমল হলো- সাদকায়ে জারিয়াহ, এমন ইলম যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং নেক সন্তান যারা মৃত্যুর পর তার জন্য দো'য়া করে'।"³
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস- «فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ مَعْرُوضَةً عَلَيَّ » “যে ব্যক্তি তার ওপর দরূদ পড়ে, সে দরূদ আমার কাছে পেশ করা হয়”- এটি শুধুমাত্র দরূদের সাথে খাস। অন্য হাদীসে এসেছে- «مَنْ صَلَّى عَلَيَّ وَاحِدَةً صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ عَشْرًا» “যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পড়ে আল্লাহ তা'আলা তার ওপর দশবার রহমত প্রেরণ করেন।"⁴ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
فَأَكْثِرُوا عَلَيَّ مِنْ الصَّلَاةِ فِيهِ فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ مَعْرُوضَةٌ عَلَيَّ فَقَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ تُعْرَضُ عَلَيْكَ صَلَاتُنَا وَقَدْ أَرِمْتَ يَعْنِي وَقَدْ بَلِيتَ قَالَ إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ حَرَّمَ عَلَى الْأَرْضِ أَنْ تَأْكُلَ أَجْسَادَ الْأَنْبِيَاءِ صَلَوَاتُ اللَّهِ عَلَيْهِمْ
"তোমরা জুমু'আর দিন আমার ওপর বেশি বেশি দুরূদ পড়, কারণ, তোমাদের দরূদ আমার নিকট পেশ করা হয়, জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! তা কীভাবে সম্ভব অথচ আপনি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছেন। তখন তিনি বললেন, মাটির জন্য আল্লাহ তা'আলা নবীদের দেহকে হারাম করে দিয়েছেন।” তার ওপর দুরূদের ক্ষেত্রে এটি একটি বিশেষ বিধান। অপর একটি হাদীসে তিনি বলেন,
AR Ra إِنَّ لِلَّهِ مَلَائِكَةٌ فِي الْأَرْضِ سَيَّاحِينَ يُبَلِّغُونِي مِنْ أُمَّتِي السَّلَامَ ফিরিশতা রয়েছে যারা আমার উম্মতের সালাম আমার নিকট পৌঁছায়। "⁵ এটি রাসূলের বিশেষ বৈশিষ্ট্য যে, উম্মতের সালাম তার নিকট পৌঁছানো হয়। গুনাহের থেকে তাওবা করা বা ক্ষমা প্রার্থনা করার উদ্দেশ্যে রাসূলের কবরের নিকটে গমন করার কোন ভিত্তি নেই। বরং এটি একেবারেই ঘৃণিত, নিন্দিত ও অগ্রাহ্য কর্ম যা কোন ক্রমেই বৈধ নয়। এটি শির্কের পথকে উন্মুক্ত করে। এ ধরনের কর্ম- মৃত্যুর পর তার কাছে সাফা'আত চাওয়া, সুস্থতা চাওয়া, দুশমনের ওপর বিজয়ের জন্য প্রার্থনা করা, দো'য়া করা ইত্যাদির মতোই শির্ক, যা কখনোই ক্ষমা যোগ্য নয়। কারণ, রাসূলের মৃত্যুর পর বা অন্য কারো মৃত্যুর পর এ ধরনের কোন কিছুই তারা করতে পারে না। তাদের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। যে কোন ব্যক্তিই হোক না কেন চাই সে নবী হোক বা অন্য কেউ যখন সে মারা যায় তার কাছে দো'য়া চাওয়া যাবে না, সুপারিশ কামনা করা যাবে না।
সুপারিশতো শুধু তার জীবিত থাকা অবস্থায় চাওয়া হবে। জীবিত থাকা অবস্থায় এ কথা বলা যাবে যে, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ যেন আমাকে ক্ষমা করেন সে জন্য আপনি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন, আল্লাহ যেন আমার রোগকে ভালো করে দেন, আমার হারানো বস্তুটি ফিরিয়ে দেন এবং আমাকে অমুক অমুক নে'আমত দান করেন, সে জন্য আপনি আল্লাহর নিকট সুপারিশ করুন।
অনুরূপভাবে কিয়ামতের দিন হাসর-নসরের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের জন্য সুপারিশ করবেন। কারণ, সেদিন মু'মিনগণ আদম আলাইহিস সালামের নিকট আসবেন যাতে তিনি তাদের ফায়সালা করার জন্য আল্লাহর নিকট তাদের জন্য সুপারিশ করেন। তখন তিনি অপারগতা প্রকাশ করবেন এবং নূহ আলাইহিস সালামের নিকট তাদের প্রেরণ করবেন। তারপর তারা তার নিকট আসলে তিনিও অপারগতা প্রকাশ করবেন। অতঃপর নূহ আলাইহিস সালাম তাদেরকে ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের নিকট প্রেরণ করলে তিনিও অপারগতা প্রকাশ করবেন। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাদের মূসা আলাইহিস সালামের নিকট প্রেরণ করবেন তিনিও অপারগতা প্রকাশ করবেন। অতঃপর মূসা আলাইহিস সালাম তাদের ঈসা আলাইহিস সালামের নিকট প্রেরণ করবেন। তারা সবাই অপারগতা প্রকাশ করবেন। অতঃপর ঈসা আলাইহিস সালাম মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রেরণ করবেন। তখন মু'মিনগণ তার নিকট আসবেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলবেন, 'আনা লাহা আনা লাহা' 'আমিই তার জন্য, আমিই তার জন্য'। তারপর তিনি সামনে অগ্রসর হয়ে আরশের নিচে সেজদায় পড়বেন। তিনি তার রবের গুরুত্বপূর্ণ প্রশংসা করবেন যা আল্লাহ তা'আলা তাকে শিখিয়েছেন।
অতঃপর তাকে বলা হবে, يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ قُلْ تُسْمَعْ سَلْ تُعْطَهُ اِشْفَعْ تُشَفَّعُ “মাথা উঠাও, বল, তোমার কথা শোনা হবে, চাও তোমাকে যা চাও দেওয়া হবে, সুপারিশ কর, তোমার সুপারিশ কবুল করা হবে।”⁶
ভয়াবহ কিয়ামতের মাঠে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু'মিনদের জন্য সুপারিশ করবেন যাতে তাদের মাঝে ফায়সালা করা হয়। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতীদের জান্নাতে প্রবেশ করানোর জন্য সুপারিশ করবেন। কারণ, তিনি তখন উপস্থিত থাকবেন এবং জীবিত। কিন্তু তার মৃত্যুর পর যখন তিনি বরযখী জগতে রয়েছেন তখন তার নিকট সুপারিশ, রোগীর সুস্থতা, হারানো বস্তুর সন্ধান ইত্যাদি চাওয়া যাবে না।
অনুরূপভাবে অন্য কোন মাখলুকের নিকটও এ ধরনের কোন কিছু চাওয়া যাবে না। বরং তারা যদি মুসলিম হয়ে থাকে তাদের জন্য দো'য়া করা ও ক্ষমা চাওয়া যাবে। আর উল্লিখিত বিষয়গুলো- সুপারিশ, রোগীর সুস্থতা, হারানো বস্তুর সন্ধান- কেবল আল্লাহর কাছে চাইবে। যেমন, আমরা বলব, হে আল্লাহ তুমি তোমার নবীকে আমার জন্য সুপারিশ-কারী বানাও, হে আল্লাহর তুমি আমার রোগকে ভালো করে দাও, হে আল্লাহ তুমি আমাকে আমার দুশমনের ওপর বিজয় দাও ইত্যাদি। কারণ, আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ ﴾ [غافر: ٦٠] “আর তোমাদের রব বলেছেন, 'তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দেব।” [সূরা গাফের, আয়াত: ৬০] আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন, وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ ﴾ [البقرة: ١৮৬]
বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৬]
﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴾ [النساء : ٦٥] “তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়।" [সূরা নিসা, আয়াত: ৬৫]
আয়াতটি বাহ্যিকের ভিত্তিতে ব্যাপক অর্থবোধক। সুতরাং আল্লাহর শরী'আত থেকে বের হওয়া মুসলিমের জন্য বৈধ নয়। বরং ইবাদাত, মু'আমালাতের সাথে সম্পৃক্ত এমনকি দুনিয়াও আখিরাতের যাবতীয় সর্ব বিষয়ে মুসলিমদের ওপর ওয়াজিব হলো, আল্লাহর দেওয়া শরী'আতকে বিধান হিসেবে মেনে নেওয়া। কারণ, আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ ﴾ [المائدة: ٥٠] “তারা কি তবে জাহিলিয়‍্যাতের বিধান চায়? আর নিশ্চিত বিশ্বাসী কওমের জন্য বিধান প্রদানে আল্লাহর চেয়ে কে অধিক উত্তম?।" [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৫০] আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন, ﴿وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللهُ فَأُولَبِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ﴾ [المائدة: ٤٤] “আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে ফয়সালা করে না, তারাই কাফির।” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৪৪] আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ ]هُمُ الظَّلِمُونَ ﴾ [المائدة: ٤٥ "আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম।" [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৪৫] আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴾ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلُبِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ﴿ ]المائدة: ٤٧[ "আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করে না, তারাই ফাসিক।” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৪৭]
মানুষের বিবদমান ও মতানৈক্য বিষয়সমূহের মীমাংসা বিষয়ে আয়াতগুলো ব্যাপক। এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা বলেন, فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ “তারা মুমিন হবে না” অর্থাৎ মুসলিম ও অন্যান্য লোকেরা حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ "যতক্ষণ না তারা তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে।” অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর তা হলো, তার জীবদ্দশায় তাকে বিচারক মানার মাধ্যমে এবং তার মৃত্যুর পর তার সুন্নাতকে বিচারক হিসেবে গ্রহণ করার মাধ্যমে। রাসূলের সুন্নাতকে হাকিম মানার অর্থ কুরআন ও সুন্নাহকেই হাকিম মানা। فِيمَا شَجَرَ “যে সব বিষয়ে তারা বিবাদ করে।" মুসলিমদের ওপর এটিই ওয়াজিব যে, তারা কুরআনকে এবং রাসূলের জীবদ্দশায় তাকে আর মৃত্যুর পর তার সুন্নাত যা কুরআনের বর্ণনা, ব্যাখ্যা ও অর্থ তাকে অনুসরণের মাধ্যমে হাকিম- ফায়সালা দানকারী- মানা। আল্লাহ তা'আলার বাণী: ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ ﴾ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴿ [النساء : ٦٥] "তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়।" [সূরা নিসা, আয়াত: ৬৫] আয়াতের অর্থ, মুসলিমদের ওপর ওয়াজিব হলো, রাসূলের বিধানের প্রতি তাদের অন্তর সবসময় খুশি থাকা এবং রাসূলের বিধান অনুযায়ী বিচার ফায়সালার ক্ষেত্রে তাদের অন্তরে কোন প্রকার সংকীর্ণতা না থাকা। কারণ, নি:সন্দেহে বলা যায় যে, রাসূলের ফায়সালাই সত্য ও হক। এটিই আল্লাহর হুকুম। সুতরাং তা মানতেই হবে। এতে অন্তর খুশি থাকতে হবে এবং অন্তরে কোন প্রকার সংকীর্ণতা ও সংকোচ থাকা চলবে না। শুধু তাদের অন্তর খুশি নয় বরং আল্লাহর হুকুমের প্রতি সন্তুষ্ট থেকে এবং তার প্রতি পুরোপুরি আনুগত্য করে তাদের বিবদমান বিষয়ে আল্লাহ ও রাসূলের ফায়সালা পরিপূর্ণভাবে মেনে নেয়া সমগ্র মুসলিমের ওপর ওয়াজিব। চাই তা ইবাদাত হোক বা ধন-সম্পদ বিষয়ক হোক অথবা বিবাহ, তালাক ইত্যাদি জীবনের যে কোন বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত হোক না কেন। মুসলিম হিসেবে তাকে অবশ্যই আল্লাহ ও তার রাসূলের ফায়সালা মানতে হবে।
শরী'আতকে হাকিম মানার ক্ষেত্রে এ ধরনের নিরেট ঈমানই হলো, আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি আসল ঈমান ও তাদের প্রতি সন্তুষ্টি এবং এ কথা বিশ্বাস করা যে এটিই হলো মানুষের মাঝে সত্য ফায়সালা। আর যে ব্যক্তি এ কথা বিশ্বাস করে যে, শরী'আতকে বাদ দিয়ে বিচার ফায়সালা করা যায়, অথবা এ কথা বলে যে, মানুষ তার বাব-দাদার কথা অনুযায়ী বিচার ফায়সালা করতে পারে অথবা বলে যে, মানব রচিত কানুন অনুযায়ী বিচার ফায়সালা করতে পারে চাই তা পশ্চিমাদের হোক অথবা ইউরোপিয়ানদের হোক, তা হলে তার ঈমান থাকবে না সে অবশ্যই বেঈমান-কাফের হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি এ কথা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর শরী'আত মানা ওয়াজিব নয় কিন্তু যদি করা হয় তা উত্তম হবে অথবা যদি মনে করে শরী'আত অনুযায়ী বিচার ফায়সালা করা উত্তম অথবা এ কথা বলে মানব রচিত বিধান আর আল্লাহর বিধানের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তাহলে সে অবশ্যই মুরতাদ। আর তা তিন প্রকার:
প্রথম প্রকার: এ কথা বলা যে, অবশ্যই শরী'আত উত্তম, কিন্তু শরী'আতকে বাদ দিয়ে অন্য কোন আইনে বিচার করাতে কোন বাধা নেই।
দ্বিতীয় প্রকার: এ কথা বলা যে, শরী'আতের বিধান ও মানব রচিত বিধান একই উভয়ের মাঝে কোন পার্থক্য নেই।
তৃতীয় প্রকার: মানব রচিত বিধান শরী'আতের বিধান থেকে উত্তম ও অগ্রাধিকার। তিনটি প্রকারের মধ্যে এটিই হলো সর্বাধিক মারাত্মক ও ঘৃণিত। এ গুলো সবই কুফর ও ইসলাম থেকে মুরতাদ হওয়া।
আর যে ব্যক্তি এ কথা বিশ্বাস করে ওয়াজিব হলো, আল্লাহর শরী'আত অনুযায়ী বিচার ফায়সালা করা এবং আল্লাহর বিধানকে বাদ দিয়ে অন্য কোন শরী'আত বিরোধী আইন ও বিধান অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করা জায়েয নেই, কিন্তু সে প্রবৃত্তির অনুসরণে অথবা ঘুষ খেয়ে অথবা রাজনৈতিক ইত্যাদি বা এ ধরনের কোন কারণে আল্লাহর বিধানকে বাদ দিয়ে অন্য কোন বিধান অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করে অথচ সে জানে যে, সে অন্যায়কারী, ভুলকারী ও শরী'আতের বিরোধিতা-কারী, তা হলে এ ব্যক্তি হলো দুর্বল ঈমানদার ব্যক্তি। তাকে পরিপূর্ণ ঈমানদার বলা যাবে না, তার থেকে পরিপূর্ণ ঈমান না হয়ে গেছে। এ কারণে সে কাফের হবে তবে তা ছোট কাফির, যালেম হবে তবে ছোট যালেম এবং ফাসেক হবে তবে ছোট ফাসেক। এ ধরনের অর্থই বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত আছে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এবং মুজাহিদ রহ. থেকে এবং সালফে সালেহীনদের একটি জামা'আত থেকে। আর এটিই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মতামত। তবে খারেজী ও মু'তাযিলা এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছেন তাদের মতামত ভিন্ন। আল্লাহ তা'আলাই সাহায্যকারী।
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.

টিকাঃ
² সহীহ বুখারী হাদীস নং ১১৮৯; সহীহ মুসলিম হাদীস নং ৩৪৫০
³ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৩১০
⁴ মুসনাদে আহমদ হাদীস নং ১৬১৬২
⁵ মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ৩৬৬৬
⁶ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৯৫

📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 মৃতাকীদের ইমাম হওয়ার জন্য দোয়া করা

📄 মৃতাকীদের ইমাম হওয়ার জন্য দোয়া করা


প্রশ্ন: আল্লাহ তা'আলার বাণী-﴿ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا ﴾ [الفرقان: 74] “আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন”। [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৭৪] তে দো'য়া করা এবং রাসূলের অপর বাণী: اللهم اجعلني عبدا خفيا غنيا تقيا “হে আল্লাহ তুমি আমাকে গোপন বান্দা বানিয়ে দাও” 'তে যে দো'য়া রয়েছে উভয়ের মধ্যে কোন বিরোধ ও অসঙ্গতি রয়েছে কিনা'?।
উত্তর: বিসমিল্লাহ ওয়াল হামদু লিল্লাহ। আয়াত ও হাদীস উভয়ের মাঝে কোন বিরোধ ও অসঙ্গতি নেই। কারণ, আল্লাহ তা'আলা এমন বান্দাদের পছন্দ করেন যিনি মুত্তাকী, ধনী ও বিনয়ী। আল্লাহ তা'আলা লৌকিকতা ও স্ব-প্রসংশাকে পছন্দ করেন না। যে ব্যক্তি কেবল আল্লাহর জন্য আমল করে থাকে, আমল যাতে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয় সে জন্য চেষ্টা করে এবং সে যদি মুত্তাকীদের ইমাম হয় তাহলে সে পরিপূর্ণ ঈমানদার হলো এবং সে মানুষের জন্য অধিক উপকারকারী হলো। সুতরাং, আল্লাহর নিকট মুত্তাকীদের ইমাম হওয়া কামনা করা, আল্লাহর কাছে দো'য়া করা এবং মুহসীনদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মধ্যে এবং আল্লাহ তা'আলা মুত্তাকী, ধনী ও গোপনীয় ব্যক্তিকে ভালোবাসেন এ দুইয়োর মধ্যে কোন বিরোধ বা অসঙ্গতি নেই। গোপনীয় ব্যক্তি মানে হলো যার মধ্যে লৌকিকতা নেই। আর যে ব্যক্তি মুত্তাকীদের ইমাম হওয়া এ উদ্দেশ্যে কামনা করে, সে তাদের উপকার করার উদ্দেশ্যে এ দো'আ করেন, লোক দেখানো উদ্দেশ্য নয়। সে ব্যক্তি অবশ্যই আল্লাহর নিকট প্রিয় এবং মুহসীন। আল্লাহই ভালো জানেন।
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00